Last update
Loading...

মূল্যস্ফীতিই প্রধান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

চলতি ২০১৮ সাল দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং একটি বছর। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, সরকারকে এ বছর বিভিন্ন কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এই সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ আসবে মূলত রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে, যা পর্যায়ক্রমে অর্থনীতিকেও বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে। রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আসবে প্রধানত প্রধান সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। এ বছর ডিসেম্বর অথবা আগামী বছর জানুয়ারি মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অংশগ্রহণ করবে কিনা তা নিয়ে এখনও সংশয় কাটেনি। সরকার বলছে, সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্য দিকে সংসদের বাইরে মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বলছে, বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না। তাই তারা নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি উত্থাপন করছেন। আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছাড়া বিএনপির সামনে খুব বেশি পথ খোলা আছে বলে মনে হয় না। শেষ পর্যন্ত তারা অস্তিত্ব এবং দলের নিবন্ধন রক্ষার জন্য হলেও নির্বাচনে অংশ নেবে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। সরকার এই সুযোগটাই নিতে চাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে কোনো সমঝোতায় আসতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। তাহলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তা কতটা শান্তিপূর্ণ এবং অংশগ্রহণমূলক হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাবে। আগামী জাতীয় নির্বাচন যে কোনো মূল্যেই হোক সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং ব্যাপকভিত্তিক অংশগ্রহণমূলক হওয়া জরুরি। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন ছিল। তাই যে কোনোভাবেই হোক আগামী নির্বাচন অবশ্যই সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। কারণ জাতীয় নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হলে দেশে নানা ধরনের অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়। আর অনিশ্চিত অবস্থায় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হতে বাধ্য। যেমন দশম জাতীয় নির্বাচনের পর ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাস দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক সহিংসতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু তারপর বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের স্থিতিশীলতা বিরাজ করে। স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ একটি দেশে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আহরণের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক অঙ্গনে স্থিতিশীলতা বিরাজ করা সত্ত্বেও স্থানীয় এবং বিদেশি বিনিয়োগে কাক্সিক্ষত মাত্রায় গতি আসেনি। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ব্যক্তি খাতে কাক্সিক্ষত মাত্রায় বিনিয়োগ না হওয়ার পেছনে অন্যান্য কারণ থাকলেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। কারণ অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো উদ্যোক্তা বিনিয়োগের মতো দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সব সময়ই দ্বিধান্বিত থাকেন। আগামী জাতীয় নির্বাচন যদি ব্যাপকভিত্তিক অংশগ্রহণমূলক এবং সুষ্ঠু না হয় তাহলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বৃদ্ধি পাবে। এটা দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও বিপন্ন করতে পারে। এ বছর দেশে রাষ্ট্রীয় খাতে বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে সরকার দলীয় লোকদের সুবিধার্থে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক ব্যয় বরাদ্দ দেয়া হতে পারে। উল্লেখ্য, সরকারি খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার অর্থই হচ্ছে দুর্নীতি বৃদ্ধির আশঙ্কা বেড়ে যাওয়া। স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে, নির্বাচনের আগের সময়গুলোতে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। কারণ এ সময় সরকারদলীয় সমর্থক এবং অন্যান্য দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা জনকল্যাণের নামে ব্যাপকভাবে অর্থ খরচ করতে থাকেন। এতে বাজারে সব ধরনের পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়।
সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। সাধারণ মানুষও এ সময় বাড়তি আয়ের পথ খুঁজে নিতে সচেষ্ট হয়। ইতিমধ্যেই বাজারে আমরা মূল্যস্ফীতির প্রবণতা লক্ষ করছি। শীতকাল হচ্ছে আমাদের শাক-সবজির মৌসুম। এ সময় সব ধরনের সবজি প্রচুর পরিমাণে বাজারে পাওয়া যায়। সরবরাহজনিত ব্যাপকতার কারণে অর্থনীতির সাধারণ সূত্র অনুযায়ী বাজারে কোনো পণ্যের উপস্থিতি ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি পেলে সেই পণ্যের মূল্য হ্রাস পায়। বর্তমানে বাজারে শীতকালীন বিভিন্ন শাক-সবজির উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেও স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারে মূল্য হ্রাস পাচ্ছে না। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব পণ্যের মূল্য বেড়ে গেছে। আগামী মাসগুলোতে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই অবস্থায় এটা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যেতে পারে, চলতি পঞ্জিকা বছরের জন্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করা। গত বছর সিলেটের হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা এবং দেশের উত্তরাঞ্চলে দু’দফা বন্যার কারণে খাদ্য পণ্যের উৎপাদন এবং জোগান হ্রাস পেয়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে যদি খাদ্য পণ্যের উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করে বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা না যায় তাহলে আগামী মাসগুলোতে দেশে খাদ্য পণ্যের ঘাটতি ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে। এটা খাদ্য মূল্যস্ফীতি যে আরও উসকে দেবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আগামী দিনগুলোতে অর্থনীতিতে কালো টাকার প্রভাব বেড়ে যেতে পারে। কারণ যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন তারা কালো টাকা বাজারে নিয়ে আসতে পারেন। আমাদের দেশে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলোও এমন সব প্রার্থীকে মনোনয়ন দেন যিনি প্রচুর টাকা ব্যয় করার সামর্থ্য রাখেন। কাজেই যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন তারা কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যয় করবেন এতে কোনোই সন্দেহ নেই। আগামী মাসগুলোতে দেশের বাইরে টাকা পাচারের আশঙ্কা বৃদ্ধি পাবে। সাধারণত রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনকারীরা অনিশ্চিত নির্বাচনী ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের দখলে থাকা টাকা দেশের বাইরে পাচার করে দিতে পারেন। নিকট অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের আগে অর্থাৎ ২০১৩ সালে দেশ থেকে মুদ্রা পাচার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। আগামী জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের বিষয়েও এক ধরনের অনিশ্চয়তা অনেকের মনেই বিরাজ করছে। কাজেই অতি সাবধানী কালো টাকার মালিকরা কোনো ধরনের রিস্ক নেবে না। তারা মুদ্রা পাচার করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন। বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আমদানি ব্যয় অনেকটাই বেড়ে গেছে। কিন্তু দেশের ভোগ ব্যয় এবং শিল্পায়নের গতি যেভাবে ক্রমশ মন্থর হয়ে পড়ছে তাতে আমদানি ব্যয় এতটা বৃদ্ধি পাওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
কিন্তু ঘটনাটি ঘটছে। অনেকেই মনে করছেন, মূলত মুদ্রা পাচারের প্রবণতার কারণেই আমদানি ব্যয় হঠাৎ করেই অনেকটা বেড়ে গেছে। আগামী মাসগুলোতে এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। চলতি অর্থবছরের বাকি সময়ে এবং সামগ্রিকভাবে পঞ্জিকা বছরের অন্যতম একটি সমস্যা বা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে। ইতিমধ্যেই সে রকম আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠছে। রফতানি আয় ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। রফতানির আড়ালে মুদ্রা পাচার হচ্ছে বলে অনেকেই মনে করছেন। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হচ্ছে রেমিটেন্স। এক অর্থে রেমিটেন্সকে প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত বলা যেতে পারে। যদিও এখন পণ্য রফতানি থেকে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়, কিন্তু এ খাত শতভাগ স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর না হওয়ার কারণে জাতীয় অর্থনীতিতে এর মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে জনশক্তি রফতানি খাতের জন্য কোনো কাঁচামাল আমদানি করতে হয় না বিধায় এ খাতের মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি খাত কার্যত মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশকেন্দ্রিক। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে হয় বাংলাদেশ যে বিপুল পরিমাণ রেমিটেন্স আয় করে তার বেশিরভাগই আসে সৌদি আরব থেকে। কিন্তু দেশটি বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে। ফলে তারা অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বাতিল অথবা স্থগিত করতে বাধ্য হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মুসলিম দেশের অবস্থাও প্রায় একইরকম। কোনো কোনো মুসলিম দেশ পরস্পর রাজনৈতিক বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে। এই সংকট খুব সহসাই মিটবে বলে মনে হয় না। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অনেকটাই বেড়েছে। নিকট অতীতে জ্বালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার কারণে রেমিটেন্স আসা কমে গিয়েছিল। কিন্তু জ্বালানি তেলের বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যও এসব দেশের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তেমন একটা প্রভাব ফেলতে পারছে না। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো দেশ কর্মরত শ্রমিকদের ফেরত পাঠিয়েছে। অনেকেই নতুন করে শ্রমিক নেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক শিল্পে বেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু এ খাতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ লোকবল আমরা সরবরাহ করতে পারছি না। প্রতি বছর তৈরি পোশাক খাত থেকে অন্তত ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার আয় করছে ভারত, শ্রীলংকা ও পাকিস্তানি এক্সপার্টরা। আমরা যদি এ খাতের জন্য দক্ষ লোকবল জোগান দিতে পারতাম তাহলে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশেই থেকে যেত। উপযুক্ত ও মানসম্পন্ন শিক্ষা হচ্ছে একটি জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ। কিন্তু আমরা শিক্ষিতের সংখ্যা বাড়াতে পারলেও এখনও মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারিনি। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। আমাদের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও এখনও ১২ শতাংশের বেশি নয়। অথচ প্রতিবেশী প্রতিটি দেশেই এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে আছে। এ দিকটিতে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।
এম এ খালেক : অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

0 comments:

Post a Comment