Last update
Loading...

এই শিশুরা কার কাছে যাবে?

‘অহন এই দুইডা বাচ্চারে নিয়া আমি কই যামু, বলতে পারেন?’—হাহাকারের মতো শোনাল বিধবা ছালেহা খাতুনের গলা। রাকিব (৬) আর তার ছোট বোন ফারিয়া (২) পরম নির্ভরতায় বসে আছে দাদির কোল ঘেঁষে। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার বয়স তাদের হয়নি। কিন্তু ছালেহা বেগমের চোখে এখন ঘোর অন্ধকার। পিতৃহীন আর নিরুর্দ্দিষ্ট মায়ের এই দুই সন্তান নিয়ে কোথায় যাবেন তিনি। তাদের খেতে দেবেন কী, নিজেরই-বা ভরণপোষণ চলবে কী করে! রাঙামাটি সরকারি কলেজের আশ্রয়কেন্দ্রে আপাতত ঠাঁই মিলেছে। কিন্তু এই ঠিকানা যে ক্ষণস্থায়ী, এ কথা তো আর কাউকে বলে দিতে হয় না। ভয়াবহ দুর্যোগের দিন এক প্রতিবেশীর খোঁজ নিতে পাশের বাড়িতে গিয়েছিলেন ছালেহা খাতুনের ছেলে দরবেশ আলী (৩০)। কিন্তু সেই বাড়িটিই যখন ভেঙে পড়ল হুড়মুড় করে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দরবেশ আলীও হারিয়ে গেছেন খাদের অতলে। ছেলের লাশটি অন্তত উদ্ধার হোক, এটুকু চান ছালেহা। দরবেশ আলীর সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর ছাড়াছাড়ি হয়েছিল এক বছর আগে। তারপর থেকে আর কোনো যোগাযোগ নেই। এত বড় দুর্ঘটনার পর ছেলেমেয়ের টানে হলেও তিনি একবার আসবেন, এই ক্ষীণ আশা ছাড়া আর কোনো আলো নেই ছালেহা বেগমের চোখে। আরও কম বয়সী দুটি শিশুকে নিয়ে একই আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছেন রীনা আক্তার। মাত্র কদিন আগে ভাই সালাহউদ্দিনের বাড়িতে নাইয়র এসেছিলেন রীনা। ভাইয়ের দুই মেয়ে মিম (৭) ও সুমাইয়াকে (১৭ মাস) নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন রাঙামাটিরই আরেক আত্মীয়ের বাড়িতে। পরদিন ফিরে আসার আগেই খবর পেলেন, পাহাড়চাপা পড়েছে ভাইয়ের বাড়িটি। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ভাই সালাহউদ্দিন আর ভাবি রহিমা বেগমের (২৪) লাশ। আশ্রয়কেন্দ্রের অপরিচিত পরিবেশে মিম আর সুমাইয়া ফুফুকে আঁকড়ে ধরে বসে আছে সারাক্ষণ। কিন্তু নিজেরই টানাটানির সংসার, এই দুটি অনাথ-অবোধ শিশুকে কী করে লালন-পালন করবেন ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন রীনা। মা-বাবা আর ছোট বোনকে হারিয়ে প্রায় নির্বাক মাঈনুদ্দিন জিহাদ (১৪)। সেদিনের বিভীষিকা বর্ণনা করার মতো শারীরিক-মানসিক শক্তি এই কিশোরের নেই। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহও নেই তার। তবু ক্লান্ত-বিমর্ষ ছেলেটি সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে যা বলল, তা অনেকটা এ রকম—১৩ জুন ভোর থেকে প্রবল বর্ষণের কারণে ঘর থেকে বেরোনোর কোনো উপায় ছিল না। পাশের ঘরে ছিলেন বাবা জিয়াউর রহমান, মা কাজল বেগম আর ছোট বোন বৃষ্টি (৭)। বাইরের দুর্যোগের অবস্থা একবার উঁকি দিয়ে দেখার জন্য দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল সে। তখনই কিছু বুঝে ওঠার আগে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে বাড়িটি। লাফ দিয়ে সম্ভবত দরজার বাইরে গিয়ে পড়ে সে। এরপর আর কিছু মনে নেই। একসময় জ্ঞান ফিরে এলে চারপাশে লোকজনের কোলাহল শুনে বুঝতে পারল, বেঁচে আছে সে।
