Last update
Loading...

কেন তৃতীয় পক্ষ লাগবে?

নির্যাতন থেকে প্রাণে বাঁচতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফেরাতে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সইকে ‘বিরাট কূটনৈতিক সাফল্য’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও স্থায়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে ঢাকায় আয়োজিত দূত সম্মেলনের (এনভয় কনফারেন্স) উদ্বোধনীতে দেয়া বক্তৃতায় গতকাল প্রতিবেশি দেশগুলোর সঙ্গে সমস্যা সমাধানে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার উপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। বক্তৃতায় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে গত বৃহস্পতিবার নেপিডতে সই হওয়া ‘দ্বিপক্ষীয় অ্যারেঞ্জমেন্ট’ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে শেখ হাসিনা ’৯৮ সালের স্বাক্ষরিত পার্বত্য শান্তি চুক্তির কথা স্মরণ করেন। বলেন, সেই সমস্যার সামরিক (মিলিটারিলি) সমাধানে না গিয়ে আমরা রাজনৈতিকভাবে সমাধান করেছিলাম। সেই সময়ে ৬৪ হাজার শরণার্থী, যারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের ফিরিয়ে এনেছিলাম। এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় ছিল।
আমরা সেখানে তৃতীয় কাউকে ডাকিনি। মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী। তাদের সঙ্গেও আমরা দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় রোহিঙ্গাদের ফেরাতে চুক্তি করেছি। সেখানে তৃতীয় পক্ষকে কেন ডাকতে হবে? বাংলাদেশ মানবিক কারণে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে অনেক নারী, শিশু এবং বৃদ্ধ রয়েছেন। ’৭৮ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা এসেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তাদের ফেরাতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় আমরা অন্তত একটা সমঝোতা করতে পেরেছি, যার মাধ্যমে আমরা আশা করি মিয়ানমার নাগরিকদের তাদের বসতভিটায় ফেরত পাঠাতে পারব। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তারপরও যেহেতু প্রতিবেশী দেশ, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আমরা একটা ভালো সদ্ভাব রেখেই সমস্যাটির সমাধান করতে চাই। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা প্রশংসা করছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর প্রত্যেকটা দেশ আমাদের সমর্থন দিয়েছে, সাধুবাদ জানিয়েছে। তারা জানতে চাচ্ছে- কী কী লাগবে। তারা সব করতে রাজি আছে। অতীতে বাংলাদেশ সম্ভবত এত বড় কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। রোহিঙ্গাসহ দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ইস্যুতেও কূটনীতিকদের বিশ্বাঙ্গনে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে আপনাদের তাল মিলিয়ে চলতে হবে। প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। বক্তৃতার শুরুতে অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ডিপ্লোমেসিতে আগে পলিটিক্যাল বিষয়টা গুরুত্ব পেত। এখন ইকোনমিক ডিপ্লোমেসি চালু হয়ে গেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আপনাদের চেষ্টা আরো জোরদার করতে হবে। আমরা কীভাবে আমাদের পণ্য অন্য দেশে পাঠাতে পারি, সে দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। রপ্তানির নতুন বাজার সৃষ্টি, আর বেশি করে জনশক্তি প্রেরণ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হতে দূতদের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় অন্তত দু’দফায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিষয়ে রাষ্ট্রদূতদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তারা আমার দেশের নাগরিক, তাদের ভালো মন্দ দেখা, তাদের সুযোগ-সুবিধা দেখা, অসুবিধাগুলো দূর করা- এটা কিন্তু আপনাদের কর্তব্য।’ রাষ্ট্রদূতদের অন্তত সপ্তাহ বা মাসে একটা দিন প্রবাসীদের সময় দেয়ার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের সমস্যাগুলো শুনবেন এবং সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেবেন। এটা ভুলে গেলে চলবে না তারাই কিন্তু মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্থ উপার্জন করে এবং তারা যে টাকা পাঠায় সেটাই আমাদের রিজার্ভের একটা বড় অংশ। অর্থনীতিতে তারা বিরাট অবদান রাখছে। আর আমরা যে এতগুলো কূটনৈতিক মিশন চালাচ্ছি তার সিংহভাগ উপার্জন কিন্তু তারা করছে। কাজেই সেক্ষেত্রে তাদের একটা গুরুত্ব আমাদের কাছে রয়েছে। যেখানে প্রবাসী বাংলাদেশি সংখ্যায় অনেকে রয়েছেন সেসব স্থানে স্কুল করা, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেয়ার তাগিদ দেন তিনি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী দূতাবাসে কর্মরতদের সমস্যা প্রসঙ্গে বলেন, আমি জানি বিদেশে দূতাবাসে কাজ করতে প্রায়শই বিভিন্ন কারণে সমস্যাসঙ্কুল পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। আমার সরকার বিদেশে দূতাবাসের কর্মপরিবেশ উন্নয়নে যৌক্তিক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সব সময় চেষ্টা করে যাচ্ছে। আপনারা জানেন, আমরা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার পর সরকারি কর্মচারীদের বেতন ভাতা বহুগুণ বৃদ্ধি করেছি। বৃদ্ধি করা হয়েছে নানা সুযোগ-সুবিধা। প্রশাসনের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিশ্চিত করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে হয় এদিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে। বিভিন্ন পর্যায়ে ১১৬টি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। ১২টি দেশে নতুন দূতাবাস স্থাপনসহ নতুন ১৭টি মিশন খোলা হয়েছে। ২০১২ সালে বৈদেশিক ভাতা ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি এবং সন্তানদের শিক্ষাভাতা বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষাভাতা প্রাপ্তির ঊর্ধ্বসীমা ২৩ বছর করা হয়েছে। রাষ্ট্রদূতদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিদেশে আপনারা একেকজন একেকটি বাংলাদেশ। আপনাদের কাজ নিছক চাকরি করা নয়, আরো অনেক বড় এবং মহান কিছু। দেশের ১৬ কোটি মানুষের হয়ে আপনারা সেখানে প্রতিনিধিত্ব করছেন। ‘কাজেই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সব সময় দেশের স্বার্থে আপনাদের কাজ করতে হবে।’
