Last update
Loading...

আরববিশ্বে শক্তির ভারসাম্যে অনারব ভূমিকা

কাতারকে আকস্মিক বহুমুখী কূটনৈতিক চাপে ফেলে অন্য আরব শক্তিগুলো আর পরাশক্তি কী পেতে চায় তা সমীকরণসমৃদ্ধ। আয়তন ও জনসংখ্যায় অতি ক্ষুদ্রাকার উপসাগরীয় দেশ কাতারকে নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে যে হই চই শুরু হয়েছে, তার পেছনে ভূ-কৌশলগত এবং ভূ-অর্থনৈতিক অভিলাষ পরিষ্কার। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে কাতার অর্থনৈতিকভাবে অন্যতম প্রধান শক্তিশালী দেশ। কাতার অভিযুক্ত মূলত ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’ ও ‘হামাস’কে আশ্রয় আর সমর্থন দান প্রসঙ্গে। এটাকে পশ্চিমারা উসকে দিচ্ছে চরমপন্থী ইসলামের লালন পালন আখ্যা দিয়ে। পশ্চিমা সরকার ও গণমাধ্যমগুলো বলছে, কাতার ‘রেডিক্যাল ইসলাম’-এর লালন পালন করছে। ‘রেডিক্যাল ইসলাম’ কথাটা পাশ্চাত্যের প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রশক্তির আবিষ্কার। পশ্চিমা রাজনীতিবিদেরা রেডিক্যাল ইসলাম বা ফান্ডামেন্টালিজমের সাথে একীভূত করছেন ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’ ও ‘হামাস’কে। কার্যকারণে দেখা যাচ্ছে, ব্রাদারহুড একটি রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী, যাদের রয়েছে জনসমর্থিত দল এবং অতীতে আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়েছে। পাশ্চাত্যের কিছু রাষ্ট্রচিন্তক একেক সময় একেক টার্ম ব্যবহার করে প্রকারান্তরে ব্যবহারিক ইসলামপন্থীদেরও সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করে থাকেন। অন্য দিকে ইসলামে রাজনীতির চর্চাকারী বিশ্বের বিভিন্ন দল এটা প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছে যে, পলিটিক্যাল ইসলামে উগ্রবাদ বা কথিত সুফিবাদ কোনোটারই গুরুত্ব নেই। পলিটিক্যাল ইসলাম উদারনীতি ও মধ্যপন্থা অবলম্বনকেই প্রাধান্য দেয় বলে প্রতীয়মান। রেডিক্যাল ইসলামের যে ব্যাখা দিয়ে কাতারকে একঘরে করার কথা বলা হচ্ছে, সেটা খুবই হাস্যকর। আধুনিক বিনোদন ব্যবস্থা আর ফুটবলের বিশ্বকাপ আসরের আয়োজন এমন অভিযোগের অযৌক্তিকতার প্রমাণ চরমপন্থার অবস্থান যে মত, পথ ও ধর্ম বিশ্বাসের (সব ধর্ম) অনুকূলেই হোক না কেন, সেখানে আধুনিক সভ্যতার বিচরণ সহজ নয়। কাতার ব্রাদারহুডকে আশ্রয় দিতে পারে, তার অর্থ এই নয়, সে সন্ত্রাসবাদের ধারক বাহক। এভাবে যখন যাকে খুশি সন্ত্রাসের সাথে জুড়ে দেয়ার প্রবণতা সব জাতিরাষ্ট্র ও তার সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। সন্ত্রাসবাদের যে ফর্মুলা পশ্চিমারা আবিষ্কার করেছে তা বিভ্রান্তিকর। তাহলে একটি অধুনা রাষ্ট্র, যার আছে কাতার এয়ারওয়েজের মতো জনপ্রিয় আধুনিক বিমান পরিবহন, যাদের একটি বিশ্বনন্দিত গণমাধ্যমের ড্রেসকোড উন্মুক্ত ধাঁচের, তারা চরমপন্থায় বিশ্বাসী হয় কী করে তা কারো বোধগম্য নয়। যেকোনো মত ও পথকে পছন্দ করা না করা অথবা পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার এখতিয়ার সব রাষ্ট্রেরই আছে। মূলত এর ক্ষমতার মাধ্যমেও বিকশিত হয় একটি দেশের সার্বভৌম শক্তি। আর এটা আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা স্বীকৃত। আপাতত বিশ্ববাসী সতর্ক পর্যবেক্ষণ করছে যে, কাতারের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণœ হলে মিত্র বা শত্রুরা কী ভূমিকা পালন করে। তবে ইরাক, লিবিয়া বা সিরিয়ার মতো আরো একটি অগ্নিগর্ভ দেশ সৃষ্টি করা, বা অশান্তির বীজ বপন করে তিন মিলিয়ন শান্তিপ্রিয় মানুষকে যুদ্ধাবস্থার মধ্যে ঠেলে দেয়া কারো জন্যই সুফলপ্রসূ নয়। আরব ভাষাভাষীদের রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। ভাষার ভিত্তিতে আরব জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটেনি। আরবরা অনাদিকাল থেকেই বিচ্ছিন্ন ও বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত। তারা ভাষার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। অথচ বিশ্বময় বহু দেশে ও অঞ্চলে ভাষাকে জাতীয়তাবাদ সৃষ্টির একটি বিশেষ উপাদান হিসেবে নির্ভর করা হয়। ধর্মের ভিত্তিতেও আরবরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। ইসলাম ধর্মের তো বটেই, খ্রিষ্টান এবং ইহুদি ধর্মবিশ্বাসের মহাপুরুষরা এ অঞ্চলেই আগমন করেছিলেন। অবশ্য আরবি ভাষাভাষী মানুষের বেশির ভাগই ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। আরব নেতাদের অনৈক্য সৃষ্টি হয়েছে যেসব ইস্যুতে, তার অন্যতম হচ্ছে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিভাজন।
তবে শিয়া-সুন্নি ‘বিশ্বাস’ ব্যবস্থা বড় কোনো দ্বন্দ্বের বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়নি অতীতে। পরে তাকে দ্বান্দ্বিক করতে কাজ করেছে বহিঃশক্তি। এ অঞ্চলের শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বকে উজ্জীবিত করেছে, অর্থ ঢেলেছে বহিঃশক্তি। যুগে যুগে আরব শাসকদের বেশির ভাগ ঐক্যবদ্ধ ছিলেন নিজেদের রাজতন্ত্র ধারাবাহিক করার কাজে আর সম্পদকে কুক্ষিগত করার অভিপ্রায়ে। পরিণামে আজকের আরব নেতারা জাতীয়তাবাদ ও শান্তির পরিবর্তে বেছে নিয়েছেন সঙ্ঘাতের পথ। হামাস দীর্ঘদিন সংগ্রাম করছে মাতৃভূমি ফিলিস্তিন ভূখণ্ড রক্ষার জন্য। ২০০৬ সালে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে দলটি। তাদের বসতভূমি ইহুদি দখলদারদের আগ্রাসন থেকে রক্ষার জন্য যে ন্যায়সঙ্গত সশস্ত্র সংগ্রাম করা হয়েছে, সেটা যদি সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম হয়, তবে উপনিবেশোত্তর বিশ্বের বহু দেশের জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টির সশস্ত্র সংগ্রামকে কী বলে আখ্যা দেয়া যাবে? ভিয়েতনামের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন যদি স্বীকৃত জাতীয়তাবাদ হয়, তাহলে হামাসের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন করা অবৈধ কেন? এবার উপসাগরীয় অঞ্চলে কাতারকে কূটনৈতিক চাপে ফেলার দু’দিন পরেই তুরস্কের পার্লামেন্ট কাতারে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। কাতারের সাথে সামরিক কার্যক্রমের বহিঃপ্রকাশ দ্রুত ঘটল তুরস্ক যা আঞ্চলিক প্রভাব সৃষ্টি ইস্যুতে সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশও বটে। এটা ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় একটি উদ্যোগ যা আগেই অনুভব করেছিল তুরস্ক। আঞ্চলিক শক্তিসাম্য রক্ষায় কাতার ও তুরস্ক দীর্ঘ দিন ধরেই একই রকম ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে মিসরে আরব বসন্ত এবং সামরিক অভ্যুত্থানে একই