Last update
Loading...

নৈতিকতাহীন হয়ে পড়েছে উচ্চশিক্ষা

প্রাচীনকালে এ দেশে শিক্ষকদের ‘গুরু’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো। আর ছাত্রছাত্রীদের অভিহিত করা হতো শিষ্য হিসেবে। বর্তমানে প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার বিদ্যাপীঠ পর্যন্ত কোথাও শিক্ষকদের গুরু বলা হয় না। তার মানে, আগের দিনের সেই গুরু প্রথা বাতিল হয়ে গেছে। শিষ্য প্রথাও বিলুপ্ত প্রায়। সময় দ্রুত এগিয়ে চলেছে। শিক্ষক থেকে আরম্ভ করে সবাই রাতারাতি বড়লোক হতে চান। আর এ জন্যই দেশের উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো আজ লাল, সবুজ, হলুদ, কালো, গোলাপি, বেগুনি দলে বিভক্ত। আর তদানুযায়ী শিক্ষকদের মাঝেও বিভক্তির অভাব নেই। এ বিভক্তি এত দ্রুত ধাবমান যে, শ্রেণীকেন্দ্রিক উন্নত শিক্ষা প্রদান বাদ দিয়ে নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষকই নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত, ব্যস্ত নানামুখী প্রচার আর প্রপাগান্ডা নিয়ে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলতে পারি, যেখানে বর্তমানে একটি বিভাগীয় প্রধান যিনি একদম অসততার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন, অবৈধ প্রভাব খাটিয়েছেন এবং ছাত্রছাত্রীদের মগজ ধোলাই করাসহ ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্বৃত্তায়ন করে চলেছেন। ওই একই বিভাগের আরেক শিক্ষক মিথ্যা ছাড়া সত্য বলেন না বললেই চলে এবং তিনি বহাল তবিয়তে বর্তমানে প্রক্টরের দায়িত্বও পালন করে চলেছেন। তাদের অসৎ কর্মকাণ্ডে উসকানিদাতা উপ-রেজিস্ট্রার যিনি গার্মেন্টের শ্রমিক নেতার মতো আচরণ করেন প্রায়ই। পরিচালনা পর্ষদের চার সদস্যের মধ্যে সবাই অন্যায় ইচ্ছা বাস্তবায়নে বিশ্বাসী ও নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, যাদের অন্যায়-অনাচার আর পাপের বোঝা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। বর্তমান সরকারবিরোধী হয়েও অনেকে ব্যস্ত কী করে কূটনৈতিকপাড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে নানা পদের মিষ্টি বিলিয়ে স্বপদে বহাল তবিয়তে থাকা যায় তা নিয়ে। অথচ, অনেক আগেই সিদ্ধান্ত ছিল যে, কূটনৈতিকপাড়ায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা চলবে না। এমনকি এ বিত্তশালীরা সাবেক এক উপাচার্যের ন্যায্য পাওনার প্রায় আট লাখ টাকা দিচ্ছেন না; উকিল নোটিশ পাঠিয়েও ফল হচ্ছে না। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের চরম অসৎ ও দুর্নীতিবাজ ডেপুটি ডিরেক্টররা পরিচালনা পর্ষদের ছত্রছায়ায় দুর্নীতিতে মগ্ন। আসলে শিক্ষা যখন বেনিয়া হয়ে উঠে, তখন ইউজিসি শত চেষ্টা করলেও তাদের আটকানোর কোনো সহজ পথ খুঁজে পান না। ইউজিসির বর্তমান চেয়ারম্যান যতই শিক্ষার মান উন্নত করার জন্য প্রয়াস নিতে চান না কেন, একটি জায়গায় এসে তিনি হয়তো সীমাবদ্ধতা ঠিকই টের পেয়ে যান। টাঙ্গাইলে চলে যাওয়ার নির্দেশ সত্ত্বেও কেবল ক্ষমতার দাপটে ওই বিশ্ববিদ্যায়টি এখনও কূটনৈতিক পাড়ায় চলছে। উকিল নোটিশের জবাব কিংবা প্রাপ্য অর্থ না পেয়ে বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান চেয়ারম্যানকে বললে, নানা দোহাই দেন। বলেন, ‘আমি তখন পরিচালনা পরিষদে ছিলাম না’। সুশীল সমাজের লোক যখন কুশীল সমাজের কাজ করেন, নয়ছয় করেন, তখন বলার আর কিছুই থাকে না। বর্তমান সরকার সচেষ্ট রয়েছে চলতি বছরের শেষভাগে অ্যাসেসভিশন কাউন্সিল স্থাপন করার। সম্প্রতি শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য সরকার কর্তৃক আয়োজিত হেক্যাপ প্রকল্পের আওতায় (যা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রচলিত হচ্ছে) অন্যতম ভালো কাজ ছিল ৬৯টি বেসরকারি-সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইকিউসি স্থাপন করা। এর মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৮টি।
