Last update
Loading...

বাংলাভাষার এ দুর্দশা কেন? by আ.স.ম জাকারিয়া

নিজস্ব ভাষার মাধ্যমে সত্যিকারভাবে ভাব প্রকাশ করা যায়। মাতৃভাষার মাধ্যমে যত সহজ, সাবলীল এবং সুন্দরভাবে ভাব প্রকাশ করা যায়, অন্য কোনোভাবে তা প্রকাশ করা যায় না। এ জন্য মাতৃভাষা সবার কাছে প্রিয়। প্রিয় মাতৃভাষা রক্ষার জন্য বাঙালিরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ছিল। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি বাংলার ছাত্র, যুবক জনতা ভাষার দাবিতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
সালাম, জব্বার, বরকতের বুকের তাজা রক্তে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষা স্বীকৃত। এটা আমাদের গর্ব। যারা রক্ত দিয়ে জীবন দিয়ে আমাদের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, তারা ধন্য। সে ভাষা নিজের দেশে কতটুকু মর্যাদায় তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে। আন্দোলন করে যারা জীবন দিয়েছে, যে উদ্দেশ্যে রক্ত দিয়েছে, বিনিময়ে কী পেয়েছে? বাংলা ভাষার বর্তমান অবস্থা এবং তার সামগ্রিক প্রয়োগ দেখে প্রশ্ন জাগে এর জন্য কি তারা জীবন দিয়েছে? যেভাবে আমরা বাংলা ভাষার ব্যবহার করছি, চর্চা করছি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করছি, এ জন্য তারা জীবন দেয়নি। তাদের স্বপ্ন ছিল বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সব ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। রাষ্ট্রের দাফতরিক কর্মকাণ্ড অন্য ভাষার ব্যবহার করতে আগ্রহ বেশি দেখা যায়। বাংলায় কথা বলা, এর চর্চা করা আমাদের কাছে বিরক্তিকর ও নিচু মানের বলে মনে হয়। ইংরেজিতে কথা বললে ভদ্র লোক মনে হয়। বিচিত্র আমাদের ভাষাপ্রীতি। যাদের কথা বলার জন্য ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠা করেছে তাদের ভাষার প্রয়োগ চলন, বলন দেখে কষ্ট লাগে। শিক্ষিত লোকদের বাংলা বলার ঢং, শুদ্ধ করে বলতে গিয়ে বিকৃত। ইংরেজির অতিমাত্রায় প্রয়োগ। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে উপস্থাপনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড যা, বাংলায় সহজে বলা সম্ভব তাও অবলীলায় ইংরেজিতে। উপস্থাপকরা বাংলার সাথে ইংরেজি এবং ইংরেজির সাথে বাংলা মিশিয়ে খিচুড়ি উপস্থাপনা করেন, যা রীতিমতো পীড়াদায়ক। বলার কেউ নেই, দেখার কেউ নেই, চোখ থাকতে অন্ধ, কান থাকতেও বধির। প্রশ্ন করতে পারেন ভাষা মিশ্র পদ্ধতিতে উপস্থাপনা করলে দোষ কী? বিভিন্ন ভাষায় তা থাকতে পারে, কিন্তু এ ধরন বাংলায় বেশি। পূর্ববঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ, দুই বঙ্গেই মিশ্র, বিশেষত বাংলা এবং ইংরেজির মাধ্যমে রেডিও টেলিভিশন, সভা, সমাবেশ, বক্তৃতা, বিবৃতি ইত্যাদি চলে। শিল্পী, সাহিত্যিক, নায়ক, গায়ক প্রায় সবার মুখেই এ মিশ্র পদ্ধতির লক্ষণ দেখা যায়। মনে হয়, এ পদ্ধতি তারা উঁচু মানের পদ্ধতি মনে করে ব্যবহার করেন। অন্যেরা বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ বা দুনিয়ার অন্যরা যেভাবে ভাষার প্রয়োগ করুক, এ ব্যাপারে বলার কিছু নেই। কিন্তু বিশেষ করে বাংলাদেশের বাঙালিরা এ ভাবে প্রয়োগ করলে কথা বলতে হয়, কষ্ট লাগে। কারণ এ ভাষাটা রক্ত দিয়ে কেনা, জীবন দিয়ে কেনা। যে ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতার বীজ বোপিত হয়েছে, এ পথ ধরে কাক্ষিত স্বাধীনতা এসেছে সে আন্দোলনের নায়কেরা উপেক্ষিত। জীবন উৎসর্গকারীদের স্বপ্ন অবহেলিত। এ ভাষা ইদানীং কিভাবে চর্চা হচ্ছে, তার দিকে কারো খেয়াল নেই। যাদের এ ক্ষেত্রে করণীয় রয়েছে তারা সবাই উদাসীন রাষ্ট্রক্ষমতায় যখন যারা আসে, সবাই এ ক্ষেত্রে রুটিন মাফিক কাজ করেন। কার্যকর ভূমিকা কেউ রাখে না। মনে হয় ভাষা যেনতেনভাবে বললেই হলো।
মনে করা হয়, দুনিয়া চলছে ইংরেজির ওপর সুতরাং ইংরেজির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে, অন্য সবকিছু পরে। বিশ্ব বাস্তবতার আলোকে ইংরেজি জানার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না, তাই বলে নিজের ভাষাকে তুচ্ছ করে নয় মোটেও। আগে মাতৃভাষার গাঁথুনি, পরে অন্য সব। অঙ্গীকার ছিল, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অভ্যন্তরে প্রশাসনিক সব কাজ বাংলায় চলবে। সব স্তরে বাংলার প্রাধান্য থাকবে। দুর্ভাগ্য, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। বাংলাদেশে এ ভাষা অবহেলিত। হাইকোর্ট নির্দেশ প্রদান করতে হয় সর্বত্র বাংলা ভাষার ব্যবহারের জন্য। ভাষা শহীদের স্মৃতির পবিত্রতা রক্ষার জন্য হাইকোর্ট যেতে হয়, মাতৃভাষা স্মৃতি জাদুঘর করতে হাইকোর্ট লাগে। এর চেয়ে চরম দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে। রাষ্ট্রক্ষমতার লড়াই এর জন্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ লড়াই চলে, ক্ষমতায় যাওয়ার পর এসব আর মনে থাকে না। ‘পক্ষের শক্তি’ ক্ষমতায় গেলেও যে অবস্থা, ‘বিরোধীরা’ গেলেও সে অবস্থা। বর্তমানে প্রশাসনিক তথা দাফতরিক সব কাজ এমপি, মন্ত্রী, উজির, নাজির সবাই বাংলার পরিবর্তে ইংরেজিতে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এমনকি ভদ্রলোকরা সাধারণ আলাপ আলোচনা বাংলার পরিবর্তে ইংরেজিতে বলতে ভালোবাসেন। যাদের হাতে নিয়মনীতি ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ইত্যাদি বাস্তবে কার্যকর করার ক্ষমতা, তারা যদি তা না করে অবস্থা কী দাঁড়াবে? দেশের সর্বত্র বাংলা ভাষা উপেক্ষিত। বিচার বিভাগ, প্রশাসনের সব দফতর, শিক্ষা, সংস্কৃতি সব স্তরে ইংরেজির ব্যবহার সব ধরনের ‘সাইন বোর্ড’ সরকারি, বেসরকারি, সবই ইংরেজি ভাষায় লিখিত। বাংলা ভাষায় যদিও কিছু দেখা যায় তাও আবার বানানে ভুল। মাতৃভাষা বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিশেষ করে এলিট শ্রেণীর কাছে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে গণ্য ইংরেজি যেন তাদের মাতৃভাষার মতো। প্রতি বছর একুশে ফেব্র“য়ারি বইমেলা হয়, বড় বড় কর্তাব্যক্তি এবং রাষ্ট্রের কর্ণধারেরা সুন্দর ভাষায় বক্তব্য উপস্থাপন করেন, ভাষা নিয়ে আশার বাণী শোনান। তারা বলেন, আজকে আমাদের শপথ হোক বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার। বাংলা