Last update
Loading...

সন্ত্রাসবাদ by এবনে গোলাম সামাদ

বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ থেকে এই উপমহাদেশে কংগ্রেসের আন্দোলনের পাশাপাশি বাংলাভাষাভাষি অঞ্চলে আরেকটি আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল, যা সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন নামে খ্যাত হয়ে আছে। কেননা, এই আন্দোলনকারীরা মনে করতেন যে, এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ রাজকর্মচারীদের হত্যা করলে প্রশাসনযন্ত্রে ধরবে ভাঙন। আর এর ফলে শেষে ভারত থেকে ব্রিটিশরাজকে বিদায় নিতে হবে। এই আন্দোলনটিকে ভারতীয় কংগ্রেস দল কখনই জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের অংশ হিসেবে স্বীকার করতে চায়নি।
কিন্তু সম্প্রতি (১৬ জানুয়ারি ২০১৮, চট্টগ্রামে) কংগ্রেস নেতা প্রণব মুখোপাধ্যায় বাংলাদেশে সফর করতে এসে এই সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনকে স্বীকৃতি দিলেন একটি প্রকৃত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন হিসাবে। এতদিন পরে বাংলাদেশে এসে প্রণব মুখোপাধ্যায় এই স্বীকৃতি দেয়ার প্রয়োজন কেন অনুভব করলেন, তা নিয়ে বাংলাদেশের জনমনে জাগছে প্রশ্ন। কেননা, সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের সংগঠনসগুলো সৃষ্টি হয়েছিল কলকাতায়। কিন্তু কলকাতায় এসব সংগঠনকে স্বীকৃতি না দিয়ে স্বীকৃতি দেয়া হলো চট্টগ্রামে, বাংলাদেশে এসে। মনে হচ্ছে এর পিছে থাকা সম্ভব একটা বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। যেটা কলকাতায় বসে সন্ত্রাসবাদকে প্রশংসা জানালে সম্ভব হতো না। ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আছে। এই জাদুঘরের উদ্বোধন হয়েছিল ২২ মার্চ ১৯৯৬। উদ্বোধনের দিনে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের উদ্দেশে জ্বালানো হয়েছিল শিখা অনির্বাণ, যা এখনো প্রজ্বলিত আছে। এই জাদুঘরে ব্রিটিশ শাসনামলে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য যাদের ফাঁসি হয়েছিল, এমন ২৯ জন ব্যক্তির নামের একটি তালিকাও সংরক্ষিত আছে। যার প্রথম নামটি হলো ক্ষুদিরাম বসু। আমি জানি না ভারতের কোন জাদুঘরে এদের নাম এভাবে সংরক্ষিত করা আছে কিনা। অথচ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এদের নাম স্থান পেতে পেরেছে। যদিও আজকের বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ে এদের অভ্যুত্থানের কোনো অবদানই নেই। আজকের বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে বাংলাভাষী মুসলমানের সংগ্রামের কারণে। এর আছে একটি পৃথক রাজনৈতিক ইতিহাস। যার সাথে ক্ষুদিরাম বসুদের ইতিহাসকে এক করে ফেলা যায় না। যায় না প্রকৃত ইতিহাস রক্ষার কারণেও। জাহানার ইমাম লিখিত ‘একাত্তরের দিনগুলি’ প্রসিদ্ধি পেয়েছে।
এতে জাহানারা ইমাম যেভাবে তার পুত্র রুমির কথা বিবৃত করেছেন, তা অনেকের কাছে মনে হতে পারে ক্ষুদিরাম বসুর জীবন-কথা যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, তার দিয়ে প্রভাবিত। কিন্তু ঘটনা যদি তাও হয়, তথাপি বলতে হবে যে, ১৯৭১-এর দিনগুলো কেবলই ছিল না সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে প্রভাবিত। সেদিনের আন্দোলনে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উপাদান। যাকে তুলনা করা চলে না ব্রিটিশ আমলের সন্ত্রাসবাদী অভ্যুত্থানের সাথে। ভারতের লেফটেন্যান্ট জেনারেল জেএসআর জ্যাকব, তার Surrender At Dacca. Birth of A Nation বইতে লিখেছেন, বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চাইত, তাদের বড় রকমের অভিযানে ভারতীয় বাহিনী এসে সাহায্য করুক। অর্থাৎ ১৯৭১-এর যুদ্ধ ছিল না কেবলই কিছু সন্ত্রাসবাদী তরুণের অভ্যুত্থানের ব্যাপার। এতে থাকত