Last update
Loading...

বেঁচে থাকলে লজ্জা পেতেন সৌদির প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ

ইসরাইল ও সৌদি আরবের মধ্যে প্রকাশ্য মাখামাখিতে ইসরাইলজুড়ে জয়ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সৌদি আরবের নতুন ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে মোহাম্মদ বিন সালমানের নিয়োগ ছিল ইসরাইলের জন্য প্রথম ‘শুভ বার্তা’। তখন সৌদি আরবকে ইসরাইলের ‘স্বর্গরাজ্য’ হিসেবে অ্যাখ্যা দেয়া হয়েছিল। যদিও ঘনিষ্ঠ এ সম্পর্কের কারণে ইসরাইলকে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যে ইসরাইলের মন্ত্রীরা স্বীকার করেছেন যে, সৌদির সঙ্গে গোপন কৌশলগত আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সৌদি আরবের একটি পত্রিকাকে এক নজিরবিহীন সাক্ষাৎকারে ইসরাইলের সেনাপ্রধান বলেছেন, ইরানকে টার্গেট করেই দুই দেশ এক চুক্তি সম্পন্ন করেছে। হারেৎজ পত্রিকার এক নিবন্ধে বলা হয়, দুই দেশের মধ্যে অপবিত্র এ সম্পর্ক এটাই ইঙ্গিত দেয় যে তারা তাদের অতীতের শত্রুতাকে ইরানের কম্বলের মধ্যে সমাহিত করেছে। এক সময়ের শাশ্বত শত্রুতা এখন চমৎকার বন্ধুত্বে রূপান্তরিত হচ্ছে। সৌদির সঙ্গে ইসরাইলের এ সম্পর্কের খবরে মর্মান্তিক আঘাত পেতেন সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ। বস্তুত কবরের মধ্যেও হয়তো তিনি নড়েচড়ে বসেছেন। ফিলিস্তিনে আরব ও ইহুদীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার এক রহস্য উন্মোচক মতাদর্শের মধ্যেই শান্তির ভিশন লুকিয়ে রয়েছে। যেমনটা সম্ভবত কোনো আরব ও মুসলিম নেতা, এমনকি তার উত্তরসূরিদের মধ্যে কেউ দিতে পারেননি। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের সঙ্গে এক বৈঠকে ওই মতাদর্শের উন্মোচন করেন ইবনে সৌদ। সেখানে ইসরাইল ও ইহুদিদের নিয়ে সৌদি আরবের প্রকাশ্য ধারণা সুস্পষ্ট হয়। ১৯৩৮ সালের নভেম্বরে ইসরাইলে আবর বিপ্লবের শুরুর দিকে বাদশাহ ইবনে সৌদ এক চিঠিতে রুজভেল্টকে লিখেছিলেন, ‘ফিলিস্তিনে ইহুদিদের কোনো অধিকার নেই এবং সেখানে তাদের অধিকার চাওয়া মানবজাতির ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন অন্যায় আবদার।’ প্রেসিডেন্টকে বাদশাহ আরও মনে করিয়ে দেন যে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড আরবদের কাছ থেকে এসেছে এবং আরব দেশগুলোর মধ্যেই এটি অবস্থিত। ইহুদিরা শুধু একটি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য এটি দখল করে। আর সেই সময়ের বৃহত্তর অংশই ছিল গণহত্যা এবং ট্র্যাজেডিতে পরিপূর্ণ। বাদশাহ সৌদ হুমকির সুরে আরও বলেছিলেন, যদি ইউরোপের ইহুদিরা ফিলিস্তিনের দিকে অগ্রসর হয় তবে ‘স্বর্গে ফাটল ধরবে, পৃথিবী বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং পাহাড়গুলো প্রকম্পিত হবে।’ এর পাঁচ বছর পর ১৯৪৩ সালের এপ্রিলে বাদশাহ সৌদ রুজভেল্টকে আরও একটি চিঠি লেখেন। ওই চিঠিতে তিনি মুসলিম ও ইহুদিদের মধ্যকার ধর্মীয় দ্বন্দ্বের বিষয়ে তুলে ধরেন। ইসলামের আবির্ভাব, মুসলিম ও মহানবী (সা.) এর প্রতি ইহুদিদের বিশ্বাসঘাতক আচরণের ইতিহাস তুলে ধরেন সৌদি বাদশাহ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি উল্লেখ করে তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, যাদের সঙ্গে ইহুদিদের কোনো সম্পর্ক নেই সেসব মিত্রদের উচিত নয় ফিলিস্তিনে ইহুদিদের অনুমতি দেয়া। ন্যায় ও ন্যায্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে তাদের কোনো ভিত্তি নেই। জালিয়াতি এবং প্রতারণার মাধ্যমেই তাদের উত্থান হয়েছে। বাদশাহ তার চিঠির ইতি টানেন এভাবে, ‘যদি ইহুদিরা তাদের ইচ্ছা পূরণ করতে পারেন, তবে ফিলিস্তিন সর্বদাই অতীতের মতো ভয়াবহ সমস্যায় জর্জরিত হবে। কারণ তারা (ইহুদিরা) অতীতেও বহু সমস্যার কারণ ছিল।’ বাদশাহ আবদুল আজিজের এ বার্তা ম্যাজিকের মতো কাজ করে। ১৯৪৩ সালের মে মাসে রুজভেল্ট চিঠির জবাবে লেখেন, আরব ও ইহুদীদের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা ছাড়া ফিলিস্তিনের মৌলিক পরিস্থিতি পরিবর্তন না করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। দুই বছর পর ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইয়াল্টা কনফারেন্সে অংশগ্রহণের পর রুজভেল্ট সুয়েজ খালে গ্রেট বিটার লেকে ভ্রমণ করেন, যেখানে তিনি ইউএস ক্রুজার কুইন্সি জাহাজের ওপর বাদশাহ ইবনে সৌদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এটাই ছিল এ ধরনের প্রথম বৈঠক। ওই বৈঠকে রাজকীয় উপহার বিনিময়, রাজকীয় ভোজ ও আরবীয় কফি পানের মাধ্যমে ফিলিস্তিন ইস্যুতে আলোচনা হয়। ফিলিস্তিনে একটি ইহুদি ন্যাশনাল হোম প্রতিষ্ঠার জন্য তার সমর্থনের কথা বাদশাহকে অবগত করেন রুজভেল্ট। তিনি ইউরোপীয় ইহুদিদের দুর্দশার কথা বাদশাহকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বাদশাহ সৌদ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। একটি ভবিষ্যদ্বাণীপূর্ণ মন্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ‘অতীতের মতোই ফিলিস্তিন রক্তের সাগরে ডুবে যাবে।’ বাদশা ইবনে সৌদ ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসনের প্রতি তার সমর্থনের বিনিময়ে মার্কিনিদের ত্রাণ সহায়তা নিতে অস্বীকার করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি এ হুশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, হয় আরব না হয় ইহুদি, যুক্তরাষ্ট্রকে এর যেকোনো একটাকে বেছে নিতে হবে। ইবনে সৌদ বলেন, ‘আরবরা মরে যাবে কিন্তু ইহুদিদের কাছে তাদের এক ইঞ্চি জমিও ছেড়ে দেবে না।’ দেশে ফিরে আসার পরও রুজভেল্ট স্পষ্টত ইবনে সৌদের এ বক্তব্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন। যেমন ১৯৪৫ সালের মার্চে মার্কিন কংগ্রেসের একটি যৌথ সেশনে তিনি বলেন, ‘দুই-তিন ডজন চিঠি বিনিময় করে মুসলিম ও ইহুদি সমস্যার পুরো বিষয়টি সম্পর্কে আমি যতটুকু জানতে পারতাম, ইবনে সৌদের সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বলে আমি তার চেয়ে বেশি জানতে পেরেছি।’ একই বছরের ৫ এপ্রিল রুজভেল্ট ইবনে সৌদের কাছে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি তাকে নিশ্চিত করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না ‘যাতে আরব জনগণের নিকট শত্রু বলে প্রমাণিত হয়।’ এক্ষেত্রে ইবনে সৌদের প্রতি রুজভেল্টকে যে বিষয়টি আকৃষ্ট করেছিল সেটা ভূ-রাজনীতি নয়, বরং ফিলিস্তিনের ব্যাপারে বাদশার ব্যক্তিগত অবস্থান বা প্রতিশ্রুতি। আর সেটা হচ্ছে, ইসলাম ধর্মের জন্মভূমিতে বসে ইবনে সৌদ নিজেকে ধর্ম বিশ্বাসের রক্ষক হিসেবে দেখতেন। একইভাবে মক্কা ও মদিনার পরেই ইসলামের পবিত্রতম স্থান ফিলিস্তিন ছিল তার সেই দৃষ্টির কেন্দ্রে। মুসলিম বিশ্বও তার এই দৃষ্টিভঙ্গিকে শ্রদ্ধার চোখে দেখত। ইবনে সৌদের এ সংকটের প্রতি এক ধরনের সহানুভূতিও দেখিয়েছেন রুজভেল্ট। ইহুদি নেতা রাব্বি স্টিফেন ওয়াইজের কাছে বিরল এক স্বীকারোক্তিতে তিনি এ কথা বলেছেন। ইবনে সৌদ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তিনি একজন বৃদ্ধ মানুষ। তিনি আর যে কয়েক দিন বাঁচেন, শান্তিতে বাঁচতে চান।’

0 comments:

Post a Comment