Last update
Loading...

বিদেশের প্রলোভনে নারী শিকারের জাল by রুদ্র মিজান

ভয়ঙ্কর প্রতারণা। টার্গেট কম বয়সী সুন্দরী নারী। পারিবারিক, আর্থিক অবস্থা জানার পরই শুরু হয় আসল খেলা। শিকারির মতো জাল ছড়িয়ে দেয়া হয় তাদের ঘিরে। নানা কৌশলে বিদেশে পাচার করা হয় তাদের। অল্প শ্রমে, অল্প সময়ে বেশি আয়, বাসা কিংবা ক্লিনিকের কাজের কথা বলে আকৃষ্ট করা হয়। প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে বাধ্য করা হয় যৌনকর্মে। এতে বাধা দিলে মারধর করা হয়। ইলেকট্রিকের শক দেয়া হয়। এ চক্রের ফাঁদে পড়ে লাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে কোনো কোনো নারীকে। বাধ্য হয়েই বিদেশের মাটিতে যৌনকর্মকে ব্যবসা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন নারীদের অনেকে।
সূত্রমতে, প্রলোভনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নারীদের পাচার করা হচ্ছে। বাসায় কাজের নামে তাদের অনেককেই যৌনকর্মী হিসেবে ব্যবহার করে। এমনকি একই পরিবারের বাবা, ছেলে, ভাইসহ সকল পুরুষ সদস্যদের কাছেই নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে নারীকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পতিতার দালালদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। আবাসিক হোটেলে রেখে যৌনকর্ম করানো হয় এই নারীদের দিয়ে। অনুসন্ধানে এরকম কয়েক নারীর সন্ধান পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে একজন দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। বাড়ি মাদারীপুরে। গত ১৪ই মার্চ সৌদি আরবে পাঠানো হয় তাকে। বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে করে একটি বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। ওই বাসার কর্তা শুরুতেই তার দিকে অবাক দৃৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। তাকে গোসল করে বিশ্রাম নিতে বলা হয়। নতুন কাপড় দেয়া হয়। রাত নামতেই এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তিনি। তার আগমন উপলক্ষে বাসায় জমে উঠে আড্ডা। একে একে ধর্ষণ করে পাঁচ জন। বাধা দিলে বেদম প্রহার করা হয়। অসুস্থ হয়ে যান তিনি। এভাবে একেক রাতে একেক বাসায়, হোটেলে পাঠানো হয় তাকে। বাধা দিলে তারা জানায়, ‘টাকার বিনিময়ে কেনা হয়েছে তোমাকে। আমরা যা বলি তাই করতে হবে।’ গত ৩০শে মে বড় বোনের কাছে ফোনে নির্যাতনের এই করুণ কাহিনী জানান তিনি।
দেশের দালালরা গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি পাঠানোর নামে বিক্রি করে দিয়েছে নারী শিকারি চক্রের কাছে। তাকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছেন স্বজনরা। কিন্তু দালালর দাবি করছে, ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এই টাকা দিতে পারলে তাকে ফিরিয়ে দেবে তারা। এ বিষয়ে গত ১৩ই জুন তার বড় বোন বাদী হয়ে আদালতে মানবপাচার আইনে পিটিশন মামলা করেছেন।
