Last update
Loading...

সর্বোচ্চ উচ্চারিত সংখ্যা ১০,৩২৩

১০,৩২৩। ভারতে টানা দুই যুগ ধরে কমিউনিস্ট শাসিত রাজ্য ত্রিপুরার আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে সবচেয়ে চর্চিত সংখ্যা ১০,৩২৩। অবাঙালিদের মুখে টেন থাউজেন্ড থ্রি হানড্রেড টোয়েন্টি থ্রি। সব দলের সব প্রচারে উঠে আসছে ১০,৩২৩। এমনকি অরাজনৈতিক আলোচনার সূত্র ধরে ১০,৩২৩ হেঁশেলেও ঢুকে পড়েছে। বলা যেতে পারে, ত্রিপুরায় এই সংখ্যার থেকে আর কোনো সংখ্যাই ইদানীংকালে এত আলোচিত হয়নি। কিন্তু কী আছে এই ১০,৩২৩-এ? কেন এতবার উচ্চারিত হচ্ছে সংখ্যাটি?  উত্তরটা খুব সোজা, আবার কঠিনও। সোজা কারণ, এক কথায় বলে দেওয়া যায়, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে ত্রিপুরায় সরকারি চাকরিচ্যুত শিক্ষকদের মোট সংখ্যা হলো ১০,৩২৩। কিন্তু এতটা সোজাভাবে বলা গেলেও এত সহজে মেনে নেওয়া যাচ্ছে না মাত্র ৩৪ লাখের রাজ্যে এত বড় সংখ্যার সরকারি চাকরিচ্যুতির ঘটনা। পাড়ায় পাড়ায় হাহাকার তৈরি হয়েছে। ভেঙে পড়তে চলেছে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা। ভোটের মুখে ত্রিপুরায় এতজনের চাকরিচ্যুতি বিপাকে ফেলে দিয়েছে সরকারপক্ষকে। বিরোধীরাও স্বস্তিতে নেই। কারণ, অনেকেই মনে করছেন, বিরোধীদের কেউ কেউ আদালতের দ্বারস্থ হওয়াতেই তাঁদের স্থায়ী চাকরি খোয়াতে হচ্ছে। আবার অন্যরা বলছেন, তাঁরা অবৈধভাবে চাকরি পেয়েছিলেন বলেই লাখ লাখ বেকার বঞ্চনার শিকার। তা ছাড়া সরকার চাকরি ঠিকমতো দিতে পারেনি বলেই আইনি যুদ্ধে পরাস্ত হতে হয়েছে। পুনর্বাসনের প্রক্রিয়াও আদালতের নির্দেশে থমকে গেছে। তবু কিছুটা স্বস্তি মিলেছে সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ রায়ে। রায়ে বলা হয়েছে, ৩১ ডিসেম্বরেই ১০,৩২৩ জনের চাকরি গেলেও ৩০ জুন পর্যন্ত চাকরিচ্যুতদের অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ করা যাবে। তবে সুপ্রিম কোর্ট বলে দিয়েছেন, এটাই শেষ সুযোগ। আর কোনো অবস্থাতেই মেয়াদ বাড়ানো যাবে না। কেন হলো এমন অবস্থা? এর উত্তর খুঁজতে হলে যেতে হবে সমস্যার গভীরে। ১৯৯৩ সালে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের পতনের পর থেকে সিপিএম টানা রয়েছে ত্রিপুরার ক্ষমতায়। প্রথম পাঁচ বছর দশরথ দেবের পিরিয়ড বাদ দিলে বাকি প্রায় দুই দশক ধরে ক্ষমতায় রয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের সরকার। বামেরা ত্রিপুরার ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকেই শিক্ষক নিয়োগে শুরু হয় মারাত্মক ঢিলেমি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক নিয়োগ একরকম বন্ধই হয়ে যায়। মাঝে ২০০২,২০০৬ এবং ২০০৯-এ বিধানসভা ভোট সামনে রেখে নেওয়া হয় শিক্ষক নিয়োগের গণপরীক্ষা। কিন্তু নিয়োগের প্রক্রিয়া তখনো চালু হয়নি। নিয়োগের পর্ব শুরু হয় ২০১০-এ।
প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী নৃপেণ চক্রবর্তীর আমলে গৃহীত নিয়োগনীতি মেনে শুরু হয় শিক্ষক নিয়োগ। প্রথমে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরদের নিয়োগ করা হয়। বিরোধী দলের তরফে প্রথম থেকেই আপত্তি করা হয়। সেই সময়ের কংগ্রেস নেতা সুদীপ রায়বর্মণ দাবি তোলেন, শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে যোগ্যতার ভিত্তিতে। সেই সঙ্গে মানতে হবে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়োগনীতি। কারণ সেই সময়ে ইউপিএ সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী কপিল সিব্বাল শিক্ষক নিয়োগে গোটা দেশে অভিন্ন নির্দেশিকা জারি করেছিলেন। তাতে বলা হয়েছিল, শিক্ষকতা করতে হলে ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বর পেতেই হবে। কিন্তু ত্রিপুরায় সেটা মানা হয়নি। বরং গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে চাকরিপ্রার্থীর আর্থিক প্রয়োজনীয়তাকে। বিরোধের শুরু এখান থেকেই। বিরোধীদের অভিযোগকে গুরুত্ব না দিয়ে চলতে থাকে নিয়োগের প্রক্রিয়া। ২০১৩ সালে বিধানসভায় বিপুল ভোটে