ভাষার জন্য যারা রক্ত দিয়েছে তাদের রক্তের ঋণ শোধ করার। এ বক্তব্য শুধু কথার কথাই থেকে যায়, বাস্তবে কিছুই হয় না। এমন কিছু মধুর বচন শোনার জন্য পরবর্তী একুশে ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। একুশ নিয়ে, শহীদ স্মরণে ভাষার মর্যাদায় ‘বইমেলা’ হয়, এ নিছক ‘মেলা’। সেমিনার সিম্পোজিয়াম হয়, কথা হয়, বই প্রকাশ ও বিক্রি করা হয়। লেখক, লেখিকার সাক্ষাৎ মিলে; নবীন ও প্রবীণের মিলনমেলা বসে। কিন্তু যে ভাষার শহীদ স্মরণে এই মেলা, তার ব্যাপারে কথা হয়, ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত হয় না। কার্যকরি পদক্ষেপ গৃহীত হয় না। সব কর্মকাণ্ডে বাংলা ভাষার প্রচলন, বাংলার সঠিক বানান, শুদ্ধ উচ্চারণ এসব ব্যাপারে কিছু হয় না। এ জন্য কী করণীয়, কী বর্জনীয় তার সিদ্ধান্ত হয় না। সব বাঙালির কাছে বইমেলা যেন আনন্দের মেলা এবং এক মাসব্যাপী সব স্তরের সব বয়সের বাংলা ভাষাভাষীর বিনোদনের মেলা। অথচ একুশে শোকের মাস, ভাষার প্রতি দায়িত্বের চেতনার মাস। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন ব্যক্তিরা শহীদ মিনারে ঘটা করে ফুল দেন, শহীদদের জন্য মায়া কান্না করেন, অনেক প্রতিশ্রুতি দেন। কার্যত একুশ শেষে সব কিছু ভুলে যান। ক্ষমতার ভিত মজবুত করার জন্য বিভিন্ন স্লোগানের ফানুস উড়ানো হয়; একের দোষ, অন্যের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে। স্বাধীনতার ‘পক্ষ বিপক্ষ’ বিভাজন করে বা হলেও আসল কাজ কিছুই করেন না। এহেন কার্যকলাপ বন্ধ হওয়া উচিত। ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। মাতৃভাষা বাংলাকে স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখা দরকার। বাংলা ভাষা আজ বিশ্ব স্বীকৃত। সুতরাং এ ভাষা যাদের মাতৃভাষা, যারা এ ভাষা রক্তের বিনিময়ে অর্জন করেছে, যে ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে স্বাধীনতা এসেছে, সে ভাষার মান, মর্যাদা, রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার। আমরা যারা এ ভাষায় কথা বলি, তাদের সবাই এ ভাষার পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগের লক্ষ্যে কাজ করা উচিত। বর্তমান রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি, সুতরাং ভাষার সঠিক ব্যবহার, সর্বস্তরে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে বাংলা ভাষার প্রচলন দাফতরিক কাজে বাংলা ব্যবহার। ভাষার অপ-ব্যবহার বন্ধ করার জন্য এবং প্রয়োজনীয় কর্মসূচি গ্রহণ ও রূপায়ণ উচিত। অতি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে, বাংলা ভাষা তার স্বকীয়তা হারাবে। আগামী প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা ব্রাত্যজনের ভাষায় পরিণত হবে। বাঙালির মাতৃভাষা, তাদের কাছেই দ্বিতীয় শ্রেণীর ভাষার স্তরে নেমে যাবে। ইংরেজি ভাষা হয়ে যাবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে শিখন, বলন, চলন ও কথনের ভাষা। সুতরাং সময় থাকতে ‘সাধু সাবধান’।
লেখক : শিক্ষক, শ্রমিক নেতা ও সাংস্কৃতিক কর্মী

0 comments:

Post a Comment