Last update
Loading...

প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন ট্রাম্পকন্যার by মাইকেল উলফ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে লেখা বই ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি : ইনসাইড দ্য ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ প্রকাশের পরই তোলপাড় শুরু হয়েছে মার্কিন মুল্লুকে। অনুসন্ধানী সাংবাদিক মাইকেল উলফের বইটির প্রকাশনা ঠেকাতে আইনি পদক্ষেপও নিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে তাতে কাজ হয়নি। বরং নির্ধারিত তারিখের আগেই গত ৫ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে বইটি। প্রকাশের প্রথম দিনেই শেষ হয়ে যায় সব কপি। অগ্রিম অর্ডার দেয়া হয় ১০ লাখ কপির। বইটির চুম্বক অংশ নয়া দিগন্তের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো। ভাষান্তর করেছেন আহমেদ বায়েজীদ
[পর্ব-৮]

অভিবাসন আইন পাস হওয়ার একদিন পর রোববার এমএসএনবিসির প্রভাতী অনুষ্ঠান, মর্নিং শোয়ের উপস্থাপক জো স্কারবরো ও সহউপস্থাপক মিকা ব্রেজিজিনস্কি ট্রাম্পের আমন্ত্রণে হোয়াইট হাউজে মধ্যাহ্ন ভোজে অংশ নিতে আসেন। দিনটি ছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের নবম দিন। স্কারবরো ফ্লোরিডার পেনসাকোলা এলাকার সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য। আর ব্রেজিজিনস্কির বাবা ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসনের শীর্ষস্থানীয় উপদেষ্টা ও জিমি কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। মর্নিং শো একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক টক শো। এই দুই উপস্থাপকের কারণে টিভি চ্যানেলটাও অনেকটা ট্রাম্পপন্থী অবস্থান নিয়েছে। ট্রাম্প খুব আগ্রহ নিয়ে এই জুটিকে পুরো হোয়াইট হাউজ ঘুরিয়ে দেখালেন। একপর্যায়ে বেশ উৎফুল্ল মেজাজে তাদের কাছে জানতে চান, প্রেসিডেন্সির প্রথম সপ্তাহটি কেমন কাটলো বলে মনে হয় আপনাদের? সারা দেশে যখন (নতুন অভিবাসন আইনের বিরুদ্ধে) বিক্ষোভ চলছে, সে সময় ট্রাম্পের এমন প্রশ্ন শুনে যেন বোকা হয়ে গেলেন স্কারবরো। কিছুটা সঙ্কোচ নিয়ে বললেন, ‘ভালো, ইউএস স্টিল বিষয়ে আপনার পদক্ষেপ এবং হোয়াইট হাউজে ইউনিয়ন নেতাদের আগমনের বিষয় আমার ভীষণ ভালো লেগেছে’ (অপ্রিয় সত্য কথাটি বলতে চাইলেন না তিনি)। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের পাইপলাইনগুলোতে দেশে তৈরি স্টিল ব্যবহারের অঙ্গীকার করেছেন এবং ইমারত ও স্টিল শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের হোয়াইট হাউজে ডেকে বৈঠক করেছেন। ট্রাম্পের মতে, এ কাজ ওবামা কখনোই করেননি। কিন্তু ট্রাম্প আবারো প্রশ্নটি করলেন। স্কারবরো বুঝলেন, প্রথম সপ্তাহটি যে ট্রাম্পের জন্য কতটা খারাপ গেছে, সে ব্যাপারে তাকে কেউ কিছুই বলেনি। তিনি ভাবলেন, স্টিভ ব্যানন ও রেইন্স প্রিবাস শুধু অফিসে আসা যাওয়াই করেছেন, আর ট্রাম্পকে বুঝিয়েছেন তিনি সফল একটি সপ্তাহ পার করেছেন।’ এরপর অভিবাসী ইস্যুটি আরো কতটা ভালোভাবে মোকাবেলা করা যেত, সে বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন জো স্কারবরো। ট্রাম্প এতে অবাক হয়ে বলেন,‘ জো মনে করছে না যে, সপ্তাহটি আমাদের ভালো কেটেছে’।