ভারতীয় পেশাদার সেনাবাহিনীরও বিশেষ অবদান। পরে আমরা জানি ১৯৭১-এর ৩ ডিসেম্বর থেকে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে খোলাখুলিভাবেই শুরু হয়েছিল পেশাদার ভারতীয় বাহিনীর সাথে পেশাদার পাকিস্তান বাহিনীর যুদ্ধ। ১৯৭১ সালে জ্যাকব ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার অধীনে একজন মেজর জেনারেল। তিনি রচনা করেছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে এএকে নিয়াজির আত্মসমর্পণের দলিল। লক্ষ করার বিষয় নিয়াজি আত্মসমর্পণ করেছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে। এখানে উপস্থিত ছিলেন না বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক আতাউল গনি উসমানী। সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল নিয়াজির সঙ্গে অরোরার। নিয়াজি ছিলেন না পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। তাই আসলে পাকিস্তান যে ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল, তা নয়। পূর্ব পাকিস্তানে, ভারতের সংবাদমাধ্যম অনুসারে প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করেছিল। এদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল একটি বিশেষ নিরাপত্তা অঞ্চলে। তারপর সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় ভারতে। ভারতে ১৯৭২ সালের ৩ জুলাই হয় ভারত-পকিস্তানের মধ্যে সিমলাচুক্তি। সিমলা চুক্তির পর ছেড়ে দেয়া হয় সব পাকিস্তানি বন্দিফৌজকে। তাদের কাউকে বিচার করা হয় না যুদ্ধাপরাধী হিসাবে। এখানে আরো উল্লেখ থাকে, সিমলা সম্মেলনে কোনো বাংলাদেশের প্রতিনিধি ছিল না। ছিল কেবলই ভারতের পক্ষ থেকে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী (ভারতের প্রধানমন্ত্রী) ও তার উপদেষ্টারা এবং অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো ও তার উপদেষ্টারা। সম্মেলেন শেষে যে যুক্ত ইস্তেহার প্রকাশিত হয়, তাতে ১৯৭১-এর যুদ্ধকে বলা হয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। কোথাও বলা হয় না, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।
বিষয়টি তাই রয়েছে রহস্যঘেরা। এখানে আরো উল্লেখ করা যেতে পারে, বাংলাদেশ থেকে ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে শুরু হয়েছিল ভারতীয় বাহিনীর অপসারণ। অন্যদিকে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে এসেছিল ২৪ হাজার বাংলাভাষী মুসলিম সৈন্য। যারা মনমানসিকতার দিক থেকে ছিল খুবই রক্ষণশীল ও ভারত বিরোধী। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে এখন যত সহজ করে বলা হচ্ছে, সেটা তা আদৌ ছিল না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন বঙ্গোপসাগরে পাঠিয়েছিলেন সপ্তম নৌ-বহর। যখন রমনার মাঠে নিয়াজি সই করছিলেন আত্মসমর্পণ দলিল, তখন এসে তা পৌঁছেছিল বাংলাদেশের সমুদ্রসীমানায়। প্রণব মুখোপাধ্যায় ঢাকায় আসেন ১৪ জানুয়ারি ২০১৮। তাকে বাংলা একাডেমি আমন্ত্রণ করে আনেন বাংলা ভাষাসাহিত্যের ওপর বক্তৃতা দেয়ার জন্য। কিন্তু তিনি এ বিষয়ে যা বলেন, তাকে বাংলাভাষা সাহিত্যের ওপর কোনো বক্তৃতা হিসেবে চিহ্নিত করা চলে না। বলা চলে একজন রাজনীতিবিদের খুবই স্থূল বক্তব্য। ব্রিটিশ শাসনামলে হতে পেরেছে বাংলা সাহিত্যের ও ভাষার বিপুল বিকাশ। যেটাকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। কেন বিদেশি ব্রিটিশ শাসনামালে বাংলাভাষা সাহিত্যের এভাবে বিকাশ সম্ভব হলো, সেটা নিয়ে আলোচান এখনও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু সেটা করা হয় না। ইংরেজি ভাষা এখন হয়ে উঠেছে বিশ্বের প্রথম ভাষা। অথচ ইংরেজি ভাষার এই প্রকর্ষ হতে পেরেছে কোনো একাডেমি ছাড়াই। আমরা গড়েছি ‘বাংলা একাডেমি’। এই একাডেমি আসলে বাংলাভাষার প্রকর্ষ কতটা