Last update
Loading...

একাত্তর: আগে-পরে ৪- খবরটি থিয়েটার রোডে পৌঁছালে মর্মাহত হই by কাজল ঘোষ

নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে আলোচনায় কলকাতার থিয়েটার রোড। সম্ভবত ডিসেম্বরের ৮ বা ৯ই ডিসেম্বর ইন্দিরা গান্ধী গড়ের মাঠে ভাষণ দেন। ঠিক এর আগের দিন রাজভবনে আলোচনায় বুঝতে পারি তিনি  বাংলাদেশ সরকারের স্বাীকৃতির বিষয়টি ভাষণে উল্লেখ করতে পারেন। প্রবাসী সরকারের সবাইকে আবেগ নিয়ে অবহিত করি। কিন্তু ভাষণে পরোক্ষভাবেও তিনি এর উল্লেখ না করায় আমি সহকর্মীদের কাছে নাস্তানাবুদের শিকার হই। যদিও পরে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে ইন্দিরা গান্ধী বিষয়টি স্পষ্ট  করেন।
অন্যদিকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে রাজি নন শুনে দিল্লির মাধ্যমে থিয়েটার রোডে খবরটি পৌঁছলে আমরা হতাশার মধ্যে পরে যাই। এমন নানা ঘটনার সাক্ষী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক নূরে আলম সিদ্দিকী
আজ পড়ুন চতুর্থ কিস্তি:
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী সরকারের সঙ্গে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সমন্বয় কিভাবে হতো?
তাজউদ্দীন ভাই দিল্লিতে বহু কষ্টে পৌঁছে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে সক্ষম হন। ইতিমধ্যেই বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হয়ে গেছেন। তাজউদ্দীন ভাই দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সংসদ সদস্য। তাকে যারা পছন্দ করতেন না তারা মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস এমনকি আজ পর্যন্ত একটা গুজব ছড়ায়। ইন্দিরা গান্ধীর কাছে তাজউদ্দীন ভাই বঙ্গবন্ধুর লেখা একটি চিরকুট দিয়েছিলেন যেখানে উল্লেখ ছিল, তিনি বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তাজউদ্দীন সাহেবকে যেন আস্থায় বিশ্বাসে নেয়া হয় প্রয়োজনে তিনি সরকার গঠনও করতে পারবেন। এটার সত্য-মিথ্যা কোনোটাই আমার জানা নেই। তবে যারা এই প্রচারে সম্পৃক্ত ছিল তাদেরকে তাজউদ্দীন ভাই ভীষণ ভয় পেতো এবং অত্যন্ত কোণঠাসা অবস্থায় থাকতেন। তখন পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রের শাসন ছিল। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় মুখ্যমন্ত্রী, তার উপ-মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বিজয় সিন নাহার। এদের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রীর মর্যাদায় মি. ডিপি ধর ইন্দিরা গান্ধী মূল সমন্বয়কারী ছিলেন। এদের মাধ্যমেই নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ দিল্লির সঙ্গে নিয়মিত সংযোগ রাখতেন। ডিপি ধর ছিলেন তীক্ষ্ণবুদ্ধি এবং অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তি। প্রধান সমন্বয়কারী তো বটেই এই কাশ্মীরী ব্রাহ্মণ মনে-প্রাণে মুক্তিযুদ্ধের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। ফলে দিল্লি ও প্রবাসী সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তার আন্তরিকতা ভীষণ সহায়ক হয়েছিল। তখনকার কর্মরত মুখ্য সচিবের সঙ্গেও প্রবাসী সরকারের নিবিড় সংযোগ ছিল। তখনকার দেশরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম প্রধান সেনাধ্যক্ষ জেনারেল মানেকশ এবং পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার ছিলেন জেনারেল জেকব। প্রবাসী সরকার তো বটেই এইসব শক্তিধর ব্যক্তিদের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠক ও আলোচনার মাধ্যমে আমারও একটি নিবিড় সখ্য তৈরি হয়। যা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভারতীয় সহযোগিতা ও সিদ্ধান্ত আদায়ে অনেকটা সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বিশেষ করে ডিসেম্বরের ৮ বা ৯ তারিখে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী কলকাতায় আসেন রেসকোর্সে গড়ের মাঠে ভাষণ দেয়ার উদ্দেশে। ভাষণ দেয়ার আগের দিন খুব সম্ভবত ডিপি ধরের প্রভাবে আমাকে রাজভবনে ডেকে পাঠান। প্রায় আধাঘণ্টা আলোচনার প্রাক্কালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের স্বীকৃতির প্রশ্নটি স্পষ্ট করে তুলে ধরেন। আমি খবরটি পেয়ে আবেগাপ্লুত হৃদয়ে আমাদের সকল মহলকে অবহিত করি। গড়ের মাঠের জনসভায় ভাষণ প্রদানকালে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী পরোক্ষভাবেও স্বীকৃতির বিষয়টি ভাষণে উল্লেখ করেননি। ফলে আমার মহলে আমার অবস্থা শোচনীয় হয়ে দাঁড়ায়। টাঙ্গাইলের মান্নান ভাই, অধ্যাপক ইউসুফ আলী ভাই, মোয়াজ্জেম ভাই সকলেই গড়ের মাঠের মিটিংয়ে আমার ওপর চড়াও হয়ে যান। তাদের মতে আমি এটা চাপা মেরেছি। হঠাৎ বেতার ঘোষণায় জানা গেল শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। সমগ্র ভারতবাসী, আমরা প্রবাসীরা সেই ভাষণটি শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে রইলাম। আমরা থিয়েটার রোডে বসেই ভাষণটি শুনেছিলাম। যেখানে ইন্দিরা গান্ধী ঘোষণা দেন ভারত পাকিস্তানের দ্বারা আক্রান্ত। আত্মরক্ষার খাতিরে ভারতকে সামরিকভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে। প্রতি আক্রমণ করতে হবে। এখানে উল্লেখ করা অতীব প্রয়োজন যে, প্রশিক্ষণরত মুক্তিযোদ্ধাদের রণাঙ্গনে ভারতের সৈন্যবাহিনী প্রথম থেকেই অংশগ্রহণ করেছিল। তখন যশোরসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিরাট অংশ। এদিকে চট্টগ্রাম, কুমিল্লারও উল্লেখযোগ্য অংশ পাকিস্তানের দখলমুক্ত হয়েছিল। এর আগে ইন্দিরা গান্ধী ইউরোপ সফর শেষে যখন যুক্তরাষ্ট্রে কূটনৈতিক সফর করেন তখন ক্ষমতায় ছিলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সন। সম্ভবত শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে ১৯শে ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত একটি সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে হটিয়ে দিতে পারলে আমেরিকা কোনো হস্তক্ষেপ করবে না, নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি উঠাবে না। যদিও সেন্টো-সিয়াটো চুক্তির বদৌলতে আমেরিকার সামরিক বাস্তবতা ছিল পাকিস্তানকে আক্রমণ করলে আমেরিকা অবশ্যই সামরিক সাহায্য দেবে। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর এই যুক্তরাষ্ট্র সফর কূটনৈতিক সাফল্যে ভাস্বর। আমার স্পষ্ট মনে আছে, গড়ের মাঠে জনসভায় তিনি বলেছিলেন, আমেরিকা আমাকে বলে আমি নাকি খুব জেদি। প্রতি উত্তরে আমিও বলি, আমি জেদি নই তবে সিদ্ধান্তে অটল। প্রাণভয়ে ছুটে আসা ও ভারতে আশ্রয় নেয়া এক কোটি শরণার্থীকে আমি নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারি না। এই বলে তিনি ভাষণটি শেষ করেন। পরে বেতার ভাষণে তিনি এসব কথার পুনরুল্লেখ করে বলেন, পাকিস্তান ভাঙাতো দূরের কথা; পাকিস্তানের রাজনীতিতে বিন্দুমাত্র নাক না গলিয়েও আমি এই শরণার্থীদের একটি নিরাপদ গ্যারান্টি চেয়েছিলাম। সেটাও পাইনি। তাই আজ আমি তাদের নিরাপত্তার জন্য; নিরাপদ আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের মুক্তিযুদ্ধের সরকারের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করলাম। আক্রান্ত ভারতকে রক্ষার জন্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ ঘোষণা করলাম। আমি আশা করবো, বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষ এইক্ষেত্রে আমাদের সর্বাত্মক সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদান করবে। আবেগ উচ্ছ্বাস বিবর্জিত বেতারযোগে এমন কঠিন ও প্রত্যয়দীপ্ত ঘোষণা প্রদান শুধু তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ফসলই নয়; ইতিহাসেরও একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। বাংলাদেশের মানুষ তাদের বুক উজাড় করে ইন্দিরা গান্ধীর এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছিল। প্রত্যেকটি রণাঙ্গনে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে তাড়িয়ে দেয়ার লড়াইয়ে জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত সক্রিয় সহযোগিতা প্রদান করেছিল। সারা বাংলার গ্রামগঞ্জে প্রান্তিক জনতার সহায়তায় পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী শুধু উপর্যুপরি মারই খাইনি; আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছিল। সমগ্র  দেশ থেকে সৈন্যরা পালিয়ে ঢাকা চলে আসছিল। এরকম কোণঠাসা পরিবেশে তখনকার ইয়াহিয়া খানের সরকার জেনারেল নিয়াজীর কাছে আত্মসমর্পণের নির্দেশ পাঠায়। নিয়াজী আত্মসমর্পণ করতে সম্মত হন তবে একটি শর্তজুড়ে দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তিনি আত্মসমর্পণ করবেন না। খবরটি যখন দিল্লির মাধ্যমে থিয়েটার