৩৮টির মধ্যে আবার আইকিউসির কার্যক্রম বাস্তবায়নে মূল সমস্যা হচ্ছে, আইকিউসির পরিচালকদের পদমর্যাদা কী হবে। থাইল্যান্ডে আইকিউসির ডিনের পদমর্যাদা হচ্ছে Vice President মর্যাদায়। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশে দাঁড়াচ্ছে উপ-উপাচার্য সমকক্ষের। কিন্তু এটি করতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোয় যে পরিবর্তন করতে হয়, সেটি কিন্তু সংসদে পাস হয়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে সংযুক্ত হওয়া দরকার। আর ডিরেক্টর আইকিউসিকে রিপোর্ট করতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে। কিন্তু সমস্যা হল মাঝখানের স্তরগুলো ( যেমন : রেজিস্ট্রার, ট্রেজারার, উপ-উপাচার্য) নাখোশ হন। একই অবস্থা বেসরকারি খাতেও। তারপরও ইউসিজি এবং কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স ইউনিট তাদের আন্তরিকতায় কাজ করে চলেছে। এ কাজগুলো অবশ্যই এককেন্দ্রিকভাবে করা প্রয়োজন। বিচ্ছিন্নভাবে করলে চলবে না। যিনি কোয়ালিটি নিয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাজ করে চলেছেন, তাকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে। Right Man in the Right Place-এ- এই নীতির বাস্তবায়ন দরকার এ ক্ষেত্রে। এখন কৌশলগত শিক্ষা পদ্ধতি কেমন হবে? যদি মনে করি, অ্যারাবিকের শিক্ষক যিনি নিজে কোর্স কারিকুলাম নিয়ে কখনও কাজ করেননি, তিনি যদি তা উপস্থাপন করেন তখন হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হবে। Plan-Do-Check-Act এ ক্ষেত্রে কেবল খাবি খেতে থাকবে। ‘অটিজম’-এ আক্রান্ত ছাত্রছাত্রীদের কীভাবে শিক্ষকরা উবধষ করে কর্ম উপযোগী শিক্ষার ব্যবস্থা করবেন, সে জন্য একটি মডিউল তৈরি করা হয়েছিল। ইউজিসির চেয়ারম্যান সেটি উদ্বোধন করেছিলেন; কিন্তু বর্তমানে তা নানা কারণে স্থগিত রয়েছে। আসলে যে কোনো কাজের ধারাবাহিকতা থাকা বাঞ্ছনীয়। আইকিউসির ক্ষেত্রে একই ধরনের সমস্যা হতে পারে। আগামী ২০১৯-এ হেক্যাপ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। আইকিউসির মতো উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, Outcome based teaching-learning প্রতিটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চালু করা প্রয়োজন। অ্যাসেসমেন্ট পদ্ধতিতে উন্নয়ন করা, শিক্ষা পদ্ধতিকে আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগীকরণ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীতকরণ একটি বৈপ্লবিক চিন্তা-চেতনার কাজ। কিন্তু প্রকল্প শেষ হলে আর দশটা সাধারণ প্রকল্পের মতো এটি যে মাঝ পথে থেমে যাবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? যদিও বর্তমানে ইউজিসি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বলতে পারে যে, প্রকল্প মেয়াদ শেষ হলেও আইকিউসির মতো কার্যক্রম চালু রাখা দরকার। আর বেসরকারিগুলোকে বলতে পারে যে, আইকিউসির কার্যক্রম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০-এর আওতায় ইন্টারনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স হিসেবে চালুকরণ প্রয়োজন। বর্তমানে দুটো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্বউদ্যোগে আইকিউসি চালু করেছে। কিন্তু আর যারা করেনি, তাদের কী হবে?
