Last update
Loading...

ঢাকার নির্ঘুম রাত by রোকনুজ্জামান পিয়াস

তিলোত্তমা নগরী রাজধানী ঢাকা। কাকডাকা ভোরেই এ শহরের মানুষ বের হয়ে পড়ে জীবিকার তাগিদে। ঘরে ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামে তাদের। রাজধানীর নানা ঝক্কিঝামেলা শেষে বাসায় ফিরে গভীর ঘুমে ডুবে যান ক্লান্ত বেশিরভাগ মানুষ। কিন্তু ঘুমায় না রাজধানী ঢাকা। জেগে থাকে এ শহরের মানুষের জন্যই। সোডিয়াম আলোয় জেগে থাকে কর্মব্যস্ত মানুষকে নিয়ে। কোথাও হ্যালোজেন বাতির সাদা আলো ঝকঝকিয়ে তোলে প্রিয় এ শহরকে। সাদা-হলুদ আলোর দাপটে চাঁদের রুপালী আলোও হার মানে। তাই তো জোসনার আলো গায়ে মাখনোর সুযোগ নেই এ শহরের মানুষের। একশ্রেণির মানুষ দিনের মতোই কর্মব্যস্ত থাকে। বরং রাজধানীর কোনো কোনো এলাকায় দিনের চেয়ে রাতের বেলায় বেশি কর্মচাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যায়। সৌন্দর্যের বিচারেও রাতের ঢাকা অপরূপ, মোহনীয়। শহরের প্রধান রাস্তাগুলো দিনের বেলায় সংকীর্ণ, ঠাসা যানবাহনে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে নাকাল নগরবাসী। ঠিক উল্টোটা রাতের ঢাকায়। রাস্তাগুলোর প্রশস্ততা যেন বেড়ে যায় কয়েকগুণ। চোখের নিমিষেই যানবাহনগুলো শাঁ শাঁ করে চলে যায়। ঢিমেতালে চলা দিনের যানবাহনগগুলোই হয়ে ওঠে গতিদানব।
রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সব এলাকাতেই কমবেশি ব্যস্ততা রয়েছে। বিশেষ করে বাসস্ট্যান্ড, ট্রেনের প্লাটফর্ম এলাকায় ঘুমন্ত মানুষের পাশাপাশি নির্ঘুম মানুষের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। তবে বন্দর ও পাইকারি কাঁচাবাজারগুলোতে দিনের চেয়ে রাতে বেশি সংখ্যক কর্মজীবী মানুষ বিচরণ করে।
বুধবার রাত ১২টা। রাজধানীর কাওরানবাজার। একেবারেই ভিন্ন এক পরিবেশ। যিনি রাতের কাওরানবাজারে কখনো আসেননি তার কাছে এ চিত্র অচেনা। কাজী নজরুল এভিনিউ সংলগ্ন এ কাঁচাবাজারে পা ফেলার জায়গাও নেই। পাইকারি, খুচরা ব্যবসায়ী আর শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্য। কেউ কাঁচামাল ভর্তি ট্রাকের পেছনে ছুটছে ভ্যান নিয়ে। ভ্যানওয়ালাদের প্রতিযোগিতায় হাউকাউ লেগে যায় এ সময়। রীতিমত হিমশিম খেতে হয় ট্রাক-শ্রমিকদের। কেউ কেউ মাথায় করে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে মালামাল। কর্মব্যস্ততার পাশাপাশি জোরেশোরে হাকডাক শোনা যায়। হট্টগোলও বাধে মাঝেমধ্যে। কাওরানবাজারের টিনপট্টির একটি ভ্যারাইটিজ স্টোরের মালিক বাবু জানালেন, কেবল দুটি ঈদেই তার এই দোকানটির সাটার নামে। এছাড়া আর কখনো বন্ধ হয় না। তিনি ও তার কর্মচারীরা ২-৩ শিফটে ২৪ ঘণ্টা দোকানটি খোলা রাখেন।
রাত ১টার দিকে হাতিরঝিলে গিয়ে দেখা যায় লোকসমাগম। হাইস্পিডে দামি দামি গাড়ি হাঁকিয়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ। কেউ আবার ব্রিজের ওপর গাড়ি থামিয়ে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডায় মশগুল। এ আড্ডায় উঠতি বয়সী ছেলেদের পাশাপাশি রয়েছে সুন্দরী ও জিন্স-শার্ট পরা মেয়েরাও। কেউ কেউ সিগারেটও টানছেন। হাতিরঝিলে কথা হয় ১০ বছরের ছেলে চা বিক্রেতা ফয়সালের সঙ্গে। ফয়সাল জানায়, সারা রাত সে চা বিক্রি করে। সকালে বাড়ি ফেরে। এরপর খাওয়া-দাওয়া করে ঘুম দেয়। কখনো কখনো বিকাল ৪টা পর্যন্ত ঘুমায় সে। এরপর রাত নামলে আবারো চায়ের ফ্লাক্স নিয়ে চলে আসে এই হাতিরঝিলে। তার ভাষ্যমতে, সারা রাতই এই হাতিরঝিলে মানুষ থাকে। বিশেষ করে বড়লোকের ছেলে মেয়েরাই বেশি আসে। এই লেকের গুলশানের দিকটায় তাদের উপস্থিতি বেশি দেখা যায়।
