Last update
Loading...

অসহায় রোগীদের প্রতি ভালোবাসা by শুভ্র দেব

সরকারি হাসপাতালে সেবিকার চাকরি করেন। নির্ধারিত কাজ প্রতিদিনই করতে হয়। কিন্তু এর বাইরেও গরিব অসহায় রোগীদের প্রতি তাদের অন্য রকম ভালোবাসা কাজ করে। বাড়িতে ভালো রান্না হলে তা হাসপাতালে নিয়ে আসেন। গরিব অসহায় কোনো রোগীর মুখে তুলে দেন। টাকার অভাবে কোনো রোগী ওষুধ কিনতে পারছে না, তাদেরকে ওষুধ কিনে দেন।
হাসপাতালে থাকার জন্য দরকার হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক কিছুর। টাকার অভাবে সবাই কিনতে পারে না। তখন নিজেদের মধ্যে থেকে চাঁদা তুলে কিনে দেন। গরিব রোগীরা যখন তাদের শিশুদের কাপড় কিনে দিতে পারে না, কাপড়ও কিনে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। আবার কোনো বিশেষ দিনে সবার প্রচেষ্টায় খাওয়ানো হয় গরিব অসহায় কিছু রোগীদের। রোগীদের প্রতি এরকমই এক ভালোবাসার বন্ধন তৈরি করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের কিছু সেবিকা।
ঢামেকের বার্ন ইউনিটের কেবিন ব্লক ও তার পাশে গ্রিন ইউনিট ও নন ইকুইটি ফিমেল ওয়ার্ড। ৬৬ বেডের এই ওয়ার্ডগুলোর সেবিকাদের ইনচার্জ হলেন সুলেখা বাসিয়া। তারই নেতৃত্বে কাজ করেন সেবিকা তাসলিমা খাতুন, রেখা বালা, সুমনা দেউড়ি, সুমা আক্তার, হোসনে আরা আক্তার, সুফিয়া আক্তার, শিউলি আক্তার, সুলতানা রাজিয়া, দীপু বারই, শিল্পি আক্তার, পারবন সম্মানিত, শামিমা আক্তার। হাসপাতালের রোস্টার অনুযায়ী সকালে ৬ জন, বিকালে ৩ জন ও রাতে ২ জন সেবিকা দায়িত্ব পালন করেন। মূলত সেবিকাদের ইনচার্জ সুলেখা বাসিয়ার উদ্যোগেই এখানকার সেবিকারা রোগীদের প্রতি ভালোবাসার অন্যরকম এক বন্ধন তৈরি করেছেন। সুলেখা মানবজমিনকে বলেন, আমি সেই ১৯৯৮ সালে নার্সিং ডিপ্লোমা শেষ করেছি। তারপর ধানমন্ডি ক্লিনিক, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে (বারডেম) চাকরি করি। ২০১০ সালে আমার সরকারি চাকরি হওয়ার পর মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের একটি সরকারি হাসপাতালে যোগদান করি। ২০১১ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে আসি। আর ২০১৪ সাল থেকে কেবিন ব্লকের ইনচার্জ হিসাবে কাজ শুরু করি। সুলেখা বলেন, ছোট বেলা থেকে আমার স্বপ্ন ছিল সেবিকা হয়ে রোগীদের সেবা করব। তাই আমি নার্সিংয়ে ডিপ্লোমা করি। চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই গরিব রোগীদের প্রতি আমার অন্যরকম একটা ভালোবাসা কাজ করত। কারণ, যারা দু’বেলা দু’মুঠো ভাত খেতে পারে না। তারা অসুস্থ হলে কিভাবে চিকিৎসার খরচ যোগাবে। বিশেষ করে নারী ও শিশু রোগীদের জন্য আমার অনেক কষ্ট হতো। কারণ, বার্ন ইউনিটে যারা চিকিৎসা নেন তাদেরকে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিতে হয়। আমরা দীর্ঘদিনই তাদেরকে সেবা করি। তাই তাদের সঙ্গে ভালো একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। অনেক সময় চোখের সামনে যখন দেখি তারা ভালো খাবার খেতে পারছে না। কাপড় কিনতে পারছে না। ছোট বাচ্চাদের কিছু কিনে দিতে পারছে না, তখন সত্যিই অনেক খারাপ লাগত। বাসায় যখন ভালো কিছু রান্না করতাম তখন তাদের কথা মনে হতো। তাই ভালো কোনো রান্না হলেই গরিব অসহায় কিছু রোগীর জন্য নিয়ে আসতাম। তাদের খাবার খেতে দেখলে অনেক ভালো লাগত। ভালো খাবার খেয়ে তারাও অনেক খুশি হতো। এমনকি