Last update
Loading...

রোহিঙ্গাদের দুর্দশা

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের দুর্দশার শেষ নেই। দেশে সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে তারা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে সেদেশের সেনাবাহিনী। এমনকি জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের নির্মূলের যে অভিযোগ এনেছে সেই অভিযোগও অস্বীকার করেছেন মিয়ানমারের এখনকার মূল নেত্রী অং সান সুচি। এরই মধ্যে রোহিঙ্গাদেরকে ঠেঙ্গারচরে পুনর্বাসন পরিকল্পনার কথা বলেছে বাংলাদেশ সরকার। তবে তাতে তাদের ইতিবাচক সাড়া নেই। তারা চান তাদের বিষয়ে একটি রাজনৈতিক সমাধান। তাদের অনেকেই বলেছেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতার পক্ষে তারা। এমন সমঝোতার মাধ্যমে তাদেরকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কথা বলেছেন। তাদের একজন দিলরুবা নামের এক শরণার্থী। তিনি বলেছেন, যদি এমনটা না হয় তাহলে আমাদেরকে বোমা দিয়ে মেরে ফেলুন। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন পিবিএস নিউজআওয়ার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের দুর্দশা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে এমন প্রায় অর্ধ মিলিয়ন বা ৫ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে। তাদেরকে ঠেঙ্গারচরে পুনর্বাসনের কথা বলা হয়েছে। ওই দ্বীপটি বসবাসের অনুপযোগী বলেও অনেকের মত রয়েছে। তবে সেখানে গাছ লাগিয়ে বসবাসের উপযোগী করার কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে রোহিঙ্গাদের অধিকার বিষয়ক কর্মী হাফেজ বলেছেন, যদি আমাদেরকে সেখানে পাঠানো হয় তাহলে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়বো। আমরা মূল ভূখন্ডেই নিরাপদে আছি। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৮ মাসে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ৭০ হাজার। তবে এখানে তাদের জীবনধারণও কঠিন হয়ে পড়েছে। এই বর্ষা মৌসুমে ও ঘূর্ণিঝড়ে তাদের অনেক বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থায় নির্জন দ্বীপ ঠেঙ্গারচরে ৬০ হাজার রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসন করে এ সমস্যা সমাধান করার পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এ পরিকল্পনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পিবিএসের রিপোর্টে বলা হয়েছে ঠেঙ্গারচর মূল ভূখন্ড থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন। পলি মাটি জমে সৃষ্টি হয়েছে এ দ্বীপ। সেখানে যাতায়াতও খুব বিপদজনক। স্থানীয় সরকারের একজন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেছেন, অতীতে রোহিঙ্গারা মাদক সমস্যার সঙ্গে জড়িত ছিল। তারা পাচারের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। ওই অঞ্চলে যেসব মানুষ বসবাস করেন তাদের মূল জীবিকা হলো মাছ ধরা। মিজানুর রহমান বলেছেন, রোহিঙ্গাদের এই খারাপ আচরণে প্রভাবিত হবেন স্থানীয়রা। এ জন্য তাদেরকে দেশের জনগণ থেকে আলাদা রাখাটাই যুক্তিযুক্ত। এ বিষয়ে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানীয় একজন বিশেষজ্ঞ হলেন ড. আইনুন নিশাত। তিনি বলেছেন, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল প্রধানত একটি বিপদজনক এলাকা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে আমরা বিশ্বাস করি ঝড়ের মাত্রা অবশ্যই বৃদ্ধি পাবে। তাই তাদেরকে কংক্রিটে তৈরি ভাল অবকাঠামোতে রাখা উচিত। বিশেষ করে জরুরি অবস্থার কসময়। ওই রিপোর্টে বলা হয়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন ক্যাম্পে বর্ণবাদী আমলের মানুষের মতো বসবাস করছেন প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। সেদেশের সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ সম্প্রদায় থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে তাদেরকে। তাদের নেই কোনো নাগরিকত্ব। বিয়ে করতে গেলে তাদেরকে সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। এমন কি তারা নিজেদের গ্রামের বাইরে যেতে চাইলেও অনুমতি নিতে হয়। গত বছর ৯ই অক্টোবর রোহিঙ্গা জঙ্গিরা হত্যা করে মিয়ানমারের ৯ নিরাপত্তা কর্মীকে। তার প্রতিশোধ নিতে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংস অভিযান চালায় সেনাবাহিনী। এতে এক হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়। তাদের বাড়িঘর, মসজিদ পুড়িয়ে দেয়া হয়। তবে এ অভিযোগকে বাড়িয়ে বলা হয়েছে বলে দাবি মিয়ানমার সরকারের। এর পর যে ৭০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন তার মধ্যে দিল নওয়াজ অন্যতম। তাকে সেনাবাহিনী গণধর্ষণ করেছে। তার চোখের সামনে তার স্বামীকে হত্যা করেছে তারা। তিনি বলেন, আমার চোখের সামনে রাস্তার ওপর আমার স্বামীকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে তারা। তারপর তাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ধানক্ষেতে ফেলে দেয়। সেনাবাহিনী তারপর নারীদের নিয়ে ধানক্ষেতের মধ্যে চলে যায়। তাদের কয়েকজনকে নিয়ে যায় আলাদা করে। ৫ সেনা সদস্য পর্যায়ক্রমে তাদেরকে ধর্ষণ করে। লোকজনের স্বর্ণালঙ্কার, আংটি, কানের দুল সব নিয়ে যায়। তারা শিশুদের হত্যা করে। এ জন্যই আমরা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছি। তবে রোহিঙ্গা হাফিজ বলেন, বাংলাদেশ ছোট্ট দেশ। ঘনবসতিপূর্ণ। তা সত্ত্বেও তারা আমাদেরকে ঠাঁই দিয়েছে। এটা একটি বড় বিষয়। আমাদেরকে ঠেঙ্গারচরে পাঠানোর চেয়ে মিয়ানমার সরকার যেন আমাদেরকে নাগরিকত্ব দেয় আমরা সেই দাবি করি। ৪৫ বছর বয়সী দিলবারের কণ্ঠে তীব্র হতাশা। তিনি বলেন, আমাদের জীবনের সব কিছু ফেলে, ত্যাগ করে এখানে এসেছি। যদি আমাদের জীবনে কোনো শান্তিই না থাকে তাহলে মরে যাওয়াই ভাল। মিয়ানমারে আমাদের শিশুদের হত্যা করা হয়েছে। যদি আমাদেরকে এখন ওই চরে পাঠিয়ে দেয়া হয় তাহলে সেটাও হবে একরকম হত্যার সামিল। আমাদের পায়ের নিচে তো মাটি নেই।

0 comments:

Post a Comment