Last update
Loading...

বিপর্যয়ের মুখে জীবনধারণের মৌলিক উপকরণ

আমাদের সংবিধানে জীবনধারণের মৌলিক উপকরণ বলতে মূলত অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাকে বোঝানো হয়েছে [অনুচ্ছেদ ১৫(ক)]। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এসব উপকরণ ন্যায্যমূল্যে জনগণের কাছে সহজলভ্য করা। দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করা এদেশে এসব মৌলিক উপকরণের দাম আকাশচুম্বী, যা সাম্প্রতিক সময়ে শুধু দারিদ্র্য হ্রাসের গতিকে রোধ করেনি, বরং নিম্নবিত্তের মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিচ্ছে এবং দরিদ্র মানুষকে অতি দরিদ্রে পরিণত করছে। কেন এমন হচ্ছে তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য। মৌলিক উপকরণগুলোর মধ্যে প্রধান হছে অন্ন। অন্ন বলতে সাধারণত ভাতকে বোঝায়। চাল থেকে রূপান্তরিত ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য। ভাত আমাদের ক্যালরির প্রধান উৎস। চালের উচ্চমূল্য কীভাবে দেশে দারিদ্র্য বাড়াচ্ছে একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে তা ফুটে উঠেছে। ২৩ ডিসেম্বর রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে প্রকাশিত বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং বা সানেমের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণেই গত কয়েক মাসে ৫ লাখ ২০ হাজার মানুষ গরিব হয়েছে। আগে তারা দারিদ্র্যসীমার ওপরে ছিল, এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। আরও বলা হয়েছে, বন্যার পাশাপাশি সময়মতো আমদানি না হওয়ায় এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যার কারণে গত কয়েক মাসে হঠাৎ করে চালের দাম ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। এর ফলে দশমিক ৩২ শতাংশ দারিদ্র্য বেড়েছে। সংস্থাটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেড়েছে। এতে সামনের দিনগুলোতে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, যা চালের বাজারকে অস্থির করে তুলে নিম্নবিত্ত ও গরিব মানুষের জীবনে দুর্ভোগ বাড়াতে পারে। বিঘিœত হতে পারে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা। একাধিক কারণে চালের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের জীবনে ভীতিকর হয়ে দাঁড়ায়। এক. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (এইচআইইএস) ২০১০ মোতাবেক জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের মাসিক মোট ব্যয়ের ৫৪ দশমিক ৮১ শতাংশ খরচ হয় খাদ্যে। আবার মাসিক মোট খরচের ৩৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ ব্যয় হয় চাল কেনায়। তাই চালের দামের ওঠানামার সঙ্গে জনগণের দুর্ভোগের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। চালের দামে ঊর্ধ্বগতি স্বাভাবিকভাবে তাদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দুই. চালের বিশেষ করে মোটা চালের দামবৃদ্ধির ক্ষতিকর প্রভাব ওই চালের সব শ্রেণীর ভোক্তার ওপর পড়লেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র ও হতদরিদ্র পরিবারগুলো। সরকারি হিসাবমতে, দেশে এখনও ৪ কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ হতদরিদ্র। বিআইডিএসের এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী খাদ্য-মূল্যস্ফীতি বাড়লে ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ হতদরিদ্র পরিবারই তখন চালের ভোগ কমিয়ে দেয়। দরিদ্র পরিবারের বেলায় এ হার ৬৬ শতাংশ। তাই মোটা চালের দাম উচ্চহারে বৃদ্ধি পেলে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়ে। তিন. শুধু দরিদ্র ও হতদরিদ্ররা নয়, চালের দামবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তরাও, বিশেষ করে যাদের আয় নির্দিষ্ট। চালের দামে ঊর্ধ্বগতির কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের মাছ, মাংস, ডিম, দুধ অর্থাৎ আমিষ জাতীয় খাবার কেনা অনেকটা কমিয়ে দিতে হয়। এতে তাদের পরিবারে, বিশেষ করে শিশু ও মহিলাদের পুষ্টির অভাব ঘটে। এতে অবনতি ঘটে তাদের স্বাস্থ্যের। তাছাড়া এসব পরিবারকে কমিয়ে দিতে হয় শিক্ষা খাতে ব্যয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরা। সঙ্কুচিত করতে হয় তাদের পরিবারের স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চালের উচ্চমূল্যের কারণে মানুষের, বিশেষ করে গরিব মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে বলে স্বীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তবে শুধু চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণেই গত কয়েক মাসে ৫ লাখ ২০ হাজার মানুষ গরিব হয়েছে মর্মে সানেমের প্রতিবেদনের বক্তব্যের সঙ্গে তিনি দ্বিমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেছেন, চালের দাম বাড়ার কারণে কত শতাংশ দারিদ্র্যের হার বেড়েছে সেটা এখনই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তার মতে, গরিব মানুষের সংখ্যা কমছে না বাড়ছে তা বলার জন্য কমপক্ষে এক বছর অপেক্ষা করতে হবে। তবে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, চালের দাম বাড়ার কারণে দেশে একটা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সংখ্যা যা-ই হোক, চালের উচ্চমূল্যের কারণে সমাজের কিছু মানুষ নিঃসন্দেহে দারিদ্র্যের মুখে পড়েছে। জীবনধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা স্বাস্থ্যসেবা সূচকে বালাদেশের মান দক্ষিণ এশিয়ার সূচকের গড় মানের চেয়ে কম। দক্ষিণ এশিয়ায় সূচকের মান ৫৩, আর বাংলাদেশের মান ৪৬। বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টের (বিএনইচএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে জনপ্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ৬৭ টাকা মানুষের পকেট থেকে ব্যয় হচ্ছে, ২০১২ সালে যা ছিল ৬৩ টাকা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এবং সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ট্রাকিং ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ : ২০১৭ গ্লোবাল মনিটরিং রিপোর্ট’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বণিক বার্তার ২৪ ডিসেম্বরের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে দেশের সাড়ে ৪ শতাংশ মানুষ। মাথাপিছু দৈনিক ১ দশমিক ৯ ডলার আয়ের হিসাবে এ তথ্য দেয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। আর মাথাপিছু দৈনিক আয় যাদের ৩ দশমিক ১ ডলার, অতিরিক্ত স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে দারিদ্র্যের কবলে পড়ছে তাদের ৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। বাসস্থান মানুষের একটি মৌলিক চাহিদা। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম ও শহরাঞ্চলে বাসস্থানের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অপরিকল্পিতভাবে বাসস্থান নির্মাণের জন্য গ্রামাঞ্চলে নষ্ট হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে মূল্যবান কৃষি জমি। বর্তমান সরকার গ্রামাঞ্চলে পরিকল্পিত বাসস্থান নির্মাণ কর্মসূচি গ্রহণ করলেও তা বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এদিকে কর্মসংস্থান, উন্নত মানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য শহরমুখী মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এদিকে নির্মাণসামগ্রীর দাম অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় এবং ব্যাংকের উচ্চহারের সুদের কারণে শহর ও গ্রামাঞ্চলে বাড়ি নির্মাণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরাঞ্চলে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও অন্যসব মহানগরীতে হোল্ডিং কর বেড়ে যাওয়ায় বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বহুলাংশে বেড়ে গেছে। ফলে বাড়ি ভাড়া বেড়েই চলেছে। রাজধানী ঢাকায় ৮০ ভাগের বেশি মানুষ ভাড়া বাড়িতে বাস করে এবং তাদের আয়ের বড় অংশ বাড়ি ভাড়ায় ব্যয় হয়। বিশেষ করে যারা সীমিত আয়ের ভাড়াটিয়া, বাড়ি ভাড়া মেটানোর পর তাদের সংসার নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত বেসরকারি খাতভিত্তিক হওয়ায় শিক্ষাব্যবস্থার সর্বস্তরে শিক্ষাব্যয় বেড়েই চলেছে। নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শ্রেণী শিক্ষার মান সন্তোষজনক না হওয়ায় শহর ও গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট কোচিংয়ের দিকে দারুণভাবে ঝুঁকছে। প্রাইভেট কোচিংয়ের ব্যয় মেটাতে অভিভাবকরা হিমশিম খাচ্ছেন। তারা সংসারের অনেক প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে পারছেন না। এমনকি পরিবারের জন্য সুষম খাবার জোগাড় করতে পারছেন না। এতে পরিবারে, বিশেষ করে মহিলা ও শিশুদের মধ্যে পুষ্টি সমস্যা প্রকট হয়ে উঠছে। বর্তমানে পুষ্টিমানে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে। সরকার নিজেই স্বীকার করেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে দারিদ্র্য হ্রাসের হার অনেকটা স্তিমিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ আয় ও ব্যয় জরিপ (এইচআইইএস) ২০১৬-এর প্রাথমিক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ২০০৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের তুলনায় সর্বশেষ ছয় বছরে (২০১১-২০১৬) বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্য হ্রাসের গতি কমেছে। বিবিএসের তথ্য মোতাবেক, জাতীয় পর্যায়ে ২০০০ সালের ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ দারিদ্র্যের হার কমে ২০০৫ সালে দাঁড়ায় ৪০ শতাংশে। প্রতি বছর গড়ে দারিদ্র্য হ্রাসের হার ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০১০ সালে দারিদ্র্যের হার কমে জাতীয় পর্যায়ে দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ৫ শতাংশে। অর্থাৎ ২০০৫-পরবর্তী ৫ বছরে প্রতি বছর গড়ে দারিদ্র্য কমে ১ দশমিক ৭ শতাংশ হারে। সর্বশেষ ২০১৬ সালে জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে। এতে ২০১০-পরবর্তী প্রতি বছর গড়ে দারিদ্র্য হ্রাসের হার ১ দশমিক ২ শতাংশ। সবশেষে বলা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা আমাদের প্রধান খাদ্য চালে আমদানিনির্ভর হয়ে উঠেছি। দ্বিতীয় প্রধান খাদ্য গমের ৭০ শতাংশ আমদানি করতে হচ্ছে। বিদেশে এসব পণ্যের দাম ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশে চালের দাম অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে ফেলেছে। ফলে জীবনধারণের সবচেয়ে মূল্যবান উপকরণটি সংগ্রহ করা গরিব ও হতদরিদ্র মানুষের পক্ষে কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এতে এদের খাদ্য নিরাপত্তা দারুণ হুমকির মধ্যে পড়বে। খাদ্যশস্যসহ জীবনধারণের অন্যসব মৌলিক উপকরণের ব্যয়বৃদ্ধি সব শ্রেণীর মানুষের, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত, দরিদ্র ও অতি দরিদ্রদের শ্রেণীগত অবনমন ঘটাচ্ছে। এর মূল কারণ জীবনধারণের জন্য মৌলিক উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধি তাদের আয় বৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি।
আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক
latifm43@gmail.com

0 comments:

Post a Comment