Last update
Loading...

অভিষেকের দিনেও বউয়ের সাথে ঝগড়া by মাইকেল উলফ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে লেখা বই ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি : ইনসাইড দ্য ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ প্রকাশের পরই তোলপাড় শুরু হয়েছে মার্কিন মুল্লুকে। অনুসন্ধানী সাংবাদিক মাইকেল উলফের বইটির প্রকাশনা ঠেকাতে আইনি পদক্ষেপও নিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে তাতে কাজ হয়নি। বরং নির্ধারিত তারিখের আগেই গত ৫ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে বইটি। প্রকাশের প্রথম দিনেই শেষ হয়ে যায় সব কপি। অগ্রিম অর্ডার দেয়া হয় ১০ লাখ কপির। বইটির চুম্বক অংশ নয়া দিগন্তের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো। ভাষান্তর করেছেন আহমেদ বায়েজীদ।
[পর্ব-৫]
পুরো প্রচারাভিযানের সময় এবং নির্বাচনের পরে আরো জোরালোভাবে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সিআইএ, এফবিআই, এনএসসিসহ ১৭টি গোয়েন্দা সংস্থাকে অযোগ্য ও মিথ্যাবাদী বলেছিলেন তিনি। তার ঘনিষ্ঠ একজন জানিয়েছেন, এটি অনেকটা বিমানের অটো পাইলট মুডের মতো, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছেই। তার এই অনর্গল ও বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ অনেক ক্ষেত্রে এমনকি রক্ষণশীল মানসিকতারও বিরোধী ছিল। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে তার সমালোচনায় উঠে এসেছে ইরাকের গণবিধ্বংসী অস্ত্র বিষয়ে মিথ্যা তথ্য, যা ইরাক যুদ্ধের মূল কারণ। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ও অন্যান্য যুদ্ধসংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং সর্বশেষ রাশিয়ার সাথে তার সম্পর্কবিষয়ক অতিরঞ্জিত তথ্য ফাঁস করা ছিল এর মধ্যে। ট্রাম্পের এসব সমালোচনা তাকে বামপন্থীদের কাতারে নিয়ে গেল, যারা পঞ্চাশ বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ‘ভয়ের ছায়ামূর্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আবার উল্টো উদারপন্থীরা এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো উভয়ই এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে ভয়ের মধ্যে আছে। বামদের বেশির ভাগই এতদিন অ্যাডওয়ার্ড স্নোডেনের বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অভিযোগ বিশ্বাস করেননি। তারা মনে করতেন স্নোডেন জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, বরং ভালো কোনো উদ্দেশ্যে তথ্য চুরি করে ফেরারি হয়েছেন। তারাই এখন ট্রাম্পের নিকৃষ্ট রুশ-সংযোগের বিষয়ে গোয়েন্দাদের কথা বিশ্বাস করছেন। ট্রাম্প গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে তাই পাত্তা দিতে চাননি; কিন্তু কুশনার ভেবেছেন, নতুন প্রশাসনের প্রথম কাজগুলোর একটি হওয়া উচিত- সিআইএ’র সাথে আলোচনা। সে অনুযায়ী তিনি সিআইএ কার্যালয়ে গেলেন (পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত আসবে)। অভিষেক অনুষ্ঠান নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি চেয়েছিলেন অনুষ্ঠানটি আরো জাঁকজমকপূর্ণ হোক। ট্রাম্পের বন্ধু টম বারাক দায়িত্ব নিয়েছিলেন অভিষেক অনুষ্ঠানের তহবিল সংগ্রহ ও আয়োজনের। যদিও তার আয়োজনের পরিকল্পনাটি ছিল নতুন প্রেসিডেন্টের চরিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। ট্রাম্প তার বন্ধুদের বলেছিলেন তাদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে শীর্ষস্থানীয় কিছু তারকাকে অভিষেক অনুষ্ঠানে হাজির করতে; কিন্তু ওইসব তারকা আসলে ট্রাম্পের অভিষেককে এক রকম বয়কট করেছিলেন।