আবার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে স্বায়ত্তশাসনের জিগির তোলে, তার কী হবে? বস্তুত তারা কি স্বায়ত্তশাসনের দোহাই দিয়ে প্রকল্প শেষ হলে নিজস্ব অর্থায়নে আইকিউসি রাখতে দেবে? বিভিন্ন দেশে দেখা যায়, আইকিউসি অ্যাকচুয়েলি ইন্টারনাল ও এক্সটারনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্সের কার্যক্রমে সমন্বয় করে থাকে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাগ্রো বেজড ডিপার্টমেন্টে প্রফেসর ড. সঞ্চয় কুমার অধিকারীর নেতৃত্বে যে স্টাডিটি হয়েছিল, সেখানে অনেক ভালো দিকনির্দেশনা ছিল। আসলে বাংলাদেশের জন্য ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক প্রস্তুত করে পার্লামেন্টে আইন হিসেবে পাস করা দরকার। তেমনি বর্তমান সরকারের একটি ভালো প্রকল্প আইকিউসি। আর এটি যেন প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বহাল থাকে, কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারে, সে জন্য উদ্যোগ থাকাসহ এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করা বাঞ্ছনীয়। কারণ, চিঠিপত্র লিখে এ দেশে খুব কমই কাজ হয়। একজন দক্ষ শিক্ষাবিদ হিসেবে ইউজিসির বর্তমান চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রীকে এ ব্যাপারে বোঝাতে পারেন। এ দেশে বহুরূপীর সংখ্যা কম নয়। ক্ষণে ক্ষণে যারা রং পাল্টায়। বিপরীতে যারা সাচ্চা মানুষ এবং দেশের উন্নয়নে কাজ করছেন তারা বাস্তবতা বুঝে ব্যবস্থা নিতে পারেন। এখন পর্যন্ত শিক্ষা আইন ২০১৬-এর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। প্রাইমারি, সেকেন্ডারি, হায়ার সেকেন্ডারি, আন্ডার গ্র্যাজুয়েট এবং পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট একই সূত্রেগাঁথা। একটি গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি, সরকারের চেষ্টা সত্ত্বেও প্রাইমারি থেকে হায়ার সেকেন্ডারি পর্যন্ত শিক্ষার উন্নতিতে প্রধান অন্তরায় অনেক শিক্ষক বিদ্যাপীঠে কাজ-কর্মে ফাঁকি দিতে সর্বদা ব্যস্ত। আর এসব কালো শিক্ষকদের জন্য ভালো শিক্ষকরা কাজে-কর্মে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কেননা, কালো শিক্ষকরা আবার একজোট হয়ে সিন্ডিকেট ও দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ন্যক্কারজনক ও জঘন্য ঘটনার সঙ্গেও কোনো কোনো শিক্ষকের সম্পৃক্ততা রয়েছে। কিছু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বিভাগ আর কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মদদে শিক্ষার্থীরা মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদে উৎসাহিত হচ্ছে। এসবে সংশ্লিষ্ট সঠিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। অন্যের গবেষণা প্রবন্ধ কাট-পেস্ট করে অনেক শিক্ষক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। শিক্ষককে সততা ও নৈতিক বলে বলীয়ান হওয়া দরকার। আসলে শিক্ষকরা যখন নৈতিকভাবে দুর্বল হয়, মিথ্যা বলেন, পরনিন্দা করেন, অর্ধসত্য বলেন, তখন তাদের কি আর শিক্ষক বলা যায়? বস্তুত, বর্তমান শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক-প্রশিক্ষণ এবং নানমুখী পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি দুষ্টু কর্মকর্তা এবং শিক্ষকদের প্রমাণ সাপেক্ষে ছাঁটাই করাসহ তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। এরা রক্ত-বীজের মতো একজন থেকে সৃষ্টি করে লক্ষ জন। এদের দ্বারা যেন আমাদের আগামী প্রজন্ম কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিক অবশ্যই ভালোভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে।
প্রফেসর ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী: শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ
pipulbd@gmail.com

0 comments:

Post a Comment