Last update
Loading...

হকার উচ্ছেদ নিয়ে রাজনীতি by আলী ইমাম মজুমদার

ইংরেজি শব্দ ‘হকার’-এর সাধারণ বঙ্গানুবাদ হচ্ছে ঘুরে ঘুরে উচ্চ স্বরে হাঁক দিয়ে মালামাল বিক্রিকারী। তবে কেমব্রিজ ডিকশনারির সংজ্ঞানুসারে যিনি কোনো ‘পাবলিক প্লেসে’ অনানুষ্ঠানিকভাবে মালামাল বিক্রি করেন, তাঁকে হকার বলা হয়। মনে হচ্ছে, এ সংজ্ঞাটিই অধিকতর ব্যাপকভাবে হকারদের পরিচিত করে আমাদের কাছে। এই হকাররা নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য নিয়ে আবাসিক এলাকায় ঘুরে বেড়ান। কেউবা স্থির হয়ে যান ভ্যানগাড়িসহ কিংবা শহর-বন্দরের জনবহুল স্থানে। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা পসরা সাজিয়ে বসেন রাজপথ-সংলগ্ন পায়ে চলার পথ বা ফুটপাতে। ক্ষেত্রবিশেষে তা প্রসারিত হয় রাজপথের কিয়দংশেও। পথ পথিকের, এটি সম্ভবত পুরোনো দিনের কথা হয়ে গেছে। এখন পথ যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক বিভিন্ন যানবাহনের। আর ফুটপাত? তার কিয়দংশ যায় দোকানপাটের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে। অবশিষ্ট যেটুকু থাকে, তাতে বেপরোয়া গতিতে চলে মোটরবাইক। তার ওপর হকাররা তো আছেনই। ফলে পথচারীর জন্য কার্যত কিছুই থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের নগর-মহানগরগুলোর যানবাহন ও পথচারী চলাচলে অনেকটা বিপর্যস্ত অবস্থা বিরাজ করছে। আর এর প্রতিকার করতে মাঝেমধ্যে চলে হকার উচ্ছেদ অভিযান। পালিয়ে যান তাঁরা। ক্ষেত্রবিশেষে তাঁদের অস্থায়ী স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়। আবার দিন কয়েক গেলেই যে কে সেই। যেন কিছুই হয়নি। অথবা এমন কিছু হয়েছে, যা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ছিল অত্যন্ত সহায়ক। এই হকার বসানো ও উচ্ছেদ নিয়ে চলে রাজনীতি। অবশ্য রাজনীতি হতে পারে যেকোনো সামাজিক অবস্থা নিয়ে। পাশাপাশি এর একটি আর্থিক দিক সম্পর্কেও গণমাধ্যমে কিছু তথ্য আসে। হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা নেওয়া হয়। এই চাঁদার ভাগ যায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা-কর্মীর কাছে। আর এর পরিমাণও নেহাত কম নয়। তাই মাঝেমধ্যে পরিস্থিতির ফেরে তাঁরা হকার উচ্ছেদের কাজে অংশ নিলেও বস্তুত আবার তাঁদের পুনর্বাসনে সহায়ক শক্তি হিসেবেই থাকেন।
রাজধানীসহ দেশের সব শহর-বন্দরে এই চিত্র দেখা যায়। তবে এ বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক শক্তির বিপরীতমুখী অবস্থান খুব একটা দেখা যায় না, যেমনটা দেখা গেল গত মাসের ১৫ তারিখে নারায়ণগঞ্জে। সেখানকার সিটি মেয়র ফুটপাত হকারের দখলমুক্ত করতে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন, এর বিপরীতে প্রকাশ্যে অবস্থান নিলেন একই দলের একজন নেতা। তিনি সাংসদও বটে। আর ব্যাপারটা অহিংস থাকেনি। মেয়রের নেতৃত্বে চলমান মিছিলের ওপর হামলা চালানো হয়। আহত হন মেয়রসহ বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হয় মেয়রকে। আমরা গণমাধ্যমে ঘটনাটি দেখলাম। রাজপথে মেয়র তাঁর নিজ দলেরই এক অংশের নেতা-কর্মীদের হামলার শিকার। হামলাকারীদের পক্ষ থেকে আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহার করা হয়। মেয়রের সাহায্যে এগিয়ে আসেননি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকেরা। এ ব্যাপারে অনেক গড়িমসির পর মামলা নেওয়া হলেও কোনো গ্রেপ্তার না করতে হুমকি আসছে। আমরা চলমান প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারি। উল্লিখিত হামলার ঘটনায় মামলাটির করুণ পরিণতিও অনুমান করা দুঃসাধ্য কোনো ব্যাপার নয়। তবে একটি বিষয় এখানে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। এই হকাররা আমাদের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে অতি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাঁরা পরিবার-পরিজনসহ জীবন-জীবিকা চালান এর আয় থেকে। তাঁরা ত্রাণ সাহায্য কিংবা ব্যাংকঋণও চান না। ক্রেতারাও হাটবাজারের চেয়ে কম দামে পণ্য কিনতে পারেন তাঁদের কাছ থেকে। তাই উপমহাদেশের সব শহর-বন্দরে হকার রয়েছে। রয়েছে লন্ডন, নিউইয়র্কের মতো অনেক সমৃদ্ধ নগরীতেও। তবে আমাদের দেশটিতে যেমন বিশৃঙ্খল অবস্থায় তাঁরা আছেন, তেমন আমাদের প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও নেই। একটি সীমারেখায় তাঁরা ব্যবসা করেন। এতে