Last update
Loading...

দেশে ঋণ খেলাপির হার কমেছে, বেড়েছে ঋণের প্রবাহ

২০০৯ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সাত বছরে মোট ঋণের পরিমাণ বাড়লেও শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের হার অনেকটা কমে এসেছিল। এর মধ্যে শুধু ২০১২ সালে শ্রেণিকৃত ঋণের হার দুই অঙ্কে ছিল। এই সময়ে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি মোকাবেলায় সক্ষমতাও বেড়েছে। তবে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের হার খানিকটা বেড়েছে। এই সময় তা পুনরায় দুই অঙ্কে পৌঁছে যায়। ২০০৯ সালের ১ মে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দশম গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আতিউর রহমান। ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত দীর্ঘ সাত বছর তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি সত্ত্বেও এই সময়ে তার হার অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে কম ছিল। তবে ব্যাংকিং খাত অধিকতর সংস্কারের লক্ষ্যে এবং ঋণ শ্রেণিকরণকে অধিকতর কার্যকর করার স্বার্থে ২০১২ সালে ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং নীতিমালা এবং ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ নীতিমালা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হয়েছে। আগে ৬ মাসের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণকে নিম্নমান (এসএস), ৯ মাসের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণকে সন্দেহজনক (ডিএফ) এবং ১২ মাসের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণকে ক্ষতিজনক বা মন্দ (বিএল) ঋণ হিসেবে নির্ধারণ করা হতো। নতুন ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালা অনুযায়ী ২০১২ সাল থেকে ৩ মাসের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণকে নিম্নমান (এসএস), ৬ মাসের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণকে সন্দেহজনক (ডিএফ) এবং ৯ মাসের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণকে ক্ষতিজনক বা মন্দ (বিএল) ঋণ হিসেবে নির্ধারণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে, নতুন ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ নীতিমালা অনুযায়ী পুনঃতফসিলকৃত ঋণ পরিশোধের সময়সীমা হ্রাস এবং ডাউন পেমেন্ট প্রদানেও বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।
ফলে, বর্তমানে ব্যাংকগুলোকে আগের তুলনায় অধিক হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। নতুন নীতিমালায় ঋণ শ্রেণীকরণের সময়সীমা হ্রাস এবং ন্যূনতম প্রভিশন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ নিম্নমানের ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ প্রভিশন, ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে হলে সন্দেহজনক ঋণ, যার বিপরীতে ৫০ শতাংশ প্রভিশন এবং ৯ মাসের বেশি হলে তাকে মন্দ বা ক্ষতি মানে বিবেচিত হয়, এর বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়। আর্থিক খাতে এসব সংস্কারের ফলে ২০১২ সালে শ্রেণিকৃত ঋণের হার কিছুটা বেড়ে গেলেও তা ১৯৯৮ বা ১৯৯৯ সালের তুলনায় এক চতুর্থাংশ। ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন এ সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়কালে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ছিল শতকরা ৩১.৪৯ থেকে ৪১.১১ পর্যন্ত। শ্রেণিকৃত ঋণ কমিয়ে আনার উদ্যোগ শুরু করা হয় ২০০১ হতে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্বপালনকারী গভর্নর ড. ফখরুদ্দিন আহমদের সময়কালে। ২০০১ সালে গঠিত ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে জারিকৃত ঋণ শ্রেণীকরণ ও অবলোপন সংক্রান্ত নীতিমালা প্রস্তুত করা হয়। সেই থেকে অবলোপনকৃত ঋণ খেলাপিঋণ থেকে আলাদাভাবে দেখানো হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অবলোপনকৃত অংশ টেনে এনে শ্রেণিকৃত ঋণের সঙ্গে যোগ করে এই হারকে স্ফীত করে দেখানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে এটা সমীচীন নয়। কারণ অবলোপনকৃত ঋণকে শ্রেণিকৃত বলে বিবেচনায় আনা হয় না। খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে অবলোপনের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা হলে হলে বিগত একদশকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার অনেকাংশেই কম ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে দেখা যাচ্ছে যে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৬ পর্যন্ত (কেবল ২০১২ বাদে) এই হার এক অংকে ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ডিসেম্বর ২০০৮ শেষে ব্যাংকিং খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ছিল ১০.৮ শতাংশ। বৈশ্বিক মন্দার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নানা প্রতিকূলতার মাঝেও ২০০৯-২০১৬ পর্যন্ত শ্রেণিকৃত ঋণের হার এক অঙ্কের নিচে সহনীয় মাত্রায় স্থিতিশীল ছিল। এতে দেখা যায়, ২০০৯ সালে শ্রেণিকৃত ঋণ ৯.