Last update
Loading...

এই দো-আঁশলা সংস্কৃতির মানে কী? by একেএম শাহনাওয়াজ

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। এমনি এক ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠনের সংকলনে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। শিরোনাম ছিল ‘পরের ভাষায় প্রেমপ্রীতি’। বলার চেষ্টা করা হয়েছিল ইংরেজি মাধ্যমে পড়া আর নিজ ভাষাকে হেয় করে দুই বাঙালির মধ্যে আলাপচারিতায় ঘনঘন ইংরেজি বলার মধ্যে যে সম্মান নেই, হীনমন্যতার প্রকাশ রয়েছে সে কথাটি। উদাহরণ হিসেবে লন্ডনের একটি পার্কের কথা বলেছিলাম। ধরে নেই সেখানে দুই অশীতিপর ইংরেজ বন্ধু গল্প করছিলেন। তরুণ বয়সে তারা ঔপনিবেশিক শাসন যুগে বাংলাদেশে বেশ ক’বছর চাকরি করেছিলেন। সেই সূত্রে কিছুটা বাংলা বলতে পারেন। এখন যদি এই বৃদ্ধ বয়সে দুই বন্ধু আলাপচারিতার মধ্যে মাঝে মাঝে বাংলা শব্দ আর বাক্য বলতে থাকেন, তাহলে বিষয়টা কেমন হাস্যকর হয়ে যাবে। কিন্তু এসব আমাদের তথাকথিত শিক্ষিতদের ছুঁয়ে যাচ্ছে না। নিজেদের এক ধরনের ঠুনকো আভিজাত্য ফুটিয়ে তুলতে নিজ ভাষাকে তুচ্ছজ্ঞান করে যখন পরের ভাষা অপ্রয়োজনে কণ্ঠে ধারণ করেন, তখন একটি অসহ্য যন্ত্রণা হয়। অতি আধুনিক পোশাকে দুটি ছেলেমেয়ে যখন শপিং কমপ্লেক্সে ঘুরে বেড়ায় তখন তেমন বিসদৃশ মনে হয় না। কিন্তু এই জুটিই যখন একই পোশাকে একটি মিলাদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়, তখন খুব উৎকট মনে হবে। আমারও তেমন মনে হয়েছিল ৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা বা রাতের শুরুতে। এনটিভিতে চায়ের আড্ডা নামে একটি অনুষ্ঠান হচ্ছিল। বাঙালি উপস্থাপিকা একজন বাঙালি ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন। দেখলাম ও শুনলাম পুরো অনুষ্ঠানে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ভাগ ইংরেজি বাক্যে ও শব্দে কথা বললেন উভয়ে। যেটুকু বাংলা বললেন, সেটাকে যেন গ্রাস করে ফেলল ইংরেজি। আমি বুঝতে পারলাম না এনটিভি কর্তৃপক্ষ এই ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা ভাষাকে তাচ্ছিল্য করা অমন একটি দোআঁশলা সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে একটি অনুষ্ঠানের অনুমোদন করলেন কেমন করে! যদি ভুল না করি তবে বলতে পারি টিভি চ্যানেল এবং এফএম রেডিওতে বাংলা ও ইংরেজির অদ্ভুত মিশেলের কথামালায় বিরক্ত হয়ে উচ্চ আদালত একটি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। এরপর কিছুদিন বিরত ছিল এসব প্রচার মাধ্যম। এখন আবার আদালতের আদেশ থোরাই কেয়ার করে ইংরেজি শব্দ ঢুকিয়ে অদ্ভুত স্মার্টনেস প্রকাশ করছে মিডিয়ার উপস্থাপক-উপস্থাপিকারা। এফএম ব্যান্ডের রেডিও চ্যানেলগুলোয় উপস্থাপনায় থাকা ছেলেমেয়েরা এখন আর দর্শকদের অনুরোধে গান শোনায় না, ওরা গান ‘প্লে’ করে। টেলিভিশনের অনেক অনুষ্ঠানে বাংলা শব্দ ‘দর্শক’ বলা নিম্নমানের মনে করে ‘ভিউয়ার্স’ বলতেই পছন্দ করে। দুর্ভাগ্য এই, ইতিহাস বলছে হাজার বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে আছে বাংলা। বাংলার শিক্ষার ইতিহাস ইউরোপের চেয়েও হাজার বছরের পুরনো। পাঁচ শতকের শেষ দিকে রোমান সভ্যতা পতনের পর শিক্ষা সংস্কৃতির পতন ঘটে ইউরোপে। নয় শতকের আগে অক্ষরজ্ঞানের চর্চাও হয়নি সামন্ততান্ত্রিক ইউরোপে। তারপর সে যুগের গল অর্থাৎ আজকের আধুনিক ফ্রান্সে গির্জাকেন্দ্রিক প্রাইমারি শিক্ষা শুরু হয়। এগারো শতকের আগে ইউরোপে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়নি। অন্যদিকে আট শতকেই বৌদ্ধ বিহারগুলোয় পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল এ দেশে। স্থাপত্যকলা ও ভাস্কর্য নির্মাণেও অনেকটা উচ্চতায় ওঠে এ দেশ। রচিত হয় সাহিত্য। এমন গৌরবের দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল বলেই বাঙালি মায়ের ভাষার জন্য জীবন দিতে পেরেছে। মাতৃভাষার সম্মান প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। আর