Last update
Loading...

অনশন ভাঙলেন শিক্ষকরা

তিন দিন পর অনশন ভাঙলেন প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকরা। সোমবার বিকালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষক নেতাদের পানি ও ফলের রস খাইয়ে অনশন ভাঙান। তিনি আশ্বাস দেন- ‘আলোচনার টেবিলে সমাধান হবে’। এ সময় শিক্ষক নেতারা কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দিলে বিভক্ত হয়ে পড়েন শিক্ষকরা। তারা দাবির পক্ষে স্লোগান দিতে থাকেন। মন্ত্রীর কাছে সুনির্দিষ্ট আশ্বাস চান, দাবি মানার ঘোষণা চান। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ঘোষণা না আসা পর্যন্ত অনশন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন। এর মধ্যেই মন্ত্রী চলে গেলে শহীদ মিনার তত্ত্বাবধানকারী কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ শিক্ষকদের চত্বর ত্যাগ করার নির্দেশ দেয়। রাতে হতাশা ও ক্ষোভ নিয়ে শহীদ মিনার ছাড়েন শিক্ষকরা। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের পরের ধাপে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড নির্ধারণের দাবিতে শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনশন শুরু হয়। দেশের সাড়ে তিন লাখ শিক্ষকের সংগঠন বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক মহাজোট এ অনশনের ডাক দেয়। সহকারী শিক্ষকদের ৮টি সংগঠন এ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে।
সারা দেশ থেকে কয়েক হাজার শিক্ষক এতে অংশ নেন। অনশনের দ্বিতীয় দিনেই অসুস্থ হয়ে পড়েন অনেকে। তৃতীয় দিন পর্যন্ত তা ৬০ জনে গিয়ে ঠেকে। এর মধ্যে দুপুরে দাবির পক্ষে মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসেন শিক্ষক নেতারা। সেখানে মন্ত্রী আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দিয়ে অনশন ভাঙতে শহীদ মিনারে আসার প্রতিশ্রুতি দেন। জাতীয় প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক ফাউন্ডেশনের সভাপতি মোসা. শাহীনুর আকতার যুগান্তরকে বলেন, মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর আন্দোলন এক মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। প্রত্যাহার করা হয়নি। মন্ত্রী আমাদের জানিয়েছেন, সহকারী শিক্ষকদের সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেড দেয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত থাকবে। সহকারী শিক্ষকদের বেতনবৈষম্য দূর করতে এমন আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে। দুপুরের পর শিক্ষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী। তার মিন্টো রোডের বাসায় প্রায় এক ঘণ্টার ওই বৈঠকে ছিলেন প্রায় ১৫ প্রতিনিধি। আন্দোলনকারী শিক্ষকরা জানান, তারা এক দফা দাবিতে এখানে আন্দোলন করছেন। তাদের দাবি, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের এক ধাপ নিচে রাখতে হবে। বর্তমানে প্রধান শিক্ষকদের চেয়ে তিন ধাপ নিচের স্কেলে বেতন পান প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা। সরকারি প্রাথমিক স্কুলে একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক যেখানে একাদশ গ্রেডে বেতন পান, সেখানে একই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে চাকরিতে ঢোকা সহকারী শিক্ষকরা পান চতুর্দশ গ্রেডে। এ বৈষম্য দূর না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। বিকালে শহীদ মিনারে এসে শিক্ষকদের উদ্দেশে মোস্তফিজুর রহমান ফিজার বলেন, শিক্ষকদের এ আন্দোলন গোটা জাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আমরাও দেখছি প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে সহকারী শিক্ষকদের কোন মাত্রায় বৈষম্য আছে।
