Last update
Loading...

রক্তে ভেজা পিলখানা by ইকতেদার আহমেদ

বাংলাদেশের সেনাবাহিনী পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সেনাবাহিনীর মতো কর্মকর্তা ও সাধারণ সৈনিক সমন্বয়ে গঠিত। বাংলাদেশের বিভিন্ন বাহিনী ও বিভাগের মধ্যে সেনাবাহিনীতে কর্মকর্তার সংখ্যা সর্বাধিক। সরকারের বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সাংবিধানিক সংস্থা বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) মাধ্যমে প্রারম্ভিক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে পর্যায়ক্রমে পদোন্নতির মাধ্যমে সর্বোচ্চ সচিব পদে পৌঁছার সুযোগ আছে। অনুরূপ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদেরও আইএসএসবির মাধ্যমে মনোনীত হওয়ার পর সামরিক একাডেমিতে প্রশিক্ষণ শেষে প্রারম্ভিক পদে যোগ দিয়ে সর্বোচ্চ জেনারেল পদ অবধি যাওয়ার সুযোগ আছে। সরকারের বিভিন্ন ক্যাডার পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিপিএসসি কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে। বর্তমানে যে হারে কোটা সংরক্ষণ করা হয়, তা হলো শতকরা হিসাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-৩০, জেলা-১০, মহিলা-১০, উপজাতি-৫ ও প্রতিবন্ধী-১।
এতে কোটার পরিমাণ দাঁড়ায় শতকরা ৫৬। সরকারের ক্যাডার পদ ছাড়া অন্য সব পদ এবং সরকারের অধীনস্থ বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে সবপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও কোটা পদ্ধতি অনুসৃত হচ্ছে। বিগত দুই দশকের অধিক সময় ধরে সরকারি কর্ম কমিশনের নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হয়ে আসছে। এসব অভিযোগের যে বস্তুনিষ্ঠতা আছে, তা দেশের সচেতন মানুষ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছ কার্যকলাপ এবং কোটার ভিত্তিতে অর্ধেকেরও অধিক পদ পূরণ হওয়ার কারণে বিভিন্ন ক্যাডার পদসহ সরকারি চাকরিতে মেধাবীদের নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এ কারণে, সার্বিক বিবেচনায় সরকারের বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দক্ষতার মান ক্রমনি¤œমুখী। এ দিক থেকে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের তুলনা করা হলে তাদের মান সরকারের যেকোনো ক্যাডারের ও বিভাগের কর্মকর্তাদের চেয়ে ঊর্ধ্বমুখী। এর পেছনে মূল যে কারণ, সেটি হলো, সেনাবাহিনীতে নিয়োগপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ এবং এতে কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না। একজন সেনাকর্মকর্তা প্রারম্ভিক পদে যোগদানের পর অনেকটা স্বাভাবিক নিয়মেই মেজর অবধি পদোন্নতি লাভ করেন। পরবর্তী পদোন্নতিগুলো অতীতে স্বাভাবিক নিয়মে জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও মেধার ভিত্তিতে নির্ধারিত হতো। কিন্তু বর্তমানে সচিবালয়ের উপ-সচিব ও তদূর্ধ্ব পদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও মেধার চেয়ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যেমন অধিক বিবেচ্য, ঠিক তেমনি সেনা কর্মকর্তাদের ঊর্ধ্বতন পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয় জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও মেধার চেয়ে বেশি গুরুত্ব যাতে না পায়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। সেনাবাহিনীর সৈনিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের অন্যান্য বিভাগের নিয়োগের মতো কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এ পদটিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মানসিক যোগ্যতার চেয়ে শারীরিক যোগ্যতা অধিক গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কোটা পদ্ধতি সার্বিক বিচারে নিয়োগের মানের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে না।বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষী হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করে দেশের জন্য অশেষ সম্মান কুড়িয়ে আনার পথ প্রশস্ত করে চলেছেন।
সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা সেনাবাহিনী ছাড়াও দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন বাহিনীতে প্রেষণে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে দায়িত্ব পালনের সুযোগ লাভ করে থাকেন। এসব বাহিনীর মধ্যে একটি হলো আগেকার বিডিআর, যা বর্তমানে বিজিবি নামে অভিহিত। এ ছাড়াও আছে র‌্যাব, আনসার প্রভৃতি। বিডিআর বাহিনীর সৃষ্টিলগ্ন থেকে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাপর্যায়ের বিভিন্ন পদধারী এর প্রায় শতভাগ কর্মকর্তা পদে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা এরূপ প্রেষণে নিয়োগপ্রাপ্ত হলে তিনি নির্ধারিত সময় পরে নিজ বিভাগে প্রত্যাবর্তন করেন। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বাহিনীর ইতিহাসে চরম কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা ঘটেছিল, ওই দিন বিডিআরের সৈনিক ও বিভাগীয় কর্মকর্তাদের হাতে ঢাকায় বিডিআর সদর দফতর পিলখানায় দরবার অনুষ্ঠান চলাকালে সেনাবাহিনীর প্রেষণে নিয়োগপ্রাপ্ত ৫৭ জন কর্মকর্তা মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। তাদের মধ্যে বাহিনীটির প্রধান, সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল পদের কর্মকর্তা থেকে নি¤েœ ক্যাপ্টেন পর্যায়ের কর্মকর্তাও ছিলেন। এ নির্মম হত্যাযজ্ঞে যে ৫৭ জন কর্মকর্তা নিহত হয়েছিলেন, তারা সবাই সেনাবাহিনীর মেধাবী ও চৌকস কর্মকর্তা। নিহত ৫৭ জন কর্মকর্তার মধ্যে লে. কর্নেল পদমর্যাদার একজনের সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। তা ছাড়া, ক্যাপ্টেন পদধারী অপর এক কর্মকর্তার বিয়ের অনুষ্ঠানে আমার যোগ দেয়ার সুযোগ হয়েছিল। সুনামগঞ্জে জেলা জজ পদে কর্মরত থাকাকালে একদিন ট্রেনে সিলেট থেকে ঢাকা আসার পথে সেনাবাহিনীর মেজর পদধারী একজন কর্মকর্তার সাথে আমার পরিচয় হয়। আলাপ আলোচনার একপর্যায়ে তিনি যখন জানতে পারেন আমি সুনামগঞ্জের জেলা জজ, তখন তিনি আমাকে বলেন, তার বড় ভাই হুমায়ুন মঞ্জুর সুনামগঞ্জ জেলা জজ আদালতের একজন আইনজীবী। ট্রেনে ভ্রমণকালে আইনজীবী হুমায়ুন মঞ্জুরের ভাই এলাহী মঞ্জুরের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ হয়েছিল। আলাপকালে তার জ্ঞানের গভীরতার বিষয়ে আমার ধারণা লাভের সুযোগ ঘটে। তা ছাড়া স্বল্প পরিচয়ে তাকে যতটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছি, তাতে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে- তিনি অত্যন্ত অমায়িক এবং অগ্রজ, সতীর্থ ও অনুজদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, বন্ধুবৎসল ও স্নেহপ্রবণ।
পথে আমরা যে দু-একবার চা পান করেছি, বিল পরিশোধে আমার শত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তার স্বভাবসুলভ নম্রতায় আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি কাজটি সেরে ফেলেন। সত্যিই তার আচার-আচরণ ও কথাবার্তা ছিল মনোমুগ্ধকর এবং দৈহিক অবয়বে একনজরে তিনি ছিলেন সুদর্শন। এরূপ একজন ব্যক্তির অকালমৃত্যু আমাকে ব্যথিত ও মর্মাহত করেছিল। তার এ মৃত্যু শুধু পরিবারের জন্য নয়, সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশের জন্যও ছিল অপূরণীয় ক্ষতি। উপরিউল্লিখিত ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার কর্মকর্তার নাম ছিল মাজহার। তিনি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদের জামাতা। নূর মোহাম্মদের জ্যেষ্ঠ কন্যার বিবাহের অনুষ্ঠানটি সেনাকুঞ্জে হয়েছিল এবং বিয়ের দিন ছেলেটির আকর্ষণীয় চেহারা ও শারীরিক গঠন