বাঙালির এই গৌরবগাথার গভীরতা ছিল বলেই ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই প্রেরণা বাঙালিকে যেভাবে প্রাণিত করেছে, তার শক্তিতে পরবর্তী সব অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সক্রিয় হতে পেরেছে বাংলার মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করতে পেরেছে। অথচ এমন উজ্জ্বল ঐতিহ্য গড়ে তোলা দেশে যারা বাংলা ভাষাকে হেয় করে দোআঁশলা সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করছে এবং নির্লজ্জের মতো প্রচার করছে আজ, সেই সন্দ্বীপের কবি আবদুল হাকিম বেঁচে থাকলে তাদের জন্ম পরিচয় কিভাবে খুঁজতেন আমি জানি না। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন প্রথিতযশা ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী স্যার ছিলেন আমাদের উপাচার্য। এই মার্জিত স্বভাবের শিক্ষক চিত্তাকর্ষক বক্তৃতা করতেন। মনে পড়ে না তিনি বাংলাভাষায় করা বক্তৃতায় একটিও ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেছেন। একই কথা বলা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক খ্যাতিমান লেখক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের বেলায়। মনে পড়ে আমার প্রয়াত শিক্ষক পশ্চিমবঙ্গ নিবাসী ভারতীয় ইতিহাসের গুরুনানক অধ্যাপক ড. অমলেন্দুদের কথা। বলেছিলেন, তোমার থিসিসটি বাংলা ভাষায় বই করে প্রকাশ করবে। অসংখ্য বাংলাভাষী মানুষকে পড়তে দিতে হবে আগে। আমি পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনে যে দেশগুলো বাধা পড়েছিল, সেসব দেশের মানুষের মধ্যে উৎকট ইংরেজি ভাষার প্রতি আনুগত্য প্রকট। নিজ ভাষাকে অচ্ছুত করে ইংরেজি বলাটাকে আভিজাত্যের প্রতীক মনে করা হয়। ইংরেজি ভাষা ও ভার্সনের স্কুলের ছড়াছড়িও এসব দেশেই বেশি। আমাদের এক শ্রেণীর শিক্ষিত মানুষের একটি বড় হীনমন্যতার প্রকাশ দেখা যায় সন্তান বা ভাইবোনের বিয়েতে ইংরেজি আমন্ত্রণপত্র ছাপানো। ভাবতে খুব কষ্ট হয় বাঙালির বিয়েতে বাঙালি আত্মীয় আর বন্ধুদের দাওয়াত করছি পরের ভাষায় বাক্য বিন্যাস করে। অবশ্য স্বাজাত্যবোধ এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষও আছেন। আমি আমার এক পরিচিতজনকে জানি। প্রথম সারির ধনাঢ্য ব্যক্তি। দেশ-বিদেশে অনেক ব্যবসা রয়েছে।
উচ্চশিক্ষিত ভদ্রলোক। পুরো পরিবারেই বাঙালি সংস্কৃতি চর্চা বহাল রেখেছেন। শত ব্যস্ততায়ও ফেব্রুয়ারি মাসে কয়েকদিন দেশে থাকার চেষ্টা করেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে একদিন অন্তত বইমেলায় আসেন। স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসায়িক কারণে অনেক বিদেশি বন্ধুও আছে। তার মেয়ের বিয়েতে তিনি দু’ধরনের আমন্ত্রণপত্র করেছিলেন। বিদেশি বন্ধুদের জন্য ইংরেজি ভাষায় আর বাঙালি নিমন্ত্রিতদের জন্য বাংলা ভাষায়। পশ্চিম ইউরোপজুড়ে দেখেছি এসব উন্নত দেশে ইংরেজি বলা বা লেখা যেন নিষিদ্ধ। পর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি- সর্বত্রই নিজ নিজ ভাষার চর্চা। দূরপ্রাচ্যে চীন, জাপানের মতো রাষ্ট্র ক্রমে বিশ্ব অর্থনীতির নেতৃত্ব নিতে যাচ্ছে, সেসব দেশের অধিকাংশ মানুষ নিজ মাতৃভাষার বাইরে ইংরেজি চর্চায় একেবারেই অপটু। এতে করে কি এসব দেশ পিছিয়ে পড়েছে? একজন শিক্ষিত বাঙালি ইংরেজি ভাষা চর্চায় অপটু হলেও নিজ ভাষায় দক্ষ হলে সারা বিশ্বে চলার মতো ইংরেজি আয়ত্ত করে নিতে পারে সহজেই। ভাষা শিক্ষা খুব জটিল কিছু নয়। এর জন্য ইংরেজি মিডিয়াম আর ভার্সনে পড়ে ইংরেজি ভাষার পণ্ডিত হওয়ার দরকার পড়ে না। কিন্তু এসব মিডিয়ামে পড়ে যখন একজন শিক্ষার্থী মাতৃভাষা চর্চায় দুর্বল থেকে যায়, শেষ পর্যন্ত তার অবস্থা না ঘরকা না ঘাটকা দশায় পৌঁছে। এসব অসুস্থতার মধ্যেই দেশজুড়ে এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছড়াছড়ি। