Last update
Loading...

দ্রুত বিচার আইন

বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধ প্রতিরোধ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আরও সচেষ্ট হওয়ার পরিবর্তে দণ্ডের মাত্রা বাড়ানো বা কঠোরতর আইন প্রণয়ন করার ঝোঁক আমরা সব সরকারের আমলেই লক্ষ করে আসছি। কিন্তু এর কোনো সুফল আমরা দেখতে পাই না। দণ্ডের মাত্রা বাড়ানোর ফলে অপরাধবৃত্তি হ্রাস পেয়েছে—এ রকম দৃষ্টান্ত এ দেশে নেই বললেই চলে। তা সত্ত্বেও কোনো সরকার যখন এ রকম উদ্যোগ নেয়, তখন প্রশ্ন জাগে, এই প্রবণতার কারণগুলো কী হতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান রোববার সংসদে দ্রুত বিচার আইনে সর্বোচ্চ দণ্ডের মেয়াদ বাড়ানোর বিধানসংবলিত সংশোধনীটি পাস করার প্রস্তাব করার পরিপ্রেক্ষিতে সেই প্রশ্ন আবারও উঠে আসছে: দণ্ডের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্দেশ্য কী? আগামী ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা, এই সময়ে ‘আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ’-সংক্রান্ত আইনের দণ্ডের মাত্রা বাড়ানোর সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক মোটেও অস্পষ্ট নয়। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন স্পষ্ট ভাষায় সে কথা বলেছেন: হঠাৎ করে দ্রুত বিচার আইনের সাজা বৃদ্ধি করার পেছনে রাজনৈতিক অশুভ ইঙ্গিত রয়েছে। বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা হচ্ছে। এটি তাঁদের দীর্ঘ মেয়াদে সাজা দিয়ে আগামী সংসদ নির্বাচন একতরফা করার প্রচেষ্টা। তিনি আরও বলেন, এই আইনে বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেই মামলা করা হচ্ছে। অবশ্য সাবেক আইন ও বিচারমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু বলেছেন, বিরোধী দল বা অন্য কাউকে হয়রানি, অপদস্থ করতে নয়, ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই আইনটি সংশোধন করা হচ্ছে। আমরা স্মরণ করতে পারি, ২০০২ সালে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার যখন দ্রুত বিচার আইন জারি করে, তখন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ এর প্রবল বিরোধিতা করেছিল; তারা এই আইনকে আওয়ামী লীগ দমন আইন বলে অভিহিত করেছিল। আর উল্টো দিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই আইনটি জারি করা হয়েছে।
পরিহাসের বিষয়, আজ সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। যে আওয়ামী লীগ আইনটি প্রণয়নেরই বিরোধিতা করেছিল, আজ তাদেরই সরকার এর সাজার মেয়াদ বাড়াচ্ছে। আর যে বিএনপির সরকার আইনটি চালু করেছিল, তারা আজ এর বিরোধিতা করছে। বিরোধিতা করতেই হচ্ছে, কেননা, এ আইনের বর্ধিত দণ্ডের শিকার হওয়ার আশঙ্কা তাদের নেতা-কর্মীদের জন্যই সবচেয়ে বেশি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইন প্রণয়ন ও তার ব্যবহারের প্রবণতা আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। শুধু তা-ই নয়, নৈতিক বিবেচনায়ও এই প্রবণতা পরিত্যাজ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, সরকার পরিচালনায় অভিজ্ঞ উভয় বড় রাজনৈতিক দল আইনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার দ্রুত বিচার আইন জারি করেছিল দুই বছরের জন্য। ২০০৪ সালেই আইনটি আপনাআপনি বিলুপ্ত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা হতে দেওয়া হয়নি, আইনটির কার্যকারিতার মেয়াদ তারা বাড়িয়েছে। তারপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে আইনটি বাতিল করার পরিবর্তে উল্টো মেয়াদ বাড়ায়। এভাবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে আইনটিকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। সর্বশেষ এটির সর্বোচ্চ সাজার মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে সাত বছর করে সংশোধনীর প্রস্তাব সংসদে পাস হয়েছে। আমরা মনে করি, এর কোনো প্রয়োজন নেই। বরং আইনটি বাতিল করে ফৌজদারি আইন ও বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হওয়া বেশি প্রয়োজন।

0 comments:

Post a Comment