Last update
Loading...

মানবতা এক ভয়াবহ মোড়ে by আলমগীর মহিউদ্দিন

বিগত বছরকে নানাভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর মাঝে যে বক্তব্যটি বারবার উচ্চারিত হয়েছে তা হলো, এটা ছিল ‘ভয় এবং ঘৃণার বছর’। এর অন্যতম কারণ ছিল, এত ভীতিপ্রদ ঘটনা এবং ঘৃণার প্রকাশ এমনভাবে আগে হয়নি। এ জন্য সবাই ভাবছে (অবশ্য এক ক্ষুদ্রগোষ্ঠী ছাড়া) সময় কি এভাবেই মানুষকে নিষ্পেষিত করতে থাকবে? সম্ভবত প্রশ্নটি খানিকটা অবান্তর এ জন্য যে, বিগত দিনগুলোর মাঝেও কখনো অনাবিল শান্তি, স্বস্তি ও আশার ঝলকানি নিরবচ্ছিন্ন থাকেনি। বোদ্ধাজন ও অনুসন্ধানকারীরা সেজন্য শঙ্কা প্রকাশ করেছেন এই বলে যে, ‘মানবতা এখন এক ভয়াবহ মোড়ে’।
তাদের এই আশঙ্কা অমূলক নয় এবং এর জন্য গভীর অনুসন্ধানের প্রয়োজনও সম্ভবত নেই। পথচারী সাধারণ মানুষকে তার সময়ের কথা জিজ্ঞেস করলে প্রায়ই এক সাধারণ জবাব পাওয়া যায়। তা হলো, তার ভরসা সৃষ্টিকর্তার ওপর। স্রষ্টার ওপর বিশ্বাস রেখেও এই নিয়তি এবং ভাগ্যের ওপর মানুষ তখনই ভর করে যখন তার সব চেষ্টা ও কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য ব্যর্থ হয় অথবা পথ হারিয়ে ফেলে। এমনটি হয় এ জন্য যে, ক্ষুদ্র শক্তিশালী গোষ্ঠী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণের জন্য শক্তি ব্যবহার করে তা পরিণামে ব্যর্থ হলে। তখন তারা এই বিশ্বাসের পথ বেছে নিয়ে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করে তাদের স্বার্থ উদ্ধার করতে চায়। তারা জানে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী কোনো না কোনো বিশ্বাসের অনুসারী। তারা তাদের সব দৈনন্দিন জড়বাদী সমস্যার সমাধানে ব্যর্থ হলে এই বিশ্বাসের আশ্রয় নেয় এবং তাদের সব সমস্যার সমাধান না হলেও, মানসিক প্রশান্তি ও স্বস্তির আশ্রয় সেখানে মেলে। তাই বহু পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা ও গ্রন্থে এই সাধারণ বক্তব্য এসেছে যে, ‘বিংশ শতাব্দী ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তাক্ত শতাব্দী। আর প্রচলিত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মানবতার নামে এক নতুন ধর্মের সৃষ্টি হয়, যাকে বলা হয় ধর্মহীনতা বা সেকুলারিজম। যার আচরণে ঘটে সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম রক্তপাত।’ ঐতিহাসিক পল জনসন এ মন্তব্য করে তার বইতে লিখেছেন, ‘এ শতাব্দীতেই সৃষ্টি হয় গণহত্যা (জেনোসাইড) বলে শব্দটি।’ তিনি দাবি করেছেন, এই নতুন ধর্ম (সেকুলারিজম) প্রতিষ্ঠা করতে যে রক্তপাত হয়েছে ইতিহাসে তার তুলনা নেই এবং যেখানেই এই ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা হয়েছে রক্তপাতের মধ্য দিয়ে। জনসনের এ বক্তব্য অত্যন্ত ঋজু এবং বিতর্কিত বলে মনে হলেও, তিনি যে উদাহরণগুলো দিয়েছেন তা অকাট্য। তিনি বলেছেন, ‘ইহবাদ (সেকুলারিজম) অবশেষে নাস্তিকতায় নীত হয়। আর এই মতবাদগুলোতে মানুষের স্থান কোথায়?’
