Last update
Loading...

পাকিস্তানের ভাঙন পর্ব by সোহরাব হাসান

পৃথিবীর সব দেশেই ক্ষমতার অন্দরমহলে অনেক না-বলা কথা থাকে, যা ইতিহাস বা ইতিহাসের কুশীলবদের আত্মজীবনীতে ঠাঁই পায় না। সূচনা থেকেই পাকিস্তানের রাজনীতি ছিল অস্থির, অনিশ্চিত ও প্রাসাদ-ষড়যন্ত্রের শিকার। দেশটির প্রথম বড়লাট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু রহস্যাবৃত্ত তিনি মারা গেছেন, না তাঁকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। স্বাধীনতার চার বছরের মাথায় ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান আততায়ীর গুলিতে খুন হন। ‘বাঙালি’ নাজিমুদ্দিনকে সরিয়ে বড়লাট হন পাঞ্জাবি আমলা গোলাম মোহাম্মদ। তাঁকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসেন সামরিক আমলা ইস্কান্দার মির্জা।
আবার ১৯৫৮ সালের ২৬ অক্টোবর সেনাবাহিনীর প্রধান আইয়ুব খান তাঁকে সরিয়ে নিজেই প্রেসিডেন্ট পদটি দখল করেন। যে কায়দায় আইয়ুব মির্জাকে তাড়িয়েছেন, প্রায় একই কায়দায় ইয়াহিয়া খান তাঁকে সরিয়ে ক্ষমতার দৃশ্যপটে আসেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ইয়াহিয়া খানকে ক্ষমতাচ্যুত করে জুলফিকার আলী ভুট্টো হন খণ্ডিত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট।
আইয়ুব, ইয়াহিয়া, ভুট্টো পাকিস্তানের তিন প্রেসিডেন্টের এইড ডি ক্যাম্প বা বিশ্বস্ত সহকারী ছিলেন আরশাদ সামি খান। তাঁর থ্রি প্রেসিডেন্টস অ্যান্ড অ্যান এইড: লাইফ, পাওয়ার অ্যান্ড পলিটিকস-এ আছে পাকিস্তানের ক্ষমতার অন্দরমহলের কথা। শাসকদের পারস্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস ও হীনম্মন্যতা কীভাবে দেশটির গণতান্ত্রিক শাসনকাঠামো ধ্বংস করে, কীভাবে তাঁরা সংখ্যাগুরু বাঙালিদের ন্যায়সংগত অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখেছেন, তারও বর্ণনা আছে এই বইয়ে।
প্রেসিডেন্টের বিশ্বস্ত সহকারী বা এডিসির দায়িত্ব নেওয়ার আগে বিমানবাহিনীর চৌকস কর্মকর্তা আরশাদ সামি খান ১৯৬৫ সালে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব সিতারাই জুরাত উপাধি পান। কিন্তু ইতিহাসের পরিহাস হলো, তাঁরই পুত্র প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী আদনান সামি পাকিস্তান ছেড়ে ভারতকেই দেশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি তরুণ প্রজন্মের হৃদয় জয় করা এই শিল্পীকে নাগরিকত্ব দেয়।
আরশাদ সামি খান ১৯৬৬ সালে আইয়ুবের এডিসি হিসেবে কাজ শুরু করেন। আইয়ুব বিদায় নিলে তিনি ইয়াহিয়ার এডিসি হন। এরপর জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গেও কিছুদিন কাজ করেন তিনি। পরবর্তীকালে আরশাদ সামি দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের সচিব ও রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন।
আরশাদ সামি খান তাঁর বই শুরু করেছেন আইয়ুবের পতনের ঘটনা দিয়ে। তার আগেই সেনাবাহিনীপ্রধান ইয়াহিয়া খান সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, ক্ষমতা দখল করবেন। আইয়ুব যেমন এক কাপড়ে ইস্কান্দার মির্জাকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিলেন, ইয়াহিয়া খানও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ থেকে বিতাড়িত করেন।
উনসত্তরের অভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব চেয়েছিলেন পুনরায় সামরিক শাসন জারি করে নিজের গদি টিকিয়ে রাখতে। যেমন নব্বইয়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও পুনরায় সামরিক শাসন জারি করতে চেয়েছিলেন। কেউ সফল হননি। যে সেনাবাহিনীর কাঁধে ভর দিয়ে তাঁরা ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেই সেনাবাহিনী তত দিনে তাঁদের ‘পরিত্যক্ত’ ঘোষণা করেছে। এরশাদের সেই সময়ের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে নানা তথ্য আছে মনজুর রশীদ খানের বইয়ে (আমার সৈনিক জীবন, প্রথমা, ২০১৬)। আরশাদ সামি খানের ভাষ্য এবং সেই সময়ের তিন প্রধান কুশীলবের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নিয়ে সাজানো হয়েছে এই ধারাবাহিক।
জবরদখলকারী কোনো শাসকের বিদায় সুখের ও স্বাভাবিক হয় না। আইয়ুবের বেলায়ও ব্যতিক্রম হয়নি। তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের ভাগ্য মেনে নিলেন।
সেদিনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে আরশাদ সামি লিখেছেন, ‘আমি করিডর পার হয়ে যেতে ধীরে ধীরে দরজা খুলে দেখলাম, আইয়ুব ও তাঁর স্ত্রী বসে আছেন, নির্বাক। তাঁরা গভীর চিন্তায় মগ্ন। বাইরে তখন প্রচন্ত ঝড়বৃষ্টি। কিন্তু প্রেসিডেন্ট পদ হারানোর আশঙ্কায় তাঁর মনে যে দমকা হাওয়া বইছিল, তার শক্তি বাইরের ঝড়ের চেয়েও অনেক বেশি বলে মনে হচ্ছিল।’ উল্লেখ্য, ও রকম হতাশাজনক সময়েও তাঁরা ছিলেন পরিপাটি পোশাকে। তাঁদের চুল ছিল পাট পাট করে আঁচড়ানো। পরিষ্কারভাবেই দীর্ঘ দায়িত্ব পালনকালে তাঁরা দেশ-বিদেশের অনেক স্টাইলিশ মানুষের সান্নিধ্যে এসেছিলেন, যা তাঁদের রুচিকে পরিশীলিত করেছে। আমি যখন ভেতরে ঢুকলাম, তখন তাঁদের চোখের ভাষায় বুঝতে পারলাম, তাঁরা একা থাকতে চাইছেন।
আমি প্রেসিডেন্টকে বললাম, ‘স্যার, আমি আপনাকে মনে করিয়ে দিতে এসেছি, পাঁচ মিনিট পরই আপনার ভাষণ প্রচার করা হবে।’
তিনি বললেন, ‘আমি জানি, আমি জানি, তোমাকে ধন্যবাদ।’
এরপর আইয়ুব তাঁর ভাষণ শুরু করলেন বরাবরের মতো ‘মাই ডিয়ার কান্ট্রিমেন’ বা আমার প্রিয় দেশবাসী বলে। ভাষণের সারকথা ছিল,
‘আমি প্রেসিডেন্ট থাকাকালে দেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারি না। পরিস্থিতি আর সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই এবং সব সরকারি প্রতিষ্ঠান ক্রোধ, আতঙ্ক ও আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীপ্রধান আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করুন এটাই গোটা জাতির দাবি।’
আরশাদ সামি জানাচ্ছেন, ভাষণ শেষ না হতেই তাঁর কক্ষের সব টেলিফোন সচল হয়ে উঠল। বিদায়ী সরকারের মন্ত্রীরা প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাঁদের প্রতি সহমর্মিতা জানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু তাঁরা কারও সঙ্গে দেখা করলেন না।
এরপর আরশাদ সামি ক্ষমতার পালাবদলের যে বর্ণনা দিলেন, তাতে বিদায়ী ও নতুন শাসকের মধ্যকার তিক্ততাই লক্ষ করা যায়। তিনি লিখেছেন, একপর্যায়ে আইয়ুব তাঁকে ইয়াহিয়া খানকে টেলিফোনে ধরিয়ে দিতে বললেন। সামি অফিসে গিয়ে জেনারেল স্টাফ অফিসার ব্রিগেডিয়ার ইসহাক খানকে আইয়ুবের ইচ্ছার কথা জানালেন। কিন্তু ইয়াহিয়া খান তাঁর অনুরোধ নাকচ করে দিলেন এবং নবনিযুক্ত চিফ অব স্টাফ জেনারেল এস জি এম এম পীরজাদার সঙ্গে কথা বলতে বললেন। আরশাদ তিন বছর ধরে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আছেন। কখনো এ রকম ঘটনা ঘটেনি যে প্রেসিডেন্ট কারও সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতে চেয়েছেন কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি কথা বলেনি। বরং মন্ত্রী-কর্মকর্তারা তাঁর টেলিফোন পেলে ধন্য হতেন।
আরশাদ লিখেছেন, ‘আমি বিষয়টি নিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আখতারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলাম। তিনি বললেন, এ ক্ষেত্রে পীরজাদাই হবেন উত্তম বিকল্প। আমি ফিল্ড মার্শালের কাছে গিয়ে বললাম, জেনারেল ইয়াহিয়া মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন। তাঁর বদলে তিনি নবনিযুক্ত চিফ অব স্টাফ পীরজাদার সঙ্গে কথা বলবেন কি না, জানতে চাইলাম।’
আইয়ুব বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি কিছু মনে করছি না। শুধু জানতে চাইছি ২৫ মার্চ আমি অফিসে যে বিদায়ী নোট রেখে এসেছি, তা তিনি পেয়েছেন কি না। তিনি সেটি পড়েছেন এটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। পীরজাদাকে টেলিফোন করে নিশ্চিত হও এবং তাঁকেও পড়তে বলো।’
এরপর আরশাদ সামি জেনারেল পীরজাদার সঙ্গে সরাসরি টেলিফোনে কথা বলেন। তিনি সকাল থেকে নানা ঘটনায় ব্যথিত ছিলেন। কিন্তু পীরজাদার কথা নোংরামির পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। তাঁদের দুজনের কথোপকথন ছিল এ রকম:
‘হ্যাঁ সামি, কী, বলো?’
