Last update
Loading...

রংপুর সিটি নির্বাচনের বার্তাটি অনুধাবন করতে হবে

রংপুর সিটি কর্পোরেশন (রসিক) নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। নিঃসন্দেহে এর ফলে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা প্রমাণিত হল। সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসনও নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করেছে। নাগরিক সমাজও বিশেষত সুজন এ ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। অনলাইনে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছে। যারা সুজনের সঙ্গে যুক্ত তারা এবং ভলান্টিয়ার পিস অ্যাম্বাসেডররা সাংস্কৃতিক দল গঠন করে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছে। তারা মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে মুখোমুখি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এভাবে এ নির্বাচনে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে ভোটাররা সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ প্রার্থীদের ভোট দেয়। আমি মনে করি, এ সবকিছুর ফলেই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোও সদাচরণ দেখিয়েছে, দায়িত্বশীল আচরণ করেছে। তারা কোনোরকম দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত হয়নি। কোথায় নাকি পুলিশের সঙ্গে একটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তবুও নির্বাচনটা সার্বিকভাবে নির্বিঘ্নে ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এটি সবারই অবদানের ফসল। রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে অনেকে মডেল নির্বাচন বলছেন। আমিও মনে করি, এটিকে মডেল নির্বাচন বলা যায়। এটা ঠিক, সব জায়গায় রংপুরের মতো পরিস্থিতি থাকে না। রংপুরে এবার যত আয়োজন করা হয়েছে- যেমন, নির্বাচন কমিশন অনেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাজার হাজার সদস্য নিয়োগ করেছে- এমনটি সব জায়গায় দেখা যায় না। সবচেয়ে বড় কথা, সরকার এ নির্বাচনকে কোনোভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালিয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। ফলে এটিকে একটি মডেল নির্বাচন বলা যেতেই পারে। রংপুর সিটি নির্বাচন নিঃসন্দেহে মানুষের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে। আমরা আশা করি, জাতীয় নির্বাচনও এভাবেই অনুষ্ঠিত হবে। নাগরিকরা মনে করে, সব ক্ষেত্রেই নির্বাচন কমিশনের এমন ভূমিকা পালন করা উচিত। তবে এ নির্বাচন যে বার্তাটি দিয়েছে, তার ফলে সেটা ভবিষ্যতে বাস্তবে ঘটবে কিনা তা দেখার বিষয়। রংপুর সিটি নির্বাচনে একটি কেন্দ্রে সফলভাবেই ইলেকট্রুনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হয়েছে। অতীতেও কোনো কোনো নির্বাচনে নির্দিষ্ট কিছু কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছে। শুনেছিলাম কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যাও হয়েছিল। তা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন সফলভাবেই ইভিএম ব্যবহারে সক্ষম হয়েছে। ভবিষ্যতে আমাদের ইভিএমে যেতে হবে। প্রযুক্তির মহাসড়কে প্রবেশ করতে হবে। তবে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। আমার মনে হয়, এটি সঠিক সিদ্ধান্ত। কারণ নির্বাচন কমিশনের সেই প্রস্তুতি নেই। তাছাড়া ইভিএম নিয়ে একটা বিতর্কও আছে। এ ব্যাপারে ঐকমত্য সৃষ্টি না হলে এটি ব্যবহার করা ঠিক হবে না। সমাজে এমনিতেই অনেক বিতর্ক আছে। এর মধ্যে আর নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করা উচিত হবে না। রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তিনটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ব্যবহার করা হয়েছে। সিসিটিভির ব্যবহারকে আমি যুক্তিসঙ্গত বলেই মনে করি। জাতীয় নির্বাচনেও