তখন চিৎকার করে সবাইকে তার আটকে থাকার কথা জানিয়েছে। চারপাশের মানুষ এসে বুক পর্যন্ত মাটিতে আটকে থাকা জিহাদকে উদ্ধার করে ভর্তি করেন রাঙামাটি সদর হাসপাতালে। তার হাত, পা, বুক, গলা—সর্বত্র ছিল আঘাতের চিহ্ন, নিশ্বাস নিতে পারছিল না। চার দিন হাসপাতালে থাকার পর শনিবার ছাড়া পেয়েছে। কিন্তু বাড়ি নেই, মা-বাবা নেই, কার কাছে ফিরে যাবে জিহাদ? শেষ পর্যন্ত ভাগ্যবিড়ম্বিত এই ছেলেটির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তার সহপাঠী নাজিবুলের মা-বাবা। তাঁরা তাকে নিয়ে গেছেনরাঙামাটি শহরের রসুলপুর কলোনির বাসায়। নাজিবুলের মা রুমা আক্তার বললেন, ‘এই ছেলে এখন থেকে আমাদের সঙ্গে আমাদের ছেলের মতোই থাকবে।’ দুর্যোগ-দুঃসময়ে মানুষ আবেগতাড়িত হয়ে পড়ে। রুমা আক্তারের এই আবেগ কত দিন স্থায়ী হবে কে জানে! কিশোর জিহাদ পিতা-মাতা হারানোর শোক ও নির্মম বাস্তবতা জীবনে কোনো দিন ভুলতে পারবে কি? শহরের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রে সাময়িক ঠাঁই জুটেছে খাদিজা বেগমের (৩৯)। ছেলে সোহেলের (২৩) দুই ছেলে (৯ ও ৭) ও এক মেয়েকে (৬) নিয়ে দুঃস্বপ্নের দিন কাটছে তাঁর। বাড়ি ধসে পড়ে ছেলের বউ কমলা আক্তার মারা গেছেন। সোহেল রাঙামাটি সদর হাসপাতালে আছেন জীবন-মরণের টানাটানিতে। ছেলে বাঁচবে কি না, বাঁচলেও আয়-রোজগার করার মতো শারীরিক সামর্থ্য ফিরে পাবে কি না, এই দুশ্চিন্তায় প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে খাদিজার। নিজের স্বামী মারা গিয়েছিলেন সোহেলের আড়াই বছর বয়সে। দ্বিতীয় স্বামীর ঘরে গিয়ে ছেলেকে বড় করে তুলেছেন অনেক কষ্টে। এখন ছেলের তিন সন্তানকে কীভাবে মানুষ করবেন, ভাবতেই পারছেন না খাদিজা বেগম। রাঙামাটির আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে স্বজন হারানোর ঘটনা, ঘরবাড়ি-সম্পদ বিলীন হয়ে যাওয়ার মর্মস্পর্শী বিবরণ। এই দুর্যোগের ভয়াবহতা হয়তো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করবেন তাঁরা, আবার নতুন করে মাথা গোঁজার ঠাঁইও হয়তো জোটাতে পারবেন। কিন্তু যে শিশুগুলো পিতা-মাতা হারিয়ে স্বজনদের আশ্রয়ে আপাতত আছে, তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার অন্ধকারে আচ্ছন্ন। শিশুদের যাঁরা আশ্রয় দিয়েছেন, তাঁদের কেউই অর্থনৈতিকভাবে তেমন সচ্ছল নন। সামর্থ্য না থাকলে মায়া-মমতার স্রোতেও যে ভাটার টান লাগে!
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

0 comments:

Post a Comment