দেখে কনে পক্ষের আমন্ত্রিত অতিথিরা নূর মোহাম্মদকে একজন ভাগ্যবান শ্বশুর হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। অতিথিদের মুখে স্তুতিবাক্য শুনে নূর মোহাম্মদ তার স্বভাবসুলভ চাপা হাসির বহিঃপ্রকাশে নিজ মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু এক বছর না গড়াতেই নূর মোহাম্মদের সেই হাসি তার বন্ধুমহল ও শুভানুধ্যায়ীদের জন্য যে বিষণ্নতার কারণ হয়ে দাঁড়াবে, সেটি সে দিন কেউ উপলব্ধি করতে পারেনি। মাজহার বিডিআরের ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। যেকোনো বাহিনীপ্রধান ব্যক্তিগত সচিব নিয়োগের ক্ষেত্রে সব সময় মেধাবী ও চৌকসদের পছন্দ করে থাকেন। ক্যাপ্টেন মাজহারের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। নূর মোহাম্মদের জামাতার মৃত্যুর পর সমবেদনা জানানোর জন্য তার বাসভবনে গিয়েছিলাম। সেদিন নূর মোহাম্মদ জামাতার দাফন সম্পন্ন করে সবে তার বাসভবনে ফিরে এসেছেন।
আলাপকালে ক্যাপ্টেন মাজহারের মতো একজন রুচিশীল ও ব্যক্তিত্ববান এবং সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে জামাই হিসেবে পেয়ে তিনি ও তার পরিবারের অপর সদস্যরা যে খুবই সন্তুষ্ট ছিল, বারবার বিভিন্ন ঘটনা প্রসঙ্গে তাই উল্লেখ করছিলেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অনন্য অবদান রেখেছিলেন। স্বাধীনতাযুদ্ধে মুক্তিবাহিনী যে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত হয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন, এগুলোর নেতৃত্বে ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বিদ্রোহ করে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া বাঙালি সেনাকর্মকর্তারা। স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনী সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশটির সেনাবাহিনী পুনর্গঠনে নব উদ্যমে কাজ করতে থাকলেও আওয়ামী লীগের কিছু ক্ষমতালিপ্সু ব্যক্তি সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তার অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে নৃশংসভাবে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেন। অতঃপর ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ জাসদ নামের রাজনৈতিক দল সাধারণ সৈনিকদের সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উসকে দিয়ে নির্দয়ভাবে কিছু কর্মকর্তার মৃত্যু ঘটিয়ে হীনস্বার্থ চরিতার্থের প্রয়াস পেয়েছিল। তা ছিল খুবই ন্যক্কারজনক ও নিকৃষ্ট মনোবৃত্তির পরিচায়ক। সে ঘটনার দ্বারা সেনাবাহিনীর যে শৃঙ্খলা নষ্ট হয়েছিল, তা পুনরুদ্ধারে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছিল। সেনাবাহিনীর বিপথগামী কর্মকর্তাদের দ্বারা বঙ্গবন্ধুর মতো রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুও ছিল দেশ ও জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে যেসব সেনাকর্মকর্তা জড়িত ছিলেন, তাদের সবাইকে বিচারের আওতায় এনে সাজা প্রদান করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান উভয়ে রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালেই সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের দ্বারা নিহত হন। এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত আইন কিংবা সামরিক আইনে বিচারের পাশাপাশি তদন্ত কমিশন গঠন করে হত্যার পেছনের রহস্য উদঘাটনের প্রয়াস চালানো হয়। কিন্তু উভয় হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেই কেন তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়নি, সেটি আজো রহস্যাবৃত। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পাশাপাশি অন্যান্য ছোটখাটো অভ্যুত্থান এবং বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানের হত্যা সংশ্লেষে যতজন সেনাকর্মকর্তা নিহত হয়েছেন তা ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ বিডিআর বিদ্রোহের দিন যে ৫৭ জন সেনাকর্মকর্তা নিহত হয়েছেন, তার চেয়ে বেশি নয়।