‘স্যার, ফিল্ড মার্শাল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর কর্মকর্তা আমাকে আপনার সঙ্গে কথা বলতে বললেন।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি সেটা জানি। দ্রুত বলো যুবক, আমি খুবই ব্যস্ত। ফিল্ড মার্শাল কী চান?’
‘স্যার, তিনি জানতে চান যে ২৫ মার্চ তিনি অফিসে যে বিদায়ী নোট রেখে গেছেন, সেটি তিনি পেয়েছেন এবং পড়েছেন কি না। তিনি চান, আপনিও এটি পড়ে দেখুন।’
এ পর্যায়ে পীরজাদা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমরা তা পেয়েছি। তুমি তাঁকে বলো, তিনি যেসব উপদেশ ও পরামর্শ দিয়েছেন, সেগুলো শুনলে তাঁর মতো আমাদেরও পতন ঘটবে। তিনি যদি আমার পরামর্শ চান, বলব, অবিলম্বে তাঁর প্রেসিডেন্ট ভবন ছেড়ে বিদেশে চলে যাওয়া উচিত। অন্তত যেন রাজধানীর বাইরে চলে যান।’ বিদায়ী নোটে আইয়ুব রাজনীতিকদের দাবির প্রতি নমনীয় না হতে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের এক ইউনিট ভেঙে না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি এক ব্যক্তি এক ভোট চালু না করার কথাও বলেছিলেন, তাতে সংখ্যাগুরু পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে পশ্চিম পাকিস্তান শাসন করা সহজ হবে।
কিন্তু তত দিনে নতুন জেনারেল ও তাঁর শাগরেদরা নিজস্ব পদ্ধতিতে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।

আরশাদ সামি খান পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও তিন প্রেসিডেন্টের বিশ্বস্ত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তাঁর বইটি (থ্রি প্রেসিডেন্টস অ্যান্ড অ্যান এইড: লাইফ, পাওয়ার অ্যান্ড পলিটিকস) কিন্তু পাকিস্তানে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এটি প্রকাশ করেছে নয়াদিল্লির পেন্টাগন প্রেস। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আই কে গুজরাল বইয়ের প্রকাশনা উৎসবেও যোগ দিয়েছিলেন। এ থেকে ধারণা করা যায় যে সামি খানের বইটিতে এমন সব তথ্য আছে, যা পাকিস্তানের রাজনীতিকদের জন্য অস্বস্তিকর। সেখানকার রাজনীতি সুস্থ ধারায় চলেনি বলেই আজ যিনি সাচ্চা দেশপ্রেমিক হিসেবে নন্দিত হয়েছেন, আগামীকাল তাঁকেই দেশদ্রোহী হিসেবে নিন্দিত করা হয়েছে।
আরশাদ সামি খান পাকিস্তানের তিন প্রেসিডেন্টের এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও আইয়ুব খানের সঙ্গেই বেশি সময় ছিলেন। তাঁর প্রতি লেখকের যে কিছুটা পক্ষপাত আছে, তা তিনি গোপন করেননি। তিন প্রেসিডেন্টের মধ্যে তাঁর কাছে আইয়ুবকেই ‘উত্তম’ মনে হয়েছে। কিন্তু সেই ‘উত্তম’ প্রেসিডেন্ট পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আজম খানের জনপ্রিয়তায় এতটাই সন্ত্রস্ত ছিলেন যে তিনি কিছু আজগুবি অভিযোগ এনে তাঁকে সরিয়ে দেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন ময়মনসিংহের উকিল নামে পরিচিত আবদুল মোনায়েম খান। এর আগে অবশ্য তিনি আইয়ুবের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। আইয়ুবও স্বীকার করেছেন, অর্থনীতি, উন্নয়ন ও উচ্চতর প্রশাসন সম্পর্কে লোকটির কোনো ধারণা নেই। তারপরও কেন তাঁকে গভর্নর নিয়োগ করা হয়েছে? অপরিসীম আনুগত্য। যোগ্যতার ঘাটতি তিনি আনুগত্য দিয়ে পুষিয়ে নিয়েছেন।
সামি খান পাকিস্তানের অনেক রাজনীতিক ও সামরিক-বেসামরিক আমলার চারিত্রিক দুর্বলতা প্রকাশ করেছেন, যার সবটা এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। তবে তাঁর বইয়ে মোনায়েম খান সম্পর্কে যেসব মজার তথ্য ও ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে, তা যেকোনো কৌতুকুনাটকের উৎকৃষ্ট চরিত্র হতে পারে। এখানে একটি ঘটনা তুলে ধরছি।
আবদুল মোনায়েম খানের পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হওয়া নিয়ে গভর্নর ভবনের কর্মীদের মধ্যে যে কৌতুকটি চালু ছিল, তা এ রকম: একদিন ‘শুভক্ষণে’ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ঘোষণা করলেন, ঢাকার পুবদিকের ফটক দিয়ে আগামীকাল সকালে যে ‘খাঁটি বাঙালি রক্তের’ ব্যক্তিটি ঢাকায় প্রথম ঢুকবেন, তাঁকেই গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। মোনায়েম খান এমন একটি প্রাণীর (গাধার) পিঠে চড়ে এসেছিলেন, যেটি পূর্ব পাকিস্তানে কদাচিৎ দেখা গেলেও পশ্চিম পাকিস্তানে মালামাল বহনের জন্য প্রায়ই ব্যবহৃত হতো। আর মোনায়েম খান এমনই বিরল বাহনে চড়ে সেদিন সকালে প্রথম ঢাকায় ঢুকলেন এবং আইয়ুবের সব শর্ত মেনেই তিনি গভর্নরের চেয়ারে বসলেন।
আরশাদ সামি খান লিখেছেন, তিনি গভর্নর মোনায়েম খান সম্পর্কে অনেক কৌতুককর ঘটনার কথা শুনেছেন। সেগুলো নিয়ে বেশি আলোচনা করেননি। নিজের দেখা কিছু ঘটনা তুলে ধরেছেন। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব যেহেতু বাংলা বলতে পারেন না, সেহেতু উর্দু কিংবা ইংরেজিতে বক্তৃতা দেন এবং দলের কোনো নেতা কিংবা মন্ত্রী তা বাংলায় অনুবাদ করেন।
১৯৬৭ সালের মার্চের শুরুতে ময়মনসিংহে আয়োজিত এক জনসভায় আইয়ুব খানের ভাষণ মোনায়েম খান নিজেই ভাষান্তর করবেন বলে তাঁর (প্রেসিডেন্ট) সামরিক সচিবকে অনুরোধ করেন। সেটি ছিল বেশ বড় সমাবেশ। সেই সময় আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে আসামি করায় তা আরও বেড়ে গিয়েছিল। আমাদের ধারণা হলো, মোনায়েম খান শেখ মুজিব ও ছয় দফা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি, তাঁর ভয়, মানুষ তাতে ক্ষুব্ধ হবে। আইয়ুবের ভাষণ ভাষান্তরের উদ্দেশ্য হলো, তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা হলে সেটি লুকানো।
এরপর সামি খান জনসভাস্থলের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘নিরাপত্তার কারণে মঞ্চ অনেক উঁচু করা হয়েছিল এবং জনগণের বসার জায়গা ছিল বেশ দূরে। মঞ্চে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে গভর্নর ছাড়াও সাদাপোশাকের নিরাপত্তাকর্মী, ওই এলাকার প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন। প্রেসিডেন্ট পোডিয়াম থেকে ভাষণ শুরু করলেন। গভর্নর বসে ছিলেন প্রেসিডেন্টের ঠিক পেছনে, যাতে তিনি তাঁর ভাষণ ভাষান্তর করতে পারেন। কিন্তু তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন এবং নাক ডাকতে থাকলেন। মঞ্চে উপবিষ্ট সবাই তাঁর নাকডাকা শুনতে পেলেন। গভর্নর যখন ঘুমাচ্ছিলেন, সামি তাঁর সচিব ক্যাপ্টেন জিলানিকে ডেকে তাঁকে জাগিয়ে দিতে বললেন; না হলে তিনি তো ভাষান্তর করতে পারবেন না। কিন্তু সচিবের জবাব ছিল, ‘চিন্তা করবেন না, আমি নোট নিচ্ছি, যাতে গভর্নর ভাষান্তর করতে পারেন।’
সামি আরও বলেন, ‘আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে গভর্নরের নাকডাকা শুনতে লাগলাম এবং ভাবলাম, তৃতীয় একজনের নোটের ভিত্তিতে তিনি কীভাবে ভাষান্তর করবেন?’ প্রেসিডেন্ট প্রায় এক ঘণ্টা ভাষণ দিলেন, যাতে পূর্ব পাকিস্তানের নেতাদের ছয় দফা এবং আরও বেশি দাবিদাওয়ার ওপর আলোকপাত করা হয়। তিনি জনসমাবেশকে সতর্ক করে দিয়ে বললেন, এসব দাবির উদ্দেশ্য হলো কেন্দ্রীয় সরকারকে দুর্বল করা, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভাঙন ধরানো, যা ভারতের উদ্দেশ্য।
