Last update
Loading...

দুর্নীতি ও জবাবদিহির অভাবে সরকারি মিলের নাজুক অবস্থা

প্রথম আলো: দেশের সরকারি-বেসরকারি পাটকলগুলো কেমন চলছে?
নাজমুল হক: খুব যে ভালো চলছে, তা কোনোভাবেই বলা যাবে না। নানা কারণে সরকারি মিলগুলো তো ভালো চলছেই না, পাশাপাশি বেসরকারি অনেক পাটকলও লোকসান বইতে না পেরে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি খাতের ছোট ছোট অনেক পাটকল বন্ধ হয়ে গেছে। তবে বেসরকারি খাতের যেসব পাটকল ভালো করছে, তারা লাভেই চলছে।
প্রথম আলো: বেসরকারি পাটকল বন্ধ হচ্ছে কেন? বিশ্ববাজারে তো চাহিদা বাড়ছে।
নাজমুল হক: বেসরকারি খাতের পাটকল বন্ধ হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো বৈষম্য। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয় প্রতিবছর। অথচ সেই তুলনায় বেসরকারি খাত তেমন কিছুই পাচ্ছে না। শুরু থেকেই এ বৈষম্য চলে আসছে। এ কারণে বেসরকারি খাতের অনেক ভালো ভালো পাটকল নাজুক অবস্থায় চলে গেছে।
প্রথম আলো: কিন্তু সরকারি পাটকলের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বেসরকারি খাতের অনেক পাটকল ভালোভাবেই টিকে আছে। বছর শেষে ভালো মুনাফাও করছে। সরকারি মিলগুলো পারছে না কেন?
নাজমুল হক: বেসরকারি যেসব পাটকল ভালো করছে, সেগুলো ভালো ব্যবস্থাপনার কারণে করছে। সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে সেসব উদ্যোক্তা নিজেরাই নিজেদের সমস্যার সমাধান করছেন।
প্রথম আলো: তার মানে ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণেই সরকারি পাটকল লাভের মুখ দেখছে না?
নাজমুল হক: অবশ্যই। সরকারি পাটকলগুলোর ব্যবস্থাপনায় চরম দুর্বলতা ও ত্রুটি রয়েছে। সরকারের কাছে টাকা চাইলেই টাকা পাওয়া যায়, তাই লাভ-লোকসানের দিকে তারা খুব বেশি মনোযোগী না। সরকারি পাটকলগুলোতে কোনো জবাবদিহি নেই। সরকারের কাছ থেকে টাকা আনছে অথচ তার যথাযথ জবাবদিহির কোনো ব্যবস্থা নেই। জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকলে আজকে সরকারি পাটকলগুলোর এই অবস্থা তৈরি হতো না। অলাভজনক প্রতিষ্ঠানকে কেন সরকার বছরের পর বছর টাকা দিয়ে টিকিয়ে রাখছে, তা আমার বোধগম্য নয়। পাশাপাশি দুর্নীতিও সরকারি খাতের পাটকলকে লাভজনক করতে না পারার পেছনে একটি বড় কারণ। এককথায় বললে, ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা, দুর্নীতি ও জবাবদিহির অভাবে সরকারি পাটকলগুলোতে নাজুক অবস্থা তৈরি হয়েছে।
প্রথম আলো: সরকারি পাটকলগুলোকে লাভজনক করার কোনো উপায় কি নেই?
নাজমুল হক: সরকারি পাটকলগুলোকে ভালোভাবে চালাতে হলে সবার আগে দরকার পাটকল করপোরেশন বা বিজেএমসিকে পুনর্গঠন করা। আমলা দিয়ে বিজেএমসি চালালে কখনো সরকারি পাটকল লাভের মুখ দেখবে না। কারণ, পাট খাত নিয়ে তাদের বাস্তব কোনো অভিজ্ঞতা নেই। বিজেএমসি পুনর্গঠন করতে হবে এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও অভিজ্ঞব্যক্তিদের সমন্বয়ে। আমার জানামতে, গত ২০ বছরে বিজেএমসিতে নতুন কোনো লোক নিয়োগ করা হয়নি। ফলে সংস্থাটি তাদের কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মিলগুলো পণ্য বৈচিত্র্যও আনা সম্ভব হয়নি। বিশ্ববাজার এখন চরম প্রতিযোগিতামূলক। একটা সময় ছিল যখন যা বানানো হতো, ক্রেতারা তা-ই কিনতেন। আর এখন ক্রেতারা পণ্যের নকশা ঠিক করে দেন। সেটি যাঁরা বানাতে পারেন, তাঁরাই ক্রয়াদেশ পান। তাই বর্তমান বাজারে টিকে থাকতে হলে পণ্যে বৈচিত্র্য আনা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে বিপণনের ক্ষেত্রেও দক্ষতা বাড়াতে হবে। এ জন্য সবার আগে প্রয়োজন পেশাদারি। বিজেএমসিতে সেই পেশাদারির অভাব রয়েছে।
প্রথম আলো: সরকারি পাটকলগুলোর যে অবস্থা, তাতে পণ্যে বৈচিত্র্য আনা কতটা বাস্তবভিত্তিক?
নাজমুল হক: আমি মনে করি, সরকারের উচিত সবার আগে বিজেএমসিকে ঢেলে সাজানো। এরপর পাটকলগুলোর আধুনিকায়নে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি সরকারি মিলগুলোকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া দরকার। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে তার জন্য জবাবদিহিরও ব্যবস্থা রাখতে হবে। আমি মনে করি সরকারি পাটকলগুলোর পরিচালনা পেশাদার লোকের হাতে ন্যস্ত করা উচিত।
প্রথম আলো: পাট খাতে সুদিন ফিরিয়ে আনতে হলে কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
নাজমুল হক: আমি মনে করি, বিজেএমসিকে একটি হোল্ডিং কোম্পানিতে রূপান্তর করা দরকার। উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতসহ বিভিন্ন পর্যায়ের জন্য পেশাদার লোক নিয়োগ করতে হবে। তাতে কাজে গতিশীলতা আসবে। বিজেএমসিতে এখনো কিছু ভালো লোকজন আছে। কিন্তু দুর্নীতিবাজ লোকদের কারণে তারা ভালোভাবে কাজ করতে পারছে না, আবার কাজের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

0 comments:

Post a Comment