বক্তৃতায় দেশের চলমান উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৪ সালে অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে জনগণ আমাদের ভোট দিয়েছে। আমরা উন্নয়নের ধারা এগিয়ে নিয়ে চলেছি। আগামী দিনে জনগণ ভোট দিলে ক্ষমতায় আসবো, না দিলে আসবো না। নির্বাচনের ফল যাই হোক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয় এমন কিছু যেন না হয়।
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রশ্নে সরকারের জিরো টলারেন্সনীতির পুনরোল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের এই মাটিতে কোনরকম জঙ্গিবাদ আমরা হতে দেব না। আমাদের ভূখণ্ডকে কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর জন্যও আমরা ব্যবহার করতে দেব না। আমরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান চাই। বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বড়াতে কূটনীতিকদের সর্বদা তৎপর থাকার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবার সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব হবে সমতার ভিত্তিতে। কারো মুখাপেক্ষী হয়ে না। ভিক্ষা নয়, আমরা মর্যাদার আসন চাই। বিশ্ব এখন বাংলাদেশকে সম্মানের চোখে দেখে বলেও মন্তব্য করেন সরকার প্রধান। প্রধানমন্ত্রী উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আন্তঃসংযোগ বা কানেকটিভিটির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি আন্তর্জাতিক অভিবাসন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে দেশের স্বার্থ নিশ্চিত করা এবং খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা ইত্যাদি নিশ্চিত করার বিষয়েও রাষ্ট্রদূতদের ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। যুদ্ধরাপরাধী এবং বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার প্রসঙ্গে সরকার প্রধান বলেন, আপনারা জানেন, আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি। ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে জাতির পিতার খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে তাদের পুরস্কৃত করা হয়েছিল। এটা জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জার ও দুঃখজনক। এরচেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কিছু হয় না। কূটনৈতিক মিশনে চাকরি পাবার যোগ্যতার মাপকাঠি ছিল তারা জাতির পিতার হত্যাকারী। একটা দেশের রাষ্ট্রপতিকেই শুধু নয় তারা নিরপরাধ শিশু ও নারী হত্যাকারী। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিল করে সেই খুনিদের বিচার করে বিচারের রায় কার্যকর করেছি। তবে, এসব খুনি এখনও বিভিন্ন দেশে রয়ে গেছে (পলাতক)। তারা বসে নেই এখনও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। আর একাত্তরে গণহত্যাকারীরা বিভিন্ন দেশে যারা রয়ে গেছে তারা নানা ধরনের অপপ্রচার দেশের বিরুদ্ধে চালাচ্ছে। পাশাপাশি কিছু সংস্থাও আছে। এদের মধ্যে অনেকে পঁচাত্তরের পর দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় অনেক অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অপপ্রচার যেন কোনোভাবেই আমাদের দেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে না পারে সেজন্য বিশ্বের কাছে বাস্তব অবস্থা তুলে ধরতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তার দীর্ঘ ৫৫ মিনিটের বক্তৃতায় বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন। এ সময় তিনি মোটাদাগে কয়েকটি অভিযোগও করেন। যার মধ্যে রয়েছে- ৭৫ পরবর্তী সময়ে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কাজ না হওয়া, বিভিন্ন বিদেশ মিশন বন্ধ করে দেয়া, জাতির জনকের বিদেশি মিশনে পোস্টিং দেয়া এবং আদালতের রায়ে একজন ব্যক্তির এমডি পদ হারানোর কারণে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন আটকে যাওয়া ইত্যাদি। এ সময় চ্যালেঞ্জ নিয়ে পদ্মা সেতুসহ জনগণের কল্যাণে তার সরকার গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কথা দৃঢ়তার সঙ্গে তুলে ধরেন। বক্তৃতার একেবারে সমাপনী লগ্নে প্রধানমন্ত্রী তার মা-বাবা ভাই-ভাবিসহ স্বজন হারানোর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, আমি সব হারিয়েছি। সব শোককে ধারণ করে আমি দেশের মানুষকে নিয়ে একটি আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি। অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বক্তব্য দেন; পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক স্বাগত বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী, এইচটি ইমাম, তৌফিক-ই-ইলাহী, ইকবাল সোবহান চৌধুরী, সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মণি, আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ফারুক খান ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমশের মবিন চৌধুরী এবং অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিকরাও অংশ নেন।

0 comments:

Post a Comment