যখন প্রেসিডেন্ট ভাষণ শেষ করলেন, তখন সচিব দ্রুত গিয়ে তাঁর বসের ঘুম ভাঙালেন। গভর্নর দীর্ঘ হাই তুললেন এবং সচিবকে নোটগুলো পোডিয়ামে রাখতে বললেন। এরপর গভর্নর প্রেসিডেন্টের কাছে ভাষণ অনুবাদ করার অনুমতি চাইলেন। তিনি ভাষণ শুরু করলেন কোরআনের আয়াত পাঠ দিয়ে, যদিও প্রেসিডেন্টের ভাষণে তা ছিল না। এরপর তিনি প্রেসিডেন্টের এক ঘণ্টার ভাষণের ভাষান্তর করতে দুই ঘণ্টা সময় ব্যয় করলেন। দ্রুতগতির ট্রেনের মতো তিনি কোথাও থামলেন না। হিটলার যেভাবে নাজিদের উদ্দেশে ভাষণ দিতেন, গভর্নরও সেভাবে কখনো গলার স্বর উচ্চগ্রামে, কখনো নিম্নগ্রামে নিয়ে গেলেন। রবীন্দ্রনাথ, গালিব ও ইকবালের কবিতা থেকে আবৃত্তি করলেন, যা প্রেসিডেন্ট বলেননি। এটি ছিল একবারেই নজিরবিহীন ঘটনা।
বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে প্রেসিডেন্ট তাঁর পাশে বসা গভর্নরকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মোনায়েম সাব, আমি তো অত বড় বক্তৃতা দিইনি। আপনি যে কবিতাগুলো আবৃত্তি করলেন, আমি সেসব বলিনি। এমনকি টেগরের (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) কোনো কবিতাই আমি পড়িনি। আপনার ভাষান্তরে এসব এল কীভাবে?’
মোনায়েম খান হাসলেন এবং বললেন, ‘স্যার, কিছু মনে করবেন না। আপনি কী বলেছেন আর আমি কী যোগ করেছি, সেটি বিষয় নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো, জনগণ তা শুনতে চেয়েছে। আপনি কি লক্ষ করেননি, আমি যখন গান গাইছিলাম, তখন তারাও গান গাইছিল। আমি যখন হাসছিলাম, তখন তারাও হাসছিল। দূরদূরান্ত থেকে আসা এই মানুষগুলো আপনার বা আমার বক্তৃতা শুনতে চায়নি। তারা এসেছে আনন্দের জন্য, স্যার। তাদের একঘেয়ে জীবনে আনন্দের প্রয়োজন আছে। এ কারণেই তারা যৌনতার প্রতি বেশি আকৃষ্ট, বিশেষ করে যখন যৌনতা ছাড়া তাদের কিছু করার থাকে না। আপনি দেশব্যাপী যে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করছেন, তারপরও জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটছে। তারা এসব কেন্দ্রে যায় বিনা মূল্যে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী নিতে নয়, এটির ব্যবহারবিধি শুনে যৌনানন্দ পাওয়ার জন্য।’
এরপর সামি খান লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট আইয়ুব, যাঁকে আমি অত্যন্ত উঁচু রুচির ও গুরুগম্ভীর মানুষ বলে মনে করি, হঠাৎই তিনি অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। সামনের আসনে বসা আমার পক্ষেও হাসি সংবরণ করা কঠিন হয়ে পড়ল।’
সামি খান আরও একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন, যেখানে বিমানবন্দরে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবকে অভ্যর্থনা উপলক্ষে সড়কে সব ধরনের যানবাহন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষকে দাঁড় করিয়ে দেখানো হয়েছিল প্রেসিডেন্ট কত জনপ্রিয়। সেদিন আইয়ুবের এডিসি সামি খান তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে গিয়েও ঠিক সময় পৌঁছাতে পারেননি। এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মোনায়েম খান বলেন, ভবিষ্যতে তাঁকে যেন আগেভাগে জানানো হয়। তাহলে গভর্নর তাঁর সহায়তায় আরও বেশি নিরাপত্তা বাহন দিতে পারবেন। এ কথা শুনে সামি হাসছিলেন। তিনি সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা বলছিলেন; আর গভর্নর ভাবছেন প্রটোকলের কথা!
ভাবা যায়, এই চরিত্রের একজন মানুষ ছিলেন পূর্ববঙ্গের গভর্নর, তাও স্বল্প সময়ের জন্য নয়, দীর্ঘ ছয় বছর। এই মোনায়েম খানই নাকি বলেছিলেন, তিনি গভর্নর থাকতে শেখ মুজিব জেলখানা থেকে মুক্তি পাবেন না। আইয়ুব খান অস্ত্রের ভাষায় ছয় দফার জবাব দেবেন বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো উনসত্তরে শেখ মুজিব জেলখানা থেকে ছাড়া পাওয়ার কয়েক দিনের মাথায় মোনায়েম ও তাঁর নিয়োগকর্তা দৃশ্যপট থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। আইয়ুব প্রথমে মোনায়েম খানকে সরিয়ে ড. এম এন হুদাকে গভর্নর করেন। পরে তাঁকেও ক্ষমতা ছাড়তে হয়।
আর শেখ মুজিবুর রহমান তখন বাংলাদেশের ভাগ্যনিয়ন্তার ভূমিকায় আবির্ভূত হন।

ইয়াহিয়া খান ছিলেন আরশাদ সামি খানের বস। এ কারণে তিনি তাঁর অনেক ‘দুষ্কর্ম’ গোপন করেছেন। সামি খান তাঁর বইয়ে ইয়াহিয়াকে একজন প্রেমিক ও রসিক পুরুষ হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু যাঁরা পাকিস্তানের অন্দরমহলের খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা জানেন ইয়াহিয়া খান কী চরিত্রের মানুষ ছিলেন। তিনি প্রেমিক ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর প্রেমিকার সংখ্যা ছিল অগুনতি। পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলাদের অনেকের লেখায় এসব উঠে এসেছে। পাকিস্তান পুলিশের সাবেক আইজি সরদার মুহাম্মদ চৌধুরী দ্য আলটিমেট ক্রাইম-এ লিখেছেন, ‘স্বয়ং প্রেসিডেন্টের ছিল মদ ও নারীভোগের নেশা। আর তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্নেল ছিলেন সমকামী...। বারবনিতা আর বেশ্যার দালালদের প্রেসিডেন্ট হাউসে যাতায়াত ছিল অঢেল ও অবাধ। তাঁদের কজন আবার বেশ হাই স্ট্যাটাস ভোগ করতেন। আকলিম আখতার, মিসেস কে এন হোসেইন ও লায়লা মুজাফফরের মর্যাদা ছিল সর্বোচ্চ। মোহময়ী রমণীদের পাল ঘুরে বেড়াত ভবনের সর্বত্র। তাঁরা ধূমপান করতেন, মদ পান করতেন, নেচে-গেয়ে হেলেদুলে হই-হুল্লোড় করতেন।’ ১৯৭১-এ ঢাকায় মার্কিন মিশনের প্রধান আর্চার কে ব্লাড, যিনি নিক্সন-কিসিঞ্জার চক্রের চোখ রাঙানি অগ্রাহ্য করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছিলেন, দ্য ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ বইয়ে লিখেছেন, ‘১৯৪৪ সালে ইয়াহিয়া ছুটিতে বাড়িতে এসে বিয়ে করেন এক আর্মি অফিসারের মেয়েকে। তাঁদের এক ছেলে এক মেয়ে। দিনে দিনে ইয়াহিয়া বিখ্যাত হয়ে ওঠেন এক নারীবাজ হিসেবে। তিনি তাঁর এই কীর্তি গোপন করার চেষ্টা করতেন না। নাইট ক্লাবে তাঁর রক্ষিতাকে বগলদাবা করে প্রকাশ্যে আবির্ভূত হতেন। আমাকে কয়েকজন অত্যন্ত আকর্ষণীয় বিবাহিত মহিলার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলা হয়েছিল, এরা সবাই ইয়াহিয়ার রক্ষিতা।’
কথাশিল্পী আনিসুল হক ইয়াহিয়ার প্রেম ও লাম্পট্য নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন জেনারেল ও নারীরা। বইয়ের এক জায়গায় আছে, ‘রানি ইয়াহিয়াকে কোট পরালেন। তাঁর টাইয়ের নট বেঁধে দিলেন। তাঁর মনে পড়ে গেল তাঁর ফেলে আসা স্বামীর কথা। একদিন তিনি এভাবে স্বামীর টাইয়ের নটও বেঁধে দিতেন। তাঁরও দুই বাহু পাখির ডানার মতো উড়িয়ে দিয়ে তাঁকে পরিয়ে দিতেন কোট। আগাজি তাঁকে চুম্বন করলেন কপালে।’ (প্রথমা প্রকাশন, ২০১৬) আরশাদ সামি খান নারী ও গানপ্রেমিক ইয়াহিয়া খানের দুটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। একটি ঢাকায় তাঁর রোমাঞ্চকর নৈশবিহার এবং অপরটি সংগীতসম্রাজ্ঞী নূরজাহানের গানের রেকর্ড নিয়ে। সামি লিখেছেন, ‘আমরা তখন ঢাকায় প্রেসিডেন্ট ভবনে ছিলাম। একদিন বিকেলে ইয়াহিয়া তাঁর অফিসের কাজ সেরে আমাকে ডাকলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন এই সন্ধ্যায় আমার কোনো পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি আছে কি না।’
আমি বললাম, ‘না স্যার’
এরপরের কথপোকথন এ রকম:
‘তুমি একটি পার্টিতে আমন্ত্রিত!’
