Last update
Loading...

সামর্থ্য বেড়েছে, প্রয়োগে ঘাটতি by ইফতেখারুজ্জামান

এই সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও নীতিকাঠামোর মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানের কথা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যেসব উপাদান অপরিহার্য, সেগুলো প্রতিষ্ঠিত ও বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার ছিল। এখন ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই, বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এটা স্বীকার না করে উপায় নেই। যেমন নবম সংসদের প্রথম অধিবেশনে তথ্য অধিকার আইন হয়েছে, যেটা দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। এর পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধের যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আছে, অর্থাৎ দুর্নীতি দমন কমিশন, সেটির আইনে কিছু সংস্কার এনে এর দুর্বলতাগুলো কাটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন এখন পর্যন্ত যে রকম বাজেট চেয়েছে, সরকার দিয়েছে। কোনো রকম আর্থিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়নি। সম্প্রতি দুদকের নিজস্ব পুলিশ ফোর্স এবং হেফাজতখানা তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া অ্যান্টি মানি লন্ডারিং অ্যাক্টের নীতিগত সংশোধন হয়েছে। মানি লন্ডারিংয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট গঠন করা হয়েছে এই সরকারের আমলে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনের সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যে অঙ্গীকারগুলো করেছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য কর্মপরিকল্পনা এ সরকার প্রণয়ন করেছে। তার ভিত্তিতে আরও কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল প্রণয়ন। এটাকে আমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে দেখি। বলা বাহুল্য, এটার খসড়া প্রণয়নের সঙ্গে আমরা জড়িত ছিলাম। আমি বলব, এই শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নকে সরকার প্রাধান্য দিয়েছে। কেননা আমরা দেখছি, সরকার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের রিফর্ম ইউনিটের ওপর এটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব অর্পণ করেছে। তথ্য প্রকাশকারী সুরক্ষা আইন নামে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন হয়েছে ২০১২ সালে। এই আইনে বলা হয়েছে, তথ্য যাঁরা প্রকাশ করবেন, রাষ্ট্র তাঁদের সুরক্ষা দেবে। ২০০৪ সাল থেকে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস পালন করলেও সরকারিভাবে এত দিন ধরে তা পালন করা হতো না। আমাদের দীর্ঘ প্রচারণার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এ বছর থেকে দিবসটি সরকারিভাবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটাকে আমি ইতিবাচক রাজনৈতিক সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখি। এগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে বলা চলে, আমাদের রাষ্ট্রকাঠামোয় দুর্নীতি প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্য আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অঙ্গীকার আছে, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়েছে, কিন্তু ঘাটতি দেখা যাচ্ছে প্রয়োগের ক্ষেত্রে। সে কারণে বাংলাদেশে গত নয় বছরে দুর্নীতি উল্লেখযোগ্য হারে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে বা কমেছে এমনটা বলা কঠিন। আমাদের গবেষণা এবং পৃথিবীর অন্যান্য সংশ্লিষ্ট গবেষণা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে সুশাসনের ক্ষেত্রে, উন্নয়নের ক্ষেত্রে এখনো সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা দুর্নীতি। টিআইবির খানা জরিপে দেখা যাচ্ছে, মানুষের দুর্নীতির শিকার হওয়ার যে হার, সেটা অব্যাহতভাবে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশের কাছাকাছি রয়ে গেছে। ২০১৬ সালে আমাদের যে জাতীয় খানা জরিপ প্রকাশিত হয়, যেটা ২০১৫ সালের তথ্য, তাতে দেখা যাচ্ছে, সেবা খাতে ৬৭ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতির শিকার হয়েছে। যারা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে, তাদের ৭১ শতাংশ বলেছে, ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না। অর্থাৎ মানুষকে জিম্মি করে ঘুষ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক তুলনামূলক পরিপ্রেক্ষিতেও বাংলাদেশের অবস্থার কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি। এটা ঠিক যে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের যে দুর্নীতির ধারণা সূচক, সেখানে ২০০১ থেকে ২০০৫ সালের মতো সর্বনিম্ন অবস্থানে আমরা এখন আর নেই, কিন্তু আমরা ১৩তম, ১৪তম, ১৫তম অবস্থানে রয়ে গেছি। ২০০৯ সালের পর থেকে অবস্থার হেরফের খুব একটা হয়নি। এতে স্বস্তির কিছু নেই। লক্ষণীয় বিষয় হলো, দুর্নীতির সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শুধু আফগানিস্তান আমাদের নিচে। এটা আমাদের জন্য বিব্রতকর বলেই আমি মনে করি। মোটা দাগে দুর্নীতি একটা ব্যাপক সমস্যা রয়েই গেছে। এখানে সরকার যে খুব সাফল্য দাবি করতে পারে, সেটা বলা কঠিন। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে প্রথমত দেখা যাবে, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে জবাবদিহির যে রাজনৈতিক অবকাঠামো দরকার, সেটা ক্রমাগতভাবে সংকুচিত হয়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ (কনসেনট্রেশন অব পাওয়ার) আগের চেয়ে বেশি হওয়ায় এটা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোয় ক্ষমতা নির্বাহীদের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা ক্রমাগত বাড়ছে। এর পাশাপাশি গণতন্ত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার যে মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, সেগুলোর কার্যকারিতা ক্রমাগতভাবে খর্ব হতে আমরা দেখেছি। যেমন জাতীয় সংসদ। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সংসদের যে ভূমিকা অপরিহার্য, নবম ও দশম দুটি জাতীয় সংসদের ক্ষেত্রেই সেটা আমরা কার্যকর দেখতে পাইনি। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর কার্যক্রম প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। মাসে অন্তত একটি বৈঠক করার যে বাধ্যবাধকতা, সেটা পালনে কমিটিগুলো যেমন ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি এগুলো স্বার্থের দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল। কোনো কোনো কমিটির আলোচ্য বিষয়ে এটির সদস্য বা সভাপতির স্বার্থ জড়িত দেখা গেছে। সংসদে দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। রাষ্ট্রে, সরকারে দুর্নীতি বিরাজমান-এই কথাগুলো বলা হয়েছে। কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। উল্টো কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী বা সাংসদেরা। সামগ্রিকভাবে দুর্নীতির উপস্থিতি অস্বীকৃতির যে সংস্কৃতি, সেটা বিরাজমান থেকেছে। এ কারণে যাঁরা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাঁরা সুরক্ষা পেয়েছেন। তাঁরা আরও বেশি ক্ষমতাবান হয়েছেন। দুর্নীতি করলে শাস্তি পেতে হয়-এ ধারণা তৈরি না হলে দুর্নীতি উৎসাহিত হয়। যাঁরা দুর্নীতি করেছেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্যেই স্বীকার করা হয়েছে যে ‘তাঁরা আমাদের মানুষ’। দুর্নীতির কারণে মানুষের নিরাপত্তা কীভাবে কমেছে, জীবনের ঝুঁকি কীভাবে বেড়েছে, তার একটা প্রকট দৃষ্টান্ত রানা প্লাজা ধস। দুর্নীতির মাধ্যমেই ওরকম একটি ত্রুটিপূর্ণ ভবন নির্মিত হতে পেরেছে। এটির নকশা অনুমোদন করা হয়েছে দুর্নীতির মাধ্যমে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অন্যতম ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে দুর্নীতি। মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে এ রকম কথা বলেন যে ক্ষমতায় থাকলে দুর্নীতি করার, অর্থবিত্তের অধিকারী হওয়ার সুযোগ মিলবে। আবার যাঁরা ক্ষমতার বাইরে থাকেন, তাঁরা এ রকম সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত বোধ করতে থাকেন। ফলে দুর্নীতি করার সুযোগই ক্ষমতায় থাকা বা বাইরে থাকার নিয়ামক হয়ে উঠছে। এটা একটা প্রতিযোগিতার জন্ম দিচ্ছে। পত্রপত্রিকার খবরে দেখা যায়, দুর্নীতির সুযোগের প্রতিযোগিতার কারণে হানাহানিতে অনেককে মৃত্যুবরণ করতে হচ্ছে। এটা আগে এভাবে দেখা যায়নি। ক্ষমতার সঙ্গে যাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত, যাঁরা প্রভাবশালী, তাঁদেরকে বিচারের