প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেছে তারা। ইরানের সাথে সম্পর্ক রক্ষায় কাতার ও তুরস্ক অভিন্ন ভূমিকায় অবতীর্ণ দীর্ঘ দিন ধরে। গত বছর সৌদি আরবের সাথে দ্বৈত বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে সম্পর্ক সুদৃঢ় করেছে তুরস্ক। এর পরিপ্রেক্ষিতে চলমান সঙ্কট নিরসনে সংলাপ ফলপ্রসূ করার জন্য তুরস্কের ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে নিতে হবে উপসাগরীয় আরব নেতাদেরকে। কাতারকে কথিত একঘরে করায় ইসরাইলের আত্মতৃপ্তির বিপরীতে ইরানের দ্রত সাড়া দেয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। বিশ্বব্যবস্থা জাতিগত দ্বন্দ্ব প্রশমিত করতে পুরোপুরি সফল নয়। মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র ব্যবসার জনপ্রিয় বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে আর তেল লুটের অভিপ্রায়ে যেসব অনৈক্য সৃষ্টির কর্মকৌশল ঠিক করা হয়েছে, তা থেকে অন্তত মুসলিম নেতাদের সতর্ক থাকাই সময়ের দাবি। আরব অঞ্চল হলো বিশ্ব ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি চন্দ্রদ্বীপ। এই দ্বীপ ও এর আশপাশের এশীয় অঞ্চল অর্থনৈতিক কাঁচামালের ভূস্বর্গ। এটা ধ্বংস ও লুট করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে নব্য সাম্রাজ্যবাদীরা। আজকের আরবাঞ্চল তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে। বাগদাদের ধ্বংসলীলায় কুয়েতের আনন্দ, সিরিয়ায় বারুদের তপ্ত হাওয়ায় কিছু আরব দেশের স্বস্তি, ইরানের সাথে সৌদির দ্বন্দ্বে কোনো কোনো দেশের তালি বাজানো, মিসরের আরব বসন্তে কেঁপে ওঠা রাজতন্ত্রের বসন্তবিরোধী অর্থ বিনিয়োগ এ সব কিছুই হয় পরাশক্তি প্রেসক্রিপশনে। সৌদি আরবের সাথে ইরানের দ্বন্দ¦, ইয়েমেনের সাথে সৌদির যুদ্ধের পর কাতারকে বয়কট করা পরিস্থিতি শুধু জটিলই করে তুলবে। পারস্য উপসাগরে কাতার ও ইয়েমেনের মতো দেশে আইএসকে স্থান করে দিতে পারলে বা বহুজাতিক আগ্রাসী বাহিনীকে স্থান করে দিতে পারলে ইরানকে শায়েস্তা করা সহজ হবে বলে কোনো দেশ মনে করছে। আরব অঞ্চল একটি বিশাল ভোগ্যপণ্য বাজার। এ বাজার একাধারে চীনের, জাপানের, ভারতের, বাংলাদেশের, জার্মানের এবং বহু ইউরো-এশিয়ান দেশের। বাজারব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতে পণ্য উৎপাদনকারী এসব অনারব রাষ্ট্রের ভূমিকা রাখা উচিত। আরব-অনারব সবারই উচিত একটি শান্তিপূর্ণ আরব অঞ্চল উপহার দেয়া। সৃষ্ট সঙ্কট নিরসনে ট্রাম্পের ও কুয়েতের আমিরের উদ্যোগকে সবার কাছে আস্থাভাজন করা সহজ নয়, যেখানে ট্রাম্পের পক্ষাবলম্বন করে দেয়া টুইট বার্তা পরিষ্কার। সঙ্কট নিরসনে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় বরং অনারব মুসলিম রাষ্ট্রগুলো একটি ভিন্ন প্লাটফর্ম গড়ে তুলতে পারে আরব অঞ্চলে তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট রেগুলেটর হিসেবে। আর সে ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকার দাবিদার তুরস্ক, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশ। বাস্তব বিবেচনায়, কাতার বা যেকোনো সার্বভৌম দেশকে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র বানানো বিশ্ব শান্তি বিনষ্ট করার শামিল।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

0 comments:

Post a Comment