ডারউইনের আবির্ভাব এখানেই। ডারউইনের তত্ত্বে মানুষকে কীটের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এখানে যারা বেঁচে থাকার যোগ্য তারাই থাকবে (সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট)। এখানে মানবতার সংজ্ঞা ধর্মীয় নৈতিকতার দিক থেকে নয়, বরং নিষ্ঠুর ধ্বংসের নিরীক্ষায়। এসব নিরিশ্বরবাদীরা বিবর্তন প্রক্রিয়ায় (ইভলিউশন) বিশ্বাসী। যেমন মানুষ বানর থেকে এসেছে। ইহবাদী প্রবক্তা শেনবার্গ, নিৎসে, ডারউইন, গোল্ড, থ্যাচারে, দু মরিয়র, গুলিভার ওয়েনডেল হোমস প্রভৃতি পণ্ডিত এবং নেতৃবর্গ কেউই মানবতাকে প্রাধান্য দেননি। যেমন শেনবার্গ মন্তব্য করেছেন, ‘মানুষ কী? লোমহীন বানর ছাড়া আর কী?’ ডু মরিয়রের ভাষায়, ‘মানুষ একটি ছোট্ট গ্রহের এক ক্ষুদ্র ফাঙ্গাস।’ অর্থাৎ ইহবাদীদের কাছে মানবতা এবং মানুষ অর্থহীন। ড. জেমস কেনেডি তার ‘হোয়াট ইফ জেসাস হ্যাড নেভার বিন বর্নে’ মন্তব্য করেছেন, ‘তা হলে একটি শূন্যের সৃষ্টি হতো যা পূর্ণ করত স্বৈরাচারী রাষ্ট্র যা হতো এক বন্দিশিবির যেখানে সব অন্যায়ই ন্যায় হতো।’ ড. কেনেডি ইহবাদ মানবতার প্রবক্তা হিসেবে লেলিন, স্টালিন, মাও সেতুং, ফিদেল ক্যাস্ত্রো, মুগাবে প্রভৃতির নাম উল্লেখ করে বলেছেন, ‘এরা এই ইহজাগতিক মানবতা প্রবর্তন করতে গিয়ে কোটি কোটি মানুষ হত্যা করেছেন। অন্তত ১৮ কোটি মানুষ এই সেকুলার সরকারগুলো হত্যা করেছে। এরা হত্যার জন্য অস্ত্র নির্মাণ করেছে, যুদ্ধ বাধিয়েছে, মানুষে-মানুষে সঙ্ঘাতের সূচনা করেছে, যা আজো চলছে। ‘আবার ওয়ার্ল্ড খ্রিষ্টিয়ান এনসাইক্লোপিডিয়ার সম্পাদক ড. ডেভিড ব্যারেট লিখেছেন, ‘স্টালিন চার কোটি লোক হত্যার জন্য দায়ী। স্টালিন ৪৮ হাজার চার্চ বন্ধ করেন এবং সমগ্র চার্চ ব্যবস্থা ধ্বংস করার জন্য চেষ্টা করেন। তেমনিভাবে মাও সেতুং তার গ্রেট প্রলেটারিয়েট রেভ্যুলিউশনের মাধ্যমে ৭২ মিলিয়ন (সাত কোটি ২০ লাখ) লোক হত্যা করেন।.... ১৯৭৫ এ কমিউনিস্টরা ক্যাম্বোডিয়া দখলের পর সে দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ হত্যা করে। এর সাথে যদি কোরিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস, আফগানিস্তান ইথিওপিয়া, অ্যাঙ্গোলা, মোজান্বিক, পোল্যান্ড, চেকোশ্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, কিউবা ও জিম্বাবুয়েতে এই সেকুলার সরকার স্থাপনের জন্য যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়, তার মৃত্যু সংখ্যা যদি এ হিসাবের সাথে যোগ করা হয়, তাহলে তা হবে এক অভাবনীয় সংখ্যা, ড. ব্যারেট মন্তব্য করেন। এর সাথে ভস্টোয়েভস্কির মন্তব্য- ‘যদি সৃষ্টিকর্তা (গড) মৃত হয় (যা নিরশ্বরবাদীরা বলে থাকে), তা হলে সবকিছুই সম্ভব’- মিলিয়ে পড়লে ইহবাদী মানবতার স্বরূপ বেরিয়ে পড়ে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেছেন, ‘এ তত্ত্বের ভয়াবহ দিক হচ্ছে, রাষ্ট্র সর্বময় ক্ষমতাধর হওয়ায় কোনো অন্যায়ের (যা রাষ্ট্র করে থাকে) বিরুদ্ধে আপিল করা যায় না। একজন ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছিলেন, ‘ছোটখাটো যুদ্ধ ও সঙ্ঘাত চালু থাকা ভালো। কারণ স্বস্তি ও শান্তির পরেই আসে মানব বিপর্যয়।
এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের সঙ্ঘাতপূর্ণ এলাকার দিকে দৃকপাত হয়তো এ আশা করা যায়। তবে বিশ্বশক্তির ভাণ্ডারে যে মারণাস্ত্র দিনে দিনে বিশাল আকার ধারণ করেছে, তা অনুসন্ধানকারীদের অধুনা অত্যন্ত ভাবিয়ে তুলেছে। কারণ বিশ্বসঙ্ঘাত ও স্থানীয় যুদ্ধ উভয়ের মূলে প্রথমত, অর্থনৈতিক অসমতা এবং তারপর অস্ত্রের এই সমাহার। এখন এ দু’টিই বিশাল আকারে বিদ্যমান। বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র কটি দেশ এবং এ বক্তব্যকে আরো পরিষ্কার করলে দেখা যাবে, এ নিয়ন্ত্রণ মাত্র কয়েকজনের হাতে। অতীতের সাম্রাজ্য ধারণা কখনো বিলীন হয়নি। এটা কখনো গণতন্ত্রের ওপর সওয়ার হয়েছে, আবার নতুন ধারণার যেমন সমাজতন্ত্র ওপর ভর করেছে। এই ধারণার কারণ গোষ্ঠীস্বার্থ বা কয়েকজনের স্বার্থ। তার পূর্ণ অবয়ব এখন দেখা যাচ্ছে। রাশিয়ান লেখক আলেক্স ভরকিন (Alex Dvorkin) ‘আণবিক যুদ্ধ’ বলে তার বইতে ভয়াবহ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। অনুসন্ধানমূলক এই বিশাল বইতে তিনি দেখিয়েছেন, প্রতি ৮৪ বছরের প্রান্তে আমেরিকাতে একটি ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হয়েছে। এ যুদ্ধটি তখন ধীরে ধীরে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। যেমন ১৭৭৬ তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। ঠিক তার ৮৪ বছর পর ১৮৬০ এ তাদের গৃহযুদ্ধ শুরু হয় (প্রায় ১১ লাখ লোক আহত-নিহত হয়)। এর ৮৪ বছর পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। আবার যদি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করা যায় দেখা যায়, ১৯১৭ এপ্রিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এর ৮৪ বছর পর সে মধ্যপ্রাচ্যের ভয়াবহ সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়ে। নানা হিসাবে এই ‘ওয়ার অন টেররের’ নামে এ পর্যন্ত এ তিন যুগব্যাপী যুদ্ধে মৃতের সংখ্যা কোটির ওপর ছাড়িয়ে গেছে এবং বেশির ভাগই মুসলিম। পশ্চিমা যুদ্ধপ্রীতি সে দেশের মানুষদেরও এখন বিশেষভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। কারণ তারা অতীতে সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য এবং তার পরে প্রভাববলয় স্থিত রাখতে যে যুদ্ধগুলো করেছে, তাতে সে স্থান এবং অন্য দেশগুলো প্রভাবিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ যে অস্ত্রগুলো ব্যবহৃত হয়েছিল, তার ধ্বংস শক্তি ছিল সীমিত। কিন্তু এবারের যুদ্ধে অবশ্যই আণবিক অস্ত্র ব্যবহৃত হবে। তার আঘাত থেকে তারা নিজেরাও বাঁচবে না। তাই প্রশ্ন উঠেছে, ২০১৮ সালে কি যুদ্ধ হবে? নাকি ৮৪ বছর পর ২০২০/২০২৯ হবে সর্বশেষ যুদ্ধ।