আওতায় আনার দৃষ্টান্ত আগেও কখনো তৈরি হয়নি, এই নয় বছরেও তেমন একটা তৈরি হতে দেখা যায়নি। উচ্চ আদালতের নির্দেশে ও ব্যাপক জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতে দুদক দৃশ্যত বাধ্য হয়ে বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে বটে, তবে শেষ পর্যন্ত আবার তা লোক দেখানো একটা ব্যাপার হয়ে যায় কি না, এ রকম সন্দেহ অমূলক না-ও হতে পারে। তা ছাড়া এ বিষয়ে দুদকের সুদীর্ঘকালের গড়িমসি যেমন তার দক্ষতার মাপকাঠিতে নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তেমনই এর ফলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আইনের চোখে যে সবাই সমান এবং অভিযুক্তের পরিচয় বা অবস্থাননির্বিশেষে সবাইকে দুদক বিচারের মুখোমুখি করতে সক্ষম, এরূপ আস্থা অর্জন সুদূরপরাহত রয়ে গেল। আমাদের স্বীকার করতে হবে যে দুর্নীতি দমন কমিশন সাম্প্রতিককালে আগের চেয়ে সক্রিয় হয়েছে এবং মানুষের মধ্যে একপ্রকার আশাবাদ তৈরি হয়েছে। মানুষ ভাবছে এই কমিশন চেষ্টা করছে। কিন্তু একটা সীমারেখার মধ্যেই এটা রয়ে গেছে বলে মনে হয়। কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা শ্রেণিই আর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে না-এমন আস্থা মানুষের মধ্যে এখনো তৈরি হয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন এককভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে পারে না। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যেমন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসন, বিচার বিভাগ ইত্যাদির সামর্থ্যকে প্রয়োগ করতে হবে। সেটা প্রয়োগের পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিচার বিভাগের সঙ্গে শাসন বিভাগের যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা কখনোই শাসনব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক নয়। আইন ও কাঠামো ছাড়াও সাধারণ মানুষকেও দুর্নীতি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে হয়। জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনে সদস্যদেশগুলো এমন এক পরিবেশ তৈরির অঙ্গীকার করেছে, যেখানে সাধারণ মানুষ, গণমাধ্যমসহ সব অংশীজন নিরাপদ পরিবেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমানভাবে সোচ্চার হতে পারে। সেই পরিসর তৈরির ক্ষেত্রে বৈপরীত্য দেখতে পাচ্ছি। একদিকে সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস পালন করছে, আবার অন্যদিকে এমন কিছু আইন তৈরি করছে, যার কারণে মানুষের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। যেমন তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা ও ফরেন ডোনেশন রেগুলেশন অ্যাক্টের ১৪ নম্বর ধারা। এসবের মাধ্যমে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সমালোচনার স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ভয়ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষের সোচ্চার হওয়ার সম্ভাবনা তিরোহিত হচ্ছে।
এই সামগ্রিক কারণে দুর্নীতি দমনে এই সরকারের নিজেদের তৈরি করা সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
ইফতেখারুজ্জামান: নির্বাহী পরিচালক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)
দুর্নীতি প্রতিরোধে উদ্যোগ ও ঘাটতি
ইতিবাচক পদক্ষেপ
* তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন
* তথ্য প্রকাশকারী সুরক্ষা আইন
* বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট গঠন
* অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং অ্যাক্টের নীতিগত সংশোধন
* জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল প্রণয়ন
দুর্নীতির পরিস্থিতি
* ৬৭ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতির শিকার
* ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না
* দুর্নীতিতে দক্ষিণ এশিয়ার আট দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সপ্তম
* অধিক দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের কাতারেই একটানা অবস্থান
* সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো কম সক্রিয়
সূত্র: দুর্নীতির পরিসংখ্যানগুলো টিআই-এর দুর্নীতির ধারণাসূচক এবং টিআইবির ২০১৬ সালের খানা জরিপ থেকে নেওয়া

0 comments:

Post a Comment