দুপুরের খাবারে তাদের সাথে যোগ দেন জ্যারেড কুশনার ও ইভাঙ্কা ট্রাম্প। বারবারই তার প্রথম সপ্তাহ সম্পর্কে তোষামোদ শুনতে চান; কিন্তু স্কারবরো সব কিছু বাদ দিয়ে ইউনিয়ন নেতাদের সাথে সফল বৈঠকের প্রশংসা করলেন। এ সময় জ্যারেড কুশনার বলেন, এই কাজটি ব্যাননের অবদান এবং করা হয়েছে তার নির্দেশিত পন্থায়। ট্রাম্পের গলা চড়ে যায় জামাতার ওপর, ‘কিসের ব্যানন? সেটি ব্যাননের পরিকল্পনা ছিল না। ছিলো আমার পরিকল্পনা। ট্রাম্পের কর্মপন্থা, ব্যাননের নয়’। কুশনার নতি শিকার করে আলোচনা অন্য দিকে নিতে চেষ্টা করেন। ট্রাম্পও তাতে যোগ দেন। স্কারবরো ও ব্রেজিজিনস্কির সম্পর্কের কথা ইঙ্গিত করেন বলেন, ‘আপনাদের কী খবর বলুন। কেমন চলছে?’ স্কারবরো জানান, পুরোটাই এখনো গোপনে চলছে, বাইরের কেউ জানে না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনাদের বিয়ে করা উচিত’। কুশনার বলেন, ‘আমি আপনাদের বিয়ে পড়াতে পারি! আমি একজন ইন্টারনেট ইউনিটারিয়ান মিনিস্টার (খ্রিষ্টানদের একটি ধর্মীয় সংগঠনের সদস্য)। অথচ তিনি গোঁড়া ইহুদি। ট্রাম্প আবারো চটে গেলেন, ‘কি বললে? কেন তারা তোমার কাছে এসে বিয়ে করবে যখন আমিই তাদের বিয়ে পড়াতে পারি? স্বয়ং প্রেসিডেন্টের কাছেই তারা বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে’। প্রায় সবাই কুশনারকে নিষেধ করেছে হোয়াইট হাউজের কোনো পদ দখল না করতে। প্রেসিডেন্টের পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি অনায়াসেই পর্দার আড়াল থেকে অনেক প্রভাব খাটাতে পারতেন এবং সে ব্যাপারে কেউ চ্যালেঞ্জও জানাতে পারত না। কিন্তু একজন কর্মকর্তা হিসেবে শুধু তার অনভিজ্ঞতা নয়, পরিবারের সদস্য হয়ে রাষ্ট্রীয় পদে বসা নিয়ে প্রতিপক্ষ ও মিডিয়া ব্যাপক সমালোচনা করতে পারে। এমনকি জ্যারেডের ভাই, জোশও তাকে নিষেধ করেছেন। ইভাঙ্কার কাছেও এসেছে এই পরামর্শ। তবে সেগুলো তারা কানে তোলেননি।
ট্রাম্প বরাবরই তার মেয়ে ও জামাতাকে উৎসাহ দিয়েছেন তাদের নতুন মিশনে। আবার কখনো এটাও বলেছেন, তিনি ওদের থামাতে পারছেন না। জ্যারেড ও ইভাঙ্কা শুধু নয়, নতুন প্রশাসনের সবার ক্ষেত্রে-এমনকি খোদ প্রেসিডেন্টেরও নতুন দায়িত্ব নিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাকে আর থামানো যায়নি। প্রশাসনে দায়িত্ব নেয়া ছিল ওই দম্পতির যৌথ সিদ্ধান্ত, এমনকি ‘যৌথ চাকরি’ও বলা যায়। জ্যারেড ও ইভাঙ্কার মধ্যে এই চুক্তি হলো যে, ভবিষ্যতে যদি কখনো সুযোগ আসে, তাহলে ইভাঙ্কা প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবেন। ইভাঙ্কা স্বপ্ন দেখতে লাগলেন- হিলারি ক্লিনটন নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হবেন ইভাঙ্কা ট্রাম্প! জ্যারেড ও ইভাঙ্কার নামের প্রথম অংশ নিয়ে এক সাথে তাদেরকে ‘জারভাঙ্কা’ ডাকতেন ব্যানন। এই দম্পতির অলিখিত চুক্তির বিষয়টি শোনার পর ব্যাননের চেহারা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। বললেন, ‘থামুন, তারা এমন কোনো কথা বলেনি। আসলেই তারা এমন কিছু বলেনি। আমাকে এসব বলবে না। ঈশ্বর রক্ষা করো!’ বাস্তবতা হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত ইভাঙ্কাই ছিলেন হোয়াইট হাউজের সব স্টাফের চেয়ে অভিজ্ঞ। এই দম্পতি কিংবা শুধু ইভাঙ্কা ছিলেন কার্যত চিফ অব স্টাফ অথবা চিফ অব স্টাফ প্রিবাস বা ব্যাননের মতো ক্ষমতাবান, যারা প্রত্যেকেই সরাসরি যেকোনো বিষয় প্রেসিডেন্টের কাছে রিপোর্ট করার ক্ষমতা রাখেন। এমনকি অফিশিয়াল বিষয়েও হোয়াইট হাউজের ওয়েস্ট উইংয়ে (নির্বাহী ভবন যেখানে প্রেসিডেন্টের অফিস) এই দম্পতির একটি স্বাধীন অবস্থান ছিল। এরই মধ্যে ট্রাম্প তার জামাতার হাতে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দায়িত্ব তুলে দিলেন, যা তাকে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারকের আসনে বসিয়ে দেয়। প্রথম কয়েক সপ্তাহে অন্যান্য আন্তর্জাতিক ইস্যু সম্পর্কেও তাকে অবহিত করা হলো। যদিও জ্যারেড কুশনারের অতীত বলছে, তিনি এই কাজের জন্য মোটেও প্রস্তুত নন। মূলত বিশাল ধনসম্পদের মালিক ও নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করা লোকদের যে আত্মগরিমামূলক স্বভাব থাকে, ট্রাম্পও সে ক্ষেত্রে ভিন্ন কেউ ছিলেন না। সামাজিক শৃঙ্খলার কোনো শিক্ষাই তার ছিল না। এমনকি প্রয়োজনের সময় অন্যেরটা দেখেও করতে পারতেন না। মানুষের সাথে সাধারণ আলাপ বা কথার দক্ষতাটুকুও তার মধ্যে নেই। তাকে কে কী বলল তা ভাবার সময় নেই; সেই কথার উত্তরে কী বলা উচিত তা নিয়েও ভাবনা ছিল না। ন্যূনতম ভদ্রতা দেখিয়ে একজনকে স্বাগত জানাতে পারেন না। নিজে কিছু চাইলে তা নিয়ে খুবই সিরিয়াস থাকেন; কিন্তু তার কাছে কেউ চাইলে বিরক্ত হন, কোনো আগ্রহই দেখান না সে ব্যাপারে। ট্রাম্পের সাথে তার জামাতার অনেক বিষয়ে মিল থাকলেও তারা একই তালে কাজ করার লোক নন। কুশনার সব সময়ই চেষ্টা করতেন শ্বশুরের আচরণ যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখতে।
ব্যানন যখন হোয়াইট হাউজে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা স্বাক্ষর করিয়ে নিতে মরিয়া, কুশনার তখন ব্যস্ত তার প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের সাথে বৈঠক নিয়ে। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টকে ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণার সময় হুমকি দিয়ে ও অপমান করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। এই কাজে নামার আগে কুশনার ফোন করেন ৯৩ বছর বয়সী কিসিঞ্জারকে। মূলত পরামর্শ নেয়ার জন্যই তাকে ফোন করেছিলেন। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের সাথে কোন কারণ ছাড়াই বিবাদ বাধিয়েছেন ট্রাম্প। কুশনার চাইলেন, তাকে হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে কৃতিত্ব নেবেন। সে লক্ষ্যে আলোচনা চলল। কুশনারের ইচ্ছা ছিল সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের বিষয়টিকে একটি দ্বিপক্ষীয় অভিবাসন চুক্তিতে রূপ দেয়ার। সে লক্ষ্যে মেক্সিকোর উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল হোয়াইট হাউজে এসে কুশনার ও প্রিবাসের সাথে বৈঠক করে। বৈঠকের পর কুশনার তার শ্বশুরকে জানালেন, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউজে আসবেন, বৈঠকের পরিকল্পনা করা শুরু হয়েছে। পরদিনই ট্রাম্প টুইট করলেন, ‘মেক্সিকোর সাথে ৬০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি আছে যুক্তরাষ্ট্রের। ফলে কর্মসংস্থানের ক্ষতি হচ্ছে। মেক্সিকো যদি সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের অর্থ দিতে রাজি না হয়, তাহলে বৈঠক বাতিল করাই সঠিক হবে’। এর জবাবে, উল্টো মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টই বৈঠক বাতিল করে দিলেন। কুশনারের প্রচেষ্টা মাঠে মারা গেল।

0 comments:

Post a Comment