ঘটাতে পারছে সেটা আলোচিত হওয়া প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গে অনেক প্রথম শ্রেণীর গবেষক আছেন, যারা বাংলাভাষা সাহিত্য নিয়ে আছেন গবেষণায় ব্যাপৃত। কিন্তু তাদের কাউকে আমন্ত্রণ না জানিয়ে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিকে কেন ডেকে আনা হলো বাংলাভাষা সাহিত্যের ওপর বক্তৃতা দেয়ার জন্য, সেটা আমাদের মনে জাগাচ্ছে ক্ষুব্ধ বিস্ময়। প্রণব মুখোপাধ্যায়কে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডি লিট ডিগ্রি। এই ডিগ্রি নেয়ার সময় তিনি যে বক্তৃতা দিয়েছেন, তা অনেকের কাছেই মনে হবে খুবই স্থূল। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক খুন কেন হয়, সে বিষয়ে গবেষণা করতে। তার মতে, এ বিষয়ে গবেষণা করলে জানা যাবে রাজনৈতিক খুনের কারণ। আর সম্ভব হবে তা এড়ানো। কিন্তু রাজনৈতিক খুন নানা কারণেই হয়। যেমন মোহনদাস করম চাঁদ গান্ধীকে খুন করেছিলেন নাথুরাম বিনায়ক গটসে।
গটসে ছিলেন একজন গোঁড়া হিন্দুত্ববাদী। তিনি গান্ধীকে খুন করেছিলেন হিন্দুত্ববাদ বিরোধী হিসেবে। এ ক্ষেত্রে তার কোনো ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির হিসাব ছিল না। ইন্দিরা গান্ধী খুন হন শিখ দেহরক্ষীদের গুলিতে। এসব শিখ রক্ষীরা ছিলেন খালিস্তানপন্থী। যারা চাচ্ছেন ভারতে শিখদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। যেহেতু ইন্দিরা গান্ধী খালিস্তানপন্থীদের ওপর নির্মমভাবে গুলি চালাতে হুকুম দিয়েছিলেন, তাই খালিস্তানপন্থী শিখরা ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা করে তার প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। খালিস্তানপন্থী আন্দোলন এখন স্তিমিতি হয়ে পড়েছে। কিন্তু আবার তা উঠতে পারে তীব্র হয়ে। ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র রাজিব গান্ধী খুন হন শ্রীলঙ্কার তামিলদের হাতে। এই তামিলরা মনে করছিলেন ভারত চায় না শ্রীলঙ্কার তামিলরা স্বাধীনতা পাক। গণতন্ত্রে রক্তপাত কম ঘটে। কেননা, গণতন্ত্রে ভোটের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে এক দলের হাত থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা যেতে পারে আরেক দলের হাতে। কিন্তু তথাপি রাজনৈতিক নেতা খুন হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ পর্যন্ত চারজন নেতা ঘাতকের গুলিতে খুন হয়েছেন। প্রণব বাবু যা বলছেন, সেরকম গবেষণা তাই এক্ষেত্রে সম্ভব নয়। এই একই সভায় তিনি আবার করেছেন সূর্যসেন ও প্রীতিলতার প্রশংসা। এরা ব্যক্তি-খুনের মাধ্যমেই ভাবতে পেরেছিলেন ভারত স্বাধীন করার কথা। সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন এ দেশে সবার কাছে আদ্রিত হতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথ যতগুলো উপন্যাস লিখেছেন, তার মধ্যে ‘চারঅধ্যায়’ একটি। রবীন্দ্রনাথের এই উপন্যাসটি তার লেখা অন্য আর সব উপন্যাসের চেয়ে অধিক দ্রুত ও অধিক সংখ্যায় বিক্রি হতে পেরেছিল। এর একটি কারণ হলো, রবীন্দ্রনাথ তার এই উপন্যাসে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনকে করেছেন কঠোর সমালোচনা। সে সময়ের ব্রিটিশ প্রশাসন রবীন্দ্রনাথের এই উপন্যাসটি ক্রয় করে বিভিন্ন জেলে সন্ত্রাসবাদীদের মধ্যে বিলি করেছিল। ব্রিটিশ প্রশাসন ভেবেছিল রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস পড়ে সন্ত্রাসবাদীরা ছাড়বেন সন্ত্রাসবাদী পথ। প্রণব বাবু কি এই সংবাদ অবগত আছেন? ভারতের কংগ্রেস দল বাংলাদেশ সম্পর্কে নীতিনির্ধারণে মনে হয় গোলযোগের মধ্যে আছে। কেননা বাংলাদেশ সম্পর্কে কংগ্রেসের ধারণা স্বচ্ছ ছিল না। ১৯৪৬ সালে পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরু লেখেন তার The Discovery of India নামের বই। তিনি তার এই বইতে