রোডে পৌঁছায় তখন ভীষণভাবে মর্মাহত হই। তা সত্ত্বেও আত্মসমর্পণ করানোটি আমাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দেয়। নইলে আকাশ, স্থল, ও জলপথে যে সর্বাত্মক আক্রমণ ভারতীয় বাহিনী করতো তাতে বাংলাদেশ ভস্মীভূত হয়ে যেতো, ঢাকায়ও ছাই ছাড়া আর কিছুর অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যেতো না। কারণ, আমি স্বচক্ষে তাদের প্রস্তুতির অনেকটা সাক্ষ্য বহন করি। সেইজন্য তাদের এই অকারণ জেদকে মেনে নিতে আমরা বাধ্য হই। এ খবরে জেনারেল এমএজি ওসমানীর সর্বপ্রকার প্রস্তুতির মহাযজ্ঞ নিমেষে নিঃশেষ হয়ে যায়। তিনি পোশাক, ব্যাজ, মেডেল পরে একরকম রিহার্সেল পর্যন্ত দিয়েছিলেন। হেলিকপ্টার প্রস্তুত ছিলই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব উলটপালট হয়ে গেল। তিনি মানেকশর সহপাঠী ছিলেন স্যান্ডার্সে। সেখানে তার কাছে আত্মসমর্পণ না করলে তার উপস্থিত থাকা বেমানান বিধায় তিনি বাধ্য হয়ে বিরত থাকেন। বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন একে খন্দকার। তবে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় যে, একে খন্দকার তখনও সেকেন্ড-ইন কমান্ড ছিলেন না। সিলেটের জেনারেল রব সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন। সে যাই হোক আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানটি সফলভাবে ১৬ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হলেও পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, রাজাকার, আলবদর, আল শামস সশস্ত্র অবস্থায় ধানের মধ্যে আগাছার মতো বিস্তীর্ণ বাংলাদেশে রয়ে গেল। অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য প্রবাসী সরকার তাৎক্ষণিক দেশে প্রত্যাবর্তন করেনি। ভারতীয় সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে শাজাহান সিরাজ ও আমি ঢাকার পুরনো বিমানবন্দরে অবতরণ করি। সে এক অভূতপূর্বে অবিস্মণীয় মুহূর্ত। আমাদের শরীরে প্রচণ্ড শিহরণ ও উত্তেজনা। আমার ধমনীতে ধমনীতে শিরায় শিরায় টগবগে রক্তের উত্তেজনা অনুভব করছিলাম। অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র থেকে সশস্ত্র গোলা নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে আমাদেরকে বরণ করলো। দিনটি ছিল ১৭ই ডিসেম্বর। আমরা লাখ লাখ লোকের জনাকীর্ণ মিছিল নিয়ে সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে পৌঁছালাম। সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে মঞ্চ তৈরিই ছিল। রব ও মাখন আমাদের পূর্বেই ঢাকা এসে গিয়েছিলেন। তারা বাংলাদেশ বেতারে কমান্ডার অথরিটি হিসেবে তাদের নাম ঘোষণা করেন। সম্ভবত এই আশঙ্কায় তাজউদ্দীন আহমদসহ প্রবাসী সরকারের সদস্যরা একটু পর্যবেক্ষণ ও সবুজ সংকেতের আশায় কলকাতায় রয়ে যান। কিন্তু হেলিকপ্টারযোগে পুরনো এয়ারপোর্টে নামলে রব, মাখনসহ গোটা বাংলাদেশই আমাদেরকে পরম আপ্লুত হৃদয়ে বরণ করে নেয়। সার্জেন্ট জহুরুল হলের প্রবেশ মুখ নীলক্ষেতের প্রবেশ মুখ থেকে শুরু করে টিচার্স ক্লাবের পাশে সার্জেন্ট জহুরুল হক ময়দানটি জনসমুদ্রে রূপান্তরিত হয়। আমরা ৪ জন একসঙ্গে মঞ্চে ওঠলে সমগ্র জনসমুদ্র বজ্রনির্ঘোষে গর্জে ওঠে। উদগত, উদ্যত, উদ্ধত পূর্ণায়ত পদ্মটির মতো অথবা সূর্যকিরণে চোখ ঝলসে যাওয়া কচি নারকেল গুচ্ছের মতো উদ্যত জনতার সেই সমাবেশ আমাদের অশ্রুজলে বুক ভাসিয়ে দেয়। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে আবেগঘন বক্তৃতা তো দূরে থাকা, আবেগাপ্লুত বক্তৃতা তো দূরে থাক মুখ দিয়ে কোনো শব্দই যেন বের হচ্ছিল না। তবে এফ এফ আর মুজিব বাহিনীর সংঘাত এড়ানোর তাগিদে আমরা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ধারা-উপধারার বাইরে এসে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আদলে জেলা, থানা, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ের গঠিত ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বের আওতায় সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করা এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তির আন্দোলনকে অব্যাহত রাখার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাই। এটি মারাত্মক প্রভাব ও শুভ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

0 comments:

Post a Comment