Last update
Loading...

অ্যাটর্নি জেনারেল সব কথা বলেননি by আলী ইমাম মজুমদার

‘এভাবে চললে সততা বজায় রাখা কঠিন হবে’-বক্তব্যটি দেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলের। এ শিরোনামেই প্রথম আলোতে খবরটি এসেছে। অনেক কথার মাঝে এ কথা তিনি বলেছেন নতুন প্রধান বিচারপতির প্রথাসিদ্ধ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। তাঁর মতে, আদালতের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি বিরাট অংশ ইতিমধ্যে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। তাঁর বক্তব্যে কোনো কোনো বিচারপতির বেঞ্চ কর্মকর্তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া, আদালতের রায় নিয়ে জাল-জালিয়াতি, বিশেষ বিশেষ কোর্ট বিশেষ বিশেষ আইনজীবীর হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গসহ বিচারালয়ের অনিয়মের বেশ কয়েকটি দিক উঠে এসেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আমি ঢালাওভাবে হাইকোর্টের সকল বেঞ্চের জন্য এ কথা বলছি না। অনেক বিচারকই বিচারকার্য হাতের মুঠোয় রেখেছেন এবং আদালতের কর্মকর্তারা তাঁদের কথামতো কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। সঠিকভাবে আইনজীবীদের প্রত্যাশামতো তাঁরা তাঁদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কতিপয় বিচারপতির আদালত চালানোর অব্যবস্থার দ্বারা সমস্ত বিচারালয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তার কারণ, সুগন্ধের পরিধি হয় সীমিত অথচ দুর্গন্ধের পরিধি হয় বিস্তৃত।’ তাঁর মতে, বেশ কয়েক বছর ধরে বিচার বিভাগের অবক্ষয় ঘটছে। জনসাধারণের মধ্যে আদালতের যে ভাবমূর্তি ছিল তাতে পরিবর্তন ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি দুর্নীতির বিষয়টি উল্লেখ করেন।
তাঁর মতে, কিছু অসাধু কর্মচারী মামলা শুনানির কার্যতালিকায় পরিবর্তন আনার সুযোগ পান। লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে সামনে-পেছনে নিয়ে যান শুনানির তারিখ। আদালত বসার সময়সীমাও অনেক ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এ অবস্থা চললে বিচারব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিশেষ বিশেষ কোর্ট বিশেষ বিশেষ আইনজীবীর হয়ে গেছে। তাঁদের কেউ কেউ সেসব বিচারকের নিকটাত্মীয়। বিচারপ্রার্থীরা অনেকে জেনে গেছেন, কোন কোর্টে কাকে নিয়ে গেলে মামলায় জেতা যাবে। কোন কোন বেঞ্চে বিচারপতিরা সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েন তাঁর বেঞ্চ অফিসারের ওপর। এ প্রসঙ্গে তিনি সদ্য অবসরে যাওয়া একজন বিচারপতির রায়ের গুণগত দিক এবং এর প্রকৃত রচয়িতার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। এ ধরনের কিছু বিষয়ে তিনি আগেও অভিযোগ করেছিলেন। হয়েছিল তদন্ত। কিন্তু শেষাবধি নথিটি নিখোঁজ হয়ে গেছে বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল। আমরা সবাই জানি, একটি স্বাধীন দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার শেষ আশ্রয়স্থল বিচার আদালত। আর সব আদালতের শীর্ষে সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান। এখানকার বিচারব্যবস্থার যে ভঙ্গুর চিত্র অ্যাটর্নি জেনারেল তুলে ধরলেন, তা ভীতিকর। অবশ্য অবস্থা এখনই নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেছে, এমন কথা কেউ বলবে না। তবে দ্রুত লাগাম টানার সময় এসেছে, এটা সবাই বলতে চান। অ্যাটর্নি জেনারেল যে কথাগুলো বলেছেন সেগুলো একেবারে সবার অজানা, এমন নয়। বিচ্ছিন্নভাবে অনেকেই অনেক কিছু জানেন। খোঁজখবরও রাখেন কেউ কেউ। এ পবিত্র অঙ্গনে ধস নামতে শুরু করেছে, এমন আলোচনা বিভিন্ন প্রসঙ্গে হয়। এমনকি সদ্য সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে চাপ দিয়ে পদত্যাগ করানো হয়েছে, এমন দাবির বিপরীতে স্বয়ং আইনমন্ত্রী বলেছেন, তিনি দুর্নীতি করায় পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এসব অভিযোগ তাঁদের সামনে আসায় তাঁর সহকর্মীরা একই বেঞ্চে বসতে অস্বীকৃতি জানানোয় এস কে সিনহাকে পদত্যাগ করতে হয়, এমনটাই সরকারের দাবি। তবে পদত্যাগের পর সে দুর্নীতির বিষয়ে কোনোরূপ তদন্ত চলছে, এমন কিছু জানা যায় না। অ্যাটর্নি জেনারেলও তাঁর বক্তব্যে সদ্য সাবেক প্রধান বিচারপতির প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছেন। অথচ এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি দুর্নীতি যদি করেই থাকেন তবে পদত্যাগ করলে তো দায়মুক্তি মেলে না। এ ধরনের অভিযোগ অনিষ্পন্ন রেখে সরকার বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে আরও ধূম্রজাল সৃষ্টি করছে। এ ধরনের অতি উঁচু পদে আসীন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে দ্রুত তার আইনসিদ্ধ নিষ্পত্তি প্রয়োজন। দোষী হলে যেমন সাজা পেতে হবে, তেমনি নির্দোষ হলে পাবেন সাধুবাদ। এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে বিলম্ব করা অযাচিত। এ ক্ষেত্রে দুদকেরও আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি আন্তরিকভাবে সক্রিয় হতে হবে সরকারকে। তা যদি না হয় এস কে সিনহার বিরুদ্ধে করা বক্তব্যটি সরকারকে ব্যাখ্যাসহ প্রত্যাহার করে নিতে হবে। অ্যাটর্নি জেনারেল শুধু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা নন, একজন প্রবীণ আইনজীবী। তাঁর অভিজ্ঞতার ভান্ডারে জমেছে অনেক। সরকারি অন্যান্য সেবাদানকারী সংস্থার মতো নিম্ন আদালতগুলো কখনোই পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত ছিল না। দেশের সর্বোচ্চ আদালতেও নিম্নপদস্থ কিছু লোক দুর্নীতি করে আসছিলেন অনেক আগে থেকেই। তবে এ ধরনের অভিযোগ কতিপয় বিচারকের উচ্চাসনকে স্পর্শ করছে গত কয়েক দশক। আর ধীরে ধীরে ঘটছে এর বহুমাত্রিক প্রসার। নিঃসন্দেহে এটা জাতির জন্য অশনিসংকেত।
অ্যাটর্নি জেনারেল তাঁর বক্তব্যে আদালতের অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা ও দুর্নীতির কথা বলেছেন। তবে অদক্ষতার জন্য নিয়োগ-প্রক্রিয়া যে একটি নিয়ামক, এমন কথা বলেননি। আর তা অস্বীকার করারও সুযোগ নেই। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তারা ‘আমাদের লোক’কে নিয়োগ দেয়। সে ‘আমাদের লোক’ যদি দক্ষ, যোগ্য ও সৎ হন তাহলে আপত্তির তেমন কিছু থাকে না। তবে সব ক্ষেত্রে এমনটা হচ্ছে, এরূপ দাবি করার কোনো ভিত্তি নেই। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা কিছু ক্ষেত্রে এর বিপরীতে। উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগ দেওয়ার জন্য একটি আইন করতে সরকার জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্রে অঙ্গীকারবদ্ধ। একটি আইনি বাছাই-প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ হলে অদক্ষতার অভিযোগ কমে আসবে, হ্রাস পাবে অব্যবস্থাপনা। তেমনি দুর্নীতিও কমার কথা। অ্যাটর্নি জেনারেল যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যথাসময়ে যথাস্থানে সাহসের সঙ্গে তুলে ধরছেন, সেগুলো সমাধানের পরামর্শ হিসেবে এমন কিছু বললে আরও ভালো হতো। এ পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর বক্তব্যটি প্রশংসনীয় হলেও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। দুর্নীতি হ্রাসের জন্য বিচারকদের নিয়োগের শুরুতেই এবং প্রতিবছর সম্পদ বিবরণী প্রকাশে যদি আপত্তি থাকে তাহলে অন্তত প্রধান বিচারপতির কাছে দাখিলের নিয়ম করা যায়। তিনি কয়েকজন বিচারকের সমন্বয়ে একটি কমিটির মাধ্যমে এ বিবরণীগুলো তলিয়ে দেখতে পারেন। প্রয়োজনে ব্যাংক বা অন্যান্য সম্পদের হিসাবাদি গোপন অনুসন্ধানের ব্যবস্থা নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রাথমিক তথ্য এলে দুদককে দ্রুততার সঙ্গে তার তদন্ত করতে বলা যায়। দুদকেরও নিজ থেকে এদিকে একটু নজর রাখা সংগত হবে। বিশেষ করে বেঞ্চ কর্মকর্তাসহ আদালতের অন্য কর্মচারীদের বিষয়গুলো দুদক দেখা শুরু করলে একটু টনক নড়বে। তবে এর জন্য দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে দুদকের একটি ফাস্ট ট্র্যাক সেল থাকতে হবে। সূচনায় বিষয়গুলো গোপন রাখা যায়। এজাহার দায়ের পর্যায়ে এলে অন্য মামলার মতো একই নিয়মে চলবে। অবশ্য নৈরাশ্যবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে বলতে হবে, গোটা সমাজব্যবস্থা যে পথে চলছে, বিচার বিভাগও সে পথে চলাই তো স্বাভাবিক। সমাজের প্রতিটি অঙ্গনে অবক্ষয়, দুর্নীতি ও অদক্ষতার ছাপ তাদের স্পর্শ না করাই তো অস্বাভাবিক। কিন্তু আমরা আশাবাদী মানুষ। ব্যক্তিজীবন নশ্বর। কিন্তু জাতি অবিনশ্বর। বিচার বিভাগ একটি দেশের অন্যান্য অঙ্গ সঠিকভাবে চলে কি না, তার নজরদারি করে। অপরাধীকে সাজা দেয়। দুর্বলকে রক্ষা করে। তাই তাদের ঘিরে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। ব্যাধি যেটুকু ছড়িয়েছে তা নিরাময়ের ব্যবস্থা আছে। হয়তো-বা সময় লাগবে। তবে স্থির লক্ষ্যে যেতে হলে সততা ধরে রাখতে হবে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব
majumderali1950@gmail.com

0 comments:

Post a Comment