Last update
Loading...

তেজস্ক্রিয় গামারশ্মি ছড়ানোর আশঙ্কা

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের একটি কক্ষে দেয়াল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে প্রায় ১৫ বছর আগে মেয়াদোত্তীর্ণ কোবাল্ট-৬০ এক্সপোজার। যার মধ্যে রয়েছে জীবনঘাতী তেজষ্ক্রিয় গামারশ্মি। আন্তর্জাতিক বিধান অনুযায়ী, মানুষ ও প্রকৃতির নিরাপত্তার স্বার্থে মেয়াদোত্তীর্ণের পর এ ধরনের এক্সপোজার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে ফেরত পাঠানোর কথা। কিন্তু অদ্যাবধি সেটি করা হয়নি। শুধু তাই নয়, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এটি ফেরত নিতে চাইলেও তা দেয়া হয়নি। যদিও এ ব্যাপারে প্রস্তুতকারী ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমদানিকারকদের চুক্তিও আছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কখনও সংস্কারের প্রয়োজনে ঘিরে রাখা দেয়ালটি ভাঙা হলে তেজস্ক্রিয় রশ্মি ছড়িয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। হতাহত হতে পারে বিপুলসংখ্যক মানুষ। কারণ দেশের সর্ববৃহত্ এই ঢামেক হাসপাতালে প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগীর ও তাদের স্বজনের যাতায়াত রয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি থাকেন কয়েক হাজার রোগী। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢামেক হাসপাতালের অনকোলজি (ক্যান্সার) বিভাগের একটি কক্ষে চাইনিজ ব্রাকিথেরাপি মেশিন ছিল। যেটি ক্যান্সার রোগীদের রেডিওথেরাপি দেয়ার কাজে ব্যবহূত হতো। মেশিনটি আমদানির জন্য ১৯৯৪ সালে দেশি একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয় এবং ১৯৯৬ সালে এটি স্থাপন কর হয়। এ ধরনের মেশিনে সোর্স হিসেবে ব্যবহূত হয় কোবাল্ট-৬০ এক্সপোজার। যার মধ্যে থাকে মারাত্মক তেজস্ক্রিয় গামারশ্মি। ২০০১ সালে মেশিনটি মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও ঢামেক অনকোলজি বিভাগের কর্মকর্তারা এক্সপোজারসহ এটিকে দেয়াল দিয়ে স্থায়ীভাবে আটকে রাখা হয়। সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহিঃবিভাগ গেট (শহীদ মিনার) থেকে প্রবেশ করলেই হাতের বাম দিকে রেডিয়েশন অনকোলজি বিভাগ।
যেখানে একটি কক্ষে ছিল এই চাইনিজ ব্রাকিথেরাপি মেশিন। কিন্তু সেই মেশিনটি সোর্সসহ দেয়ালের সঙ্গে রেখে চারপাশ থেকে ইট দিয়ে গঁেথে দেয়া হয়েছে। আর এর ওপরে করা হয়েছে বুক সেলফ। জানা গেছে, কোবাল্ট ৬০ সোর্সের মেয়াদ থাকে ৫ বছর ২১ সপ্তাহ। ব্যবহারের ওপর এ মেয়াদ কমবেশি হতে পারে। তবে এ মেশিনটি ঢামেক হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগে স্থাপনের পর কোনো ব্যবহার হয়নি। এভাবেই দেড় যুগ কেটে যাওয়ার পর আবার নতুন মেশিন আনা হয়। ফলে পুরাতন মেশিনের সোর্স সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে ফেরত না দিয়ে সেটিকে দেয়ালে প্লাস্টার করে আটকে দেয়া হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, তেজস্ক্রিয় পদার্থ রক্ষণাবেক্ষণে অত্যধিক সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইতিপূর্বে সামান্য অসাবধানতা থেকে মারাত্মক তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ায় অসংখ্য মানুষ হতাহত হয়েছেন। তাছাড়া পারমাণবিক বোমা থেকে যে ধরনের তেজস্ক্রিয়তা নির্গত, ক্যান্সার চিকিত্সায় ব্যবহূত ব্রাকিথেরাপি ও কোবাল্ট মেশিনের সোর্স থেকেও একই ধরনের তেজস্ক্রিয়া ছড়াতে পারে। যদি সেটা সঠিক ভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা না হয়। জানতে চাইলে বিশিষ্ট রেডিয়েশন অনকোলজষ্টি এবং ক্যান্সার ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোল্লা ওবায়েদুল্লাহ বাকী যুগান্তরকে বলেন, তেজস্ক্রিয় এক্সপোজার সব সময় সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় রাখতে হবে। কারণ এসব থেকে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়লে হতাহত অনিবার্য। হাসপাতালের দেয়ালে তেজস্ক্রিয় উপাদানসহ মেশিন বদ্ধ করে রাখা যায় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা আগে শুনিনি। যদি তেজস্ক্রিয় এক্সপোজার ফেরত পাঠানো না যায়, সেক্ষেত্রে এটোমিক এনার্জি রেগুলেটরি অথরিটিকে জানাতে হবে। তারপরেও কাজ না হলে মাটির অনেক গভীরে পুঁতে ফেলতে হবে।