বিশ্লেষকেরা বর্তমানের বিশ্বশক্তির হুঙ্কার ধ্বনি নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। যুক্তিবিদ্যা অনুসারে এ যুদ্ধ হওয়া উচিত নয়। কিন্তু অতীতের সব যুদ্ধই হয়েছে যুক্তির বাইরে। আর কোনোটিই পরিকল্পনার পরে নয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে পরিকল্পনাগুলো বিস্তার লাভ করেছে। এবারই প্রথম শক্তিমানেরা পরিকল্পনা প্রস্তুত রেখেছে। তবে তার সাথে তারাই দেখিয়েছে, এসব যুদ্ধের পরিণাম কী হবে। তবে অধ্যাপিকা-লেখিকা এলিজাবেথ কোলবার্ট (স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়) তার অনুসন্ধানী রিপোর্টে বলেছে, ‘মানবমন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যুক্তিকে গ্রাহ্য করে না।’ স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কয়েক শত অনুসন্ধান চালিয়েছে এ বিষয়ে এবং তাদের উপসংহার একই। ‘মানুষ তার বিশ্বাসকে কখনো ভাঙতে চায় না।’ তাই যারা মানুষদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তারা তাদের মাঝে ভয় এবং ঘৃণা সৃষ্টি করে। এটা করতে প্রয়োজন হয় মগজধোলাই এবং এ জন্যই প্রচারণাকে ক্ষমতাসীনেরা সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। ব্রুস ই লেভিন অলটারনেটে লিখেছেন, এগুলো করতে গিয়ে সমাজের মধ্যে বিষাদ, শঙ্কা প্রভৃতি সৃষ্টি করা হয় সবার অলক্ষ্যে। এর পেছনে যেমন ক্ষমতাবানেরা থাকে, তেমনি ব্যবসায়ীরাও জড়িত হয়। কেননা বিভিন্ন সংগঠন সৃষ্টি, বিভিন্ন সঙ্ঘাত সৃষ্টি এবং নিয়ন্ত্রণের নামে তারা আয় করতে পারে। এর মাঝে ঋণ সৃষ্টি একটি। আইএমএফের হিসাবে বিশ্বে এখন ঋণের পরিমাণ ১৫২ ট্রিলিয়ন ডলার (১৫২ লাখ কোটি ডলার)। এ ঋণ যদি প্রতিটি মানুষের মাথায় চাপে তা হবে ২১ হাজার ৭১৪ ডলার। এ ঋণের ফসল উপভোগ করছে বিশ্বের মাত্র এক শতাংশ ক্ষমতাবানেরা। তাদের নেতৃত্বে আছে রাষ্ট্র হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি তার প্রভাববলয় স্থিত রাখতে ২৮ লাখ ৬৭ হাজার মানুষকে অস্ত্র-অর্থ দিয়ে চাকরিতে রেখেছে। সারা বিশ্বের ৮৮ দেশে তাদের আছে ৭৮৭টি ঘাঁটি। সাংবাদিক জেপি সোটিল ট্রুথআউট ইন্টারনেট ম্যাগাজিনে এ বিষয়ে লিখেছেন, ৯/১১ পরে সে দেশ ২০১৮ পর্যন্ত ৫.৬ ট্রিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা বাজেটে অস্ত্র কেনার জন্য ব্যয় করেছে। এত অর্থ বিশ্বের সব দেশের (রাশিয়া, চায়না ছাড়া) বাজেট একত্রিত করলেও হবে না। এত অর্থ এবং অস্ত্র কেনার ব্যয় বিশ্ব অর্থনীতিকেও ভারাক্রান্ত করছে। বিশ্বের ইতিহাসে এসব রাষ্ট্র শাসন এবং শোষণের জন্য এর ব্যবহার করেছে বারবার। বেশির ভাগ সময় শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। যেমন আফগানিস্তানে গণতন্ত্র এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করে। গত ১৫ বছর ধরে সেখানে যুদ্ধ চলছে এবং ১৪ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। তার সাথে সে অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু অস্ত্র নির্মাতা এবং আক্রমণকারী দেশগুলো লাভবান হয়েছে। কিন্তু শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। এখন বিশ্ব দু’ভাগে বিভক্ত এবং তাদের নেতৃত্বে আছে একদিকে রাশিয়া-চীন। অপর দিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শক্তিবর্গ। দু’দলই বিশাল আণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের অধিকারী। তাদের মানসিকতা প্রায় একই। তারা ভাবে বিশ্বকে তারা কিনে নিতে পারে অথবা ভয় দেখিয়ে বশে রাখতে পারে। তাদের হুমকি-ধামকিও চলছে এখন। তাহলে কি যে মহাপ্রলয়ের বক্তব্য বারবার বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে এবং বিভিন্ন ব্যক্তিরা দিয়েছেন, তা সত্যি হতে চলেছে? এই আশঙ্কাকে বাড়িয়ে দিয়েছে সাম্প্রতিক সিআইএ এবং মার্কিন সরকারের নেতৃত্বের বিভিন্ন বক্তব্য এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়া এবং চীনের জবাব।
এর সাথে যোগ দিয়েছে ‘এটমিক সাইনটিস্টদের’ বুলেটিন। এই বুলেটিনের ঘড়ি এবার আরো দু’ঘর বাড়িয়ে মধ্যরাতের কাছাকাছি গেছে। কাঁটা আর দু’মিনিট বাড়ালে মধ্যরাত বা আণবিক মহাপ্রলয় হবে বলেছে এ বুলেটিন সৃষ্ট। এটি ১৯৪৭ সালে স্থাপন করা হয় আণবিক বোমা কখন ব্যবহার হবে সে সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারণের জন্য। উত্তর কোরিয়া যেমন তার আণবিক বোমাসমৃদ্ধ মিসাইল প্রস্তুত করেছে, ঠিক তেমনি আণবিক মিসাইলসমৃদ্ধ মার্কিন রণতরীগুলো সে দেশসহ তাদের সব ঘাঁটিকে সতর্ক করেছে। যুক্তিবাদী এবং অনুসন্ধানকারীরা নানা উপাত্ত দিয়ে বলেছেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রচলিতভাবে হবে না। আবার অন্যরা বলছেন, কোনো যুদ্ধই পরিকল্পনা করে হয়নি। সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মন্তব্য। তিনি বলেছেন, তার টেবিলে রয়েছে মিসাইল চালানোর বড় লাল বোতাম। তার বক্তব্যের সাথে সাথে অপর পক্ষও সেই তাদের বোতামের সতর্কতা দিয়েছে। এ জন্য সবাই বলেছেন, কেউ বোতাম টিপবে না। কিন্তু যদি এমনটি হয়, গল্পচ্ছলে ভুলে বোতামে হাত পড়ে চাপ লাগল এবং সব ঘাঁটি তৎক্ষণাৎ সক্রিয় হয়ে গেল, মিসাইল ছুড়তে থাকল? কী হবে তখন? হঠাৎ মহাপ্রলয় শুরু হবে। লক্ষণীয় বিষয় হলো সিরিয়ায় মার্কিনি দলের বিদ্রোহীরা রাশিয়ান প্লেন গুলি করে ভূপাতিত করে এবং রাশিয়ান পাইলটকে হত্যা করে। অর্থাৎ মার্কিন-রাশিয়া এখন মুখোমুখি। যদিও গত কয়েক দিনে এতে কোনো পক্ষ প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। রণপল ইনস্টিটিউটের ড্যানিয়েল ম্যাক অ্যাডামস এবং রুশ-আমেরিকান সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ স্টিফেন কোহেন সমগ্র অবস্থা আলোচনা করে বলেছেন, ‘দু’দলের কেউই যুদ্ধ চায় না। তবে জটিল ঘটনাবলির মাঝে ছোট একটি ভুল অথবা অমনোযোগের কারণে একটি মিসাইল উড়লে-অপরগুলোও উড়তে থাকবে। সে অবস্থায় কেউই বিজয় দেখার জন্য থাকবে না। এই ভুলগুলোর ওপর তাই সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সব বক্তব্যের সার হলো, জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে তারা যেন লোভী যুদ্ধবাজ শোষকদের ক্ষমতায় না বসায়, বিশেষ করে আণবিক শক্তির অধিকারী দেশগুলোতে। তাহলে মানবতা ভয়াবহ মোড় থেকে স্বস্তি ও শান্তিতে ফিরবে।

0 comments:

Post a Comment