যানবাহন চলাচল কিংবা পথচারীদের তেমন একটা কষ্ট হয় না। আর আমাদের অবস্থা ভুক্তভোগীরা বুঝতেই পারেন। ক্ষেত্রবিশেষে উচ্ছেদকৃত হকারদের পুনর্বাসনের জন্য মার্কেট করা হয়েছে। কতজন হকার এতে দোকান বরাদ্দ পেয়েছেন আর তাঁদের কতজন টিকে আছেন, এটা গবেষণার বিষয়। প্রকৃতপক্ষে আমাদের শহরগুলোর আয়তন ও রাস্তাঘাট বিবেচনা করলে জনসংখ্যা অনেক বেশি। তেমনি বেশি হকারের সংখ্যা। জনবহুল দেশটির এই বাস্তবতা আমাদের মেনে নিতে হবে। ব্যবসা করার সুযোগ দিতে হবে হকারদের। তবে তাঁদের জন্য দোকান বানিয়ে আমরা বরাদ্দ দেব এমন প্রক্রিয়া খুব সীমিত সুফল দেবে। প্রয়োজন হচ্ছে নির্ধারিত কিছু রাস্তায় চিহ্নিত স্থানের মধ্যে তাঁদের সীমাবদ্ধ রাখা। প্রতিটি শহরের প্রধান কয়েকটি সড়ক হকারমুক্ত করতেই হবে। হকারদের ব্যবসা করার জন্য সব ফুটপাত আর রাজপথের অংশ ছেড়ে দেওয়া যাবে না। নারায়ণগঞ্জের সিটি মেয়রও এমনটাই করতে চাইছেন। এখানে ভিন্নমতও থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে বসে যুক্তিতর্ক দিয়ে সমাধানে আসা অসম্ভব কোনো বিষয় নয়। একই দলের মধ্যে তিনি প্রবল রাজনৈতিক বৈরিতার শিকার। পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে ফুটপাতের হকারদের থেকে অর্জিত অবৈধ আয়ের প্রভাব। সিটি মেয়র পদে তাঁর প্রথম পাঁচ বছরের চলার পথও মসৃণ ছিল না। তাঁকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে কেউ কেউ ছিল সক্রিয়। দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর জয় এদের কাছে কুইনিন গেলার মতো লাগবে, এটাই স্বাভাবিক। আর সুযোগ পেলেই সৃষ্টি করে প্রতিবন্ধকতা।
এটাও বিস্ময়কর নয়। তাই তো আমরা বিভিন্ন ধরনের হুংকার শুনি। জনৈক নেতা নিজেকে বাঘের সঙ্গে তুলনা করে মেয়রকে সাবধান করেছেন। নিষেধ করেছেন তাঁর সামনে হাত না নাড়াতে। আমরা জানি, সময়ান্তরে এই নেতা প্রবল প্রতাপশালী। আবার বৈরী পরিস্থিতিতে দুই দফায় দেশ ছেড়েছিলেন দীর্ঘ সময়ের জন্য। সুতরাং, বাঘের সঙ্গে নিজের তুলনা কতটা যৌক্তিক, একটু ভেবে দেখলে ভালো হয়। এখন হকার উচ্ছেদের মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে মেয়রবিরোধী শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। বিষয়টি নতুন একটি আঙ্গিকে দেখাও প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। জাতীয় নির্বাচন আগামী ডিসেম্বরে হবে বলে জানা যাচ্ছে। সংবিধানের প্রচলিত বিধান অনুসারে এই নেতাও নির্বাচনকালে বহাল থাকবেন সংসদ সদস্য পদে। ক্ষমতাসীন দলেরই সিটি মেয়র রাস্তায় হকার উচ্ছেদের সপক্ষে স্বীয় সমর্থকদের নিয়ে মিছিল করার পথে যে কায়দায় সেই নেতার সমর্থকদের হামলার মুখে পড়লেন, নির্লিপ্ত ভূমিকায় রইলেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা, সে ক্ষেত্রে নির্বাচনকালেও তেমনটাই হবে বলে ধারণা করা যায়। আর এ ধরনের নেতা শুধু নারায়ণগঞ্জে নয়, আছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। আলোচনাটি এখানে প্রাসঙ্গিক এ কারণে যে হকার উচ্ছেদ অভিযানে নিজ দলের সিটি মেয়র যেভাবে দলীয় নেতার বৈরিতার মুখে পড়লেন, তাঁদের প্রভাবে আইন প্রয়োগ করতে প্রশাসন ও পুলিশ অক্ষম হলে আমরা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশা করছি কীভাবে? আর হকার প্রসঙ্গে বলা চলে, জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টি করে তাঁরা নিজেদের ব্যবসা করতে পারেন না। তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন আছে। যানবাহন ও জনগণের চলাচলের পথ যতটা সম্ভব সুগম রাখতে হবে। এর পাশাপাশি হকাররা যাতে নগরের কোনো কোনো স্থানে তাঁদের ব্যবসা চালাতে পারেন, এর সুযোগও প্রয়োজন। বেকারত্ব নিরসন, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রচুর হকার্স মার্কেট করার মতো স্থান ও অর্থ আমাদের নেই। তাই সব দিক বিবেচনায় নিয়েই এমনটা করা সংগত। নারায়ণগঞ্জের সিটি মেয়র একজন বিচক্ষণ ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। আমাদের ধারণা তিনি তা-ই করছেন। আর কোথাও ন্যায়সংগত সমঝোতার প্রয়োজন হলে তিনি তা করতেও দ্বিধান্বিত হবেন না, এটাও ধারণা করা যায়। রাজনীতির কদর্য খেলা নয়, বরং এর মাঝে জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটা আবশ্যক।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব
majumderali1950@gmail.com

0 comments:

Post a Comment