Last update
Loading...

পাহাড় ধসে খাগড়াছড়ি ও মৌলভীবাজারে নিহত ৫

রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে নিহতদের স্বজন ও আহতদের কান্না এখনও থামেনি। খাদ্য, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্দশায় এসব এলাকায় নেমে এসেছে বিপর্যয়। এর মধ্যেই শনিবার রাত থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত ভারি বৃষ্টিতে আবারও ধসে পড়ে বেশ কয়েকটি পাহাড় ও টিলা। এতে ঝরে গেছে ৫ প্রাণ। এর মধ্যে খাগড়াছড়ির রামগড় ও লক্ষ্মীছড়িতে মারা গেছে তিন শিশু। মৌলভীবাজারের বড়লেখায় এক শিশু ও তার মা মারা গেছেন। অনেক স্থানেই টিলা ধসে বন্ধ হয়ে গেছে সড়ক। বৃষ্টির পানি ও পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়েছে বহু গ্রাম। এসব এলাকায় অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। যুগান্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
খাগড়াছড়ি : শনিবার রাত থেকে টানা বৃষ্টি শুরু হলে অপরিকল্পিতভাবে কাটা পাহাড়গুলোতে ধস শুরু হয়। রোববার ভোরে রামগড় উপজেলার বুদংছড়া এলাকায় মো. মোস্তাফার বাড়িতে ধসে পড়ে পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের একটি বড় অংশ। চাপা পড়ে ঘর। এতে নিহত হয় তার দুই ছেলে মো. নুরনবী (১৪) ও মো. হোসেন (১০)। সকাল ৮টার দিকে লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার যতীন্দ্র কার্বারিপাড়া এলাকায় পাহাড় ধসে পড়ে দেবব্রত চাকমার বাড়ির ওপর। এতে তার ৫ বছরের শিশু নিপুণ চাকমার মৃত্যু হয়। রোববার সকালে বৃষ্টি কমে আসে। এরপরও রাতে বৃষ্টির কারণে রামগড় উপজেলার পাতাছাড়া বাজারে পাহাড় ধসে কয়েকটি দোকানপাট ও বাড়িঘর চাপা পড়ে। তবে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। চট্টগ্রামের সঙ্গে খাগড়াছড়ির সড়ক পথের অনেক স্থানেই রাস্তায় ছোট ছোট পাহাড় ধসে পড়েছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা পানি নিষ্কাশনের পথে মাটি জমে যাওয়ায় প্লাবিত হয়েছে গুইমারা উপজেলার নিন্মাঞ্চল। খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. রাশেদুল ইসলাম জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সরিয়ে আনতে জেলা সদর, মহালছড়ি, মানিকছড়ি ও রামগড়ে ৫টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৮০টির মতো পরিবার আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। যে কোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। রাশেদুল ইসলাম আরও বলেন, নিহতদের পরিবারকে দ্রুত আর্থিক অনুদান পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বড়লেখা : সদর ইউনিয়নের মধ্য ডিমাই গ্রামে শনিবার রাত সাড়ে ৩টায় মৃত আবদুস সাত্তারের বসতঘরের ওপরের টিলা ধসে পড়ে। এতে তার স্ত্রী আফিয়া বেগম (৩০) ও মেয়ে ফাহমিদা বেগম (১৩) মাটিচাপা পড়েন। পাহাড় ধসে রাস্তা বন্ধ হওয়ায় ও অবিরাম বর্ষণের কারণে দমকল বাহিনী এবং পুলিশ সেখানে আসতে না পারায় উদ্ধার কাজ বিলম্বিত হয়। রোববার সকাল সাড়ে ৬টায় এলাকাবাসী মা-মেয়ের লাশ উদ্ধার করেন। বড়ছেলে ফাহিম হোসেন (১৪) নানা বাড়িতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যায়। পরে ঘটনাস্থলে যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম আবদুল্লাহ আল মামুনসহ পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। শনিবার রাত থেকে সকাল পর্যন্ত টানা ভারি বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে ডিমাই, বোবারথল, তেরাদরম, কাশেমনগর, বিওসি কেছরিগুলসহ বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় টিলা ধসে রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যায়। এসব এলাকায় এখনও সহস্রাধিক বাড়িঘর চাপা পড়ার শঙ্কা রয়েছে। প্রভাবশালীরা অবাধে পাহাড় ও টিলা কেটে মাটি বিক্রি এবং খাল-নালা ভরাট করে অবৈধ স্থাপনা তৈরির মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করায় এখানে এ বিপর্যয় ঘটছে বলে স্থানীয়রা বলছেন। এ অবস্থার জন্য স্থানীয় প্রশাসন, রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিদের দায়ী করছেন তারা। ওয়ার্ড মেম্বার সিরাজ উদ্দিন জানান, আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে এলাকার রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর তলিয়ে গেছে। ডিমাই এলাকায় অসংখ্য ঘর ধসে পড়েছে। তবে মানুষ সতর্ক থাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। টানা বর্ষণ আর ঢলে এলাকার অন্তত ১০০ ঘরবাড়ি ধসে পড়ার হুমকিতে রয়েছ। আরেক মেম্বার সৈয়দ লুৎফুর রহমান যুগান্তরকে জানান, শনিবার রাতের ভারি বর্ষণে উত্তর ডিমাই এলাকার ৪০ বসতঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। রাস্তার ওপর টিলা ধসে পড়ে জনসাধারণের যাতায়াতের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ৩০০-৪০০ মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে বড়লেখা পৌরশহরের রাস্তাঘাট, দোকানপাটসহ অধিকাংশ এলাকা তলিয়ে গেছে। দোকানপাটে পানি ঢুকে কয়েক কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। পৌরসভা কার্যালয়, সদর ইউনিয়ন কার্যালয়, নারীশিক্ষা একাডেমি ডিগ্রি কলেজ, শহরের উত্তর চৌমুহনা, পাখিয়ালা, হাটবন্দ, বারইগ্রামে তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কুলাউড়া-বড়লেখা আঞ্চলিক মহাসড়কের বাছিরপুর, হাতলিয়া, দক্ষিণভাগ, রতুলী, কাঁঠালতলী, পানিধারসহ ১০টি স্পটের সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। অবিরাম বর্ষণ আর যানবাহন চলাচল বন্ধ হওয়ায় মারাত্মক দুর্ভোগে পড়ে চলমান ডিগ্রি পরীক্ষার্থী ও সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এছাড়া উপজেলার প্রতিটি গ্রামের অসংখ্য রাস্তাঘাট বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। উপজেলা প্রকল্প বাস্তাবায়ন কর্মকর্তা আজাদের রহমান জানান, দুর্গম এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কুলাউড়া সার্কেল) মোহাম্মদ আবু ইউসুফ যুগান্তরকে জানান, নিহতের স্বজনদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিয়ে পোস্ট মোর্টেম ছাড়াই লাশ দাফনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

0 comments:

Post a Comment