‘তাই, স্যার, কে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন’ আমি মৃদু হাসলাম।
‘মি. খন্দকার’
‘কিন্তু আমি তো তাঁর কাছ থেকে কোনো আমন্ত্রণ পাইনি।’
‘তুমি আমন্ত্রণ পাওনি এ কারণে যে এখনই আমন্ত্রণ জানানো হলো। তিনি আজ রাত নয়টায় তোমাকে নৈশভোজ ও নাচের আসরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তাঁদের বাড়িতে নাচের জন্য সুন্দর কাঠের মেঝে আছে এবং তুমি সেখানে নাচবে।’
‘কিন্তু আমি তাঁকে ভালোভাবে চিনি না এবং তাঁর ঠিকানাও জানা নেই, স্যার।’
‘তাতে কিছু আসে যায় না। আমি তোমার পক্ষ হয়ে তাঁর আমন্ত্রণপত্র গ্রহণ করেছি এবং তোমার সেখানে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। ঢাকায় তুমি কী গাড়ি ব্যবহার করো?’
‘আমি প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে পাওয়া একটি মাসির্ডিজ ব্যবহার করি।’
আচ্ছা, আজ রাতে ব্যতিক্রম হবে। তুমি তোমার গাড়িটা নিয়ে বের হয়ে তোমার কক্ষের সামনে থাকবে, যেখান থেকে প্রেসিডেন্ট ভবনের পেছনে যাওয়া যায়। চালকের কাছ থেকে গাড়ির চাবিটি নিয়ে নাও এবং আজ রাতে চালককে ছুটি দাও। এবং সুন্দর কালো লাউঞ্জ স্যুট পরবে। তোমাকে অফিস থেকে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়া হয়েছে?
‘হ্যাঁ স্যার, অফিস থেকে আমাকে ৩৮ স্পেশাল মডেলের পাঁচ গুলির একটি রিভলবার দেওয়া হয়েছে, যেটি এফবিআই ব্যবহার করে।’
‘আমি আশা করি তোমার কাছে মারাত্মক অস্ত্রই আছে। এটি তোমার ভেতরের পকেটে কৌশলে সতর্কতার সঙ্গে রাখবে। এরপর সামি লিখেছেন, তাঁর এসব কথাবার্তায় আমন্ত্রণটি রহস্যজনক মনে হলো। জিজ্ঞেস করলাম, ‘সতর্কতা কেন স্যার? আমি তো নাচের আসরে যাচ্ছি, মল্লযুদ্ধে নয়। তিনি হাসলেন এবং বললেন, ঠিক আছে। ঠিক ৯টার সময় তৈরি থাকবে এবং ৯টা ৫ মিনিটে বারান্দার সব বাতি বন্ধ করে দেবে এবং তোমার গাড়ির ছাদের বাতিও। পেছনের আসনে রাখার জন্য বিছানার চাদর নেবে। তুমি গাইডকে বিছানার চাদর দিয়ে ঢেকে দেবে। মনে রাখবে, গেটে নিরাপত্তারক্ষীদের কেউ যাতে দেখতে না পায় তুমি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টকে পাচার করে নিয়ে যাচ্ছ। তাহলে আমি চিৎকার দিতে থাকব যে তুমি আমাকে অপহরণ করছ।’ তিনি হাসলেন এবং বললেন, ‘এখন যাও, এবং সবকিছু প্রস্তুত করো। এবং কোনো কিছু যাতে ফাঁস না হয়।’ এরপর সামি খান যোগ করেন, ‘পরিকল্পনামতো পার্টির উদ্দেশে আমরা রওনা দিলাম। নিরাপত্তা ফটক পেরিয়ে এসে ইয়াহিয়া গাড়িতে বসলেন এবং গাড়ি আমাকে থামাতে বললেন। গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে সামনের যাত্রী আসনে বসলেন। তিনি চাইছিলেন যে আমি নিজেকে চালক না ভাবি।’ গাড়ি চলা শুরু করলে ইয়াহিয়া বললেন, আমাদের কোথাও থামতে হবে। আমন্ত্রণকারীর জন্য কিছু ফুল নিতে হবে। আমি নিরাপত্তাকর্মী ও প্রটোকল ছাড়া কোথাও যাইনি।
কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি হিসেবে ঢাকায় থাকার সুবাদে তিনি শহরের সবকিছু চেনেন। এবং চাদরে মুখের অর্ধেক ঢেকে ফুল কিনলেন; যাতে
তাঁকে ফুলবিক্রেতা বা পথচারীরা না চিনতে পারেন। বন্ধুর বাসভবনে পৌঁছে তিনি ডোর বেল বাজালেন। আমি তাঁর পেছনে দাঁড়ানো। প্রেসিডেন্টকে দেখে বিস্মিত খন্দকার। ভাবলেশহীন। তিনি ভাবেননি কোনো স্কোয়াড, নিরাপত্তার গাড়ি ও মানুষ ছাড়া চুপচাপ সেখানে যেতে পারেন। গৃহকর্তাকে সম্বোধন করে ইয়াহিয়া বললেন, ‘কানু, তুমি আমাদের ভেতরে যেতে বলবে না! এ আমার এডিসি স্কোয়াড্রন লিডার আরশাদ সামি খান।’ খন্দকারের দিন তখন ভালোই যাচ্ছিল। তিনি খুবই আধুনিক ও সুন্দরভাবে সজ্জিত বাড়িতে থাকেন এবং পার্টির আয়োজনও ছিল জৌলুশপূর্ণ। আর সেখানে অনেক অভ্যাগত ছিলেন, যাঁদের অনেককে আমি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখেছি। তাঁরা সবাই প্রেসিডেন্টকে ঘিরে দাঁড়ালেন। এবং প্রেসিডেন্টও তাঁদের অভিনন্দিত করলেন। সামি খান সেদিনের আয়োজনের বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, ‘ভারী, স্থূল শরীর সত্ত্বেও ইয়াহিয়া ছিলেন খুবই চৌকস নাচুনে। সেখানে উপস্থিত প্রায় সব নারীর সঙ্গেই তিনি নাচলেন। তবে তিনি যেকোনো ভদ্রলোকের মতোই দূরত্ব বজায় রাখলেন এবং মার্জিত রুচির পরিচয় দিলেন।
যেহেতু এটি সপ্তাহ শেষের আয়োজন ছিল, সেহেতু অনেক রাত কার্যত প্রায় ভোর পর্যন্ত চলছিল।’ সামির ভাষায়, ‘খোদাকে ধন্যবাদ যে তিনি প্রেসিডেন্টকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন। কেউ তাঁর অনুপস্থিতি টের পায়নি। ওই রাতে তিনি কোনো মদ পান করেননি এবং তিনি গাড়ির পেছনের আসনে বসে আমার সঙ্গে গিয়েছিলেন। এবং রুমে গিয়েছিলেন স্বাভাবিকভাবেই।’ অনেক বছর পর আবুধাবিতে এক বাঙালি নারী সেই রাতের গল্প বলেছিলেন রসিয়ে রসিয়ে। তিনি সামিকে চিনতেন না এবং অবলীলায় বলে যাচ্ছিলেন, প্রেসিডেন্ট নাকি ঢাকায় এক মেয়েবন্ধুর সঙ্গে রাত কাটিয়েছেন, যাঁর স্বামীর নাম কানু এবং তাঁর স্বামী ওই দিন শহরের বাইরে ছিলেন। দ্বিতীয় ঘটনাটি করাচির। একবার সেখানে এক গানের অনুষ্ঠানে ইয়াহিয়া খান তাঁর বন্ধুদের দেখিয়ে সপ্রতিভ কণ্ঠে সামি খানকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘পুত্র, এরা আমাকে সংগীতম্রাজ্ঞী নূরজাহানের সামপ্রতিক পাঞ্জাবি গানের একটি রেকর্ড সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। কিন্তু আমি এ সম্পর্কে কিছুই জানি না। আমি এটি সংগ্রহ করব।’ সমাবেশ থেকে এক বন্ধুকে ডেকে তিনি ওই গানের কলি আওড়ালেন ‘মেরি চিচি দ্য চালা মাহি লা লেয়া, কেরে যা কেহ সিকেত লাউঙ্গি’। এরপর ইয়াহিয়া বললেন, ‘পুত্র, আমি জানি দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু আমি বন্ধুদের বলেছি আমার এডিসি এটি আমার জন্য এনে দিতে পারবে। তুমি কি মনে করো,
পারবে?’ তাঁর শিশুসুলভ অনুরোধে আমি হাসলাম এবং বললাম, চেষ্টা করে দেখি, ‘স্যার’। এরপর সামি খান রেকর্ডের খোঁজে বের হলেন। তিনি জানেন, অনেক আগেই করাচির দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করে সামি একজন এক অডিও ক্যাসেটের দোকানের মালিককে খুঁজে বের করলেন। এরপর তাঁকে ব্যাকুলকণ্ঠে জানানো হলো, জরুরি ভিত্তিতে তাঁর নূরজাহানের সর্বশেষ রেকর্ডটি প্রয়োজন। এ জন্য বাঙতি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিলে ওই মালিক দোকান খুলে রেকর্ড বের করে দিলেন। সামি দোকানদারকে যখন বাড়ি পৌঁছে দিয়ে প্রেসিডেন্টের বসার ঘরে ঢুকলেন তখন তাঁর কিশোরসুলভ মনটি ‘হুররে’ বলে উল্লাস করছিল।’ সামি লিখেছেন, ঘটনাটিতে রংচং লাগিয়ে এই প্রচার চালানো হলো যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া মদ্যপ অবস্থায় নূরজাহানকে তাঁর সর্বশেষ রেকর্ডের গানটি গাওয়ানোর জন্য প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমানে করে করাচি নিয়ে আসতে পীড়াপীড়ি করতে থাকেন। এরপর তিনি সারা রাত ইয়াহিয়ার সঙ্গে ছিলেন। বিষয়টি সম্পর্কে এক বন্ধু জানতে চাইলে তাঁকে বললাম, ‘কী নির্বোধ!’ কী বাজে কথা চাউর হয়ে গেছে! মদ্যপ ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে নূরজাহান রাত কাটিয়েছেন!

একাত্তরে পাকিস্তানের তিন প্রধান চরিত্র শেখ মুজিব, ইয়াহিয়া ও ভুট্টো তিনজনই ছিলেন পরস্পরের প্রতি সন্দিহান। মুজিব নির্বাচনে জিতেও ভরসা রাখতে পারছিলেন না যে, ইয়াহিয়া তাঁর হাতে ক্ষমতা দেবেন। ভুট্টোর ভয় মুজিব-ইয়াহিয়া সমঝোতা হলে পাকিস্তানের রাজনীতিতে তিনি অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে যাবেন। আর ইয়াহিয়া দুই প্রধান নেতার বিবাদ জিইয়ে রেখে নিজের ক্ষমতা স্থায়ী করতে চান।
আরশাদ সামি খানের ভাষ্যমতে, ৭ই ডিসেম্বর সকালে ইয়াহিয়া খান রাওয়ালপিন্ডির কনভেন্ট স্কুল কেন্দ্রে ভোট দিতে যান। যাওয়ার সময় তিনি ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় বললেন, সামি, এজাজ, মনে রাখবে আমাদের সাইকেল মার্কায় ভোট দিতে হবে। সাইকেল ছিল মুসলিম লীগের প্রতীক।
সামির মনে হয়েছে, নিরাপত্তার দেয়ালে বন্দী থাকায় প্রেসিডেন্ট সাধারণ মানুষের মনোভাব আঁচ করতে পারেননি। এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা সেলের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল উমর তাঁকে ভুল রিপোর্ট দিয়েছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, তাঁর পক্ষে অনুমান করা কঠিন ছিল।
পরদিন রাত তিনটায় ইয়াহিয়া জেনারেল উমরকে টেলিফোনে ধরতে বললেন। সামি জানাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ও উমর যখন কথা বলছিলেন, তখন ইন্টারকমে তিনি তা শুনেছেন। দুজনের কথোপকথন ছিল এ রকম:
‘উমর এসব কী ঘটছে? তোমাদের হিসাবনিকাশ কোথায় গেল? কাইয়ুম খান, সবুর খানকে যে টাকাপয়সা দিলে তাতে কী লাভ হলো? হায় খোদা! তুমি (উমর) সবকিছু গড়বড় করে দিয়েছ। উমর তুমি কি টেলিফোনে নেই? তুমি কি বাক্রুদ্ধ হয়ে গেছ। কথা বলো।’
‘হ্যাঁ স্যার, আমি শুনতে পাচ্ছি।’
‘শোনা বন্ধ করো, উত্তর দাও। আমি উত্তর চাই। তুমি যে পরিস্থিতি তৈরি করেছ তা কীভাবে সামাল দেবে?’
