Last update
Loading...

নতুন মেয়র ও নাগরিক প্রত্যাশা

২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হলো রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। ৯৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী সাবেক মেয়র সরফুদ্দীন আহমেদকে হারিয়ে লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান জয়ী হয়েছেন। নির্বাচনে ভোটাররা তাঁকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছেন। এখন মেয়রের দেওয়ার পালা। রংপুরে পাঁচজন প্রার্থী মেয়র পদে নির্বাচন করলেও ইশতেহার দিয়েছিলেন কেবল বিজয়ী প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান। তিনি ‘রংপুর সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন কর্মসূচি’ শীর্ষক ইশতেহারে রংপুরের অনেকগুলো সমস্যাই সমাধানের অঙ্গীকার করেছেন। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত সিটি করপোরেশন এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো সহায়তা পায়নি। ফলে সদ্য বিদায়ী মেয়র পৌরসভা থেকে পরিবর্তিত সিটি করপোরেশনের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারেননি। মাত্র ৫২ বর্গকিলোমিটার এলাকার পৌরসভা এখন ২০৩ বর্গকিলোমিটারের সিটি করপোরেশন। নতুনভাবে যুক্ত হওয়া এলাকাগুলো এখনো গ্রাম। এখানে সড়ক পাকা হয়নি, বিদ্যুতের ব্যবস্থাও ভালো নয়। অন্যান্য নাগরিক সুবিধা সুদূরপরাহত। উল্টো কমেছে সাধারণ মানুষের সুযোগ-সুবিধা। ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় বয়স্ক ভাতাসহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতামূলক সেবা চালু ছিল, সিটি করপোরেশন হওয়ায় তা-ও বন্ধ হয়েছে। নতুন এলাকাগুলোতে কৃষিজমির ওপর সিটি করপোরেশন করের বোঝা চাপিয়েছে। মূল শহর, উপশহর, গ্রাম—এই তিন ধরনের মানুষের আছে কিছু অভিন্ন সমস্যা, কিছু স্বতন্ত্র সমস্যা। দায়িত্ব গ্রহণের পর এসব সমস্যা সমাধানে আগামী পাঁচ বছরের মেয়াদকাল ভাগ করে নিয়ে নতুন মেয়রের কাজে নেমে পড়া জরুরি। নতুন মেয়র শুরুতেই কিছু কাজ করতে পারেন, যে কাজের অনেকগুলোতে টাকাপয়সা কিংবা অতিরিক্ত জনবলের বেশি প্রয়োজন হবে না, শুধু সদিচ্ছাই যথেষ্ট। রংপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে ফুটপাত দখল করে আছে অসংখ্য ভাসমান দোকান। এক নির্দেশেই এসব দোকান অন্যত্র স্থানান্তরিত করা সম্ভব। প্রধান সড়কের ওপর থেকে গাড়ি পার্কিং ও ভবন সংস্কারের যাবতীয় মালামাল সরানো সম্ভব। শহরের প্রধান সড়কগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করার জন্য অতিরিক্ত কোনো জনবলেরও প্রয়োজন হবে না। তবে সমস্ত নগরে ডাস্টবিন বসাতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের সচেতন করেও তুলতে হবে। সড়ক বিভাগ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে রাস্তার ভেতর থেকে বিদ্যুতের খুঁটিগুলো সরানো সম্ভব। নতুন অন্তর্ভুক্ত হওয়া এলাকাগুলো থেকে সিটি করপোরেশনের কৃষিজমির কর কমানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করাও জরুরি। নতুন সিটি করপোরেশনকে ইচ্ছামতো ঢেলে সাজানোর সুযোগ আছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে খেলার মাঠ, বিনোদনকেন্দ্র, বড় পুকুর, প্রশস্ত সড়কের ব্যবস্থা করা সম্ভব। সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে কয়েকটি আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার পর্যাপ্ত জমিও আছে। শহরের শ্যামাসুন্দরী খালটিকে ভাগাড়ে পরিণত করা হয়েছে। শ্যামাসুন্দরী খাল, কেডি খাল, ঘাঘট নদ, খোকসা ঘাঘট নদ ও ইছামতী নদীর পরিচর্যা করতে পারলে শহরের চেহারাই পাল্টে যাবে। রংপুরবাসী এমন একটি শহর চায়, যেখানে কোনো রকম যানজট থাকবে না। রেলক্রসিংগুলোতে থাকবে ফ্লাইওভার। অটোরিকশাগুলো শৃঙ্খলার মধ্যে থাকবে। পর্যাপ্ত আলো, ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরাও প্রয়োজন।