অনেক সময় যারা হাসপাতালের পক্ষ থেকে খাবার দিতে আসে তাদেরকে বলি গরিব অসহায় রোগীদের একটু বেশি খাবার দিতে। সুলেখা বাসিয়া আরো বলেন, শুধু আমি না। রোগীদের প্রতি আমার এরকম ভালোবাসা দেখে এগিয়ে আসেন আমার সহকর্মীরা। তারাও যখন দায়িত্ব পালন করে তখন এসব দেখে তাদেরও খারাপ লাগত। সহকর্মী অনেকেই এসে বলত দিদি এই ওষুধটা কম আছে। সবাইকে দেয়া যাবে না। তখন আমি বলতাম যারা কিনতে পারবে তাদেরকে দেয়ার কোনো দরকার নাই। গরিব অসহায় যারা ওষুধ কিনতে পারবে না তাদেরকেই দাও। এতে করে কেউ রাগ করলে কিছু করার নাই। তারাও তাই করত। কেনার মতো সামর্থ্য যাদের নাই তাদেরকেই ওষুধ দিত।
একই ওয়ার্ডের সেবিকা রেখা বালা মানবজমিনকে বলেন, যখন নার্সিংয়ে পড়েছি তখন জেনেছিলাম একটি ওয়ার্ড হেড টু টো। এর মানে হচ্ছে সেবিকাদের রোগীর ক্ষেত্রে মাথা থেকে পা পর্যন্ত সর্বত্রই সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে। সেটা শারীরিক, মানসিক যাই হোক না কেন। আমরা সেবার জন্য চাকরি নিয়েছি। তাই শুধু শারীরিক সেবা করব কেন? রোগীদের মানসিক অনেক বিষয় আছে সেগুলো যদি আমরা জানতে পারি, বুঝতে পারি তবে বসে থাকব কেন। আমরা চাই একটা রোগীকে সর্বোচ্চ সেবা দিতে। সেটা যেভাবেই হোক না কেন। তাই চেষ্টা করি যখন কোনো রোগীর শারীরিক সমস্যা ছাড়া খাবার, কাপড়, ওষুধসহ অন্য কোনো  সমস্যায় পড়ে তখন তাকে সাহায্য করার। এতে তারাও যেমন খুশি হয়, আমরাও খুশি হই। একটি উদাহরণ দিয়ে রেখা বালা বলেন, আমাদের চেইঞ্জিং কক্ষে রোগী ও বহিরাহতদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আছে। কিন্তু কোনো  রোগী হয়ত মাথায় পানি দিবে বা ওয়াসরুম ব্যবহার করবে। আমরা তাদেরকে ব্যবহারের সুযোগ করে দিই। শিল্পি আক্তার নামের আরেক সেবিকা মানবজমিনকে বলেন, বার্নের রোগীদের সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিতে হয়। তাই তাদের সঙ্গে আমাদের একটা সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। অনেক সময় দেখী কিছু রোগী বাচ্চাদের কাপড় পরাতে পারছে না। এক কাপড় দিয়েই দিনের পর দিন পার করছে। আবার খাবারও কিনে দিতে পারছে না। তখন অনেক খারাপ লাগে। তাই আমরা বাসা থেকে আবার অনেক সময় টাকা দিয়ে কিনে কাপড় ও খাবার দিই।
সেবিকা শামিমা আক্তার মানবজমিনকে বলেন, একটা সময় ছিল, প্রচুর রোগীর গোটা কয়েক সেবিকা সেবা দিত। তাই সব রোগীর বেশি সময় দেয়া যেত না। সেই তুলনায় এখন জনবল কিছুটা বেড়েছে। তাই আমরা রোগীদের কাছাকাছি থাকতে পারি। কাজ করার সময় তাদের অনেক সমস্যার কথা দেখি এবং জানতে পারি। তখন আমাদের সাধ্যমতো সমস্যাগুলো সমাধান করি। বার্নের অন্য ওয়ার্ডের তুলনায় আমাদের কেবিন ব্লক ও আরো দুই ওয়ার্ডে রোগীদের চাপ একটু কম থাকে। তাই আমরা রোগীদের একটু বেশিই সেবা দিতে পারি।
ঢামেকের বার্ন ইউনিটের ছয় তলার গ্রিন ইউনিটের ৬১৯ নম্বর বেডের ৯ বছর বয়সী রোগী রিপন। তাকে সবাই ছোট বৃক্ষ মানব হিসাবে চিনে। মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে রিপন বলে, দিদিরা আমার অনেক যত্ন  করেন। সব সময় আমার খোঁজ খবর নেন। এ ছাড়া আমাকে খাবার এনে দেন। রিপনের মা গোলাপি বলেন, গরিব মানুষ আমরা। ছোটবেলা থেকে আমার ছেলেটা অসুস্থ। অনেকদিন ধরে তাকে এখানে ভর্তি করেছি। টাকার জন্য যখন ওষুধ কিনতে পারি না তখন দিদিরা ওষুধ দেন।

0 comments:

Post a Comment