Last update
Loading...

নির্বাচন হল উপায় লক্ষ্য ভালো থাকা by মো. মইনুল ইসলাম

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। আশা করা যাচ্ছে, এ বছরের ডিসেম্বরের দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নিয়ে রাজনৈতিক মহল এবং জনগণের মধ্যে নানা জল্পনা-কল্পনা ও উদ্বেগের প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থার জন্য নির্বাচন অবশ্যই দরকার। গণতন্ত্রে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। গণতন্ত্র বিশ্বব্যাপী একটি স্বীকৃত ও নন্দিত শাসনব্যবস্থা। আমরাও গণতন্ত্র চাই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সমরতান্ত্রিক পাকিস্তানের বিপরীতে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু নির্বাচনী ব্যবস্থাটি এখন পর্যন্ত দেশে সংশয় ও বিতর্কমুক্ত হতে পারেনি। তাই নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলেই এ নিয়ে জনমনে সংশয় ও শঙ্কার সৃষ্টি হয়। কারণ দেখা যায়, নির্বাচন সামনে রেখে বড় দলগুলো পরস্পরের প্রতি দোষারোপ, আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রদান, এমনকি সাংঘর্ষিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে।
এর ফলে জনজীবনে মহা অশান্তির সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং নির্বাচন নিয়ে কোনো সংশয় ও উদ্বেগের প্রকাশ দেখা যায় না। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এ নিয়ে তেমন কোনো সংশয় ও বিতর্ক হয় না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে নির্বাচন ব্যবস্থাটির (যার মধ্যে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনকালীন সরকার অন্তর্ভুক্ত) বিষয়ে বাংলাদেশে সংশয় ও বিতর্কের এখনও অবসান হয়নি। এর অর্থ আমরা একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত গড়ে তুলতে পারিনি। এজন্য দেশের বড় দল দুটিরও ব্যর্থতা আছে। কারণ তারাই পালাক্রমে ক্ষমতায় এসেছে এবং তাদেরই দায়িত্ব ছিল ব্যবস্থাটিকে শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। তারা যখন বিরোধী দলে থাকেন তখন গণতন্ত্রের জন্য সোচ্চার হন; কিন্তু ক্ষমতায় গেলে নির্বাচনসহ গণতন্ত্রের অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় উপাদানগুলোকে দৃঢ় করতে তাদের মধ্যে বিশেষ কোনো আগ্রহ ও উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। তাছাড়া এটাও বলা দরকার যে, নির্বাচনই গণতন্ত্রের একমাত্র উপাদান নয়। এ প্রসঙ্গে পরে আরও কিছু আলোচনা করা যাবে। তবে নির্বাচনের মাধ্যমেই জনগণের কাছ থেকে দেশ শাসনের সম্মতি নেয়া হয় এবং গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরু হয়। তাই এর এত গুরুত্ব। বিএনপি দেশের অন্যতম একটি বড় দল। তাই প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন, যা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের অন্যতম অনুষঙ্গ, তার জন্য বিএনপির যথাযথ অংশগ্রহণ বিশেষ প্রয়োজন। বিএনপিকে এ ব্যাপারে দোষারোপ বাদ দিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। আর সরকার ও সরকারি দলকে এ ব্যাপারে সমান সুযোগের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে ‘সহায়ক সরকার’ তথা নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের যে দাবি বিএনপি এখন তুলেছে, বর্তমান বাস্তবতার আলোকে তা কতটা যথাযথ ও যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে জনমনে সংশয় আছে।
বর্তমান সংবিধান মতে এ ধরনের সহায়ক সরকারের কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া অতীতে বিএনপি নিজেই বলে এসেছে, পাগল ও নাবালক ছাড়া দেশে কেউ নিরপেক্ষ নয়। ১৯৯৪ সালের উপনির্বাচনে তাদের ব্যাপক কারচুপি ও কারসাজির ঘটনা আমাদের নির্বাচনের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ও বটে। আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা সুষ্ঠু ও সুদৃঢ় না হওয়ার একটি বড় কারণ হচ্ছে আমাদের কলুষিত রাজনীতি। দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলো মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও মন-মানসিকতা এবং আচার-আচরণে গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলো যেমন- ভিন্নমত, সমালোচনা ও প্রতিপক্ষ দলকে সহজভাবে নেয় না বা এসব সহ্য করে না। তাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকার অভিলাষ। ক্ষমতায় থাকাকালীন নির্বাচনী ব্যবস্থাকে শক্তিশালী না করার এটিও একটি কারণ। দুর্বল নির্বাচনী ব্যবস্থা থাকলে ক্ষমতাসীনরা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তাছাড়া কোনো বড় দলই বিরোধী দলে থাকতে চায় না। অথচ সরকারি দল ও বিরোধী দলের যৌথ অংশগ্রহণ ও ভূমিকা পালনের মাধ্যমেই সংসদীয় গণতন্ত্র অর্থপূর্ণ ও গতিশীল হয়। তাই তাদের গণতন্ত্র মূলত নির্বাচন, জনগণ, উন্নয়ন- এ ধরনের বুলিসর্বস্ব হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিরোধ ও সংঘাতমূলক সম্পর্কও আমাদের রাজনীতির অঙ্গনকে সর্বদা উত্তপ্ত করে রাখে, যা দেশবাসীর কাছে সুখকর মনে হয় না। মানুষ গণতন্ত্রের জন্যই নির্বাচন চায়। কারণ গণতন্ত্র হল জনগণের শাসন।