‘হ্যাঁ স্যার, আমি কী বলব স্যার? একটি পথ বের হবেই।’
‘এখন আমার কথা ভালো করে শোনো। প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন এক সপ্তাহ পর। সেই নির্বাচন সুষ্ঠু হোক আর না হোক, আমি চাই ফলাফল উল্টে যাক। প্রাদেশিক পরিষদের ফল ভিন্ন হতে হবে। আমি নিশ্চিত, আজকের নির্বাচনে যারা শোচনীয়ভাবে হেরেছে তারা আমাদের সঙ্গে থাকবে। কাল আমার সঙ্গে দেখা কোরো এবং সজাগ থাকো। তুমি কি আমার কথা বুঝতে পেরেছ।’
‘হ্যাঁ, স্যার, হ্যাঁ স্যার। আপনার সুবিধামতো কাল দেখা করব।’
এরপর সামি খান লিখেছেন, ‘ইয়াহিয়া ও উমরের কথোপকথনের পর আমার কাছে গেম প্ল্যান পরিষ্কার হলো। জাতীয় নিরাপত্তা সেল ধারণা দিয়েছিল যে নির্বাচনে কোনো দলই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না এবং একটি বিশৃঙ্খল অবস্থা  তৈরি হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টিতে জয়ী হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ৯৯ শতাংশ আসন পেলে পশ্চিম পাকিস্তানে এবং পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানের ৭২ শতাংশ আসন পেলেও পূর্ব পাকিস্তানে একটি আসনও পায়নি।
এরপর ইয়াহিয়া খান ঢাকায় গিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক
করেন এবং বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তরে বারবার বলতে থাকেন, ‘হবু প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে অভিনন্দন জানাতে এবং তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আমি এসেছি।’
এখানে অবশ্য লেখক সামি খানও পাকিস্তানি মানসিকতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। ইয়াহিয়ার সফরসঙ্গী দুই বাঙালি কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার বাচ্চু করিম ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহমুদকে সন্দেহ করেন। তাঁর ধারণা, প্রেসিডেন্ট তাঁর পারিষদবর্গের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যেসব আলোচনা করতেন, তা এই দুই কর্মকর্তা শেখ মুজিবের কাছে ফাঁস করে দিতেন। 
সফরসঙ্গীদের সঙ্গে ইয়াহিয়া খান যেসব বিষয়ে আলোচনা করতেন তার মধ্যে ইয়াহিয়া খানকে কার্যকর প্রেসিডেন্ট হিসেবে হবু প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির কথাও ছিল। প্রেসিডেন্ট তখন ১৯৬০ সালে রানি এলিজাবেথের আগমন উপলক্ষে নির্মিত ভবনে অবস্থান করছিলেন। ড. কামাল হোসেন, তাজউদ্দীন আহমদ ও খোন্দকার মোশতাককে সঙ্গে নিয়ে শেখ মুজিব সেখানে ইয়াহিয়ার সঙ্গে দেখা করতে এলে তিনি তাঁর দিকে এগিয়ে করমর্দন করেন এবং উষ্ণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে নির্বাচনে নজিরবিহীন সাফল্যের জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানান।
 অভিনন্দনের জবাবে শেখ মুজিবও নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসায় ইয়াহিয়াকে ধন্যবাদ জানান। আলোচনায় প্রেসিডেন্ট স্মরণ করিয়ে দেন যে, হাজার মাইল দূরের দুই ভূখণ্ডকে একসঙ্গে রাখতে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ইয়াহিয়া তিনটি বিকল্পের কথা বলেন। প্রথমত, আওয়ামী লীগ সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে এককভাবে সরকার গঠন করতে পারে; কিন্তু তাতে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব থাকবে না। দ্বিতীয়ত, পশ্চিম পাকিস্তানের বিজয়ী দল পিপলস পার্টির সঙ্গে কোয়ালিশন করতে পারে। অথবা পিপলস পার্টির বাইরের দলগুলোকে নিয়েও সরকার গঠন করতে পারে।
ইয়াহিয়া যে বিষয়টির ওপর জোর দিলেন তা হলো ক্ষমতার সব পক্ষকে যুক্ত করতে না পারলে কিংবা তাদের সহযোগিতা না পেলে কোনো রাজনৈতিক দলই কার্যকর সরকার পরিচালনা করতে পারবে না। তিনি বললেন, ‘জনাব, আমি ব্যারাকে ফিরে যেতে চাই এবং বেসামরিক সরকার দেশ চালাক এটাই চাই।’
শেখ মুজিব ও তাঁর সহযোগীরা প্রেসিডেন্টের কথা ধীরস্থিরভাবে শুনছিলেন। তিনি ইয়াহিয়া খানকে ভারতের মতো প্রতীকী প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে বললেন। ইয়াহিয়া হাসলেন এবং বললেন, ‘শেখ সাহেব, আমি আশা করি আপনার বিপুল বিজয় আপনার ভিশনকে (ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা) ভণ্ডুল করে দেবে না। আপনি একজন সামরিক লোককে রাষ্ট্রপ্রধান করতে চান, যিনি হবেন দন্তবিহীন সিংহ!’
ইয়াহিয়া যে কার্যকর প্রেসিডেন্টের কথা বলেছেন, শেখ মুজিব তার মর্মার্থ বোঝার চেষ্টা করলেন এবং জানতে চাইলেন, ‘স্যার, আপনি সংসদীয় ব্যবস্থার স্থলে প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকারের পরামর্শ দিচ্ছেন?’
ইয়াহিয়ার জবাব, ‘মিশ্রিত।’ দুই পক্ষ যাতে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে পারে।
স্বাভাবিকভাবেই শেখ মুজিবের পক্ষে এই প্রস্তাব মানা সম্ভব ছিল না। ইয়াহিয়ার উপদেষ্টা জি ডব্লিউ চৌধুরী লিখেছেন, শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠকের পর ক্ষুব্ধ ইয়াহিয়া তাঁকে জানান, ‘মুজিব আমাকে হেয় করেছেন। আমি তাঁকে বিশ্বাস করে ভুল করেছি।’
ওই বৈঠকে শেখ মুজিব ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকার অনুরোধ জানালে তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ বাস্তবসম্মত নয়। শেষ সপ্তাহে হতে পারে। কিন্তু সেই অধিবেশন আর কখনোই বসেনি, পাকিস্তানও এক থাকেনি।

ইয়াহিয়া খান ঢাকায় নেমে বিজয়ী দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে হবু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সেটি তাঁর মনের কথা ছিল কি না, সে বিষয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। তিনি যদি নির্বাচনী ফল সানন্দে গ্রহণই করবেন, তাহলে গোয়েন্দাপ্রধানের ওপর খেপে যাবেন কেন? কেনইবা পিপিপি নেতা ভুট্টোর সঙ্গে লারকানা ষড়যন্ত্রে মিলিত হবেন?
