Last update
Loading...

যুক্তরাষ্ট্রকে কেন এত ঘৃণা!

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং উন
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা নতুন নয়। সেই ১৯৫০ সালে কোরিয়া যুদ্ধের সময় থেকেই দুই দেশের শত্রুতা চরমে। সম্পর্কটা যেন সাপে-নেউলে। তিন বছর ধরে চলা সে যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার পাশে এসে দাঁড়ায় মার্কিন সেনাবাহিনী। চালায় ধ্বংসযজ্ঞ। বিধ্বস্ত হয় পুরো দেশ। উল্টেপাল্টে যায় কোরীয়দের জীবনযাত্রা। প্রাণ যায় কয়েক লাখ মানুষের। এরপর থেকে সম্পর্ক আর স্বাভাবিক হয়নি।
উত্তর কোরিয়া একের পর এক পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘের রক্তচক্ষুর পরোয়া করেনি। নিষেধাজ্ঞা, অবরোধ কোনো কিছু দিয়েই নিবৃত্ত করা যায়নি দেশটিকে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি উত্তর কোরিয়ার তীব্র ঘৃণার শুরুটা সেই ১৯৫০ সালেই।
যুদ্ধের সময়ের সেই ভয়াবহতা স্বীকার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সাবেক কমান্ডার জেনারেল কার্টিস লিমে। ১৯৮৮ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা কোরিয়া যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। উত্তর কোরিয়ার বেশির ভাগ এলাকা পুড়িয়ে দিয়েছি।’
১৯৫০ সালে উত্তর কোরিয়ার জনসংখ্যা ছিল ৯৬ লাখ। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী বলছে, যুদ্ধে দেশটির ১৩ লাখ বেসামরিক নাগরিক এবং সেনাসদস্য আহত হন। আর দক্ষিণ কোরিয়ার ৩০ লাখ বেসামরিক নাগরিক ও আড়াই লাখ সেনাসদস্য আহত হন। সে সময় দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যা ছিল দুই কোটির বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার ১৯৫১ সালে যুদ্ধবিষয়ক শুনানিতে বলেন, এমন ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি আগে কখনো দেখিনি। তিনি বলেন, ‘আমি ওই পরিস্থিতি ভাষায় বর্ণনা করতে পারছি না। আমি ভয়ে কেঁপে উঠি। মনে হয়, আমি সবচেয়ে বেশি মানুষের রক্ত এবং দুর্দশা দেখেছি।’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র পাঁচ বছর পর শুরু হওয়া কোরিয়ার ওই যুদ্ধে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সেনাবাহিনীর অনেকেই অনিচ্ছুক ছিলেন। কোরীয় যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার পাশে থাকা মার্কিন সেনাবাহিনীর ৩৩ হাজারের বেশি সদস্য নিহত হন। আর উত্তর কোরিয়ার পাশে থাকা চীনা সেনাবাহিনীর ছয় লাখ সদস্য নিহত বা নিখোঁজ হন।
১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই হয়। যুদ্ধ ও সহিংসতার পর চীনা এবং মার্কিন সেনারা নিজ নিজ ঘরে ফিরে যান। তবে উত্তর কোরিয়া থেকে যায় একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে। শুরু করে বাঁচার লড়াই। যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। দেশটির বড় বড় এলাকা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
যুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞের কথা প্রচার করে চলেছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম ইল সাং, তাঁর ছেলে কিম জং ইল এবং নাতি কিম জং উন। বর্তমানে উত্তর কোরিয়া ক্ষমতাসীন কিম জং উন। ফলে মার্কিন মানেই উত্তর কোরিয়ার কাছে শত্রু—এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্বরতার প্রচার উত্তর কোরীয় নেতাদের রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়।
ঐতিহাসিক চার্লস আর্মস্ট্রং বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান থেকে ৬ লাখ ৩৫ হাজার টন বিস্ফোরক উত্তর কোরিয়ায় ফেলা হয়। আরও ফেলা হয় ৩২ হাজার টন নাপাম। আগুনে বোমায় ব্যবহৃত জমাট বাঁধা থকথকে একধরনের পেট্রল হলো নাপাম।
দক্ষিণ কোরিয়ার পুশান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক রবার্ট আ কেলি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই নৃশংস বোমা হামলার কথা উত্তর কোরিয়ায় বারবার প্রচার করা হয়েছে। এই প্রচারকে উত্তর কোরীয় নেতারা কীভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করেছেন, তাঁর বর্ণনা মেলে রবার্ট আ কেলির কথায়। তিনি বলেন, বেশির ভাগ ঐতিহাসিক বলে থাকেন কিম ইল সাং দক্ষিণ কোরিয়ায় হামলা চালানোর পরই যুদ্ধ শুরু হয়। তবে কিম ইল সাং থেকে শুরু করে কিম জং উন সব সময় বলে এসেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ শুরু করেছে। প্রচারের ধরনটা এমন ছিল যে কেবল কিমের পরিবারই উত্তর কোরীয়দের রক্ষাকবচ।
উত্তর কোরীয়দের মধ্যে মার্কিন বিদ্বেষ শুরু হয় ছোটবেলা থেকেই। কিন্ডারগার্টেনের শিশুরা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর বর্বরতার গল্প শোনে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখে তাঁদের নৃশংসতা। উত্তর কোরিয়ায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বার্তা দেওয়া হয় নাটক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে। সিনচন মিউজিয়ামে যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন সেনাবাহিনীর বর্বরতা ও নৃশংসতার বিভিন্ন নিদর্শন দেখেছে।
এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিশুরাও যুক্তরাষ্ট্রকে কতটা ঘৃণা করে, তার প্রমাণ মেলে তাদের আঁকা ছবিতে। পিয়ংইয়ংয়ের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে এক শিশুকে দেখা গেছে মার্কিন ট্যাংক ও যুদ্ধাস্ত্র আঁকতে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র মানেই তাদের কাছে হামলাকারী।
এটা ঠিক যে ১৯৫০ সালের পর থেকে উত্তর কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। তবে বারবার হামলার হুমকি দিয়েছে। পরমাণু বা ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করেছে।
তিন বছরের যুদ্ধের পর ১৯৫৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। তবে সেটি শান্তিচুক্তি ছিল না। অর্থাৎ উত্তর কোরিয়া কৌশলগতভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এখনো যুদ্ধে জড়িয়ে আছে।
যুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকেই উত্তর কোরীয়রা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষাকে। দেশটি বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে বরাবরই বড় ধরনের বরাদ্দ রাখে। ২০০৬ সালে দেশটি প্রথম সফল পরমাণু পরীক্ষা চালায়। তবে এরও আগে ১৯৬৫ সাল থেকেই উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি শুরু হয়। পিয়ংইয়ংয়ের সন্দেহ, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ মহড়ার উদ্দেশ্য উত্তর কোরিয়ায় হামলা চালানো। এই ভয় আর আশঙ্কা থেকেই একের পর এক পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে উত্তর কোরিয়া।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ থেকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক উন্নতি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মান অর্জনসহ বেশ কিছু সুফলও পাচ্ছে দেশটি।
সিএনএন, আল জাজিরা ও নিউজউইক অবলম্বনে শুভা জিনিয়া চৌধুরী

0 comments:

Post a Comment