ওই নারীর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শিকারির মতো জাল ফেলেছিল চক্রের সদস্য মাদারীপুর সদরের খোয়াজপুরের জসিম। ওই নারীর মা, বাবা অসুস্থ। সংসারের হাল ধরতে চান তিনি। এর মধ্যেই প্রস্তাবটি দেয় জসিম। ‘দেশে এতো কষ্ট করার চেয়ে বিদেশে গেলে অনেক ভালো আয় করতে পারবে। বিদেশে যেতে বেশি টাকার দরকার হবে না। রাজি থাকলে অল্প টাকাতেই বিদেশে পাঠানো যাবে। অ্যারাবিয়ানের বাসায় কাজ। মাস শেষে শুধু টাকা আর টাকা। অল্প দিনেই বাড়িতে ঘর-বাড়ি হবে।’ প্রলোভনে পা দেন তিনি। জসিম, ফিরোজপুরের মঠবাড়ির ফুলবাড়িয়ার হুমায়ূন ও যাত্রাবাড়ীর বিবির বাগিচার ফরিদ ওই তরুণীকে ঢাকায় নিয়ে আসে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলারপাড়ের বশির আহমেদের বাড়িতে তাকে আটকে রাখা হয়। ওই সময়ে বিমানের ভাড়া হিসেবে তার বড় বোনের কাছ থেকে আরো ৩৫ হাজার টাকা নেয় তারা। মতিঝিলের বিডিএক্স ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল এজেন্সি থেকে টিকিটি নিয়ে সৌদি আরবে পাঠানো হয় তাকে।
একইভাবে প্রলোভনে পা দিয়ে ওমানে গিয়েছিলেন মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার শান্তিনগরের এক নারী। শেষ পর্যন্ত লাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে তাকে। কুমিল্লার দাউদকান্দির আবদুল কাদিরের মাধ্যমে ওমানে গিয়েছিলেন তিনি। গত বছরের ২৪শে ডিসেম্বর ফোনে তার বোন হোসনে আরাকে বলেছিলেন, ‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। প্রতি রাতেই আমার ওপর অমানবিক নির্যাতন করে। এক, দু’জন না। একের পর এক ওরা অনেকে...। আমি মরে যাব। আমাকে বাঁচাও বুবু।’ পরদিন ২৫শে ডিসেম্বর তার লাশ উদ্ধার করে ওমান পুলিশ।
২০১৪ সালের ২১শে অক্টোবর আট নারীকে বিদেশে পাচার করে শরিয়তপুরের সিরাজ শিকদার। লেবাননে পাঠানোর কথা বলে পাঠানো হয় সিরিয়ায়। মামুদ ও আবু আহমদ নামে চক্রের দুই সদস্য তাদের নিয়ে যায় একটি অফিসে। ওই অফিসে আরো ১৫ বাংলাদেশি নারী ছিল। ওই অফিসেই তাদের যৌনকাজে লিপ্ত হতে চাপ দেয়া হয়। হুমকি দিয়ে বলা হয়, তোমাদের টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে। কাজ না করলে প্রাণে মারা হবে। নির্যাতিতারা জানান, সুন্দরী ও কম বয়সীদের বেশি চাহিদা সেখানে। সুন্দরীদের পতিতালয়ে আর একটু বেশি বয়সীদের কৃতদাসী হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয় ছয় মাস ও এক বছরের জন্য। নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে গত বছরের ১১ই অক্টোবর দেশে ফিরেন এক নারী। পরে তিনি এই চক্রের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তিনি জানান, যৌনকাজে লিপ্ত হতে না চাইলে মারধর করা হতো, ইলেকট্রিক শক দেয়া হতো। লোহার রড গরম করে ছ্যাঁকা দেয়া হতো। প্রতিরাতেই একেক নারীকে পাঠানো হয় একেক স্থানে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি সহেলি ফেরদৌস বলেন, নানা প্রলোভন দেখিয়ে দালালরা নারীদের পাচার করে। সাধারণত প্রতারিত হওয়ার পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। এক্ষেত্রে অপরাধীরা যদি দেশে থাকে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু বিদেশে থাকলে তা দুষ্কর হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে বিদেশে যাওয়ার আগে বিদেশগামী নারীকে সচেতনভাবে খোঁজ নিতে হবে। যে প্রতিষ্ঠান তাকে পাঠাচ্ছে তা সরকার অনুমোদিত কি-না। কোথায়, কিভাবে পাঠাচ্ছে তা জেনে বিদেশে যাওয়া উচিত। কোনো প্রকার সন্দেহ করলে পুলিশের সহযোগিতা নেয়া উচিত। এক্ষেত্রে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে বলে জানান তিনি।

0 comments:

Post a Comment