কিন্তু রাজনীতিকদের একটি বড় অংশ জনগণের শাসন ও ক্ষমতায়নের জন্য নির্বাচন চায় না। তারা নির্বাচন চায় নিজেদের শাসনের জন্য, যাতে তাদের ক্ষমতা ও সম্পদ অর্জনের পথ সুগম হবে। তাই নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের পরিবর্তন হলেও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হয় না। সাধারণ মানুষকে ন্যায্য সেবা পাওয়ার জন্য সরকারি অফিসে খাতকের মতো অসহায় অবস্থায় বারবার ধরনা দিতে হয়। তারপরও ফুয়েল তথা ঘুষ না দিলে ফাইল চলে না। দুর্নীতি ও সন্ত্রাস তাই হ্রাস পায় না। কিছুদিন আগে দেখা গেল বিশ্বের সেরা দুর্নীতিবাজ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫ নম্বরে। দুর্নীতির সঙ্গে সন্ত্রাসও সমানতালে চলছে। গুম, খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ, ধর্ষণ ও চাঁদাবাজির মতো সন্ত্রাস সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। এসব রোধে সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে বটে, তবে তা আরও জোরদার করা দরকার। তাহলেই মানুষ উপকৃত হবে। একইভাবে সরকারের ওপর তাদের আস্থাও বাড়বে। সম্প্রতি অধ্যাপক রেহমান সোবহান এশিয়াটিক সোসাইটির এক বক্তৃতায় যথার্থই বলেছেন, ‘রাজনীতি এখন ধনীদের খেলা।’ সংসদ সদস্যদের একটি বড় অংশই দেখা যায় ব্যবসায়ী। এ কথা বিশ্বাস করার কারণ আছে যে, তারা নির্বাচনকে একটি ব্যবসায়ী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করে। তাই তারা এ খাতে প্রচুর টাকা খরচ করে। সৎ ও জনদরদি মানুষের পক্ষে এ টাকার খেলায় যোগ দেয়া সম্ভবপর হয় না। ব্যবসার যা ধর্ম তা হল বিনিয়োগ থেকে মুনাফা অর্জন। তাই জনসেবার চেয়ে সম্পদ অর্জন তাদের কাছে প্রাধান্য পাবে, এটাই স্বাভাবিক। সংসদ সদস্যদের একটি অংশ যে ভালো ধন-সম্পদ অর্জন করে থাকে, তা ওয়াকিবহাল মহলের অজানা নয়। এটা এখন ‘এমপি বাণিজ্য’ বলে পরিচিতি পেয়েছে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পাচ্ছে। মানবিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হচ্ছে না। এর মধ্যে যে মহত্ত্ব ও আনন্দ আছে, তা দেশে খুব আদর্শায়িত ও প্রশংসিত নয়। ব্যক্তিগত লাভ-লোভ ও স্বার্থপরতার এ বাড়-বাড়ন্ত দেশের সত্যিকার উন্নয়নের পথে বড় বাধা। এ লাভ-লোভ ও স্বার্থপরতার কারণেই দেশে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের এত প্রাবল্য।
দেশে উন্নয়ন হচ্ছে এবং দারিদ্র্যও হ্রাস পাচ্ছে ঠিক; কিন্তু সেটা সঠিক গতিতে হচ্ছে না। তাছাড়া উন্নয়নের সুফল সবাই সমানভাবে পাচ্ছে না। ফলে ধন-বৈষম্য দেশে প্রকট রূপ ধারণ করেছে। সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সমাজের উঁচু স্তরের পাঁচজনের আয় সমাজের নিচু স্তরের পাঁচজনের চেয়ে ১২১ গুণ বেশি (দ্য ডেইলি স্টার, ০৬.১২.১৭)। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ছিল সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। সেটা না হোক, অন্তত সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাটিও যে বেজায় দুর্বল, তা উপরোক্ত সমীক্ষা থেকেই সুস্পষ্ট। অথচ একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। পরিশেষে বলতে হয়, একটি সত্যিকার ও সুষ্ঠু নির্বাচন আমরা অবশ্যই চাই। কিন্তু নির্বাচনেই যেন গণতন্ত্রের অভিযাত্রার পরিসমাপ্তি না ঘটে। একটি দলের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়ে তা যেন সত্যিকার জনগণের শাসন দেশে কায়েম করে। আইনের শাসন ও সুশাসন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, মৌলিক গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের জন্য সুষ্ঠু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো স্থাপন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের কাজ যেন নির্বাচনের মতো সমান গুরুত্ব পায়। বাস্তবে তা পায় না বলেই মানুষ সত্যিকার গণতন্ত্রের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর জন্য তাই আমাদের আকাক্সক্ষা ও আন্দোলন নিরন্তর চলমান থাকতে হবে। গণতন্ত্রের স্বপ্ন বাস্তবায়নে নির্বাচন হোক সে আকাক্সক্ষা ও আন্দোলনের একটি অন্যতম উপায় মাত্র।
মো. মইনুল ইসলাম : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

0 comments:

Post a Comment