২১ শতাংশ, ২০১০ সালে ৭.২৭ শতাংশ, ২০১১ সালে ৬.১২ শতাংশ ছিল। ২০১২ সালে তা বেড়ে দুই অঙ্কে গেলেও ২০১৬ সালে ড. আতিউর রহমানের বিদায়কালে তার পরিমাণ ছিল এক অঙ্কের নীচেই। কিন্তু বর্তমানে সেটা আবার দুই অঙ্কে পৌঁছেছে। শ্রেণিকৃত ঋণের হার ২০১৬ শেষে ছিল ৯.২৩ শতাংশ। তবে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে এ হার কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০.৬৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৭ সালে আট বছরের ব্যবধানে ব্যাংক ঋণ বেড়েছে সাড়ে তিনগুণ। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ঋণ ছিল ২ লাখ ৯ হাজার ৫০ কোটি টাকা, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৩১ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। একইসঙ্গে, এই সময়ে আমানত বেড়েছে ৩ গুণেরও বেশি। জুন ২০০৯ শেষে ব্যাংকিং খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৭৮ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা, যা জুন ২০১৭ শেষে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৭৭ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর আর্থিক সুস্থতা এবং স্থিতিশীলতার অন্যতম পরিমাপক হচ্ছে মূলধন পর্যাপ্ততা। মূলধন পর্যাপ্ততা সংক্রান্ত ব্যাসেল-২ নীতিমালার সফল বাস্তবায়নের পরে ব্যাংকের মূলধন সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক ব্যাসেল-৩ নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে। গত আট বছর নয় মাসে ব্যাংকিং খাতের মূলধনে ৩৩৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। ব্যাংকসমূহের সংরক্ষিত মূলধন ২০০৮ এর ২০ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৭ এ ৯০ হাজার ১০১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এ মূলধন পর্যাপ্ততার হার ব্যাংকসমূহের মোট ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০.৬৫ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। ড. আতিউরের সময়কালে ব্যাংকগুলোতে তারল্যের ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল না। অর্থনীতিতে বরং গতি সঞ্চারিত হয়েছিল। তবে বর্তমানে বেশকিছু ব্যাংকে তারল্য সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ফারমার্স ব্যাংকের কারণে এই সমস্যা প্রকটতর হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, কৃষি খাতে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কৃষি ঋণ বিতরণে ১২৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এই সময়ে কৃষি ঋণ বিতরণও বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। ২০০৮-০৯ বর্ষে বিতরণকৃত কৃষি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ সালে বর্ষে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২০ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা। এই সময়ে বেড়েছে এসএমই ঋণ বিতরেণর হারও। ২০১০ থেকে জুন ২০১৭ পর্যন্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ কর্তৃক ৪১ লক্ষ ২১ হাজার উদ্যোক্তাকে ৭ লাখ ৪ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা এসএমই ঋণ প্রদান করা হয়েছে। এ ঋণের মধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের ২৫ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা ও নতুন উদ্যোক্তাদের ৯১ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা ঋণ প্রদান করা হয়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ফলে খাদ্য আমদানি ব্যয় ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছর শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৭.৫ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছর ২০১৬-১৭ শেষে তা প্রায় সাড়ে চারগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩.৫ বিলিয়ন ডলার। বর্তমান রিজার্ভ ৩২.৮ বিলিয়ন ডলার, যা দিয়ে দেশের প্রায় সাড়ে ৭ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। এটি সব সময়ই তার প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে জাতীয় স্বার্থে কাজ কলে। তারই ধারাবাহিকতায় বিগত এক দশক ধরে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কৌশলের অধীনে কৃষি, এসএমই, তৈরি পোশাকখাতসহ সামাজিক দায়বদ্ধতা খাতে ব্যাপক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। সারাবিশ্বেই বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ভূমিকা প্রশংসিত হচ্ছে। তাই কোনোভাবেই মনগড়া তথ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাবমূর্তি নষ্ট করা উচিত হবে না। তাছাড়া সময় এসেছে অর্থঋণ আদালত আইনটি পুনর্বিবেচনা করার। এই আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অনেক ঋণখেলাপি পার পেয়ে যাচ্ছে। তাই আইনটি দ্রুত সংস্কার করা উচিত।

0 comments:

Post a Comment