Last update
Loading...

‘হায়রে কপাল মন্দ’ by ড. আবদুল লতিফ মাসুম

একটু কিছু হলেই মানুষ কপালের দোষ দেয়। এ জন্যই বাঙালিকে নিয়তিবাদী বলা হয়। একটি ইংরেজি বইয়ের শিরোনাম হচ্ছে ‘Peopling in the Land of Allah Jaane’।
অর্থনীতিবিদ আবদুল বাকী যদিও চর এলাকা সম্পর্কে এ গ্রন্থে আলোচনা করেছেন, তা সত্ত্বেও সাধারণভাবে বাংলাদেশের প্রায় সব মানুষ যে নিয়তিনির্ভর এ কথা জোরেশোরেই বলা যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে জনপ্রিয় গানের কলি উদ্ধৃত করে আমাদের কপাল মন্দের কথা বলেছেন। ২৪ জানুয়ারি, ২০১৮ প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্য ফজিলাতুন্নেসার সম্পূরক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘এখন এটা বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাগ্য যে, বাংলাদেশের কিছু মানুষ এই উন্নয়নটা চোখে দেখে না। বাংলা একটা গান আছে, ‘হায়রে কপাল মন্দ, চোখ থাকিতে অন্ধ।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারা চোখ থাকতে অন্ধ, কান থাকতে বধির।’ তিনি প্রশ্ন করেন, ‘ঠিক জানি না সুশীলের ব্যাখাটা কী, অর্থটা কী? কোন তত্ত্বের ভিত্তিতে তারা এখন সুশীল- সেটাই প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়, যখন তারা কোনো কিছু দেখেনও না আবার শোনেনও না, বোঝেনও না।’ সুশীলসমাজের তীব্র সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারা সুশীল না অসুশীল তা জানি না, তবে একটা শ্রেণী আছে তাদের খুব আকাক্সক্ষা ক্ষমতায় যাওয়ার। তাদের আকাক্সক্ষা একটি পতাকা পাওয়ার। কিন্তু তারা জনগণের কাছে যেতে পারে না। ভোটের রাজনীতিতে তারা অচল। ভোটের রাজনীতি করতে গেলে জনগণের কাছে যেতে হয়।
জনগণের কাছে দাঁড়াতে হয়। ভোট ভিক্ষা চাইতে হয় এবং ভোট পেয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়ে এই সংসদে বসতে হয় এবং সরকার গঠন করতে হয়।’ ১৫ আগস্টের পটভূমি ব্যাখ্যা করে, দৃষ্টান্ত তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাস্তার পাশে ডাস্টবিনে লেখা থাকে ‘ইউজ মি’। তেমনি তারাও রাজনীতির ক্ষেত্রে বা ক্ষমতার ক্ষেত্রে ওই রকম একটা সাইনবোর্ড লিখে বসে থাকে ‘ইউজ মি’- মানে আমাকে ব্যবহার করো। প্রধানমন্ত্রী সুশীলসমাজ সম্পর্কে মন্তব্য করেন, ‘তাদের আচরণ দেখলে গাধার কথা মনে পড়ে।’ একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী সংসদকে একটি গাধার গল্প শোনান। ‘একটি সার্কাস পার্টিতে একবার একটা মেয়ে দড়ি দিয়ে ঝুলে সার্কাস দেখায়। ওই মেয়েটাকে ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে। তাকে দেখাচ্ছে কিন্তু কিছুই সে পারছে না। তখন তার ইন্সট্রাক্টর এবং সার্কাস পার্টির মালিক খুব ক্ষেপে গিয়ে বলল, তুমি যদি এরপর না পারো তবে ওই যে গাধাটা দেখতে পাচ্ছো, তার সঙ্গে তোমার বিয়ে দেবো। গাধা সেই কথা শুনে ফেলল। শোনার পর গাধা খুব আশায় বসে ছিল। আশায় বসে আছে আর দড়ির দিকে তাকিয়ে আছে যে ওই মেয়েটা কবে দড়ি ছিঁড়ে পড়বে আর ওই গাধার সঙ্গে তার বিয়ে হবে। গাধা এই আশা নিয়ে সার্কাস পার্টিতে বসে আছে। এভাবে দিনের পর দিন সময় চলে যাচ্ছে। গাধাটা একসময় একটু অথর্ব হয়ে গেছে। কিন্তু সে বসেই আছে আর কোথাও যায় না। দড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে, কবে দড়ি ছিঁড়বে আর কবে একটা ভালো সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে হবে। সেই দড়িও ছেঁড়ে না আর গাধারও বিয়ে হয় না।’ গল্পের ব্যাখা দিয়ে বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার আমি কাউকে গাধা বলছি না। কারণ আমাদের দেশে সবাই খুব জ্ঞানী-গুণী, শিক্ষিত। বিদেশ থেকে উচ্চ ডিগ্রিপ্রাপ্ত। তারা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। আন্তর্জাতিক অনেক কাজ করেন। তবে, তাদের আচরণগুলো যখন দেখি আর ওই যে কবে দড়ি ছিঁড়বে, তবে কপাল খুলবে ওই আশায় যারা বসে থাকে খুব স্বাভাবিকভাবে তখন তো গাধার কথা মনে পড়ে।’ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষাপট একজন সংসদ সদস্যের সম্পূরক প্রশ্ন। সংসদ সদস্য ফজিলাতুন্নেসা সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, কিছু সুশীল ও পণ্ডিতজন সংবাদ সম্মেলন করে বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক কোনো অগ্রগতি দেখতে পারছেন না। উন্নয়নের ছোঁয়া দেখতে পারছেন না। এ বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর মত জানতে চান। সংসদ সদস্য সম্ভবত কয়েক দিন আগে একটি প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। যেমন : গণতন্ত্র ও উন্নয়ন সম্পর্কে খোদ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কে নানা ধরনের মানদণ্ড রয়েছে। তবে এসব বিষয়ের একটি সামগ্রিকতাও রয়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের জাতীয় আয়, মাথাপিছু অর্জন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্পোন্নয়ন বিশেষত তৈরী পোশাক শিল্পে ব্যাপকতর উন্নয়ন উল্লেখযোগ্য। সেই উন্নয়নের ফলে ধনিক বণিক শ্রেণী উপকৃত হচ্ছে নাকি গরিব শ্রমজীবী মানুষ তার সুফল পাচ্ছে- সে এক বিতর্ক।
পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় উন্নয়নের ধারক সামগ্রিক উৎপাদনের সমষ্টি। অপর দিকে, সমাজতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণায় সম্পদের বণ্টন সুষম হলো কি না বা সমগ্র জনসমষ্টির মধ্যে সম্পদ বণ্টন হলো কি না সেটি বিবেচ্য বিষয়। সুতরাং সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক বা নেতিবাচক দুটো দৃষ্টিভঙ্গিই সঠিক নয়। সে ক্ষেত্রে ব্যাখা-বিশ্লেষণ গবেষণা হতে হবে বস্তুনিষ্ঠ। সেখানে দল বা সরকার অনুসৃত অথবা নির্দেশিত পরিসংখ্যানের কোনো স্থান নেই। যখনই যে সরকার আসে তারা নিরবচ্ছিন্ন প্রশংসা, প্রশস্তি চায়। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সেটি সম্ভব নয়। গণতন্ত্র মানেই সব মত ও পথের সহাবস্থান। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলকে বলা হয় ছায়া সরকার। তার মানে সরকারের বিপরীতে আরেকটি সরকার। বিরোধী দল সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করবে সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশে^র দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কী অবস্থান তা সচেতন নাগরিকমাত্রই জানেন। সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলার জন্য যে রাজনৈতিক দলগুলো বর্তমান রয়েছে, তারা সরকারি সিদ্ধান্তেই অকার্যকর। তারা কোনো জনসভা মিছিল মিটিং করতে পারছে না। মরুভূমিতে মরূদ্যানের মতো অনেক বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও কিছু কিছু বিবেকবান লোক, কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের নিজ নিজ মতামত ব্যক্ত করার সাহস দেখাচ্ছে। তারা কোনো বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর পক্ষে কথা বলছে এমন