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মাধ্যম ইংরেজি। এর মধ্যে কিছুসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় আছে উচ্চমানের। সেখানে ইংরেজি চর্চার মোটামুটি একটি মান রয়েছে। কিন্তু মাঝারি মানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ইংরেজি চর্চার মান খুবই দুর্বল। কিন্তু ইংরেজিতে উত্তর লিখতে এরা বাধ্য। এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলছিলেন, অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর উত্তরপত্রে ইংরেজি বাক্য গঠন ও বানানে যে পরিমাণ ভুল থাকে তাতে নম্বর দেয়া কঠিন। কিন্তু এরপরও চোখ-কান বন্ধ করে নম্বর দিতে হয়। এমনটিই নিয়ম। কিন্তু এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি বাংলা ভাষায় উত্তর লেখার সুযোগ থাকত তবে শিক্ষার্থীরা আরেকটু সবল হয়ে বেরোতে পারত। আশঙ্কা হয়, আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাববলয় তৈরির অভিপ্রায়ে ইংরেজিভাষী পাশ্চাত্য শক্তিগুলোর একটি গোপন ষড়যন্ত্র চলছে কিনা। এগারো-বারো শতকে দক্ষিণ ভারতের সেন বংশীয় শাসকরা বাংলার সিংহাসন দখল করে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়েছিল বাংলাভাষার দিকে। কারণ এই শক্তিশালী ভাষার বাহনে চড়ে বাঙালির উজ্জ্বল সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য এ দেশবাসীর স্বাজাত্যবোধকে তীব্র করে তুলবে। ফলে প্রতিবাদী বাঙালি ক্ষমতা দখলকারী সেন শাসকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে। তাই দক্ষিণ ভারতের এই ব্রাহ্মণ শাসকরা হামলে পড়েছিল বাংলাভাষার ওপর। সাধারণ বাঙালিকে তাদের মাতৃভাষা ও সাহিত্য বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিল। একই কাজ করতে চেয়েছিল পাকিস্তানি শাসকরা। ওরা বুঝেছিল বাংলাভাষাকে আশ্রয় করে বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য যুগ যুগ ধরে প্রাণিত ও উজ্জীবিত করবে বাঙালি প্রজন্মকে। ফলে নির্বিঘ্নে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর শোষণ চালানো যাবে না। তাই বাঙালিকে নির্বীজ করে দিতে আঘাত হেনেছিল বাংলা ভাষার ওপরে। এখন যুগ পাল্টেছে। এখন সাম্রাজ্য বিস্তার হয় না। হয় অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ। এসব পাশ্চাত্য দেশের নেতারা জানেন আমাদের মতো দেশগুলোর মানুষ তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধারণ করে সচেতন থাকে। সহজে এদের ওপর প্রভাব বলয় তৈরি করা যাবে না। তাই একটি অনুগত প্রজন্ম তৈরি করতে হবে। এ জন্য ভাষার মাধ্যমে প্রভুত্ব বিস্তার করার চেষ্টা তাদের। ভুলিয়ে দিতে হবে বাংলা চর্চা আর ঠোঁটে তুলে দিতে হবে ইংরেজি। এভাবে দেশপ্রেমিক নয়- দোআঁশলা প্রজন্ম তৈরি করতে হবে। ফলে নানা প্রলোভনের মুলো ঝুলিয়ে এদের অঙ্গুলি হেলনে ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ার এত ছড়াছড়ি। বাংলা ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করাটাই বড় উদ্দেশ্য। এটি করতে পারলে একটি দেশপ্রেমবিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী তৈরি করতে পারবে। আর তখনই সম্ভব হবে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের থাবা ব্যাপকভাবে বিস্তার করা। গভীর সমুদ্রে কারও সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অভিলাষও বিনা প্রতিবাদে কার্যকর হবে। আমার মনে হয় এসব আশঙ্কা ও যুক্তিকে আমলে আনার প্রয়োজন রয়েছে। বায়ান্ন আর একাত্তরের মতো স্বাজাত্যবোধ আবার জাগিয়ে তোলা প্রয়োজন। অদ্ভুত দোআঁশলা সংস্কৃতির বিকাশকে প্রতিহত করা উচিত। নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলার জন্য বাংলাভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার পথে সব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করার জন্য সচেতন সবারই সরব হওয়া জরুরি।
ড. একেএম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnaway7b@gmail.com

0 comments:

Post a Comment