বিডিআর ঘটনার পরবর্তী সময়ে সরকার ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দু’টি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল। উভয় তদন্ত কমিশন সরকারের বরাবরে প্রতিবেদন দাখিল করলেও সেনাবাহিনীর লে. জেনারেল জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিশন যে প্রতিবেদন দাখিল করে, সেটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিডিআর বাহিনীর যেসব সদস্য এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন, তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করে সাজার ব্যবস্থা করা হয়। অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজের নেতৃত্বাধীন আদালত যে সাজা প্রদান করে, তাতে এ দেশের ইতিহাসে সর্বাধিক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছে। বিডিআরের ঘটনা ঘটার কিছু দিন আগে থেকে বাহিনীটির বেশ কিছু বিভাগীয় কর্মকর্তা ও সৈনিক তাদের অসন্তোষের বিষয়ে আওয়ামী লীগের কিছু নেতার সাথে কথা বলেছিলেন। আওয়ামী লীগের যেসব নেতার সাথে তাদের কথা হয়েছিল, তাদের নাম জানা গেলেও কী কথা হয়েছিল, তা জানা যায়নি। যে দিন বিডিআর হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়, সে দিন হত্যাকাণ্ডের পর প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বা অংশগ্রহণ করেছিলেন, এমন কিছু বিভাগীয় কর্মকর্তা ও সৈনিক। সাক্ষাৎকালে সেখানে তাদের আহারেরও ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অনেকের মনে প্রশ্নের উদয় হয়েছে, এসব কর্মকর্তা ও সৈনিক যখন সরকারপ্রধানের সাথে সাক্ষাৎ করছিলেন, তখন ইতোমধ্যে বিডিআরের সদর দফতর পিলখানার অভ্যন্তরে সংঘটিত নৃশংস ঘটনার বিষয়ে কি সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অবহিত ছিলেন না?
বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর বাহিনীটির নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ করা হয় ‘বিজিবি’। এ নাম পরিবর্তন যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, তা হলো- শুধু নাম পরিবর্তন কি বিভাগীয় কর্মকর্তা ও সৈনিকদের হাতে বাহিনীটিতে প্রেষণে কর্মরত সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের নৃশংসভাবে হত্যার কাহিনী মুছে দেয়? আর যদি মুছে না দেয়, সে ক্ষেত্রে নাম পরিবর্তনের চেয়ে অধিক জরুরি ছিল বেসামরিক ও সামরিক তদন্ত কমিশন যেসব প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, তার সুরাহা। বিডিআর হত্যাকাণ্ডে সেনাবাহিনীর যে ৫৭ জন কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন, তাদের সবার পরিবারকে নিয়মমাফিক যে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা, তার চেয়ে অধিক দেয়া হয়েছে। কিন্তু যত বেশিই দেয়া হোক না কেন, প্রতিটি পরিবার কর্তাব্যক্তিকে হারিয়ে যে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তা কোনোভাবেই অর্থ দ্বারা পরিমাপযোগ্য নয়। যত দিন বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী টিকে থাকবে, তত দিন প্রতি বছর বিডিআরের এ হত্যাকাণ্ড একক ঘটনায় বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাধিক সংখ্যক সেনাকর্মকর্তা হত্যার নারকীয় ঘটনা হিসেবে কঠিন মর্মবেদনার কারণ হয়ে থাকবে। আর এ কঠিন মর্মবেদনার পেছনের কারণ সঠিকভাবে উদঘাটিত না হলে তা হবে আরো দুঃখজনক। তাই এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে অবশ্যই সত্য যত রূঢ়ই হোক, তা উদঘাটন করা উচিত।
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com

0 comments:

Post a Comment