নয়। নাগরিক সাধারণ বিশ্বাস করে যে, তারা গোটা জাতির স্বার্থেই কথা বলছে। কয়েকটি গণমাধ্যম সীমাবদ্ধতার মাঝে এখনও নিজেদের মতো করে কথা বলার চেষ্টা করছে। প্রতিদিন বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রতীকী অর্থে যে জরিপ এবং নাগরিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হচ্ছে সেগুলোর প্রতিটিতেই সরকারের বিরুদ্ধে আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতি লক্ষ করা যায়। সুতরাং রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী এবং প্রবীণ নাগরিকদের তরফ থেকে প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক বিষয়।
বাংলাদেশের মানুষ যখন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে কোনো সুফল পায় না তখন কপালকে গালি দেয়া ছাড়া উপায় থাকে না। ব্যক্তিগতভাবে একজন মানুষ যখন তার প্রাপ্য পায় না, দুঃখ কষ্ট ভোগ করে, নিপীড়ন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন নিজের কপাল মন্দ বলেই নিজেকে প্রবোধ দেয়। তাই তারা গান গায় ‘হায় রে কপাল মন্দ, চোখ থাকিতে অন্ধ/এই জীবন জ¦ইলা পুইড়া শেষ তো হইল না।’ আসলেই বাংলাদেশের মানুষের কপাল মন্দ। না হলে লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশে দুঃখ দুর্দশার কেন লাঘব হচ্ছে না, কেন মানুষকে প্রতিদিন ঘুষ দুর্নীতি এবং রাহাজানি এবং সন্ত্রাসের মধ্যে জীবন কাটাতে হচ্ছে। সুতরাং সঙ্গতভাবেই বলা যায়, কপাল মন্দ আমাদের, সরকার পক্ষের নয়। আর মন্দ না হলেই বা আমরা এই উত্তরাধিকার কিভাবে অর্জন করলাম। তাই হয়তো হায়দার হোসেন গানে গানে প্রশ্ন করেন, ‘স্বাধীনতা কি ঢাকা শহরের আকাশচুম্বী বাড়ি?/স্বাধীনতা কি ফুটপাতে সোয়া গৃহহীন নর-নারী?/স্বাধীনতা কি হোটেলে হোটেলে গ্র্যান্ড ফ্যাশন শো?/ স্বাধীনতা কি দুখীনি নারীর জরাজীর্ণ বস্ত্র?/স্বাধীনতা কি নিরীহ লোকের অকারণে প্রাণদণ্ড?” কবির আক্ষেপ আর জিজ্ঞাসা কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়। আজ গোটা জাতির অবস্থা বিবেচনায় সবারই এটি প্রশ্ন, সবারই মনোকষ্ট। মানুষ আজ বড় অসহায়। ক্ষমতার কাছে, শক্তির মদমত্ততার কাছে তারা নিরুপায়। অনেক আগে রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাস মানুষের অরূপ সম্পর্কে লিখেছেন- ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসছে এ- পৃথিবীতে আজ/ যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা :/ যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই- প্রীতি নেই- করুণার আলোড়ন নেই/পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।/যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি/এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়/ মহত্ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা/শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।’ প্রধানমন্ত্রী তার মতো করে সত্য কথা বলেছেন। দর্শন বলে সত্যের বিপরীতে মিথ্যা থাকে। অবশেষে মিথ্যা ও সত্যের সংশ্লেষণ ঘটে তৃতীয় চিন্তায়। এটা তো সত্যি কথা যে, এবসোলিটইজম বা সামগ্রিকতা বলতে কোনো বিষয় নেই। তাই সুশীলসমাজ এই যে সামগ্রিক সত্য এ কথা বিশ্বাস করার উপায় নেই। তবে সুশীলসমাজের লোকেরা জ্ঞানের কথা বলেন। বাইবেলে আছে, ‘অজ্ঞান রাজ্যের উচ্চস্বর অপেক্ষা জ্ঞানীর ক্ষুদ্রস্বর মান্য।’
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com

0 comments:

Post a Comment