প্রতিদিন ছিনতাই এবং মোটরসাইকেল চুরির হাত থেকে শহরকে নিরাপদ করতে হবে। জেলা প্রশাসন ও প্রশাসনের সঙ্গে রংপুর সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ের অভাব আছে। নতুন মেয়র মোস্তাফিজার রহমান নিশ্চয়ই প্রশাসনের সঙ্গে এই দূরত্ব দূর করবেন। সিটি করপোরেশনের এখন পর্যন্ত মাস্টারপ্ল্যান ও অর্গানোগ্রাম পাস হয়নি। ফলে শহরটি গড়ে উঠছে অপরিকল্পিতভাবে। ঢাকা শহরের তিক্ত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনকে পরিকল্পিত শহর হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা উচিত। রংপুরের উন্নয়নের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার রয়েছে। মোস্তাফিজার রহমান জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত, তবু রংপুরের উন্নয়নে তা বাধা হবে না বলেই অনেকে মনে করছেন। জাতীয় পার্টি বিরোধী দল হলেও তো পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নামে অনেক অপবাদ আছে, তিনি রংপুরের উন্নয়নের জন্য তেমন কিছুই করেননি। যদি এখন সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করতে পারেন, তাহলে সেই অপবাদ অনেকটাই ঘুচবে। সিটি করপোরেশনের নিজস্ব যা আয়, তা দিয়ে রংপুরে বড় বড় উন্নয়ন একেবারেই অসম্ভব। ফলে নতুন মেয়রকে মনে রাখতে হবে, সরকারের কাছ থেকে এবং বেসরকারি বড় বড় দাতা সংস্থার সাহায্য নিয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনকে সাজাতে হবে। সাবেক মেয়র বেশ কিছু অবকাঠামোগত কাজ শুরু করেছিলেন। এগুলোর অনেকটাই জাইকাসহ বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায়। সেই কাজগুলোও যথাসময়ে সম্পন্ন করতে হবে। সিটি করপোরেশন শুধু মেয়রের দ্বারা পরিচালিত হবে না। সে জন্য কাউন্সিলর এবং সংরক্ষিত আসনের মহিলা কাউন্সিলরদের কাজের সুযোগ দিতে হবে। আদর্শ নগরে পরিণত হওয়ার অযুত সম্ভাবনা রয়েছে রংপুরের। নতুন মেয়র ইশতেহারে ঘোষণা করেছেন, তিনি রংপুরের সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করবেন। শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশ ও উন্নয়নমূলক কাজ সব সময়ই সবার পরামর্শ নিয়ে করবেন। যদি তিনি দক্ষ-অভিজ্ঞ-সৎ-নিষ্ঠাবানদের সঙ্গে নিয়ে উন্নয়নকাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন, তাহলে রংপুর একদিন সত্যিই আদর্শ নগরে পরিণত হবে। রংপুর শহরটি ভালো রাখার দায়িত্ব শহরের প্রত্যেক নাগরিকের। এই চেতনার উন্নয়ন জরুরি। এই চেতনাবোধ শুধু শহর পরিষ্কার রাখার প্রশ্নে নয়, সামগ্রিক বিবেচনায়। সিটি করপোরেশনে এমন একটি ফান্ড চালু করা প্রয়োজন, যেখানে সবাই উন্নয়নমূলক কাজে আর্থিক সহযোগিতা করবেন। এই ফান্ডের অর্থ ব্যয় ব্যবস্থাপনায় রংপুরের নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিরাও থাকবেন। রংপুর সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ নগরীকে সবুজ করে তুলতে পারে। নিজেদের ব্যবস্থাপনায় একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও করা সম্ভব। গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান, সম্মানজনক কাজের জন্য সম্মাননা প্রদানের ব্যবস্থা করতে পারে। সিটি করপোরেশনে একটি আর্কাইভ থাকা খুবই জরুরি। এই আর্কাইভ হয়ে উঠতে পারে ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রদর্শনকেন্দ্র। নিজস্ব একটি মাসিক কিংবা ষাণ্মাসিক প্রকাশনাও থাকতে পারে। যেখানে শিল্প-সাহিত্য-ইতিহাস-ঐতিহ্যবিষয়ক লেখা থাকবে। একই সঙ্গে তাদের নিজস্ব অবস্থানও সেখানে তুলে ধরা থাকবে। এক কথায়, রংপুর সিটি করপোরেশন হয়ে উঠবে রংপুরের নাগরিকদের প্রাণকেন্দ্র। মেয়রের নেতৃত্বে সবার অংশগ্রহণে রংপুর সিটি করপোরেশন হয়ে উঠুক একটি আদর্শ নগর।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

0 comments:

Post a Comment