Last update
Loading...

নতুন করে একই ভুল করতে যাচ্ছি by ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

২০১৭ সালের শেষে অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির ধারাবাহিকতা মোটামুটি বজায় ছিল। তবে নতুন বছরে নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা বাড়লে তার কিছু প্রভাব তো অর্থনীতিতে পড়বেই। তবে কতটা, সেটা নির্ভর করবে অস্থিরতার মাত্রার ওপর। গত অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) রেকর্ড প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। রপ্তানি প্রবৃদ্ধির স্থবিরতা এবং বিদেশ থেকে শ্রমিকদের পাঠানো আয়ের পরিমাণ কমে যাওয়া সত্ত্বেও সেই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু এই দুই খাতে মন্দার বিলম্বিত প্রভাব নতুন বছরের প্রবৃদ্ধির ওপর পড়তে পারে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পরিবেশে বেসরকারি খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ হওয়ার আশা করা যায় না। তবে একটা সুযোগ আছে, সরকারের  চলমান বড় বড় অবকাঠামো খাতের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনীতিকে চাঙা রাখা। সেটা সরকারের নির্বাচনী রাজনীতির জন্য সহায়ক হবে। একমাত্র পদ্মা সেতু ছাড়া অন্য প্রকল্পগুলোতে দক্ষতার সঙ্গে দ্রুত বাস্তবায়নে সমস্যা আছে বলে মনে হয়। একটা ইতিবাচক দিক হলো এ বছরের শেষার্ধে এসে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়েছে। প্রবাসী আয়ের প্রবাহও কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ হঠাৎ করেই দ্রুত বাড়ছে। এটা প্রকৃত উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে যাচ্ছে কি না, তাতে সন্দেহ আছে। খাদ্য পরিস্থিতি নিয়েও সতর্কতা দরকার। বন্যায় ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পর চালের বাজারে অপ্রত্যাশিতভাবে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, এর ফলে সাময়িকভাবে হলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন নির্বাহ কঠিন হয়ে গেছে। উত্তরাঞ্চলের মন্দা যেমন একধরনের মৌসুমি দারিদ্র্য—এটা অনেকটা তেমন। বার্ষিক দারিদ্র্যের হারের হিসাবে এটা যদিও ধরা না পড়ে, তাহলেও এটাকে দারিদ্র্যই বলতে হবে। খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি এখনো কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী।
বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবে ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে। যেখানে আগের বছরগুলোতে উদ্বৃত্ত ছিল। রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের মন্দা ছাড়াও আমদানি খরচ বৃদ্ধিও এর একটি কারণ। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে এবং সরকারের অবকাঠামো নির্মাণের উপকরণ ও খাদ্য আমদানির বাড়তি খরচের ফলে ডলারের দামে চাপ পড়েছে। তবে যথেষ্ট বৈদেশিক মুদ্রার মজুত থাকায় প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারবে। চলমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হলো ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা বেড়ে যাওয়া। ইতিপূর্বে রাজনৈতিকভাবে অনুমতি পাওয়া নতুন ব্যাংকগুলোর দু-একটি খুব নাজুক অবস্থায়। আবার এ প্রক্রিয়ায় আরও নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে কিছু ব্যাংকের মালিকানা বদলেছে, আরও কিছু বেসরকারি ব্যাংক ঝুঁকির মুখে। এ ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থায় বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকদের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মকানুন আরও শক্ত করার বদলে বরং শিথিল করা হচ্ছে। নতুন বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আর্থিক খাতের অন্যায়, অনিয়মের বাড়তি সুযোগ হিসেবে মনে করা হলে তো আরও বিপদ। আশির দশকের শেষে প্রয়োজনীয় বিধিবিধান ঠিক না করেই বেসরকারি খাতের ব্যাংক খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সেই ভুলের ফলে পরে দেখা গেল, ওই ব্যাংকগুলোর আমানতের এক-তৃতীয়াংশই পরিচালকদের ঋণ হিসেবে চলে গিয়েছিল। যার আবার একটা বড় অংশই খেলাপি হয়েছিল। এরপর অনেক নিয়ন-নীতি প্রবর্তন করে এবং আইন আদালতের মাধ্যমে ৬০-৭০ জন উদ্যোক্তা পরিচালককে অপসারণ করার পরই বেসরকারি ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসে। এখন অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে নতুন করে আমরা একই ভুল করতে যাচ্ছি।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ : সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

0 comments:

Post a Comment