রাত ২টা। হাতিরঝিল পেরিয়ে রামপুরা-বনশ্রী এলাকা। রামপুরা ব্রিজের দুইধারে গোটা চারেক চায়ের দোকান। রয়েছে খাবার হোটেলও। রাস্তা দিয়ে বেপরোয়া চলাচল করছে ট্রাক। যে যেভাবে পারছে যাচ্ছে। নিয়মশৃঙ্খলার কোনো বালাই নেই। রামপুরা ব্রিজের অপরপ্রান্তে দুটি খাবার হোটেল তখনো সচল। এরই মধ্যে বাড্ডা পুলিশ ফাঁড়ির কাছেই চোখে পড়লো একটি জটলা। এদের মধ্যে দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া দুই ছাত্র এবং এক ছাত্রী রয়েছে। জটলাটাও এই তিন স্কুল শিক্ষার্থীকে ঘিরেই। জানা যায়, তাদের তিনজনেরই বাসা মেরুল বাড্ডায়। প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়। কিন্তু বিপত্তি ঘটে যখন এলাকার কিছু বখাটে তাদের পিছু নেয়। তারা তাদের ভুলভাল বুঝিয়ে বাঁশপট্টির দিকে নিয়ে যায়। এ সময় ওই এলাকার মানুষজন এ বিষয়টি নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। তাদের ভাষ্য, যাদের সঙ্গে গেছে তারা খুব খারাপ মানুষ। মেয়েটিকে সর্বনাশ করতে পারে এমন আশঙ্কা করছিলেন তারা। এরপর উপস্থিত এক পুলিশ সদস্যকে এ ব্যাপারে অবহিত করে তাদের আবারো ফিরিয়ে আনা হয়। ওই তিন স্কুল শিক্ষার্থী জানায়, তারা সন্ধ্যায়ই বের হয়েছে। মেয়েটির মন খারাপ থাকায় সে তাদের দুজনকে ফোন দিয়ে ডেকে আনে। এরপর তারা রাত দেড়টা পর্যন্ত হাতিরঝিলেই ছিল। যেহেতু অনেক রাত হয়েছে তাই তারা বাসায় ফিরতে চায় না। কোথাও একসঙ্গে সেহরি খেয়ে তারপর সকালে বাসায় ফিরবে। মেয়েটি তার এক বান্ধবীকে দিয়ে বাসায় ফোন করিয়েছে সে আজ তাদের বাসায় থাকবে। মেয়েটি জানায়, তার বান্ধবীকে সে ম্যানেজ করেই ফোন করেছে। পুলিশ ধরার পর তাদের এক অভিভাবককে এসে নিয়ে যেতে বলা হয়। পুলিশ জানায়, তারা এই তিন স্কুল শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তাহীনতায় ছেড়ে দিতে চান না। এই এলাকা থেকে ভোর ৪টার দিকে ফেরার পথে হাতিরঝিলে তখনো দেখা যায় উচ্চবিত্ত যুবক-যুবতীদের আনাগোনা।
রাত সাড়ে ৪টা। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। রাজধানীর অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ফার্মগেট। দিনের মতো না হলেও বেশ কয়েকজন মানুষ তখনো সেজান পয়েন্টের সামনে বাসস্ট্যান্ডে বাসের অপেক্ষা করছিলেন। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই তারা অপেক্ষা করছিলেন। এছাড়া সেখানে যাত্রীর অপেক্ষায় ছিল ৮-১০টি সিএনজি এবং রিকশা। কথা হয় বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা ৩৫-ঊর্ধ্ব এক ব্যক্তির সঙ্গে। কথা প্রসঙ্গে জানা গেল তিনি ভিক্ষুক। বাবা-মা কেউ নেই। গিয়েছিলেন বায়তুল মোকাররমে নামাজ পড়তে। সেখানে নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে ছিলেন। যাবেন মিরপুরে। আজ সারা দিন সেখানেই ভিক্ষা