Last update
Loading...

দ্রব্যমূল্য মানুষের কষ্ট বাড়াচ্ছে by এম হাফিজ উদ্দিন খান

নানা রকম পরিসংখ্যান চিত্রে দেখা যাচ্ছে, দেশের মানুষের আয় বাড়ছে। দেখা যাচ্ছে যে, মানুষের আয়ের ক্ষেত্র বিস্তৃত হচ্ছে। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে নানা রকম প্রশ্নও আছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে আয়ের তুলনায় অনেক বেশি। মানুষের সঞ্চিত অর্থে হাত পড়ছে এবং আয় বাড়া সত্ত্বেও সমাজে এ জন্য ইতিবাচক প্রভাব যেভাবে পরিলক্ষিত হওয়ার কথা, সেভাবে হচ্ছে না। নিকট অতীতে বাংলাদেশ কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশনের (ক্যাব) প্রতিবেদনেও এমন তথ্যচিত্রই উপস্থাপিত হয়েছে। ক্যাবের তথ্যমতে, ২০১৭ সালে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় গত চার বছরের মধ্যে বেড়েছে সর্বোচ্চ। তাদের হিসাব মতে, ২০১৪ সালের পর রাজধানীর দুই কোটির বেশি মানুষকে পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ৭ দশমিক ২৭ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির মুখে পড়তে হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির কারণে ১৬ কোটির মধ্যে ১২ কোটি মানুষকেই অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার পঁচাত্তর শতাংশকেই ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের চড়া মূল্য তাদের বাড়তি আয় খেয়ে ফেলেছে। সর্বাধিক বিরূপ প্রভাব পড়েছে অতিদরিদ্র দুই কোটি মানুষের ওপর। উন্নয়নের সুফল তারা পাচ্ছে না। বাজারে চাল নিয়ে এরই মধ্যে অন্যরকম চালবাজি হয়েছে। সীমিত আয়ের মানুষের খরচের বড় অংশই চলে যায় চাল কেনায়। গত বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চালের দাম বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। আমাদের দেশে প্রায় সব মানুষের খাদ্য ভাত। এমতাবস্থায় চালের দাম বাড়লে তো মূল্যস্ম্ফীতি বাড়বেই। বাজারে আবার চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এ চিত্র গণমাধ্যমে ফুটে উঠেছে। চাল আমাদের বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি পণ্য। এর প্রয়োজন সর্বাগ্রে। অন্যান্য পণ্যের চেয়ে চালের দাম বৃদ্ধি মানুষকে খুব সহজে স্পর্শ করে। চালের বাজার দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আছে অশুভ চক্রের মুঠোবন্দি। এ ক্ষেত্রে আড়তদার, মজুদদার, পাইকার এবং অসাধু চাতাল মালিক মিলে যে চক্র গড়ে উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না নিয়ে যত কথাই বলা হোক না কেন, এর সুফল মেলা ভার। আমাদের দেশে বহুবার আমন-বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। কারণ বাজারমূল্যের চেয়ে সরকার নির্ধারিত মূল্য কম হলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হওয়া তো সম্ভব নয়। এখানে অতীতে এমনটি হয়েছে। এর সুযোগ নিয়েছে অসাধু মহল। পেঁয়াজ নিয়ে ঘটে গেল তুঘলকি কাণ্ড। বাজারে নতুন পেঁয়াজ আসার পর দামের ঊর্ধ্বগতিই লক্ষ্য করা গেছে বেশ কিছুদিন। এখন যদিও নিম্নমুখী, তবুও তা যৌক্তিক প্রত্যাশামতো নয়। চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে দৃশ্যত সরকারের উদ্যোগ-আয়োজন কম না হলেও এসব উদ্যোগ-আয়োজন যে ত্রুটিমুক্ত নয়, বিদ্যমান পরিস্থিতি সে কথাও বলে দেয়। বাজারের ওপর সরকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে কি ব্যর্থ হচ্ছে- বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এমন প্রশ্ন দাঁড়ায়। অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে বাজারে যাচ্ছেতাই কাণ্ডকীর্তি চালাতে না পারে, এ জন্য টিসিবিকে শক্তিশালী করার তাগিদ ইতিমধ্যে বহুবার নানা মহল থেকে এসেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে আশানুরূপ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শুধু যে পণ্যদ্রব্যের দামই বেড়েছে তাই নয়, বেড়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম, পরিবহন ব্যয়, বাসা ভাড়া। অর্থনীতির সূত্রমতে, উৎপাদন ব্যয় ছাড়াও জিনিসপত্রের দাম বাজারের চাহিদা-জোগানের ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে। জীবনযাত্রার অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। প্রয়োজনীয় খাতে ভর্তুকি হ্রাসের বিরূপ প্রভাবও রয়েছে। একটি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পুরো সময়জুড়েই দেশে ৫৮ লাখ ২৩ হাজার টন খাদ্যশস্য (চাল ও গম) আমদানি করা হয়েছিল, যা ছিল ওই সময় পর্যন্ত সর্বোচ্চ আমদানি। ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে খাদ্যশস্য আমদানির পরিমাণ ওই পরিমাণও ছাড়িয়ে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, এবার হাওরাঞ্চলের বন্যায় সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ- এই ছয় জেলায় গত বছরের মে মাস পর্যন্ত সময়ে ২ লাখ ৪১ হাজার হেক্টর জমি তলিয়ে যায়, যা ওই অঞ্চলের মোট আবাদি জমির পরিমাণের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ। এতে ওই অঞ্চলের প্রায় ৬ লাখ টন ধান নষ্ট হয়েছে বলে তখন এক সেমিনারে জানিয়েছিলেন খাদ্যমন্ত্রী। যদিও বেসরকারি সংস্থার হিসাবে হাওরাঞ্চলে বন্যার কারণে প্রায় ২২ লাখ টন ফলসহানি হয়েছে। এ ছাড়া একই সময়ে উত্তরবঙ্গের কয়েকটি অঞ্চলে নেক ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে এতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফসলহানি হয়। এ অবস্থায় দেশের চাহিদা মেটাতে চাল আমদানি করে সরকার। তখন বাজার ও অর্থনীতির বিশ্নেষকরা সতর্ক করে বলেছিলেন, দেশে বিদ্যমান চাহিদার বিপরীতে বর্তমান সরকারের খাদ্য মজুদ বেশ সন্তোষজনক। এ অবস্থায় ফসলহানির পরিমাণ ও কৃষক স্বার্থ বিবেচনা করে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা না হলে সাময়িকভাবে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ভোক্তার কোনো কাজেই আসবে না। অবিবেচনাপ্রসূত কোনো সিদ্ধান্তে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হলে পরবর্তী মৌসুমের উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়বে এবং জনজীবন এর বিরূপ প্রভাব থেকে বাইরে থাকতে পারবে না। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ কথা বলা যায় যে, নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা কিংবা সীমা আরও বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত হলো, বেসরকারি পর্যায়ে চালের মজুদ যতই থাকুক না কেন সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে সরকারের মজুদ বাড়িয়ে খোলাবাজারে চাল বিক্রির কার্যক্রম জোরদার করা। আরও একটি বিষয়ে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা যে, আতপ চাল খোলাবাজারে না দিয়ে সিদ্ধ চাল দেওয়া। কারণ আতপ চাল সিংহভাগ মানুষের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মিলে না। এ জন্য আতপ চাল কিনতে মানুষ আগ্রহ দেখায় না। গরিব মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা তাদের এ ব্যাপারে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অবশ্যই চালের সরবরাহ বাড়ানো দরকার। এই কথাগুলো নানা মহল থেকে এ পর্যন্ত বহুবার বলা হয়েছে। কিন্তু সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরা কথাগুলো তেমন একটা আমলে নিচ্ছেন বলে বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে না। ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে আন্দোলন হয়, কিন্তু জনসাধারণের অধিকারের বিষয় নিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কি আমাদের রাজনীতিকরা কথা বলেন? রাজনীতির মূল লক্ষ্য যদি হয় জনকল্যাণ, তাহলে রাজনীতিকরা কেন এসব দিকে যথাযথভাবে দৃষ্টিপাত না করে ক্ষমতার রাজনীতির ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী? সাধারণ মানুষের বিড়ম্বনা কি তাদের স্পর্শ করে না? মানুষ তো কত রকম বিড়ম্বনা সয়ে চলেছে তাদের চোখের সামনে; কিন্তু তারা তো এসব ব্যাপারে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সরব নন। আগেই বলেছি, চাল অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি পণ্য এবং প্রয়োজন সর্বাগ্রে। অন্যান্য পণ্যের চেয়ে চালের দাম মানুষকে খুব সহজে স্পর্শ করে। চালের বাজার দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আছে অশুভ চক্রের মুঠোবন্দি। এ ক্ষেত্রে আড়তদার, মজুদদার, পাইকার, অসাধু চাতাল মালিক মিলে যে চক্র গড়ে উঠেছে- তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না নিয়ে যত কথাই বলা হোক না কেন, এর সুফল মেলা ভার। আমাদের দেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়লে একটি মহল আরেকটি মহলকে দোষারোপ করে। কিন্তু এসব বিষয় নজরদারির দায়দায়িত্ব যাদের, অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিকারে যাদের কঠোর হওয়ার কথা তারা যদি দোষারোপের গণ্ডিবদ্ধ থাকে, তাহলে মানুষ সুফল আশা করবে কীভাবে! যারা হীন চক্রান্তে জড়িত তাদের চিহ্নিত করে যথাযথ প্রতিকার নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষকে তো এর বিরূপ ফল ভোগ করতেই হবে। এমনটি তো কোনোভাবেই কাম্য নয়। কোনো গোষ্ঠীর হাতে যদি বাজারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা চলে যায়, তাহলে ভোক্তার স্বার্থের চরম হানি ঘটবে, এটিই তো স্বাভাবিক। ভোক্তাকে সুরক্ষা দিতে হলে অবশ্যই সরকারকে বাজার নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতির মানে তো এই নয় যে, যার যা খুশি তাই করার সুযোগ বিরাজ করবে কিংবা ব্যবস্থার পথ সুগম থাকবে। সরকারের সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলদের মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আবারও অত্যন্ত জোর দিয়েই বলি, একই সঙ্গে টিসিবিকে শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। ভোক্তার স্বার্থরক্ষা করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নসহ বাজারের ওপর সরকারের নজরদারি বৃদ্ধি এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের মূলোৎপাটন ভিন্ন গত্যন্তর নেই। মূল কথা হচ্ছে, বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা কিংবা সাধারণ মানুষের আয়ত্তের মধ্যে রাখতে হলে একটি কমিটমেন্ট প্রয়োজন। বাজার নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যত সরকারের তরফে নানারকম পদক্ষেপ ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কার্যত সুফল মেলেনি কিংবা মিলছে না। কেন? এই কেনর উত্তর সন্ধান করাটা জরুরি। এর আগে কয়েক দফায় নিত্যপ্রয়োজনীয় আরও কয়েকটি পণ্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিঘ্ন ঘটিয়েছিল। বাজার নামক স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা কেন খুব জরুরি, আশা করি এর বিশদ ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নিষ্প্রয়োজন। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ভার যদি ক্রমাগত বাড়তেই থাকে তাহলে এর বিরূপ প্রভাব বহুমুখী হতে বাধ্য।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

0 comments:

Post a Comment