করাচির পথে ঢাকা ত্যাগের আগে ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালামকে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেন, যাতে তিনি আলোচনা ভেঙে যাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করেন। ইয়াহিয়ার দাবি, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাস্তবতার ভিত্তিতে সমস্যাগুলো সমাধান করতেই তিনি শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনা করতে ঢাকায় এসেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাদের নেতাকে মীমাংসায় পৌঁছাতে দেয়নি।
আরশাদ সামি লিখেছেন, ‘আমরা করাচি পৌঁছানোর পরই জেনারেল পীরজাদা চাইছিলেন প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর সঙ্গে দেখা করুন। পীরজাদা আমাকে দুবার ডেকে জানতে চান এ ব্যাপারে ভুট্টোর পক্ষ থেকে কোনো অনুরোধ এসেছে কি না কিংবা প্রেসিডেন্ট নিজে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন কি না। একদিন সকালে ইয়াহিয়ার সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি নিজেই আমাকে বললেন, প্রেসিডেন্ট ভবনে ভুট্টোর সম্মানে একটি ছোট নৈশভোজের আয়োজন করা হবে।’
আইয়ুবের পতনের পর ইয়াহিয়া-ভুট্টোর মধ্যে যে আঁতাত গড়ে উঠেছিল, সেটি আবার পুনর্জীবিত হলো এবং এই আঁতাতই পাকিস্তান ও ইয়াহিয়াকে বিপর্যয়ের দিক ঠেলে দিল। এই ব্যক্তিগত নৈশভোজে ভুট্টো জুনগড়ের নবাব মোহাম্মদ দিলওয়ার খানজি ও বেগম জুনাগড়কে নিয়ে এসেছিলেন। সেই নৈশভোজে ইয়াহিয়া ও বেগম জুনাগড়ের সখ্য সম্পর্কে সামি লিখেছেন, ‘আকর্ষণীয় বেগম জুনাগড়ের অঙ্গভঙ্গির ওপর ইয়াহিয়ার প্রলুব্ধ চাহনি নিবদ্ধ ছিল। প্রত্যুত্তরে বেগম জুনাগড় এমনভাবে তাকালেন, যাতে অনুমোদনের চেয়ে বেশি কিছু ছিল।’ পরের সপ্তাহে ইয়াহিয়া ভুট্টোর লারকানার বাড়িতে গেলে সেখানেও জুনাগড় দম্পতি যোগ দেন।
লারকানায় ভুট্টো ইয়াহিয়ার কাছে জানতে চান, মুজিব ও আওয়ামী লীগ চরমপন্থা নিলে তাঁর কাছে কী বিকল্প থাকবে? ইয়াহিয়া জবাব দিলেন, ‘মাত্র দুটি। এক. জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকা, যাতে রাজনীতিকেরাই তাঁদের অরাজকতা দূর করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তান ভাঙার দায়ে মুজিবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।’
এরপর ইয়াহিয়া পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠন করবে?’ ভুট্টোর জবাব ছিল, ‘কখনো না, কখনো না।’ তিনি আরও যোগ করলেন, ‘পাকিস্তান ভাঙার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের নীলনকশা আছে। কিন্তু আমি পাকিস্তান ভাঙার দায় নিতে পারি না।’
লারকানা বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এবং জেনারেলদের মধ্যে তাঁর নিজস্ব চক্রটি ইতিমধ্যে সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।
দলের ভেতরের লোকদের মতে, আওয়ামী লীগ ও মুজিব সরকার গঠন করলে ভুট্টো ও পিপিপি সংসদীয় ভূমিকা রাখতে এবং বিরোধী দলের আসনে বসতে ইচ্ছুক নয়। দুই দলই পৃথকভাবে সরকার গঠনে আগ্রহী। এ প্রসঙ্গে ভুট্টো বলেছিলেন, ‘এ ধার হাম ও ধার তোম।’ তুমি পূর্বাংশ নিয়ে থাকো, আর আমি পশ্চিমাংশ। প্রস্তাবটি আওয়ামী লীগের জন্য খানিকটা রাজনৈতিক সুযোগ এনে দেয়। অন্যদিকে ইয়াহিয়া চক্রের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতিও চলতে থাকে।
সামি খানের ভাষ্য, ‘আমরা প্রায়ই পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক শক্তি যাচাই করতে সদর দপ্তরে যেতাম এবং আওয়ামী লীগেই চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে বাড়তি কী প্রয়োজন, তা খতিয়ে দেখতাম। এটি জানা কথা যে পূর্ব পাকিস্তান সামরিক দিক দিয়ে ছিল খুবই ভঙ্গুর।’ এর পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনীর দুই অংশে সমান ভাগ করলে ভারতের শক্তিশালী বাহিনীর কাছে তা অধিকতর দুর্বল হতো যেকোনো অংশের জন্য। ভারতীয় বাহিনী সহজেই পশ্চিম পাকিস্তানকে ধ্বংস করে দিতে পারত।’
অর্থাৎ পাকিস্তানি শাসকেরা পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা পশ্চিম পাকিস্তানের শক্তির ওপরই নিভর্রশীল করে রেখেছিল। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে নাকি এই কৌশল কাজে লেগেছিল। কিন্তু সামরিক দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে দুর্বল রাখার কারণে যে বাঙালিদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছিল, সেটি সামি খানসহ পশ্চিম পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তারা আমলেই আনেননি। আওয়ামী লীগের ছয় দফা জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল পঁয়ষট্টির যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের অরক্ষিত থাকা।
এর আগে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে টেলিফোন আলাপে শেখ মুজিব সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘ছয় দফা অপরিবর্তনীয় ও চূড়ান্ত।’ জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানেও তিনি ঘোষণা করেন, ছয় দফা এখন জনগণের সম্পত্তি। এটি পরিবর্তনের ক্ষমতা কারও নেই। সামি স্বীকার করেছেন, ‘এটাই গণতান্ত্রিক রীতি, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে তিনি সেই দাবি করতেই পারেন।’ কিন্তু পাকিস্তানি শাসকেরা গণতান্ত্রিক রীতির তোয়াক্কা করতেন না।
মুজিবের সঙ্গে টেলিফোনে কথা শেষ হতেই ইয়াহিয়ার পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাডমিরাল গভর্নর আহসানকে সংযোগ লাগিয়ে দিতে বলেন। প্রেসিডেন্ট তাঁকে বললেন, ‘মুজিবের কণ্ঠ খুবই অবাধ্যতার সুর।’ এরপর তিনি ইয়াকুব আলী খানের সঙ্গে কথা বলেন। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে রাওয়ালপিন্ডিতে সেনা কর্মকর্তাদের বৈঠকেই সামরিক অভিযানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। ২৫শে মার্চ সামরিক অভিযানের পর ইয়াহিয়া খান বেতার টিভিতে দেওয়া ভাষণে শেখ মুজিবকে দেশদ্রোহী বা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর হবু প্রধানমন্ত্রী হলেন ট্রেইটর। তবে তাঁর শেষ রক্ষা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পাকিস্তানি বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের পর তিনি নিজেও ক্ষমতাচ্যুত হন। ইয়াহিয়া যেভাবে আইয়ুবকে হটিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, ভুট্টোও একইভাবে তাঁকে মসনদ থেকে বিতাড়িত করেন।