করবেন। আংশিক শারীরিক প্রতিবন্ধী এ মানুষটির থাকার কোনো জায়গা নেই। পুরো ঢাকা শহরেই তিনি ভিক্ষা করেন। ভোরের আগেই বেরিয়ে পড়েন। জনবহুল এলাকায় কখনো কখনো রাতেও ভিক্ষা করেন। প্রতিদিন কোনো না কোনো মসজিদে রাত কাটান। সেজান পয়েন্টে কথা হয় রনি নামে একজন সিএনজি চালকের সঙ্গেও। তিনি জানান, রাতে ফাকা রাস্তা। যানবাহন কম থাকায় ভাড়ার পরিমাণও বেশি। ফলে দিনের চেয়ে রাতে অল্প সময়েই আয়-রোজগার বেশি হয়। সকাল সাড়ে ৭-৮টা পর্যন্ত সিএনজি চালানোর পর বিশ্রামে চলে যান। এ সময়ও ফার্মগেট এলাকায় ভাসমান কয়েকজন পতিতার দেখা মেলে। 
মধ্যরাতে গাবতলী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, কিছু কিছু বাস কাউন্টার বন্ধ থাকলেও অধিকাংশ তখনো খোলা। কাউকে কাউকে এই মধ্যরাতেও যাত্রী ডাকতে দেখা যায়। আবার অনেক যাত্রীকে দেখা গেছে টার্মিনালের পিলারের কোলঘেঁষে ঝিমাতে। খাবারের দোকানগুলোর ব্যস্ততাও দিনের মতোই। খোলা রয়েছে ফাস্টফুডও। চায়ের দোকানে বসে থাকা রিগান নামে এক যাত্রী জানালেন, তিনি যাবেন খুলনায়। কিন্তু সাড়ে ১১টার গাড়ি মিস করায় আর বাসায় ফিরে যাননি। সকালের ফার্স্ট সার্ভিসেই তিনি বাড়িতে রওনা দেবেন। পুরান ঢাকার সোয়ারীঘাট মধ্যরাতের পর থেকেই সরগরম হয়ে ওঠে। খুচরা ও পাইকারি মাছ ব্যবসায়ীদের বেচাকেনা চলতে থাকে সকাল পর্যন্ত। ঘুমন্ত ভাসমান মানুষের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও যাত্রীদের পদচারণায় সরব থাকে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালও। এছাড়া রাতের ঢাকার সায়েন্স ল্যাব, শ্যামলী, শাহবাগ, টিএসসি মোড়, আরামবাগ, মতিঝিল, কমলাপুর, মগবাজারসহ অধিকাংশ এলাকাতেই কমবেশি লোকজন থাকেই। তবে অপেক্ষাকৃত কম লোকজন চলাচল করা এলাকায় মানুষের আতঙ্কও কম নয়। প্রায়ই তারা রাতে নানা অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি হন। সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ছিনতাইকারী। রাজধানীজুড়েই ঘটছে অহরহ ছিনতাইয়ের ঘটনা। ছিনতাইকারীর কবল থেকে রেহাই পাচ্ছেন না রিকশাওয়ালা, সিএনজি চালকরাও। রাতের সিএনজি চালক হকিম বলেন, রাতে রাস্তাঘাটে যানজট না থাকায় আয়েশে ভাড়া মারতে পারেন। তবে ছিনতাইকারীদের আতঙ্কে থাকতে হয় তাদের। যাত্রীবেশে ছিনতাইকারীরা তাদের সিএনজি ছিনিয়ে নেয়। ইতিপূর্বে তার চালিত এই সিএনজিও দুইবার ছিনতাই হয়েছে। এছাড়া প্রায়ই দেখা যায়, মাইক্রোবাস কোনো রিকশা বা সিএনজির সামনে দাঁড়িয়ে যায়। তারা যাত্রীদের সর্বস্ব তো নেয়-ই, পাশাপাশি চালকদের ইনকামও নিয়ে যায়। অনুসন্ধানে জানা যায়, এসব ছিনতাইয়ে জড়িত বেশিরভাগই বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় মাদকসেবী। রাতে দলবেঁধে ঘুরে বেড়ানো যুবকরাও অনেক সময় এসব ছোটখাটো ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়েন। আর বড় ধরনের ছিনতাইগুলোতে হাত থাকে সংঘবদ্ধ চক্রের। এ চক্রটি অনেক আগে থেকেই নির্দিষ্ট মানুষটিকে অনুসরণ করে সুবিধামতো নির্জন জায়গায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনতাই করে। রাতে লোকজন কম থাকায় প্রাণহানি ঘটাতেও তাদের বাধে না।

0 comments:

Post a Comment