তাদের উপস্থিত করতে না পারায় ট্রাম্প রেগে গিয়ে বলতে থাকেন, ওইসব তারকা আমাকে অপদস্থ করতে চেয়েছেন। পেশাদার সংগঠক স্টিভ ব্যানন শান্তকণ্ঠে প্রেসিডেন্টকে বোঝাতে চাইলেন তাদের অর্জনের গুরুত্ব। বললেন, তার এই সফলতা পরিমাপ করা সম্ভব নয়, কিংবা এটি নিশ্চিতভাবেই ছিল তাদের প্রত্যাশার বাইরে। সংবাদমাধ্যম ও উদারপন্থীরা তবু নিজেদের ব্যর্থতাকে ঠিক মনে করবে। ট্রাম্প ওয়াশিংটনে এসে নিজের প্রতিষ্ঠান ‘ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে’ উঠতে চাইলেও সঙ্গীরা সেটি করতে দেননি। হোয়াইট হাউজের কাছেই সরকারি অতিথি ভবন ব্লেয়ার হাউজে উঠেছিলেন তিনি। তবে অভিষেকের দিন সকালে তার ঘুম ভেঙেছে সিদ্ধান্ত পাল্টানো নিয়ে অনুশোচনায়। ব্লেয়ার হাউজের বিষয়ে একের পর এক অভিযোগ করে যাচ্ছিলেন তিনি। ‘খুব গরম, পানির সরবরাহ ভালো নয়, বিছানা ভালো নয়’ ইত্যাদি। ট্রাম্পের মেজাজের আর উন্নতি হয়নি। সকাল বেলায়ই একচোট ঝগড়া করেছেন স্ত্রীর সাথে। সে সময় মেলানিয়াকে দেখে মনে হয়েছে তার চোখে পানি টলমল করছে এবং হয়তো পরের দিনই ফিরে যাবেন নিউ ইয়র্কে। বেশ কড়া কণ্ঠে স্ত্রীর সাথে কথা বলছিলেন তিনি। কেলিয়ানি কনওয়ে মেলানিয়াকে বোঝাতে চেষ্টা করেন যাতে তিনি প্রেসিডেন্টের পাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে অবস্থান নিতে পারেন; পাশাপাশি তার নিজের অধিকারও বুঝে নিতে পারেন। আর ট্রাম্পকে এটি বোঝাতে চেষ্টা করেছেন যে, মেলানিয়াও হোয়াইট হাউজে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অভিষেক মানেই, বড় কিছু। সংবাদমাধ্যমের জন্য এ উপলক্ষে একগাদা খবরের ক্ষেত্র তৈরি হয়। দলীয় কর্মীদের জন্য আনন্দের আরেকটি মুহূর্ত এটি। কিন্তু ব্যাননের চেষ্টা ছিল অন্তত তিনটি বিষয় তার বসের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে হবে। সেগুলো হলো- তার প্রেসিডেন্সি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন, অ্যান্ড্র, জ্যাকসনের পর যা আর দেখা যায়নি। তারা জানেন, কারা তাদের শত্রু এবং তাদের ‘বন্ধুত্ব’ তৈরির ফাঁদে পা দেয়া যাবে না। আর সর্বোপরি, প্রথম দিন থেকেই নতুন প্রেসিডেন্টকে ভাবতে হবে যে, তিনি একটি যুদ্ধে আছেন। ব্যানন নতুন প্রেসিডেন্টকে বোঝাতে চেয়েছেন এখানে যে বন্ধুরা আছে তারা হয়তো অন্যত্র শত্রু তৈরি করছে এবং এর কারণ। অভিষেক অনুষ্ঠানের জন্য স্টিভ ব্যানন যে ভাষণ লিখেছিলেন, তার সাথে যেন ট্রাম্পের সে দিনের আগ্রাসী মেজাজটা পুরোপুরি মিলে গেল। ১৬ মিনিটের সেই বক্তৃতার বেশির ভাগ জুড়েই ছিল আমেরিকা ফার্স্ট, সহিংসতা আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিকল্পনা। এ সবই যেন ব্যাননের প্রতিদিনকার চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এটি আরো ভয়ানক হয়ে উঠল ট্রাম্প যখন তার হতাশ আর কাঠিন্য ভরা চেহারা নিয়ে বক্তৃতাটি উপস্থাপন করলেন। নতুন প্রশাসনের মনের কথাটিই ব্যানন সবার কাছে পৌঁছে দিলেন যে, দেশ পাল্টে যাচ্ছে। বক্তৃতা শেষে মঞ্চ থেকে নেমে ট্রাম্প নিজেই কয়েকবার নিজের বক্তৃতার প্রশংসা করলেন। ‘এই বক্তৃতা কেউ ভুলতে পারবে না’। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ডায়াসে উঠে ট্রাম্পের এই বক্তৃতা সম্পর্কে যে মন্তব্য করলেন সেটি হয়তো উদ্বোধনী বক্তৃতার ঐতিহাসিক পাদটীকা হয়ে থাকবে।
