Last update
Loading...

ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে জঙ্গিদের অর্থ লেনদেন

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে সংগঠিত জঙ্গিদের বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যয় হওয়া অর্থের লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে হয়েছে। যে কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত মনিটরিং রিপোর্টে তা ধরা পড়ছে না। আর অর্থ লেনদেনে জঙ্গিরা নিত্যনতুন প্রক্রিয়া উদ্ভাবন ও তা ব্যবহার করায় ব্যাংকগুলোর নেয়া সতর্কমূলক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের হিসাবের তথ্য আরও তদন্তের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে। বিএফআইইউর প্রতিবেদনটি সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলে জানায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র। আরও জানা গেছে, ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে লেনদেন করার কারণে জঙ্গি অর্থায়নকারীদের অধিকাংশই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জঙ্গি অর্থায়ন বিষয়ে মতামত চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দিতে পারে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই প্রতিবেদনের ওপর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন হলে পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। এছাড়া জঙ্গি অর্থায়ন উৎস অনুসন্ধান নিয়ে আমাদের একটি কমিটি আছে। সে কমিটিও কাজ করছে। জানা গেছে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে জঙ্গি অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধানে গঠিত টাস্কফোর্সের দ্বিতীয় বৈঠক। জঙ্গিবাদের পেছনে টাকা-পয়সা ব্যয় ও জোগানের উৎস শনাক্ত করতে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত হয় ওই বৈঠকে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। আর এ কারণেই টাস্কফোর্সের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতামত চাওয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ)। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকিং চ্যানেলে কোনো অর্থ প্রবেশের সময় সন্দেহ হলে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিএফআইইউকে রিপোর্ট করে। পরে তা যাচাই-বাছাইয়ের পর মানি লন্ডারিং বা সন্ত্রাসে অর্থায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে বিএফআইইউ থেকে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে পাঠানো হয়। ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ প্রবেশ থেকে শুরু করে বাইরে বের হওয়া পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। কিন্তু নন-ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন হলে বিএফআইইউর করণীয় সীমিত। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সংগঠিত বিভিন্ন সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদ সম্পর্কিত কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব ঘটনার ব্যয় হওয়া অর্থের লেনদেন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে সংঘটিত হয়েছে। জঙ্গি অর্থায়ন অনুসন্ধান সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধের ব্যাপারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংস্থা ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ) এবং এশীয় প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিংয়ের (এপিজি) বিভিন্ন সময়ে দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। এসব সংস্থার নির্দেশ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দেয়া হচ্ছে। যাতে কোনো অপরাধী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থা ব্যবহার করে সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদ কর্মকাণ্ডে অর্থ আদান-প্রদান করতে না পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কোনো জঙ্গি গ্রুপ দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাত ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য আরও বেশি নজরদারির ও সতর্কতা বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোকে।
এছাড়া সন্ত্রাসে অর্থায়ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থানরত ব্যাংকের গ্রাহক লেনদেন পর্যালোচনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও নিরীক্ষা বিভাগ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিপালন ইউনিটকে। এর মাধ্যমে কোনো অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক লেনদেন ধরা পড়লে তা বিএফআইইউকে জানানোর নির্দেশ দেয়া আছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের ক্ষেত্রে জঙ্গি গ্রুপগুলো বর্তমান নিত্যনতুন প্রক্রিয়া উদ্ভাবন ও তা ব্যবহার করছে। যা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে বাধাগ্রস্ত করছে। এসব মোকাবেলা করাও কঠিন হচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে বিএফআইইউর বার্ষিক প্রতিবেদনে নিত্যনতুন প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। যাতে ব্যাংকগুলো সহজে জঙ্গিদের নিত্যনতুন কৌশল কব্জা করতে পারে। জানতে চাইলে বিএফআইইউর মহাব্যবস্থাপক দেবপ্রসাদ দেবনাথ রোববার যুগান্তরকে বলেন, জঙ্গি অর্থায়নের সম্ভাব্য উৎসের সন্ধান এবং প্রতিরোধে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত মনিটরিং করছে। এগুলো বিএফআইইউতে পাঠানো হচ্ছে। সন্দেহজনক লেনদনগুলো তদন্তের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে পাঠানো হচ্ছে। তবে ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে জঙ্গি অর্থায়নের সন্ধান পাওয়া গেলে বিএফআইইউ তা তদন্ত করে থাকে। এছাড়া এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য একাধিক কমিটিও রয়েছে। বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালে জনগণের অভিযোগের ভিত্তি, ব্যাংকিং খাতে রিপোর্ট এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জঙ্গি অর্থায়ন সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে বিএফআইইউ মোট ৫০টি রিপোর্ট তদন্তের জন্য দেয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। একই বছরের জানুয়ারি থেকে গত এপ্রিল পর্যন্ত সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন সংক্রান্ত মোট ৭টি ঘটনাও দেয়া হয়েছে তদন্তের জন্য। প্রতিবেদনে বলা হয়, উল্লেখিত কর্মকাণ্ডের বাইরে শুধু তদন্তের প্রয়োজনে গোয়েন্দা সংস্থা থেকে পাঠানো ২১৩টি ঘটনার ব্যাপারে সব ধরনের তথ্য সরবরাহ করেছে বিএফআইইউ। বিশেষ করে বিদেশি সূত্র, বিভিন্ন রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থা এবং নিজস্ব তথ্যভাণ্ডার থেকে এসব তথ্য দেয়া হয়।

0 comments:

Post a Comment