আইয়ুবের এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সামি খান দুই পীরের যে ঘটনা বিবৃত করেছেন, সেটাই এখানে তুলে ধরছি।
‘প্রেসিডেন্টের এডিসি হিসেবে যোগদানের (১ এপ্রিল ১৯৬৬) পরপরই যখন আমি কাজ শিখছি মাত্র, একদিন সকালে প্রবেশফটক থেকে টেলিফোনে জানানো হলো, দেউল শরিফের পীর সাহেব এসেছেন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে। তাঁর সঙ্গে শ-খানেক অনুসারী আছেন। নিরাপত্তাকর্মী জিজ্ঞেস করলেন, নির্ধারিত সময়সূচির দুই ঘণ্টা আগে তিনি এসেছেন, তাঁকে আসতে দেওয়া হবে কি না। আমি আমার সহকর্মী লে. খালিদ মিরের পরামর্শ চাইছিলাম। তিনি হাসলেন এবং জানালেন, প্রেসিডেন্ট সত্যিকারভাবে কোনো পীরে বিশ্বাস করেন না। অন্য রাজনীতিকদের ব্যাপারে তাঁর যতটা আগ্রহ, তাঁদের প্রতি তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। আমার উচিত তাঁকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া। তবে তিনি আমাকে সজাগ করে দিয়ে বললেন, নির্ধারিত সময়ের আগে যেন পীর সাহেব সরাসরি প্রেসিডেন্ট অফিসে যেতে না পারেন। তিনি আরও যোগ করলেন, ‘তুমি দেখতে পাচ্ছ সামি, পীর সাহেব শ-খানেক বা দুই শ লোক নিয়ে আসেন এবং প্রেসিডেন্ট মধ্যাহ্নভোজের জন্য অফিস ত্যাগ করার পর জায়গা ছেড়ে যান, এটাই তাঁদের বৈশিষ্ট্য।’
‘এর মাধ্যমে তাঁরা অনুসারীদের বোঝাতে চান যে প্রেসিডেন্ট নিজেও পীর সাহেবের অনুগত এবং তিনি প্রাতঃরাশে তাঁকে আমন্ত্রণ জানান এবং দুপুরের খাবারও তাঁর সঙ্গে খান। প্রেসিডেন্ট আরও বেশি সময় তাঁকে সেখানে রাখতে চেয়েছিলেন; কিন্তু বাইরে অপেক্ষমাণ শিষ্যদের কারণেই তিনি চলে এসেছেন।
‘নির্দেশনামতে, আমি শুধু পীর সাহেবকে ভেতরে আসার অনুমতি দিতে বলি, তাঁর সঙ্গীদের নয়। কয়েক মিনিট পর আবারও ফটক থেকে জানানো হলো, মানকি শরিফের পীর সাহেব এসেছেন। তাঁকেও প্রেসিডেন্ট সাক্ষাতের অনুমতি দিয়েছেন। আগের মতোই তাঁকে আসার অনুমতি দিলাম।
‘সাড়ে আটটায় দুই পীর প্রেসিডেন্টের অতিথিকক্ষে এলেন। তাঁদের একজনের নির্ধারিত সময় ১০টা, আরেকজনের সাড়ে ১০টা। দ্বিতীয় পীর আসার আধা ঘণ্টা পর আমার অফিসের বাইরে শোরগোল শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি দ্রুত বেরিয়ে এলাম এবং দেখতে পেলাম যে অতিথিকক্ষে দুই পীর মল্লযুদ্ধে রত। আমি তাঁদের দুজনকে বিচ্ছিন্ন করতে চেষ্টা করলাম। তাঁরা এক হাতে একে অন্যের দাড়ি ধরে আছেন, আরেক হাতে জামার কলার। তাঁদের পদযুগলও অলস বসে ছিল না। পা দিয়ে তাঁরা ক্যাঙারুর মতো একে অন্যকে লাথি মারছেন। আমি যখন তাঁদের নিবৃত্ত করতে পারছিলাম না, তখন নিরাপত্তাকর্মীদের ডাকলাম। তাঁরা কার্যত বন্দুকের মুখে তাঁদের বিচ্ছিন্ন করলেন। এরপর আমি বিষয়টি প্রেসিডেন্টের সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মোহাম্মদ রাফিকে জানালাম। তিনি তাঁদের থামালেন এবং কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মীকে এনে নির্দেশনা দিলেন যে তাঁরা যদি একে অন্যকে মারতে যান, তাহলে তাঁদের গ্রেপ্তার করে স্থানীয় থানায় নিয়ে যাওয়া হবে। প্রেসিডেন্ট অতিথিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষ করলে সামরিক সচিব আমাকে নিয়ে তাঁর কাছে বিষয়টি জানালেন।
উত্তেজনা শেষ হলে দেউল শরিফের পীরকে আনার জন্য প্রেসিডেন্ট আমাকে হুকুম দিলেন। যদিও তখনো তাঁরা শান্ত হননি। এর ১০ মিনিট পর মানকি পীরকে আনা হলো। আমি যখন দ্বিতীয় পীরকে নিয়ে এলাম, প্রথম পীর গজগজ করতে লাগলেন। প্রেসিডেন্ট তাঁকে থামিয়ে দিলেন এবং তাঁদের দুজনকে পরস্পরের সঙ্গে হাত মেলাতে এবং ক্ষমা চাইতে বললেন। দুজনই অস্বীকৃতি জানালেন। এরপর প্রেসিডেন্ট আমাকে উদ্দেশ করে নিরাপত্তাকর্মীদের ডেকে দুজনকে হাতকড়া পরাতে এবং প্রেসিডেন্ট ভবনে গোলযোগ করার জন্য স্থানীয় থানায় গিয়ে মামলা ঠুকতে বললেন। এতে কাজ হলো। প্রেসিডেন্ট কথা শেষ না করতেই দুই পীর উঠে দাঁড়ালেন। একে অন্যের কাছে মাফ চাইলেন। এরপর তাঁরা প্রেসিডেন্টের ডেস্কের সামনে দুটি সোফায় বসলেন। তিনি উভয় পীরকে প্রেসিডেন্ট ভবন ত্যাগ করতে বললেন, যদিও তাঁরা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত থাকতে চেয়েছিলেন।
তাঁদের আর কখনো প্রেসিডেন্ট ভবনে দেখা যায়নি।’

একাত্তরের ঘটনাবলি পাকিস্তানের একেক কুশীলব একেকভাবে দেখেছেন।
ব্যাখ্যা করেছেন। সিদ্দিক সালিক ও আরশাদ সামি খান দুজনই ছিলেন পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তা। কিন্তু তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সিদ্দিক সালিক ছিলেন ঢাকায় আর সামি খান রাওয়ালপিন্ডিতে। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকের বর্ণনা দিতে গিয়ে সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, ‘জেনারেল নিয়াজি ১৪ই ডিসেম্বর রাও ফরমান আলীকে সঙ্গে নিয়ে মার্কিন কনসাল জেনারেল স্পিভাকের কাছে যান এবং যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করার অনুরোধ জানান। কিন্তু স্পিভাক জানিয়ে দেন যে তিনি তাঁদের পক্ষ নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন না, বার্তাটি পাঠিয়ে দিতে পারেন মাত্র।
জেনারেল নিয়াজি চেয়েছিলেন, প্রস্তাবটি ভারতের সেনাপ্রধান স্যাম মানেকশর কাছে পাঠানো হোক। কিন্তু স্পিভাক পাঠিয়েছেন ওয়াশিংটনে। মার্কিন সরকার ভারতের কাছে পাঠানোর আগে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে পরামর্শ করার চেষ্টা করে, কিন্তু ইয়াহিয়া খানকে পাওয়া যাচ্ছিল না। সিদ্দিক সালিক জানাচ্ছেন, ইয়াহিয়া ৩রা ডিসেম্বর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং আর অফিসে আসেননি। তাঁর সামরিক সচিব মানচিত্রের মাধ্যমে তাঁকে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানাতেন। একবার সেই মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আমি কী করতে পারি?’
