Last update
Loading...

নিউইয়র্কে বাংলাদেশি কূটনীতিক গ্রেফতার



নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কন্সুলেটের ডেপুটি কনসাল জেনারেল শাহেদুল ইসলাম গ্রেফতার হয়েছেন। সোমবার নিউইয়র্ক সময় বেলা ১১টায় পুলিশ জ্যামাইকার বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে। তার বিরুদ্ধে শ্রমিক পাচার, গৃহকর্মী নির্যাতন এবং মজুরি চাওয়ায় হত্যার হুমকির অভিযোগ আনা হয়েছে। সোমবার বিকালে শাহেদুল ইসলামকে কুইন্সের অপরাধ আদালতে তোলা হলে ৫০ হাজার ডলারের বন্ড বা নগদ ২৫ হাজার ডলারে জামিন মঞ্জুর করেন বিচারক। নিউইয়র্কের কনসাল জেনারেল শামীম আহসান যুগান্তরকে জানিয়েছেন, তারা ৫০ হাজার ডলারের বন্ড সংগ্রহ করেছেন। এ বন্ড জমা দেয়া হলে মঙ্গলবার শাহেদুল ইসলাম মুক্তি পেতে পারেন। এদিকে নিউইয়র্কে বাংলাদেশি ডেপুটি কনসাল জেনারেলকে গ্রেফতারের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। মঙ্গলবার মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে এ প্রতিবাদ জানানো হয়। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এক পলাতক ব্যক্তির কথায় একজন কূটনীতিককে কেন আটক করা হয়েছে, সেটি জানার জন্য আমরা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কারণ জানতে চেয়েছি। যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত জোয়েল রিফম্যান ও পলিটিক্যাল কাউন্সিলর আন্দ্রেয়া বি রড্রিগেজ মঙ্গলবার ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব মাহবুব উজ জামানের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেখা করেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, গোটা ব্যাপারটি আমাদের কাছে পরিষ্কার নয় এবং তাদের কাছে অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়েছি আমরা। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ডেপুটি কনসাল জেনারেলের অবিলম্বে মুক্তি চাওয়া হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশের কূটনীতিক শাহেদুল ইসলাম নিউইয়র্কে গ্রেফতার হওয়ার খবর ঠাকুরগাঁওয়ে ছড়িয়ে পড়লে সুশীল সমাজসহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ বিস্মিত ও হতবাক হয়ে পড়েন। এ ঘটনায় তাদের সবাই দুঃখ প্রকাশ করেছেন। নিউইয়র্কের ডেপুটি কনসাল জেনারেল পদে কর্মরত শাহেদুল ইসলামের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের আর্ট গ্যালারি আশ্রমপাড়া। তার বাবা মরহুম খাদেমুল ইসলাম আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা ও সংসদ সদস্য ছিলেন। জানা গেছে, ২০১২ সালের শেষদিকে ডেপুটি কনসাল জেনারেল শাহেদুল ইসলাম বাংলাদেশ থেকে মোহাম্মদ আমিন ওরফে রুহুল আমিন নামে একজনকে গৃহকর্মী হিসেবে নিউইয়র্কে নিয়ে আসেন।
গত বছরের মে’তে শাহেদুল ইসলামের বাসা থেকে নিরুদ্দেশ হন ওই গৃহকর্মী। আদালত জানান, মোহাম্মদ রুহুল আমিন বাসা থেকে পালিয়ে পুলিশের কাছে গিয়ে শাহেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে তাকে বেতন না দেয়া, শারীরিক নির্যাতন ও বাংলাদেশে তার পরিবারকে হত্যার হুমকির অভিযোগ করেন। রুহুল আমিন আরও অভিযোগ করেন, তাকে দিয়ে দৈনিক ১৮ ঘণ্টা কাজ করালেও বিনিময়ে কোনো বেতন দেয়া হয়নি। তার পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জব্দ করেন শাহেদুল ইসলাম। অভিযোগে গৃহকর্মী আরও জানান, বেতন দাবি করলেই তাকে মারধর করা হতো। এমনকি বাংলাদেশে তার বৃদ্ধা মা ও ছেলে-মেয়েকেও হত্যার হুমকি দেয়া হতো। শাহেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে নিউইয়র্কের আদালতে এরই মধ্যে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সোমবার তাকে গ্রেফতার করে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার ১৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। নিউইয়র্কের কনসাল জেনারেল শামীম আহসান যুগান্তরকে বলেন, ‘১৩ মাস আগে রুহুল আমিন নিরুদ্দেশ হয়। সে সময় বাংলাদেশ কনসুলেটের পক্ষ থেকে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টকে অবহিত করা হয়েছিল। স্টেট ডিপার্টমেন্ট বিষয়টি পুলিশকে জানালে এ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। কিন্তু তদন্তের বিষয়ে কোনো কিছু না জানিয়ে সোমবার বেলা ১১টার দিকে শাহেদুল ইসলামকে তার জ্যামাইকার বাসা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।’ শামীম আহসান বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজখবর নিতে থাকি। বিকাল ৪টার দিকে কুইন্সের ক্রিমিনাল কোর্টে তোলা হলে তার জামিন চাওয়া হয়। আদালত ৫০ হাজার ডলার বন্ড অথবা নগদ ২৫ হাজার ডলার জমার পরিবর্তে শাহেদুল ইসলামকে শর্তসাপেক্ষে জামিন দেন। তিনি আরও বলেন, শাহেদুল ইসলামের পরিবার ও সহকর্মীরা ৫০ হাজার ডলার বন্ড দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বন্ড জমা দেয়া হলে মঙ্গলবার তার মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ নিউইয়র্ক সময় মঙ্গলবার সকালে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শাহেদুল ইসলাম মুক্তি পাননি। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের মার্চে নিউইয়র্কের তৎকালীন কনসাল জেনারেল মনিরুল ইসলাম এবং তার স্ত্রী ফাহিমা ইসলাম প্রভার বিরুদ্ধে ম্যানহাটন ফেডারেল আদালতে নির্যাতনের অভিযোগ এনে মামলা করেন মাসুদ পারভেজ রানা নামে এক গৃহকর্মী। মামলার খবর শুনে ওইদিনই সপরিবারে নিউইয়র্ক ত্যাগ করেন মনিরুল ইসলাম। এ ঘটনার কয়েক মাস আগে নিজ দেশের এক গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগে ভারতীয় কনসুলেটের ডেপুটি কনসাল জেনারেল দেবযানি খোবরাগাড়েকে গ্রেফতার করার পর প্রকাশ্যে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যায় নিউইয়র্ক পুলিশ। নিজ দেশের কূটনীতিক গ্রেফতারে ওই সময় কড়া প্রতিক্রিয়া দেখায় ভারত। এ নিয়ে কিছুদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন চলে। পরে আদালত থেকে জামিন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেন ওই ভারতীয় কূটনীতিক। জানা যায়, পররাষ্ট্র দফতরের পরিচালক পদবির কর্মকর্তারা বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনসুলেটে চাকরি নিয়ে গেলে সরকারি খরচে গৃহকর্মী নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। কিন্ত গৃহকর্মীর বেতন ও অন্যান্য ব্যয়ভার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বহন করতে হয়। সরকার গৃহকর্মীকে কোনো বেতন প্রদান করে না। ২০১২ সালে শাহেদুল ইসলামকে নিউইয়র্কের কন্সাল হিসেবে রাজনৈতিক নিয়োগ দেয়া হয়। পরে তিনি ডেপুটি কনসাল জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি পান। শাহেদুল ইসলাম নিউইয়র্কে সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগ সবাইকে হতবাক করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুুক নিউইয়র্ক কনসুলেট জেনারেলের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসীবান্ধব দেশ। এ দেশে বিভিন্ন উপায়ে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ রয়েছে। শাহেদুল ইসলামের গৃহকর্মী রুহুল আমিন পারিবারিক নির্যাতনের (ডমেস্টিক ভায়োলেন্স) অভিযোগ এনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় লাভের সুযোগ খুঁজছেন কিনা, এ বিষয়টিও খতিয়ে দেখা উচিত। কেননা গত কয়েক বছরে নিউইয়র্কে বাংলাদেশি ও ভারতীয় কনসুলেটে এ ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। নিউইয়র্কের ডেপুটি কনসাল জেনারেল শাহেদুল ইসলামের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের আর্ট গ্যালারি আশ্রমপাড়া। তার বাবা মরহুম খাদেমুল ইসলাম ছিলেন আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা ও সংসদ সদস্য। বাবা মারা যাওয়ার পর ওই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন শাহেদুল ইসলাম। কিন্তু তিনি মনোনয়ন পাননি। মনোনয়ন পান আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির বর্তমান প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন। ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, শাহেদুল ইসলামের গ্রেফতারের খবরে স্থানীয় জনগণ বিস্মিত হয়েছেন। তারা বলেন, এলাকায় পরোপকারী হিসেবে এ পরিবারের যথেষ্ট সুনাম আছে। শাহেদুল ইসলামের বাবা মরহুম খাদেমুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। তিনি ১৯৮৬, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নৌকার প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এছাড়া তিনি আওয়ামী লীগের কাণ্ডারি হিসেবে দীর্ঘদিন সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে ১৭ ডিসেম্বর সংসদ সদস্য খাদেমুল ইসলাম মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে ঠাকুরগাঁওয়ের আওয়ামী লীগের রাজনীতির শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। যে অভাব আজও পূরণ হয়নি। ঠাকুরগাঁও প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি প্রবীণ সাংবাদিক ও রাজনীতিক আখতার হোসেন রাজা বলেন, এই পরিবারটি সভ্রান্ত হিসেবে পরিচিতি রয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদেক কুরাইশী বলেন, প্রয়াত সংসদ সদস্য খাদেমুল ইসলাম আমাদের আদর্শের প্রতীক ছিলেন। অন্যদিকে জেলা বিএনপির সভাপতি তৈমুর রহমান তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, খাদেমুল ইসলাম নিঃসন্দেহে একজন ভালো মানুষ ছিলেন।

0 comments:

Post a Comment