Last update
Loading...

চড়ুইগুলো সব কোথায় গেল? by মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী

মুঠোফোনের পর্দায় জীবন এখন বন্দী। প্রকৃতি ও পাখির সঙ্গে বন্ধন ছিঁড়ে গেছে। শিশুরা পাখি দেখে স্ক্রিনে। আর স্ক্রিনের বাইরে প্রাণহীন পুতুল, মনোগ্রামের ছবি, খেলনা পাখি তাদের সঙ্গী। অথচ একসময় চোখ ফেরালেই আমাদের চারপাশে শুধু চড়ুই আর চড়ুই। তাদের ফুড়ুত ফুড়ুত আসা-যাওয়া দেখেই কেটে যেত কত শিশু-কিশোরবেলা। দল বেঁধে আসা, খুঁটে খুঁটে খাওয়া, ঠোঁট ডুবিয়ে পানি পান, হঠাৎ উড়াল, হঠাৎ আড়াল—এত মায়াবী, এত আদুরে পাখি! সারা দিনে একটি চড়ুই পাখি মাত্র পাঁচ থেকে সাত গ্রাম খাবার খায়। কত খাবার আমাদের নষ্ট হয়, বিদেশি কুকুর পুষে কত অর্থের অপচয় হয়, আবর্জনায় কত খাবার ফেলে দেওয়া হয়। সুবোধ চড়ুই পাখি আমাদের জীবন বিঘ্নিত করে না, কাকের মতো ছোঁ মেরে খাবার নিয়ে যায় না। ইঁদুরের মতো গর্ত করে খাবার মজুত করে না। কিন্তু নগরায়ণের দিগন্ত যতই প্রসারিত হচ্ছে, ততই বিলুপ্ত হচ্ছে চড়ুই পাখিদের জলাধার, খাবার, ঝোপঝাড়। ১৯৮৯ সালে ঢাকার বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ছিল ১৮ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০০৯ সালে ২৪ থেকে ৩০ ডিগ্রি এবং ২০১৬ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯ ডিগ্রি। রাত-দিন হাইড্রোলিক হর্নের অসহনীয় শব্দদূষণে চড়ুই আজ সংকটাপন্ন। শব্দদূষণের মাত্রা এখন ঢাকা মহানগরীতে ১৩১ ডেসিবেল পৌঁছেছে। কংক্রিটের এ নগরীতে চড়ুই পাখিরা আজ ছিন্নমূল। নগরায়ণ, ধোঁয়া ও ধুলার আস্তরণ এবং অগণিত এসির আগ্রাসনে চড়ুই পাখি জীবনযুদ্ধকে আরও কঠোর করে তুলেছে। উঠান নেই, বাগান নেই; তবু নগরের ভবনগুলোর কার্নিশ, ছাদ, বারান্দা ও চিলেকোঠায় নিজেদের আবাস গাড়তে সচেষ্ট ওরা। মাত্র পাঁচ–ছয় বছর আয়ুষ্কালের এ পাখি মানুষের আড়াল হতে চায় না, শত সংকটেও এ নগরী তাদের প্রাণপ্রিয় চারণভূমি। তারাও এখন শীতার্ত, ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত। নির্বিচারে চড়ুই পাখি হত্যার পরিণামে ভয়ানক প্রাকৃতিক দুর্যোগের শাস্তি ভোগ করেছিল, তার জ্বলজ্বলে উদাহরণ চীন। চড়ুই ফসলের ক্ষতি করে,
এ ভ্রান্ত ধারণায় ৫০-এর দশকে মাও সে তুংয়ের নির্দেশে লাখ লাখ চড়ুই নিধন করা হয়। কিন্তু চার–পাঁচ বছরের মাথায় চড়ুইয়ের অভাবে শস্যক্ষেত্রে পোকামাকড়ের বিধ্বংসী আক্রমণে খাদ্যসংকটের কবলে পড়ে চীন। দুর্ভিক্ষে মারা যায় প্রায় ২০ মিলিয়ন মানুষ। এরপর আবার শুরু হয় চড়ুই রক্ষার আন্দোলন। একসময়ের সবুজ আঙিনা, মাধবীলতার ঝাড়, ফুলের বাগানে সমৃদ্ধ ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের বাড়িগুলো হারিয়ে যাচ্ছে এ নগরী থেকে। স্থান পাচ্ছে আকাশচুম্বী অট্টালিকা। ভূস্থাপত্যিক এ বিবর্তনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে চড়ুইদের বংশবৃদ্ধি ও টিকে থাকা। মেঘের গর্জনে, মুষলধারে বৃষ্টিতে, কালবৈশাখীর ঝড়ে এরা দলে দলে আশ্রয় নেয় বাসাবাড়ির বারান্দায়, চিপেচাপায়। এ নগরীর হিমশীতলতা, তপ্ত হাওয়া, মশার যন্ত্রণা, তথাপি জীবন-জীবিকার সন্ধানে পেতে চায় মানুষের উষ্ণতা। যত নিঃসীম আকাশ থাকুক, যত অনন্তে ওড়ার ডানা থাকুক, বারবার ফিরে আসে মানুষের কোলাহলে। কীটপতঙ্গ এবং মাছি সাবাড় করে পরিবেশের রক্ষাকবচ হিসেবে অবদান রাখছে এরা। চড়ুই পাখিদের বাঁচতে দিন। তরুণ প্রজন্মের প্রতি অনুরোধ, পড়া আর বিনোদনের ফাঁকে প্রতিদিন দুবেলা ছাদে বা বারান্দায় চড়ুইদের জন্য সামান্য খাবার ছিটিয়ে দাও। দেখবে, তাদের কত আনন্দ, আহ্লাদ। প্রিয় গৃহিণীরা, সাংসারিক ব্যস্ততার মাঝে মিটিয়ে দিন চড়ুইদের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার যন্ত্রণা। এ মহৎ কাজে সন্তানদের অনুপ্রাণিত করুন। বিশাল এ প্রকৃতির রাজ্যে জীবনটা পারস্পরিক, সামষ্টিক। কোনো জীবনই ক্ষুদ্র নয়, কোনো প্রাণীই সামান্য নয়। শুধু জৈব প্রবৃত্তি পূরণের জন্য মানুষের জীবন নয়। আমাদের প্রতিটি ঘরবাড়ি যেন হয় চড়ুই পাখির জন্য পরম মমতায় ভরা ভুবন, নির্ভয় আবাসন। আসুন, কম্পিউটার গেমস আর টেলিভিশননির্ভর যান্ত্রিক বিনোদনের আসক্তি কমিয়ে গড়ে তুলি চড়ুই পাখির সঙ্গে মিতালি। শ্রমনিষ্ঠ এ পাখি সারা দিন নগরজুড়ে খুঁজে বেড়ায় আহার। মানুষের একটু খাবার, একটু আদরে এদের অনাবিল প্রশান্তি। ঘরের বারান্দায়, জানালায় ছোট পাত্রে সামান্য চাল, ভাত, পানি রাখলে চড়ুইদের ভীষণ তুষ্টি। নিয়মিত খাবার পেলে এরা কাছে আসবেই, এটা পরীক্ষিত।
মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী: মহাপরিচালক, দুর্নীতি দমন কমিশন

0 comments:

Post a Comment