তিনি বললেন, ‘যত্তসব ফালতু কথা’। ওয়াশিংটন তাকে যথাযথভাবে স্বাগত জানাতে ব্যর্থ হয়েছে এই হতাশার মধ্যেও ট্রাম্প পরদিন সকালে অভিষেক অনুষ্ঠান খুবই সফল হয়েছে মর্মে সবার সমর্থন চাইলেন। অনেক বন্ধুর কাছে ফোন করলেন তিনি। বললেন, ‘বেশ ভিড় হয়েছিল। অন্তত ১০ লাখ লোক উপস্থিত হয়েছে; তাই না?’ বন্ধুদের অনেকেই তাতে সম্মতি দিলেন। ব্যাপক লোক সমাগমের বিষয়টি নিশ্চিত করলেন কুশনার, সম্মতি দিলেন রেইন্স প্রিবাস। আর ব্যানন কোনো মন্তব্য না করে একটি কৌতুক বললেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের প্রথম পদক্ষেপগুলোর একটি ছিল, হোয়াইট হাউজের ওয়েস্ট উইংয়ের উদ্দীপনামূলক ছবিগুলো সরিয়ে সেখানে তার অভিষেক অনুষ্ঠানের লোক সমাগমের ছবি টাঙানো। তার বাস্তবিক বিকৃতিকে যুক্তিযুক্ত করতে চাইছিলেন ব্যানন। তিনি বুঝতে পেরেছেন, ট্রাম্প যা ভাবেন, তাই করেন। ভনিতা ও ছল নেই বলেই হয়তো বেশি কথা বলেন কিংবা সত্যকে এড়িয়ে চলেন কখনো। ট্রাম্পের বিষয়ে দু’টি ভিন্ন ভিন্ন তত্ত্ব দাঁড়িয়ে গেল। একটি হলো, তাকে বোঝা যায় এবং স্বাগত জানানো যায়। এই দলে আছেন ট্রাম্পের সমর্থকরা। তারা মনে করতেন ট্রাম্প অধ্যবসায়ী নন, অভিজ্ঞ, সাহসী এবং সাধারণ। অন্য দিকে এর বিপরীত ভাবনা ছিল ট্রাম্পের প্রতি বিরূপ লোকদের। সংবাদমাধ্যম ধরে নিলো ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি বেজন্মা। ট্রাম্পের কৃতিত্ব খাটো করে দেখাতে এবং তাকে ভুল প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লাগল তারা। মিডিয়া এই সত্যটি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হলো যে, ভুল যতই থাক তার পরও কাউকে শেষ করে দেয়া যায় না। ট্রাম্প সম্পর্কে ব্যাননের ভাবনাগুলোর সারসংক্ষেপ করলে দাঁড়ায়- ১. ট্রাম্প কখনোই পাল্টান না ২. তাকে পাল্টানোর চেষ্টা করা হলে সেটি বরং তার কাজের ধারাকে নষ্ট করবে ৩. তিনি কেমন সেটি তার সমর্থকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয় ৪. সংবাদমাধ্যম তাকে কখনোই পছন্দ করবে না ৫. সংবাদমাধ্যম নিজেকে যে বস্তুনিষ্ঠতা ও ন্যায়ের রক্ষাকর্তা বলে দাবি করে, সেটি একটি লজ্জা ৬. ট্রাম্পের বৈপ্লবিক বিজয় ছিল প্রচলিত অনুমান ও অভিজ্ঞতার ওপর একটি আঘাত, কাজেই ট্রাম্পের আচরণে বাধা না দিয়ে কিংবা তাকে সংশোধনের চেষ্টা না করে এগুলো মেনে নেয়াই ভালো। সংবাদমাধ্যম ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনেছে, তার অনেক কিছুই হয়তো সহজে মিথ্যা প্রমাণ করা যেত; কিন্তু ট্রাম্পের অতি কঠোর প্রতিরক্ষা নীতির ফলে সংবাদমাধ্যম তাদের আক্রমণ দ্বিগুণ করল এবং ট্রাম্পকে তিরস্কার করতে শুরু করে দিলো। ট্রাম্প তার বন্ধুদের কাছ থেকেও তিরস্কার পেতে শুরু করলেন। শুধু যে তাকে নিয়ে ভীত বন্ধুরাই তা নয়, তার কর্মীরাও জনগণকে বলতে থাকে তাকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানাতে। জো স্কারবরো একবার টেলিফোনে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করলেন, ‘ওখানে তোমার ঘনিষ্ঠ কে? কার ওপর আস্থা আছে? কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে কার সাথে তুমি আলাপ করো? জ্যারেড কুশনার? জবাবে ট্রাম্প বললেন, ‘ভালো প্রশ্ন করেছ; কিন্তু এর উত্তর হয়তো তোমার পছন্দ হবে না। উত্তর, আমি নিজেই। নিজের সাথে কথা বলে আমি সিদ্ধান্ত নেই।

0 comments:

Post a Comment