এ বিষয়ে হাসপাতালের তৎকালীণ বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মুয়াররফ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, নিরাপত্তার জন্যই এভাবে রাখা হয়েছে। সোর্স যদি মেশিন থেকে বের না হয়, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। এভাবে সোর্সসহ মেশিন রাখলে ক্ষতি হবে, এটা যারা বলেছেন তারা না জেনেই বলেছেন বলে দাবি করেন তিনি। সোর্স ফেরত না পাঠিয়ে কেন এভাবে দেয়ালে আটকে রাখা হল জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেই সময় সোর্স পাঠানোর ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল। তাই এটি আর ফেরত পাঠানো হয়নি। সংশি্লষ্ট সূত্র জানায়, ক্যান্সার চিকিত্সায় ব্যবহূত এসব তেজস্ক্রিয় পদার্থ বাংলাদেশ এটোমিক এনার্জি রেগুলেটরি অথরিটি (বিএইআরএ) এবং আন্তর্জাতিক এটোমিক এনার্জি এজেন্সির (আইএইএ) নিবন্ধিত। তাছাড়া মেশিন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের নিয়মানুযায়ী তেজস্ক্রিয় উপাদান সবার নিরাপত্তার স্বার্থে মেয়াদান্তে ফেরত পাঠাতে হবে। সংশি্লষ্টরা জানান, ক্যান্সার নিরাময় মেশিনে যে ধরনের এক্সপোজার ব্যবহার করা হয়, মেয়াদান্তে সেগুলো এক্সপার্ট দ্বার অপসারণ করতে হয়। এরপর অত্যন্ত সাবধানে ঠাণ্ডা পাত্রে স্থাপন করে নিরাপদে স্থানান্তর করা হয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ এটোমিক এনার্জি কমিশনের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার মো. সেলিম রেজা যুগান্তরকে বলেন, কোবাল্ট ৬০ সোর্সটি অত্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সোর্স। এর তেজস্ক্রিয়তার ক্ষমতা অনেক বেশি। এটি যদি সঠিক ভাবে সঠিক স্থানে থাকে তা হলে নিরাপদ। তবে মেশিন থেকে সোর্স যদি কোনো কারণে বেরিয়ে পড়ে তাহলে এটা মারাত্মক বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এ ধরনের মেশিন পরিচালনা করেন টেকনোলজিস্টরা। কিন্তু মেডিকেল ফিজিসিস্ট ছাড়া এ ধরনের মেশিন পরিচালনা করা উচিত নয়। কারণ এসব মেশিন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ব্যবহারে সামান্য ত্রুটিতেও ঘটতে পারে মারাত্মক বিপর্যয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উল্লিখিত সব আইন-কানুন উল্লেখ করে মেশিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ, বিএইআরএ এবং সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরেজ অ্যান্ড ডিপার্টমেন্ট (সিএমএসডি)-কে একাধিক চিঠির মাধ্যমে অবহিত করেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি সংশি্লষ্টরা। ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা জানান, ক্যান্সার চিকিত্সা এবং ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার জন্য ব্যবহূত তেজস্ক্রিয়তা প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচায়। সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে বিকিরণ মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকরও হতে পারে। কখনও বা অসংখ্য মানুষের মৃতু্য ঘটায় এই তেজস্ক্রিয়তা।
যেমন রাশিয়ার চেরনোবিল এবং জাপানের ফকুসীমায় এমন দুর্ঘটনা ঘটেছিল। তেজস্ক্রিয় পদার্থের রক্ষণাবেক্ষণ সঠিকভাবে না হওয়ায় ইতিপূর্বে ১৯৮৪ সালের মার্চে মরক্কোতে আটজনের মৃতু্য ঘটে। ১৯৮৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ব্রাজিলের গোয়ানিয়া শহরে চারজনের মৃতু্য হয়। একটি পরিত্যক্ত তেজস্ক্রিয় উত্স হাসপাতাল থেকে স্থানান্তরের সময় এসব ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় আরও কমপক্ষে ২৪৫ জনের উচ্চ মাত্রার তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হয়। এবং এক লাখের বেশি লোকের ওপর তেজস্ক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এল সালভাদরের সান সালভাদর শহরে একটি কোবাল্ট-৬০ সোর্স আটকে যায়। শ্রমিকরা নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো বন্ধ করে সোর্সমুক্ত করতে ওই কক্ষে প্রবেশ করেন। এ সময় তিনটি উচ্চমাত্রায় তেজস্ক্রিয় বিকিরণে দু'জন আক্রান্ত হন। ছয় মাস পর তাদের মৃতু্য ঘটে। ১৯৯০ সালের ১০ ও ২০ ডিসেম্বর স্পেনের জারোগোজায় একটি হাসপাতালে ১১ জন রোগীর মৃতু্য হয়। যারা প্রত্যেকেই ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিল এবং রেডিওথেরাপি নিতে সেখানে গিয়েছিল। কিন্তু হঠাত্ করে সোর্স সক্রিয় হয়ে বিকিরণ ছড়িয়ে পড়লে এ ঘটনা ঘটে। তাত্ক্ষণিকভাবে তাদের চামড়া, অঙ্গ এবং অস্থিমজ্জা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১০ সালের এপ্রিলে ভারতের মায়াপুরী অঞ্চলে এ ধরনের একটি দুর্ঘটনা ঘটে। দিলি্ল বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানাধীন একটি মেশিনে সোর্স হিসেবে কোবল্ট-৬০ এক্সপোজার ছিল। '৮৫ সাল থেকে অব্যবহূত থাকায় সেটি তারা ভাঙারি ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে দেয়। ক্রেতারা মেশিনটি ভাঙা শুরু করলে এটা থেকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ শুরু হয়। ওই সময় সেই স্থানে উপস্থিত ৮ জনই মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হন এবং একজন তত্ক্ষণাৎ মারা যান।

0 comments:

Post a Comment