Last update
Loading...

প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং আমাদের মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা by দিলশাদ পারুল

শিক্ষা খাতে অসংখ্য অনিয়ম, দুর্নীতির মধ্যে এই সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো প্রশ্নপত্র ফাঁস। সর্বশেষ ফাঁস হয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশ্নপত্র। দ্বিতীয় শ্রেণিতে যে শিশুরা পড়ে, তাদের বয়স সাত-আট। এখন এই সাত বছরের শিশুটির কি আসলে প্রশ্নপত্র ফাঁস সম্পর্কে কোনো রকম ধারণা থাকার কথা? না, আসলেই নেই। তার মানে, শিশুর অভিভাবক এবং একদল ব্যবসায়ী পুরো প্রক্রিয়াটার সঙ্গে যুক্ত। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অনৈতিক যে বিষয়টা আছে, সেটা নিয়ে অসংখ্য কথা হয়েছে। আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে এই অনৈতিক অবস্থানকে উৎসাহিত করে, সেদিকে একটু দৃষ্টি দিতে চাই। বাস্তবিক শর্ট সাজেশন ও প্রশ্নপত্র ফাঁস—এই দুটির মধ্যে কিন্তু ধারণাগত ছাড়া মৌলিক পার্থক্য নেই। সাজেশন মানে আপনি জানেন না যে আসলেই এইটা আগামীকালের প্রশ্নপত্র কি না? আর ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নপত্র মানে আপনি জানেন যে এটা আগামীকালের প্রশ্নপত্র। ধরেন, একজন শিক্ষার্থী একটি সাজেশন হাতে পেল অথবা একটি প্রশ্নপত্র হাতে পেল, তারপর সেই শিক্ষার্থীটি কী করে? সব কটি উত্তর ঝাড়া মুখস্থ করে ফেলে। তারপর পরীক্ষার হলে গিয়ে মাথায় করে নিয়ে আসা যা মুখস্থ করেছে, সব উগরে দেয়। উগরে দেওয়া বা বমি করে দেওয়া শব্দ ও অক্ষরগুলোর বিনিময়ে খাতায় একগাদা নম্বর পায়। ফলাফলে জিপিএ-৫। যে ভালো সাজেশন তৈরি করতে পারে, সে একটু কম মুখস্থ করে আর যে সাজেশন পায় না, সে একটু বেশি মুখস্থ করে। একই প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি প্রতিটি পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থী ভালো ফল করে স্রেফ মুখস্থবিদ্যা আয়ত্ত করে। স্কুলজীবনের পর আসে উচ্চশিক্ষা কাল। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি গাইড পাওয়া যায়। এই ভর্তি গাইড হুবহু মুখস্থ করে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পান এবং ভর্তি হন। তারপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শিক্ষার্থীরা আবারও গাইড বই মুখস্থ করা শুরু করেন, আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা বড় ভাইদের নোট মুখস্থ করে পরীক্ষায় পাস করেন অথবা ভালো ফল করেন। যে শিক্ষার্থী যত ভালো মুখস্থ করতে পারেন, তাঁর রেজাল্ট তত ভালো। এবার দেখি, মুখস্থ করে আমাদের সমস্ত শিক্ষাজীবন তো পার হলো, চাকরির বাজারের কী অবস্থা? বিসিএস থেকে শুরু করে ব্যাংকের চাকরি, প্রতিটি সরকারি চাকরির পরীক্ষার জন্য গাইড পাওয়া যায় নীলক্ষেতে। সরকারি বাদ দেন, বেসরকারি শিক্ষকতা চাকরির জন্যও গাইড বই কিনতে পাওয়া যায়। বিসিএসে যে শিক্ষার্থী পুরো গাইড বই মুখস্থ, কণ্ঠস্থ করে ফেলতে পারবে, তাঁর