১৬ই ডিসেম্বর লাখ লাখ বাঙালির উপস্থিতিতে তৎকালীন রমনা রেসকোর্স ময়দানে জেনারেল নিয়াজি বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। নিয়াজি প্রথমে যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানালে ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা তাঁর অবস্থানে অনড় থেকে বলেন, ‘এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়।’ তখন নিয়াজি যৌথবাহিনীর কাছেই আত্মসমর্পণ করেন।
যুদ্ধ আরও কয়েক দিন প্রলম্বিত করতে পারতেন কি না, পরে সিদ্দিক সালিক জিজ্ঞেস করলে নিয়াজি জবাব দেন, ‘তাতে আরও বেশি মানুষের মৃত্যু ও সম্পদ ধ্বংস হতো। নগরজীবন অচল হয়ে যেত। মহামারি ও অন্যান্য ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ত। কিন্তু পরিণতি একই হতো। এরপর তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, ‘আমি ৯০ হাজার বিধবা ও ৫০ লাখ এতিমের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে এখন ৯০ হাজার যুদ্ধবন্দী পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাচ্ছি।’
এর আগের একটি ঘটনা। যুদ্ধে পরাজয় এড়ানোর জন্য পাকিস্তান তখন মরিয়া। ইয়াহিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কাছে সহায়তা চেয়ে বার্তা পাঠালেন। পাকিস্তান সময় রাত দুইটায় নিক্সন যখন টেলিফোন করেন, ইয়াহিয়া তখন নিদ্রামগ্ন। তাঁকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিলে দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে কথোপকথন হয়। নিক্সন পাকিস্তানের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর উদ্বেগের কথা জানান এবং বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠানোর নির্দেশ দেন। দুই নেতার টেলিফোন সংলাপ শেষ হওয়ার পর উদ্দীপ্ত ইয়াহিয়া জেনারেল হামিদকে টেলিফোনে লাগিয়ে দিতে বলেন। ইয়াহিয়ার মতো সামিও তখন উদ্দীপ্ত।
ইয়াহিয়া বললেন, ‘হামিদ, আমরা এটা করেছি। আমেরিকানরা পথে আছে।’ এরপর সামির মন্তব্য, ‘পূর্ব পাকিস্তানে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ও জীবনহানি সত্ত্বেও সেই আমেরিকান নৌবহর আর আসেনি, এমনকি ঢাকা পতনের পরও নয়।’ তাঁর কাছে ঢাকার পতন এবং আত্মসমর্পণ ছিল একটি দুঃখজনক অভিজ্ঞতা। তিনি বলেছেন, ‘আমি কেঁদেছি এবং আমাদের টিমের আরও অনেকেই কেঁদেছে। পরাজিত ও অবমাননার বোধ তাড়িত করেছিল আমাদের। এসব যখন আমাদের সঙ্গে ঘটছে, আমরা তখন তা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সামি ভেবেছেন, সেটি ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন এবং তা একসময় কেটে যাবে।
কিছুক্ষণ পর তাঁর বোধোদয় হলো, এটি কোনো দুঃস্বপ্ন ছিল না। প্রতিদিনের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের ধ্রুব সত্য।
ভুট্টো বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে যে কমিশন গঠন করেছিলেন, সেখানে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে সামি খান তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। সেটি অবশ্য নিজের জন্য নয়। তিনি যার এডিসি ছিলেন, সেই পদচ্যুত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের জন্য। কমিশনের প্রধান তাঁকে বহু নারীর নাম উল্লেখ করে জানতে চান, ‘স্কোয়াড্রন লিডার, আপনি এঁদের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ করে দিয়েছেন, আপনি কি বলতে পারেন, তাঁরা ভেতরে যাওয়ার পর কী হয়েছে? মনে রাখবেন, আপনি শপথ নিয়েছেন।’
এই প্রশ্নে সামি খান বিরক্ত হলেও মাথা ঠান্ডা করে বললেন, ‘এখানে দুটি বিষয় আছে, প্রটোকল ও নিরাপত্তা। এডিসি হিসেবে যাঁরা সাক্ষাতের সময় ঠিক না করে আসেন, তাঁদের বিষয়টি দেখা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আপনি স্মরণ করে দেখতে পারেন, অনুমতি নিয়ে অনেকবার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করেছেন। কিন্তু ভেতরে প্রেসিডেন্ট ও আপনার মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছে, সেটি আমার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। প্রেসিডেন্ট ও আপনি যেসব নারীর কথা বললেন, তাঁদের মধ্যে কী হয়েছে, তাও আমার জানার কথা নয়।’
দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, জেনারেল ইয়াহিয়া সব সময় মদ খেতেন। আপনি কী বলতে পারেন দিনে কী পরিমাণ মদ তিনি খেতেন?
সামি উত্তর দিলেন, ‘স্যার, আপনি ভুল লোককে প্রশ্ন করেছেন। আমি তাঁর মদ পরিবেশনকারী ছিলাম না। আপনি যদি এই প্রশ্নের উত্তর চান তাহলে বার বয় বা হাউস কম্পট্রোলারের কাছে জিজ্ঞেস করুন।’
নিয়াজির বার্তা পেয়ে ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন এবং ঢাকার পরাজয়কে দুঃখজনক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন,
এই বিপর্যয় সাময়িক এবং পশ্চিম ফ্রন্টে যুদ্ধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। কিন্তু প্রেসিডেন্টের ভাষণের মূল রূপরেখা অনেক দিন আগেই তৈরি করে রাখা হয়েছিল।
এরপর ইয়াহিয়া জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে এই বার্তা পাঠান যে, পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে এবং ভারতকেও এটি মানতে হবে। তিনি এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়েরও সহযোগিতা চান।
তখনো পশ্চিম পাকিস্তানের ৫ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড এবং ৯০ হাজার যুদ্ধবন্দীর বিষয়টি জনগণকে জানানো হয়নি। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে জয়ী না হয়েও যেভাবে জনগণকে বোঝানো গিয়েছিল, এবার আর সেটি সম্ভব হচ্ছে না। এর অর্থ হলো, জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও তাঁর সহযোগীদের বিদায়। জেনারেলদের সঙ্গে ইয়াহিয়ার বৈঠকের মাঝখানেই জানা গেল সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইয়াহিয়া তাঁর এডিসি সামি খানকে লক্ষ করে বললেন, ‘শোনো, ব্রিগেড বিদ্রোহ করেছে, এ খবর সত্য হোক বা না হোক, খেলা শেষ।
২০ ডিসেম্বর জুলফিকার আলী ভুট্টো দেশে ফিরে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে শপথ নেন।
সূত্র- মানবজমিন ঈদ আনন্দ ২০১৭

0 comments:

Post a Comment