তিনি বলেন, দাবির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনার টেবিলেই সমস্যার সমাধান হবে। মন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্যেই শিক্ষকরা তাদের দাবির সপক্ষে স্লোগান দিতে থাকলে মন্ত্রী বলেন, ‘আমি চাইলেই হবে না। এ বিষয়টির সঙ্গে অন্য যারা জড়িত তাদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পুরো বিষয়টি সময়সাপেক্ষ, আলোচনা না করে ও যৌক্তিকতা বিবেচনা না করে এখনই আমি কাগজপত্র দিয়ে দিতে পারব না।’ শিক্ষকরা এ বক্তব্যের প্রতিবাদ করতে থাকেন। তখন শিক্ষক নেতারা শান্ত হওয়ার আশ্বাস দেন। সহকারী শিক্ষক জোটের প্রতিনিধি মো. শামসুদ্দীন বলেন, ‘আমরা আমাদের কর্মসূচি স্থগিত করতে চাই। আপনারা আমাকে এক মাস সময় দেন, আমি দাবি আদায় করে ছাড়ব।’ পরে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা শান্ত হন, আমাকে আমার কাজ করতে দেন।’ এরপরও শিক্ষকরা হইচই করতে থাকলে মন্ত্রী শিক্ষক নেতাদের অনশন ভাঙিয়ে ওই স্থান ত্যাগ করেন। তবে শিক্ষকদের একটি অংশ সেখানে বসেই ছিল। তারা শিক্ষক নেতাদের ‘দালাল’ আখ্যা দিয়ে দাবি পূরণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালানোর ঘোষণা দেন। সন্ধ্যা ৭টায় পুলিশ তাদের শহীদ মিনার এলাকা ত্যাগ করতে হ্যান্ড মাইকে অনুরোধ জানাতে থাকে। সরিয়ে নেয়া হয় আন্দোলনরত শিক্ষকদের মাইকও। ৮টার পর থেকে শিক্ষকরা শহীদ মিনার ছাড়তে শুরু করেন। বরিশালের মুলাদী উপজেলার সহকারী শিক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, মন্ত্রী এসেছেন তাতে আমরা খুশি। তিনি দাবি পূরণের ঘোষণা না দেয়ায় হতাশ। শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার শিক্ষক মোস্তফা কামাল বলেন, ১৯৭৩ সালে সহকারী শিক্ষকরা এক গ্রেড নিচে ছিল। আর এখন সেটা ৪ গ্রেড নিচে নেয়া হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য অপমান। নেতারা যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমরা তা মানি না। আমরা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা না আসা পর্যন্ত শহীদ মিনারে অবস্থান করব। শেরপুরের নকলা উপজেলার শিক্ষক লুৎফর রহমান যুগান্তকে বলেন, ‘নেতাদের নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা নেই।
আমরা তাদের মানি না। আমরা শিক্ষক। আমরা এখানে থাকব। আমরা কোনো সংগঠনে নেই। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আমাদের অনশন চলবে।’ মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থেকে আসা শিক্ষক দেবেন্দ্রনাথ সরকার বলেন, ‘বারবার শুধু আমাদের আশ্বাসই দেয়া হয়েছে। সহকারী শিক্ষকদের দাবি কখনোই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়নি। তাই আমরা আশ্বাসে বিশ্বাস করি না।’ সোমবার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে বাংলাদেশ পৌরসভা সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনের সভাপতি আবদুল আলিমের নেতৃত্বে একটি দল শহীদ মিনারে এসে একাত্মতা ঘোষণা করে। এর আগে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ। এরপর শহীদ মিনারে একাত্মতা ঘোষণা করতে আসেন সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী, সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না প্রমুখ। অনশন চলাকালে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের সভাপতি তপন কুমার মণ্ডল, সাধারণ সম্পাদক মো. আসাদুর রহমান, জাতীয় প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক ফাউন্ডেশনের সভাপতি মোসা. শাহীনুর আকতার, সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক ভূঁইয়া, বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের সভাপতি মো. আনিসুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক নূরে আলম সিদ্দিকী রবিউল, বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের সভাপতি শাহিনুর আল-আমিন প্রমুখ।

0 comments:

Post a Comment