বিসিএসে চান্স পাওয়ার সম্ভাবনা মোটামুটি ৯০ শতাংশ। ওই জন্য বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া অসংখ্য ছেলেমেয়েকে দেখবেন, প্রথম বর্ষ থেকেই বিসিএসের গাইড বই মুখস্থ করা শুরু করে দেন। এই মুখস্থনির্ভর ভালো ফলের চক্র চলতে থাকে শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে জীবনধারণের জন্য একটা চাকরি জোগানো পর্যন্ত। এখন আপনার মনে হতেই পারে, মুখস্থ করার মধ্যে সমস্যা কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমি আরেকটা প্রশ্ন করতে চাই আপনাকে। শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? ছাত্র অবস্থায় বেশির ভাগই বলবে শিক্ষক হব, ডাক্তার হব অথবা ইঞ্জিনিয়ার হব। মা-বাবারা এভাবেই ভাবেন এবং সন্তানকেও এভাবেই ভাবান। তার মানে শিক্ষার উদ্দেশ্যের সঙ্গে ভালো জীবিকা সরাসরি যুক্ত এবং পরম্পরার পর পরম্পরা আমরা এভাবে ভাবছি। এটা এখন আমাদের শিক্ষা সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। খুব নিষ্ঠাবান মা-বাবা বা শিক্ষার্থী বলবে, শিক্ষার উদ্দেশ্য মানুষের মতো মানুষ হওয়া।
এখন আমার পরের প্রশ্ন, মানুষের মতো মানুষ হওয়া বলতে আসলে আপনি কী বোঝেন? মোটামুটিভাবে বর্তমানে মানুষের মতো মানুষ বলতে আসলে আমরা নিষ্ঠাবান মানুষই বুঝি। কিন্তু বর্তমানে ডক্টরেট করা লোকও আমাদের দেশে বিরাট মাপের চোর হন। তাঁর শিক্ষা তাঁকে চুরি করা থেকে আটকাতে পারে না। বিসিএস পাস করার পর একটা বিশাল অংশের সরকারি কর্মকর্তা আসলে মনেই করেন চুরি করার পারমিট পেয়ে গেলেন। যে কারণে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পর এত উচ্চশিক্ষিত একজন মানুষ লোহার পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করার মধ্যে কোনো সমস্যা দেখেন না। যে কারণে ডাক্তারি পাস করার পর হাজার হাজার শিক্ষিত ডাক্তার টাকার জন্য রোগী আটকে রাখার মধ্যে কোনো সমস্যা দেখেন না। তার মানে এটা প্রমাণিত যে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মানুষের মতো মানুষ বা নীতিমান মানুষ তৈরি করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ? এখন তাহলে শিক্ষার্থীদের মানুষের মতো মানুষ বা নীতিমান মানুষ বানাতে হলে আসলে কী করতে হবে? এই জায়গা থেকেই আপনার মনে হবে বা অনেক বোদ্ধা ব্যক্তিও বলে থাকেন, স্কুলপর্যায় থেকে নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। অন্য বিষয়ের মতোই ছাত্ররা যদি নৈতিক শিক্ষাও মুখস্থ করে পরীক্ষায় ১০০-তে ৯০ পেয়ে পাস করে, তাহলে? কী মনে হয়, নৈতিক শিক্ষাও যদি ছাত্ররা কোনো কিছু না বুঝে স্রেফ মুখস্থ করেই পাস করে, তাহলে সেই শির্ক্ষাথীরও তো চোর হওয়ার সম্ভাবনাই থেকে যায়, নাকি? তাহলে সমস্যাটা কোথায়? এখন মুখস্থ করার মধ্যে সমস্যা কোথায় এবং শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য কী? এই দুটি প্রশ্নের উত্তর আসলে একই সূত্রে গাঁথা। শিক্ষার উদ্দেশ্য এবং মুখস্থনির্ভর শিক্ষা সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুটি অবস্থান। শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে ইনডিপেনডেন্ট লারনার তৈরি করা, বাংলা করলে যেটা দাঁড়ায় স্বাধীন শিখিয়ে। সেটা কী রকম? নিচু শ্রেণিতে যোগ শিখলেন, বিয়োগ শিখলেন, আরেকটু উঁচু শ্রেণিতে ওঠার পর সরলটা যেন আপনি নিজেই করতে পারেন। মানে, শিক্ষা হচ্ছে এমন একটা টুলস বা মেকানিজম, যেটা আপনাকে জীবনভর সহযোগিতা করবে নতুন কিছু শেখার ক্ষেত্রে। আপনার একটা ধাপের শিক্ষা আপনাকে সহযোগিতা করবে পরের ধাপে স্বাধীনভাবে অন্য কিছু শিখতে। শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানবসভ্যতার জ্ঞানজগতের বিভিন্ন স্তরে আপনি যেন স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারেন, আপনাকে সেই দক্ষতাটা দিয়ে দেওয়া। এই ধাপে ধাপে এগোনোর মধ্যে দিয়েই ব্যক্তির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ নিশ্চিত হয়। এখন একজন শিক্ষার্থী যখনই শুধু মুখস্থ করার মধ্যে আটকে থাকে, তখন তার অন্য সমস্ত বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ (কগনেটিভ ডেভেলপমেন্ট) আটকে যায়। শিক্ষাবিজ্ঞানে ব্লুমস বলে একজন ভদ্রলোকের কগনেটিভ ডোমেইনের ছয়টি ভাগের কথা মোটামুটি শুনে থাকবেন। সেইটা কী রকম? প্রথমে একজন শিক্ষার্থী কোনো একটি বিষয় পড়ল, মানে প্রাপ্ত তথ্যগুলো মনে রাখল (রিমেম্বারিং), পরের ধাপে শিক্ষার্থী যেটুকু পড়ল সেটুকু বুঝবে (আন্ডারস্টান্ডিং), তার পরের ধাপে গিয়ে শিক্ষার্থী যেটুকু পড়ল, সেটা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারার দক্ষতা অর্জন করবে (অ্যাপ্লায়িং), এর পরের ধাপে গিয়ে শিক্ষার্থী সেই যে পঠিত বিষয়বস্তু বা একই ধরনের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করতে পারবে (অ্যানালাইজিং), তারও পরের ধাপে শিক্ষার্থী মূল্যায়ন করতে পারবে (ইভ্যালুয়েটিং) এবং সর্বোচ্চ ধাপে গিয়ে শিক্ষার মধ্য দিয়ে একজন শিক্ষার্থী নতুন কিছু সৃষ্টি করার দক্ষতা অর্জন করবে (ক্রিয়েটিং)। শিক্ষাবিজ্ঞান অনুযায়ী শিক্ষা একজন ব্যক্তিকে সরল থেকে জটিলে ভাবতে সাহায্য করবে। সহজ থেকে কঠিনে বুঝতে সাহায্য করবে। মনে রাখা, মেমোরাইজেশন বা মুখস্থ বিদ্যা হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের একদম প্রথম এবং নিম্নতম স্তর। এরপর আরও পাঁচটি স্তর রয়ে যাচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের। আমাদের সমস্ত শিক্ষাব্যবস্থা বছরের পর বছর ধরে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সবচেয়ে নিম্নস্তরকে এবং প্রাথমিক স্তর মানে মুখস্থ বিদ্যাকেই ক্রমাগত প্রোমোট করে যাচ্ছে। আমাদের শিক্ষাপদ্ধতিতে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের উচ্চতর সব কটি স্তর রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই যখন ব্যবস্থার অবস্থা, তখন সেই ব্যবস্থার ভেতর থেকে চিন্তাশীল মানুষ বের হবে, এটা আমরা আশা করি কীভাবে?
দিলশানা পারুল: শিক্ষা গবেষণা এবং বাস্তবায়ন প্রফেশনাল

0 comments:

Post a Comment