বলেছেন, বাংলাদেশ হলো একটা প্রান্তিক দেশ। এই অঞ্চল চিরদিনই থেকেছে অখ্যাত অজ্ঞাত। বাংলাভাষী অঞ্চল পরিচিতি পেয়েছে কেবল ইংরেজ শাসনামলে। ইংরেজ এই উপমহাদেশে সাম্রাজ্য বিস্তার আরম্ভ করে বাংলা থেকে। বাঙালি হিন্দু ইংরেজি ভাষা শিখে বেশ কিছু দিনের জন্য অন্য ভাষাভাষীদের ওপর এই উপমহাদেশে প্রাধান্য করতে সক্ষম হয়েছিল। ইংরেজদের হাত ধরেই আবির্ভাব ঘটেছিল শিক্ষিত বাঙালি হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের। এই হিসাবে ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনেও ঘটেছিল তাদের সাময়িক প্রাধান্য। কিন্তু পরে তাদের সেই প্রাধান্য বজায় থাকেনি। কেননা, অন্যরাও অর্জন করে ইংরেজি ভাষার জ্ঞান। ইংরেজদের অনুচর হয়ে ও তদানীন্তন ভারতের রাজধানী কলকাতার অদিবাসী হয়ে সে যে উচ্চস্থান পেয়েছিল, এই উপমহাদেশের ইতিহাসের ধারায় তা স্থায়িত্ব পেতে পারেনি। বাংলাভাষী মুসলমান সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেছেন যে, তাদের শতকরা ৯৮ ভাগের পূর্ব পুরুষ ছিল হিন্দু সমাজের সবচেয়ে নিচুকুলের মানুষ। বাংলাদেশে যে একসময় মুসলমানেরা একটা স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, জওয়াহের লাল সম্ভবত সে বিষয়ে অবগত ছিলেন না। তিনি অবগত ছিলেন না যে, বাংলাদেশে একসময় হিন্দুরা নন, দলে দলে বৌদ্ধরা গ্রহণ করেছিলেন ইসলাম। জওয়াহের লালের বইটির মধ্যে দেখা যায় যে, তার জন্মস্থান ভারতের উত্তর প্রদেশকেই তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ভারতীয় সভ্যতার জন্মভূমি।
তার কাছে গাঙ্গেয় উপত্যকার হিন্দিভাষী মানুষই হলো ভারতীয় সভ্যতার আদি উৎস। আর আর্য ভারতীয় এই সভ্যতাকেই তিনি ভারতীয় ঐক্যের মূল সূত্র হিসাবে তুলে ধরতে চেয়েছেন নানাভাবে। দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড় সভ্যতা তার কাছে মনে হয়েছে খুবই অকিঞ্চিৎকর। জওয়াহের লাল নেহরু তার বইতে বলেছেন, পরারাষ্ট্রের (Supra State) কথা। তার মতে, ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে সৃষ্টি হবে কতগুলো অতিকায় রাষ্ট্র বা পরারাষ্ট্র। ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলোকে হতে হবে এসব পরারাষ্ট্রের অংশ। তারা তাদের অস্তিত্ব অনেক ক্ষেত্রে এক একটি স্বায়ত্তশাসিত সাংস্কৃতিক অঞ্চল হিসেবে বজায় রাখতে পারলেও রাজনৈতিক স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারবে না। মনে হয় ইন্দিরা গান্ধীও তার পিতার এই ধারণার বশবর্তী ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে ভেবেছিলেন এরকমই একটি স্বায়ত্তশাসিত সাংস্কৃতিক এলাকা করার কথা। কিন্তু তখনকার বিশ্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে সেটা করা সম্ভব হয়নি। প্রণব বাবু কী ভাবছেন, আমরা জানি না। তিনি ছিলেন ভারতের প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট নন। কিন্তু বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় প্রচার করা হলো, তিনি হলেন ভারতের প্রথম বাঙালি প্রেসিডেন্ট। যেটা কখনই হতে পারে না। কেননা, তিনি ছিলেন ভারতের একজন নাগরিক হিসাবেই সেই রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। তিনি কখনো ভারতের লোকসভায় অথবা রাজ্যসভায় বাংলাভাষায় বক্তৃতা দিয়েছেন বলে আমার মনে পড়ে না। শুনেছি তিনি বিবাহ করেছেন বাংলাদেশের নড়াইল জেলার একজন কন্যাকে। কিন্তু তিনি যখন তাকে বিবাহ করেন, তিনি তখন হয়ে গিয়েছিলেন ভারতের নাগরিক। তিনি ছিলেন না তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিক। কেন প্রণব মুখোপাধ্যায়কে এত বাঙালি বাঙালি বলে ঢাকঢোল পেটানো হলো, সেটাও আমাদের কাছে মনে হচ্ছে রহস্যময়।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

0 comments:

Post a Comment