Last update
Loading...

একুশের চেতনা শিক্ষাক্ষেত্রে বেদনা by মো. সিদ্দিকুর রহমান

একুশের শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতি নিজেকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে প্রাপ্ত স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র অর্জনের মূলে ছিল একুশের চেতনা। একুশ মানে মাথা নত না করে শির উন্নত করে এগিয়ে যাওয়া। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল এ দেশের শিক্ষাসহ মৌলিক সব অধিকার ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার মাঝে নিশ্চিত করা। দুর্ভাগ্যজনক, একুশ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজ নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল এ দেশের মানুষের জন্য সোনার বাংলা গড়ে তোলা। সে লক্ষ্যে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে উপলব্ধি করেন, ধ্বংসপ্রাপ্ত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সন্তানদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে সোনার বাংলা গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে দুঃস্বপ্ন। সেদিন রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূন্য থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন তিনি। প্রায় দেড় লাখ শিক্ষক সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা পান। সাধারণ মানুষের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগের অভাব এবং পোস্ট অফিসের পিয়নদের মাধ্যমে অসহায় প্রাথমিক শিক্ষকদের সামান্য বেতনপ্রাপ্তি তার নজর কেড়ে নেয়। সাধারণ মানুষ ও প্রাথমিক শিক্ষকদের সেই প্রিয় ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধুর শাহাদতবরণের পর প্রাথমিক শিক্ষকদের ওপর ১৯৮০-৮১ সালে বেসরকারীকরণের ঝড় নেমে আসে। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির আন্দোলনে শিক্ষকদের বেসরকারীকরণের এ দুর্যোগ স্তিমিত হয়ে পড়ে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিনামূল্যে বইসহ অসংখ্য অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে প্রশাসনের কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহলের কর্মকাণ্ড। তারা একুশের অহংকারকে উজ্জীবিত করার পরিবর্তে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তোষণ নীতিতে ব্যস্ত। শিক্ষার মধ্য দিয়ে আগামী প্রজন্ম সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠুক, সংশ্লিষ্ট অনেকের মাঝেই এ ভাবনা দৃশ্যমান নয়। প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও পথভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। মাঝ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা।
যার অন্যতম চ্যালেঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান সময়সূচি। এ সময়সূচি বিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষার্থীশূন্য করে ফেলছে। উপবৃত্তি টিফিন সহায়ক হলেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এসব ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়মুখী করতে সক্ষম হচ্ছে না। খোদ রাজধানী ঢাকায় পরিদর্শন করে দেখা যায়, এক শিফটের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির করুণ দৃশ্য। সকাল ৯টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত শিশু শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় নামক ‘হাজতখানায়’ থেকে শুধু বিস্কুটজাতীয় হালকা খাবার বা উপবৃত্তির ১০০ টাকা প্রতি মাসে পায়। এ সামান্য প্রাপ্তি শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের সন্তুষ্ট করার জন্য পুরোপুরি সহায়ক নয়। এই সময়সূচি শিশু নির্যাতনের সমতুল্য। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ প্রাথমিকে যেন ‘জম্ম থেকে জ্বলছি’ প্রবাদের মতো। নদীর একূল গড়ে ওকূল ভাঙার মতো। অহরহ অবসর গ্রহণ, অন্যত্র চলে যাওয়া এবং অন্যান্য কারণে বছর না ঘুরতেই বিপুলসংখ্যক শূন্যপদ সৃষ্টি হয়। নিয়মিত নতুন শিক্ষক নিয়োগ না করে বছরের পর বছর শিক্ষকশূন্য রেখে প্রাথমিকের শিক্ষকদের অনেকেটা জোড়াতালি দিয়ে ক্লাস নিতে হয়। শিক্ষার্থীদের যথাযথ সময় না দেয়ার বিষয়ে শিক্ষকের কোনো জবাবদিহি নেই। কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে সংযোগের সামান্য ত্রুটি হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা মহাবিপদ হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষাদানবহির্ভূত কাজের ব্যাপকতায় শিক্ষকের ইচ্ছা থাকলেও ঠিকমতো পড়াতে পারেন না। ফলে আগামী প্রজন্ম বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার অধিকার থেকে। প্রশাসনসহ সর্বস্তরের মানুষ সমস্বরে নিন্দা জানায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। শিক্ষা ব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণে অভিভাবকরা ছুটছে নোট-গাইড, কোচিং সেন্টারের দিকে। ৩৭ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিরাজ করছে নানা অব্যবস্থাপনা ও সংকট। স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পর আজও কোথাও কোথাও খোলা আকাশের নিচে পাঠদান করার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। খোদ রাজধানীতে অনেক বিদ্যালয় বেদখল হয়ে আছে। এক বা দু’জন শিক্ষক দ্বারা পাঠদান চলছে দেশের অসংখ্য বিদ্যালয়ে। এক-দুই কক্ষের বিদ্যালয়ের সংখ্যাও কম নয়। প্রাথমিক শিক্ষা আজ শিক্ষার্থীনির্ভর না হয়ে কর্মকর্তামুখী। এর থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে মেধাবী ও অভিজ্ঞদের এ পেশায় ধরে রাখতে প্রাথমিক ক্যাডার সৃষ্টির বিকল্প নেই। গ্রেডমুখী পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন করে জ্ঞানমুখী শিক্ষা পদ্ধতির বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস ব্যাধি নির্মূল করতে হবে। সব দোষই যে শিক্ষকদের, তা বলা যথার্থ হবে না। শুধু শিক্ষকদের নয়, শিক্ষার সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট সবার অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই সময়ের প্রত্যাশা। সর্বস্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত না করে শুধু শিক্ষকদের অপবাদ দেয়ার বিরুদ্ধে রূখে দাঁড়াতে হবে। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থীই বাংলা ভাষার যথাযথ চর্চা করে না। তারা বাংলা বানান লিখতে ভুল করে, শুদ্ধভাবে বাংলা উচ্চারণ করতে পারে না। এটি কি একুশের চেতনাবিরোধী নয়? নতুন প্রজন্ম বাংলা ভাষার যথাযথ চর্চা করবে, স্বাধীন বাংলাদেশে এটিই একুশের প্রত্যাশা ছিল। শিক্ষার এ বেহাল দশা দেখে একুশের চেতনা আজ ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। এসব অব্যবস্থা দূর করার মাধ্যমে একুশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হোক, এটাই প্রত্যাশা।
মো. সিদ্দিকুর রহমান : আহ্বায়ক, প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম
siddiqsir54@gmail.com

0 comments:

Post a Comment