Last update
Loading...

ভাষার মৃত্যু ভাষার জন্ম by হাসান ফেরদৌস

ভাষার মৃত্যু হয় দুভাবে: যখন কোনো ভাষায় কথা বলার মতো কেউ আর বেঁচে না থাকে এবং যখন কোনো ভাষাভাষীর মানুষ নিজেরাই সে ভাষাকে অবহেলা করে। কথা বলার মানুষের অভাবে বাংলা ভাষার মৃত্যু হবে না, কিন্তু এই ভাষাভাষীদের অবহেলায় বাংলা ভাষার কার্যকর মৃত্যুর আশঙ্কা একদম উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইউনেসকোর হিসাব অনুসারে, গত এক শ বছরে মৃত্যু হয়েছে এমন ভাষার সংখ্যা ২০০-এরও বেশি। বর্তমানে যে হাজার ছয়েক ভাষায় পৃথিবীর মানুষ কথা বলে, তার মধ্যে প্রায় ২ হাজার ভাষা হয় আশুমৃত্যুর সম্মুখীন অথবা মৃত্যুর হুমকির মুখে রয়েছে। জাতিসংঘের এই সংস্থার প্রস্তুত ভাষার বিশ্ব মানচিত্র অনুসারে, প্রায় ২০০টি ভাষা রয়েছে, যাতে কথা বলে এমন মানুষের সংখ্যা ১০ জনের কম। আরও শ দুয়েক ভাষা রয়েছে, যাতে কথা বলে এমন মানুষের সংখ্যা ৫০ জনের বেশি নয়।
মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই জানা গেছে, পেরুর আমাজন জঙ্গলে তাউশিরো সম্প্রদায়ের একই নামের ভাষায় কথা বলে এমন মানুষের সংখ্যা এখন মাত্র একজন। সভ্যতার সংক্রমণ থেকে নিজেদের বাঁচাতে তারা আশ্রয় নিয়েছিল এই জঙ্গলে, কিন্তু রোগ-শোক-জন্তুর আক্রমণে তাদের সবাই এক এক করে মারা গেছে। বেঁচে আছে শুধু একজন, সেও মারা যাবে, মৃত্যু হবে আরেকটি ভাষার। বাংলাদেশের অনেক আদিবাসী ভাষার ক্ষেত্রেও সম্ভবত একই ভাগ্য অপেক্ষা করছে। দু-একটি বাদ দিলে বাংলাদেশের অধিকাংশ আদিবাসী ভাষাই বিলুপ্তির অপেক্ষায়। আশো, চিন, খাসি বা কোডার মতো ভাষা, যাতে কথা বলে এমন মানুষের সংখ্যা বড়জোর হাজারখানেক। তাউশিরোর মতো তাদের ভাগ্যেও অপেক্ষা করছে অবধারিত মৃত্যু। সংখ্যায় অপেক্ষাকৃত বেশি এমন আদিবাসী ভাষা, যেমন চাকমা বা গারো, তাদের ভাগ্যও খুব ভিন্ন নয়। অবশ্য কথা বলার লোক নেই বলে এসব ভাষার মৃত্যু হবে তা নয়। বাংলার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এদের পক্ষে অসম্ভব হবে। এসব ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষা রক্ষার কথা মাথায় রেখেই ১৯৯৯ সালে ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ঘোষণা করেছে। পরিকল্পিত উদ্যোগ ও সম্মিলিত চেষ্টার ফলে একটি মৃতপ্রায় ভাষাকেও বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব। এই দিবসের লক্ষ্য বিশ্বের দেশগুলোকে সেই কাজে উৎসাহ জোগানো। হিব্রু ভাষার কথা আমরা জানি। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীনতম এ ভাষাটি কীভাবে জাতীয় পুনর্জাগরণ আন্দোলনের অংশ হিসেবে ফের জেগে ওঠে, সে প্রায় অবিশ্বাস্য এক গল্প। প্রায় একই রকম সমষ্টিগত উদ্যমের ফলে দুই-তিন দশকের চেষ্টায় দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কয়েকটি আদিবাসী ভাষা গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। এসব ভাষায় কথা বলে এমন মানুষের সংখ্যা বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বেড়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে যে ভাষাটি, তার নাম গুয়ারানি। একসময় প্যারাগুয়ের হিস্পানিক ভাষাভাষীর শাসক দল দেশের সংখ্যাগুরু আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের কথ্য গুয়ারানি ভাষার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলাতে থাকে, তার সঙ্গে গুয়ারানির ভাগ্যও। আশি ও নব্বইয়ের দশকে প্যারাগুয়ে একই সঙ্গে হিস্পানিক ও গুয়ারানি ভাষাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে। অর্থনৈতিকভাবে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় হিস্পানিক ভাষাকে বাতিল করার কোনো সুযোগ ছিল না, কিন্তু স্কুলকক্ষে গুয়ারানি শেখার সুযোগ করে দেওয়ায় সব ধরনের মানুষ-শহুরে ও গ্রামীণ, ধনী ও দরিদ্র-গুয়ারানি ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠে। প্যারাগুয়ে এখন একটি দ্বিভাষিক দেশ, হিস্পানিক এখনো সরকারি ভাষা আর গুয়ারানি সেখানে একটি জাতীয় ভাষা। দেশের ওপরতলার মানুষেরা এখনো হিস্পানিককে তাদের পছন্দের ভাষা হিসেবেই গ্রহণ করে, তবে রাজনৈতিকভাবে গুয়ারানির গুরুত্ব বাড়ায় এই দুই ভাষার সাংস্কৃতিক বৈষম্য কমে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে তার সামাজিক মর্যাদা। বাংলা ভাষার মর্যাদার যে আন্দোলন, তার সঙ্গে গুয়ারানির একটি বিচিত্র মিল রয়েছে। একসময় পাকিস্তানের শাসক দল দেশের গরিষ্ঠ জনসংখ্যার ভাষা হওয়া সত্ত্বেও বাংলাকে সরকারি ও জাতীয় ভাষার স্বীকৃতির বদলে তাদের ভাষা হওয়ায় উর্দুকে সরকারি ভাষা বানানোর চেষ্টা করেছিল। এর পরিণাম কী হয়েছিল, তা আমরা জানি। প্যারাগুয়ের মতোই রাজনৈতিক চাপের মুখে তারা বাংলাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাকে সরকারি বলুন আর জাতীয় বলুন, তেমন স্বীকৃতিতে কোনো বাধা রইল না। অথচ বাস্তব সত্য এই যে কাগজে-কলমে স্বীকৃতি পেলেও বাংলা ক্রমে তার কার্যকর গুরুত্ব হারাচ্ছে ইংরেজির কাছে। ইংরেজি ভাষার যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব, বাংলার তা নেই। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা-জ্ঞান তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়।
দোষটা ছেলেমেয়েদের নয়, দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থার। বাংলা শিখে বড় চাকরি মেলে না, ব্যক্তিগত খাতেরমোটা বেতনের চাকরির প্রাথমিক শর্তই হলো ইংরেজি বোলচালে কে কেমন কেতাদুরস্ত। ফলে ব্যয়বহুল হওয়া সত্ত্বেও অভিভাবকেরা যে যাঁর সাধ্যমতো ইংরেজি মাধ্যম স্কুলেই ছেলেমেয়েদের পাঠাচ্ছেন। অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে এমন অসংখ্য পরিবার আছে, যেখানে ছেলেমেয়েরা বাংলার বদলে ইংরেজি বলায় অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এর ফলে শুধু যে বাংলা তার প্রতিযোগিতামূলক ধার হারাচ্ছে তা-ই নয়, এর ব্যবহারিক গুরুত্বও হ্রাস পাচ্ছে। ইংরেজি হয়ে পড়েছে ‘জাতে ওঠার’ মই। প্যারাগুয়ের হিস্পানিক ও গুয়ারানির মধ্যেও ঠিক এমন একটা ঘটনাই ঘটেছে। যারা ক্ষমতায়, তাদের অধিকাংশ হিস্পানিক ভাষাতেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। যারা ভালোভাবে হিস্পানিক বলতে পারে না, শহুরে এলিটদের কাছে তারা উপহাসের পাত্র। এ অবস্থা বদলাতে আদিবাসী মানুষেরা সমান গুরুত্বের সঙ্গে তাদের নিজের ভাষার পাশাপাশি হিস্পানিককেও গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ স্কুলে এখনো বাংলা শিক্ষার প্রধান মাধ্যম। বড় বড় শহরের বাইরে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল হাতে গোনা। তা ছাড়া সেখানে বেতন অনেক বেশি, অধিকাংশেরই তা সাধ্যের বাইরে। এর ফলে ভাষাভিত্তিক একধরনের বিভাজনরেখা তৈরি হয়েছে। ভাষাকে ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে একধরনের বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা। আমাদের বর্তমান বাংলা মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থায় বিষয় হিসেবে ইংরেজি পড়ানো হয় কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থাটি কার্যত এক ভাষিক। বাংলা মাতৃভাষা হওয়ায় শিক্ষার মাধ্যম এ ভাষাতেই হবে, এই প্রশ্নে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজিকে যদি এমনভাবে যুক্ত করা যেত যাতে সবাই বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতেও দক্ষতা অর্জন করতে পারে তাহলে এক ভাষিক শিক্ষাব্যবস্থাকে আমরা দ্বিভাষিক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারতাম। প্যারাগুয়ের মতো পৃথিবীর আরও অনেক দেশেই দ্বিভাষিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। একসময় ভাবা হতো, শিশুদের পক্ষে একসঙ্গে একাধিক ভাষা শিক্ষা কঠিন, তাদের মস্তিষ্কে দুটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষা জায়গা নিলে জ্ঞানীয় বা কগনিটিভ সংকটের কারণ ঘটবে। কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন উল্টো কথা। একই সঙ্গে দুই ভাষার অবস্থানের ফলে জ্ঞানীয় সমস্যা হবে ঠিকই, কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কের নিজস্ব ‘কার্যনির্বাহী ক্ষমতা’ (এক্সিকিউটিভ ফাংশন) রয়েছে, যার মাধ্যমে সে নিজ থেকেই দুই ভাষার দ্বন্দ্ব মিটিয়ে নেয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বাড়তি তৎপরতার ফলে মস্তিষ্ক অধিক সতেজ হয়, দ্বিভাষিক শিশুরা ঠিক সে কারণে একভাষিক শিশুদের চেয়ে অধিক চৌকস। আমি জানি, দ্বিভাষিকতার পক্ষে সাফাই শুনে আমার প্রগতিশীল বন্ধুরা, যাঁদের ছেলেমেয়েদের অধিকাংশই হয় ইংরেজি স্কুলে পড়ে, নয়তো বিদেশে থাকে-প্রতিবাদ করবেন। বাংলা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি বলে ইতিহাস থেকে পাঠ শোনাবেন। কিন্তু তাতে আমাদের বাস্তব সমস্যা মিটছে না। এটাই তো বাস্তব সত্য যে প্রতিযোগিতায় ইংরেজির সঙ্গে বাংলা টিকতে পারছে না, এখনো নয়। অন্যদিকে দেশে একই সঙ্গে দুই ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকায় ভাষাগত বৈষম্য বাড়ছে। এই বৈষম্য রোধের একটা পথ হতে পারে-সবার জন্য একই সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়ে বাংলা ও ইংরেজিতে শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি। সন্দেহ নেই কাজটা কঠিন, সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্পদের অপ্রতুলতা। কিন্তু একে যদি সংকট বলে স্বীকার করি, তাহলে আজ হোক বা কাল, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পা বাড়াতেই হবে!
হাসান ফেরদৌস যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি

0 comments:

Post a Comment