Last update
Loading...

বক্তব্যের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিলেন শিক্ষামন্ত্রী

‘সহনীয় মাত্রায় ঘুষ খাওয়া’ এবং ‘দুর্নীতি’ ইস্যুতে দেয়া বক্তব্যের তীব্র সমালোচনার মুখে বুধবার সংবাদ সম্মেলনে নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। বলেছেন, অতীতের উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি ওই কথা বলেছিলেন, এখনকার পরিস্থিতি তত খারাপ নয়। অভিযোগ পাওয়ামাত্র ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। বেশ ক’টি দফতর, পরিদফতরে ইতিমধ্যেই স্বচ্ছতা এসেছে, দুর্নীতিমুক্ত হয়েছে। তবে ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন কোন কোন দফতর দুর্নীতিমুক্ত হয়েছে’- সে কথা তিনি বলেননি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলেন, ‘আমি লিখিতভাবে দিয়েছি। এর বাইরে যাব না।’ পরে তিনি সম্মেলন কক্ষ ত্যাগ করেন। এর আগে দু’পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য পাঠ শেষে কোনো প্রশ্নের জবাব না দেয়ার ঘোষণা দেন। এরপরও সাংবাদিকরা বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চান। টিআইবির পক্ষ থেকে তার পদত্যাগের দাবির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে যেতে যেতে মন্ত্রী বলেন, ‘টিআইবি টিআইবির কাজ করেছে। আমি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে এখানে আসিনি।’ এর আগে দেয়া বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘আমার কোনো কিছুতেই ভয় নেই, হারানোর ভয় নেই। যার জন্য কখনও কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে আমি পিছপা হই না।’ দুপুরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের অতিরিক্ত সচিব জাকির হোসেন ভূঁইয়া ও মহীউদ্দিন খান এবং উপসচিব সুবোধ চন্দ্র ঢালী উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এসএম ওয়াহিদুজ্জামান অনুষ্ঠানে আসন নিলেও ‘স্যার (মন্ত্রী) আপনাকে সালাম দিয়েছেন’- বলে একজন উপসচিব তাকে ডেকে নিয়ে যান। পরে তাকে আর সংবাদ সম্মেলনে দেখা যায়নি। শিক্ষামন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ওই উপসচিব যুগান্তরকে বলেছেন, তাকে ডেকে নেয়া হলেও মূলত তাকে সভাকক্ষের আশপাশে থাকতে বলা হয়েছিল। ২৪ ডিসেম্বর পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরে অনুষ্ঠানে যোগ দেন শিক্ষামন্ত্রী। ওইদিন তিনি ঘুষ প্রসঙ্গে বলেন, ‘দায়িত্ব নেয়ার পর সব সংস্থার সঙ্গে আমি বসেছি। বলেছি, দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। সব জায়গায় এ কথা বললেও ইইডির (শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর) সভায় বলেছি, আপনারা ভালো কাজ করবেন। আপনারা ঘুষ খাবেন, কিন্তু সহনশীল হইয়্যা খাবেন। অসহনীয় হয়ে বলা যায়, আপনারা ঘুষ খাইয়েন না। তবে এটা অবাস্তবিক কথা হবে। কেননা আমার সাহসই নাই বলার যে, আপনারা ঘুষ খায়েন না।’ বক্তৃতাকালে শিক্ষামন্ত্রী ডিআইএ’র একজন কর্মকর্তাকে ৩-৪ মাস আগে ঘুষসহ হাতেনাতে ধরা এবং আরেকজনের ঢাকায় ১৩টি বাড়ি থাকার কথা উল্লেখ করেন। একই সভায় শিক্ষামন্ত্রী কর্মকর্তাদের চোর হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেছেন, ‘খালি অফিসাররাই যে চোর তা নয়, মন্ত্রীরাও চোর। আমিও চোর। জগতে এমনই চলে আসছে। তবে সবাইকে এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।’ মন্ত্রীর এই বক্তব্য একটি স্যাটেলাইট টিভি ও অনলাইনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে। এমনকি অনুষ্ঠানের পুরো ভিডিও ডিআইএ’র ওয়েবসাইটে দু’দিন ছিল। মঙ্গলবার থেকে অবশ্য তা পাওয়া যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে সংস্থার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ভিডিওটি ফেসবুকেই আছে। তবে তা শুধু দাফতরিক হিসেবে থাকায় সবাই দেখতে পাচ্ছে না। বুধবার সংবাদ সম্মেলনে এসে মন্ত্রী দাবি করেন, তার বক্তব্য ‘খণ্ডিত আকারে’ প্রচার করায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। তার ওপর ভিত্তি করেই কতিপয় বিশিষ্টজন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মতামতও জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, অধিকাংশ জায়গায় (পত্রিকা) তার বক্তব্য ঠিকমতো এসেছে। কিন্তু দু’একটি জায়গায় খণ্ডিত আকারে আসায় বিভ্রান্তিটা হয়েছে। লিখিত বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে তিনি নতুন কিছু যোগ করেন। বলেন, আপনারা আমার বক্তব্য বুঝছেন। তারপরও বাড়তি কিছু বলেছি। আমি লিখিত বক্তব্যের বাইরে কিছু বলব না। আপনারা কষ্ট করে এসেছেন। আপনাদের জন্য লাঞ্চের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে; লাঞ্চ খান, গল্পটল্প করে যান। লিখিত বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘বিশিষ্টজনদের কেউ কেউ কতিপয় মিডিয়ার খণ্ডিত ও ভিত্তিহীন সংবাদের ওপর ভিত্তি করে আমার বিরুদ্ধে নানা প্রশ্ন তুলছেন। তাদের উদ্দেশে সবিনয়ে বলতে চাই- সুদীর্ঘকাল ধরে আপনারা আমার সততার সংগ্রাম, নীতি-আদর্শ, কর্তব্যনিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ বিষয়ে অবগত। মিডিয়ার খণ্ডিত-ভিত্তিহীন সংবাদের ওপর ভিত্তি করে কোনো মন্তব্য করার আগে সরাসরি আমাকে প্রশ্ন করলে অনেক বেশি খুশি হতাম।’ তিনি বলেন, ২০০৯ সালে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেয়ার সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দফতর, অধিদফতর ও সংস্থার মধ্যে ভাবমূর্তির দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে ছিল ডিআইএ। চরম দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও মনিটরিংয়ের দুর্বলতা ছিল দৃশ্যমান। কর্মকর্তারা ঘুষ-দুর্নীতিতে ছিলেন ‘আকণ্ঠ নিমজ্জিত’। মন্ত্রী আরও বলেন, ‘এসবই ছিল পূর্ববর্তী বিএনপি-জামায়াত সরকারের অপশাসনের ফসল। অথচ যাদের কারণে এটা হয়েছে এখন তারাই মাঠে নেমে পড়েছে।
এটা তো তাদেরই কুশাসনের ফল। লিখিত বক্তব্যে নাহিদ বলেন, বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে ডিআইএ কর্মকর্তারা স্কুল-কলেজ পরিদর্শনে গিয়ে অসহায় শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে ভয় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকার ঘুষের খাম গ্রহণ করার সময় বলত, এর ভাগ উপরেও দিতে হয়। তাতে শিক্ষক-কর্মচারীরা মনে করতে বাধ্য হতো- তাদের ঘুষ শুধু পরিদর্শনকারী অফিসাররাই খায় না, জ্যেষ্ঠ আমলারাও পায়, এমনকি মন্ত্রী হিসেবে আমিও পাই। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষক-কর্মচারীরা মনে করত- ‘অফিসাররা চোর, মন্ত্রীও চোর।’ শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘সে সময় তাদের ঘুষ-দুর্নীতি থেকে বিরত রাখার পরিবেশ তো ছিলই না, অনেক শিক্ষক এসে আমার কাছে কান্নাকাটি করে বলতেন, আমরা নিন্ম বেতনের চাকরি করি, এত টাকা আমরা কোথা থেকে দেব? এক মাসের সম্পূর্ণ বেতনের টাকা ঘুষ দিলে পরিবার-পরিজন নিয়ে আমরা খাব কী? ঘুষের মাত্রা আরেকটু সহনীয় হলেও বাঁচতাম। ২৪ ডিসেম্বরের অনুষ্ঠানে অতীতের ওইসব ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরতে গিয়েই আমি উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম- ‘ঘুষের সহনীয় মাত্রা’ এবং ‘অফিসাররা চোর’, ‘মন্ত্রী চোর’। এ সময় তিনি বলেন, ‘তবে ওই বক্তৃতায় বা কোনোখানেই আমি বিএনপি-জামায়াতের এ প্রসঙ্গটা বলিনি। কিন্তু যাদের (বিএনপি-জামায়াত) এ কথাটা প্রচার হয়েছে তারাও এখন মাঠে নেমে পড়েছেন। আসলে তাদের সময়ই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। বরং তাদের উচিত তাদের সময়ের ব্যাখ্যা দেয়া, তাদের কুশাসনের ফল হল এটা। তিনি এ সময় ডিআইএকে আগের চেয়ে অনেক জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাবি করে বলেন, শিক্ষকদের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাপূর্ণ ব্যবহার করেন। প্রাথমিকের শিক্ষকদেরও স্যার বলে সম্বোধন করেন। মানুষের সঙ্গে ব্যবহারে নমনীয় হলেও নীতি, আদর্শ, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনি দৃঢ় এবং কঠোর। তিনি কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতির সঙ্গে আপস করেন না। এটিই তার ভদ্র আচরণ ও রাজনৈতিক শিক্ষা।

0 comments:

Post a Comment