সিসিটিভি ব্যবহার করা হলে তা হবে একটি ভালো সিদ্ধান্ত। ভোট গ্রহণ ও গণনার সময় সিসিটিভির ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে। রংপুর সিটি নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে আপত্তি তোলা হয়েছে। দলটির এ আপত্তির আমি কোনো যৌক্তিকতা দেখি না। কারণ আমরা এবং সব পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতেই এ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। আমার মনে হয়, আমাদের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি- বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা- বিএনপির প্রতিক্রিয়ায় তারই প্রতিফলন ঘটেছে। তবে রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। এটি সবারই অনুধাবন করা দরকার। রংপুরে সবকিছুই একই জায়গায়, একই প্রার্থী দিয়ে একই দলের মধ্যে নির্বাচন হয়েছে। একমাত্র তফাৎ হল, ২০১২ সালে নির্বাচনে মার্কা ছিল না, এবার মার্কা ছিল। দু’বারই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে। রংপুরে জাতীয় পার্টি যে জনপ্রিয় তা তো আগেই প্রতিষ্ঠিত।
এবারও তারা জনপ্রিয়তার প্রমাণ দিয়েছে। আগেরবারও তাদের প্রার্থীই জয়ী হতেন। হননি এ কারণে যে, তখন তাদের সমর্থিত প্রার্থী ছিল দু’জন- একজন দল সমর্থিত, অন্যজন বহিষ্কৃত। জাতীয় পার্টির একজন মাত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে তিনিই জিততেন। এবারও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরই জনপ্রিয়তা প্রমাণিত হল। তাই বলা যায়, নির্বাচনে মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে দুটি মার্কার মধ্যে- ধানের শীষ ও নৌকা। আর সবকিছুই ঠিক আছে। এবার ধানের শীষের ভোট বেড়েছে ৬৫ শতাংশ, আর নৌকার ভোট কমেছে ৪১ শতাংশ। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে। এ বার্তাটি পরবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। যেমন- ২০১৩ সালে দেশে যত নির্বাচন হয়েছে (৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হয়েছিল), সেসব নির্বাচন যে বার্তা দিয়েছিল, তার কারণেই পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল গণতান্ত্রিক মানসিকতা হারিয়ে ফেলেছিল। এখন নির্বাচন কমিশনের যেসব কাজ করা দরকার তার একটি হল প্রার্থীদের হলফনামার তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা। কারণ বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দিয়ে বা তথ্য গোপন করে নির্বাচন করলে তার প্রার্থিতা বাতিল হতে পারে। এখন কোনো অবাঞ্ছিত প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন কিনা তা নির্বাচন কমিশনের খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হল সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা- যে নির্বাচনে সঠিক ব্যক্তিরা নির্বাচিত হয়ে আসবেন। নির্বাচন কমিশনের উচিত এসব খতিয়ে দেখে অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের অযোগ্য ঘোষণা করা, তাদের নির্বাচন বাতিলের ব্যবস্থা করা। এর ফলে আমাদের নির্বাচনী অঙ্গনগুলো শুদ্ধ হবে এবং আমাদের রাজনীতিও ভালো মানুষদের জায়গা করে দেবে, খারাপ লোকগুলো বিতাড়িত হবে। আরেকটি বিষয়ে নজর দেয়া দরকার। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সুষ্ঠু নির্বাচন করা। তাই নির্বাচন কমিশনের স্বপ্রণোদিত হয়ে সবরকম ব্যবস্থা নেয়া দরকার। কোনোরকম অভিযোগের জন্য তাদের অপেক্ষা করা উচিত নয়। লিখিত অভিযোগ করলে তারা খতিয়ে দেখবে- এরকম বক্তব্য নির্বাচন কমিশনের জন্য অনাকাক্সিক্ষত। কারণ তাদের দায়িত্বই হল সুষ্ঠু নির্বাচন করা। নির্বাচনের যে আইন-কানুন, বিধি-বিধান রয়েছে, সেসব তাদেরই বিধি-বিধান। তাদেরই এসব প্রয়োগ করতে হবে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক)
badiulm@gmail.com

0 comments:

Post a Comment