জয়লাভের পর প্রাথমিক স্তরেও ব্যাপক নিয়োগ শুরু করে বামফ্রন্ট সরকার। শিক্ষায় দলীয়করণের অভিযোগ ওঠে সর্বত্র। শুধু তা-ই নয়, বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীরা বিভিন্ন জায়গায় সিপিএমের দলীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগও ঘটান। দলের অভ্যন্তরেও শুরু হয় গোলমাল। তবে সিপিএম পরিস্থিতি সামাল দিতেও সক্ষম হয়। সব মিলে ১০,৩২৩ জন চাকরি পান তিন বছরে। নিয়োগনীতিতে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীরা আদালতের দ্বারস্থ হলেন। আইনি লড়াইয়ে প্রথমে হাইকোর্টে জিতলেন বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীরা। হাইকোর্ট সাফ জানিয়ে দিলেন, ত্রিপুরা সরকারের নিয়োগনীতিই অবৈধ। ফলে ১০,৩২৩ জনের চাকরি বাতিল ঘোষিত হয়। কিন্তু হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয় রাজ্য সরকার। সেখান থেকে স্থগিতাদেশ পাওয়ায় চাকরি চালিয়ে যান শিক্ষকেরা। কিন্তু তাঁদের জীবনে অনিশ্চয়তা নেমে আসে চলতি বছরের ২৯ মার্চ। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দেন, এ নিয়োগ অবৈধ। শিক্ষকদের চাকরি ৩১ ডিসেম্বরেই শেষ। সর্বোচ্চ আদালতের এই রায়ের পর থেকেই আশঙ্কা বাড়তে থাকে। ইতিমধ্যে ত্রিপুরা সরকার অশিক্ষক পদে ১২ হাজার কর্মচারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। অনেকেই মনে করেন, চাকরিচ্যুত শিক্ষকদের পুনর্বাসনই ছিল এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ। কিন্তু তাঁদের সেই চেষ্টাও সফল হয়নি। কারণ সেখানেও সুপ্রিম কোর্ট স্থগিতাদেশ জারি করেছেন। ১৬ জানুয়ারি সেই মামলার শুনানি। কিন্তু তত দিনে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যেতে পারে। ফলে নির্বাচনের আগে ১০,৩২৩ সমস্যা জিইয়েই রইল। ইতিমধ্যে চাকরি যাওয়ার আশঙ্কায় রেল, সড়ক, এমনকি রাজ্য বিধানসভা ও সচিবালয় অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা। বিরোধীদের মদদে আন্দোলন ভালোই দানা বাঁধছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশে কিছুটা স্বস্তি তাঁরা পেয়েছেন। চাকরিচ্যুতরা সর্বোচ্চ আদালতে আরও এক বছর চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর আরজি জানান। রাজ্য সরকারও পৃথকভাবে সর্বোচ্চ আদালতের কাছে সময় চায়। রাজ্য সরকারের বক্তব্য ছিল, এভাবে ১০,৩২৩ জন শিক্ষক এক দিনে অবসর নিলে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে। ১৪ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সাফ জানান, ৩১ ডিসেম্বর চাকরি যাচ্ছেই। তবে রাজ্য সরকারকে অ্যাডহক ভিত্তিতে এই শিক্ষকদের ছয় মাসের জন্য নিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, আর কোনো সময় দেওয়া হবে না। নতুন করে কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া নিয়োগনীতি মেনে শিক্ষক নিয়োগ করতে বলা হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এই ১০,৩২৩ জনের মধ্যে বেশির ভাগের শিক্ষকতা করার যোগ্যতাই নেই। রাজ্য সরকারের নিয়োগনীতিতে ‘need’ শব্দটিকেই অবৈধ বলে জানিয়ে দিয়েছেন আদালত। অর্থাৎ, কারও চাকরির প্রয়োজন রয়েছে বলেই তাঁকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগে বিবেচিত করতে হবে, এমনটা চলবে না। এখানেই হচ্ছে সমস্যা। শাসক দল সিপিএমের প্রচারে বলা হচ্ছে বিরোধীরা ১০,৩২৩ জনের মুখের ভাত কেড়ে নিচ্ছে। রাজ্য সরকারের সদিচ্ছা থাকাতেই তাঁরা চাকরি পেয়েছিলেন। অন্যদিকে বিজেপির বক্তব্য, রাজ্য সরকারের পাপেরই ফল ভোগ করছেন ১০,৩২৩ জন। নিয়োগ প্রক্রিয়া অবৈধ ছিল বলেই সুপ্রিম কোর্ট এমন রায় দিয়েছেন। এখন ১০,৩২৩ জন জানেন না কী হবে। হতাশা বাড়ছে। চলছে রাজনৈতিক বিবৃতির লড়াই। অমিত শাহ থেকে সীতারাম ইয়েচুরি-ত্রিপুরায় সবার মুখেই ১০,৩২৩। কিন্তু পরিত্রাণের রাস্তা নেই কারও কাছে। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে ১০,৩২৩-এর কদর।
তরুণ চক্রবর্তী: প্রথম আলোর ত্রিপুরা প্রতিনিধি।

0 comments:

Post a Comment