Last update
Loading...

পাহাড় ধসে নিহত ১২৪

কয়েকদিনের  টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে পাহাড় ধসে কমপক্ষে ১২৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অনেকে। এর মধ্যে রাঙ্গামাটিতে সড়কের ওপর ধসে পড়া পাহাড়ের মাটি সরাতে গিয়ে মাটিচাপায় নিহত হয়েছেন দুই কর্মকর্তাসহ ৪ সেনা সদস্য। এছাড়া নিহতদের মধ্যে নারী-শিশুসহ এবং একই পরিবারের একাধিক সদস্য রয়েছে। টানা বর্ষণে পাহাড়ের মাটি নরম হওয়ায় সেখানে বসবাসকারীদের ওপর মাটি ধসে পড়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব জিএম আবদুল কাদের মঙ্গলবার রাত পৌনে ১২টায় টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, পাহাড় ধসের ঘটনায় ১২৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রাঙ্গামাটিতে ৮৮ জন, চট্টগ্রামে ৩০ জন এবং বান্দরবানে ৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।  পাহাড় ধসে মানবিক বিপর্যয়ের মতো এ ঘটনা ও দুর্যোগ মোকাবেলায় চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলা প্রশাসন পৃথকভাবে জরুরি সভা করেছে। উদ্ধার অভিযান জোরদার ও আহতদের চিকিৎসাসেবা দেয়ার জন্য সিভিল সার্জন অফিসকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দুর্গম এলাকা প্লাবিত হওয়ায় যোগাযোগ বন্ধ থাকায় প্রশাসনের লোকজন অনেকে দুর্ঘটনাস্থলে যেতে পারছেন না। সে ক্ষেত্রে আহতদের উদ্ধার ও নিহতদের দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পৃথক বাণীতে শোক জানিয়েছেন। 
রাঙ্গামাটি : রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি সুশীল প্রসাদ চাকমা ও কাউখালী প্রতিনিধি মো. ওমর ফারুক জানান, ভারি বর্ষণে পাহাড় ধসে মাটিচাপায় রাঙ্গামাটি শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় ৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার বিকালে শহরের ভেদভেদী যুব উন্নয়ন অফিস এলাকা থেকে ২ জনের লাশ উদ্ধার করে রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। তারা হলেন মো. সোহরাব (১৩) ও রুনা (১৫)। প্রশাসন, হাসপাতাল, স্থানীয় ও উদ্ধার অভিযানের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার ভোর থেকে জেলা শহরসহ বিভিন্ন স্থানে মানবিক বিপর্যয় ঘটতে থাকে। খবর পেয়ে প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয় লোকজন সকাল থেকে ঘটনাস্থল গিয়ে হতাহতদের উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন।  দুপুর পর্যন্ত রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে ১৪ জনের মরদেহ নেয়া হয় এবং বিকালে ওই দু’জনের মরদেহ উদ্ধার করে রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। এছাড়া জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় পাহাড় ধসে মাটিচাপায় ২ জনের মৃত্যু হয় বলে নিশ্চিত করেন সিভিল সার্জন ডা. সহীদ তালুকদার। এছাড়া কাপ্তাইয়ের রাইখালীর কারিগরপাড়ায় ৪ জন এবং কাউখালী উপজেলায় সর্বশেষ ২১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করে স্থানীয় সূত্র। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরের ভেদভেদীর যুব উন্নয়ন অফিস এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে উদ্ধার তৎপরতা চলে। নিহতদের মধ্যে দুই কর্মকর্তাসহ সেনাবাহিনীর ৪ সদস্য রয়েছেন। হাসপাতাল ও স্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে, প্রবল বর্ষণে বাড়িঘরে পাহাড়ের মাটিচাপায় শহরসহ রাঙ্গামাটির প্রায় জায়গা ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পাহাড় ধসের দুর্যোগে রাঙ্গামাটি শহরের রিজার্ভবাজার, ভেদভেদী, শিমুলতলী, মোনঘর, রাঙ্গামাটি ও মানিকছড়িসহ বিভিন্ন স্থানে ২২ জন, কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়ায়, ঘাগড়া, ঘিলাছড়ি, কাশখালীসহ বিভিন্ন স্থানে ২১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেন স্থানীয়রা। এছাড়া অনেককে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালসহ চট্টগ্রাম ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এদিকে মানিকছড়িতে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে পাহাড় থেকে ধসে পড়া মাটি অপসারণের সময় ৪ সেনা সদস্যের মৃত্যু হয়। তারা হলেন- মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক, ক্যাপ্টেন মো. তানভীর সালাম শান্ত, কর্পোরাল মোহাম্মদ আজিজুল হক ও সৈনিক মো. শাহীন আলম। এদিকে আইএসপিআর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধসে উদ্ধার কার্যক্রম চলাকালে দুই সেনা কর্মকর্তাসহ চারজন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার ভোরে জেলার মানিকছড়িতে একটি পাহাড় ধসে মাটি ও গাছ পড়ে যায়। এতে চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মানিকছড়ি আর্মি ক্যাম্প থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। বেলা ১১টার দিকে ওই স্থানে পাহাড়ের একটি বড় অংশ উদ্ধারকারী দলের ওপর ধসে পড়ে। এতে উদ্ধারকর্মীরা মূল সড়ক থেকে ৩০ ফিট নিচে পড়ে যান। এ ঘটনায় নিহত ওই চারজনসহ ১০ জন সেনা সদস্য আহত হন। পরে আরও একটি উদ্ধারকারী দল তাদের উদ্ধার করে।
আশঙ্কাজনক অবস্থায় পাঁচজনকে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা সিএমএইচে স্থানান্তর করা হয়। এ ঘটনায় শোক জানিয়েছেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক। তিনি বিকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। দুপুরে যাদের মরদেহ রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, তারা হলেন রুমা আক্তার (২৫), নুর আক্তার (৩), হাজেরা (৪০), সোনালি চাকমা (৩০), এক বছর বয়সী শিশু অমিয় কান্তি চাকমা, আইয়ুশ মল্লিক (২), চুমকি মল্লিক (২), লিটন মল্লিক (২৮), অজ্ঞাত (২২), মিন্টু ত্রিপুরা (৪৫), আবদুল আজিজ (৫৫), অজ্ঞাত (৩২), মিলি চাকমা (৫৫), ফেন্সি চাকমা (৪) এবং কাউখালীর যাদের নাম পাওয়া গেছে তারা হলেন- ফাতেমা বেগম (৬০), মনির হোসেন (২৫), মো. ইসহাক (৩০), দবির হোসেন (৮৪), খোদেজা বেগম (৬৫), অজিদা খাতুন (৬৫), মংকাচিং মারমা (৫২), আশেমা মারমা (৩৭), শ্যামা মারমা (১২), ক্যাচাচিং মারমা (৭), কুলসুমা বেগম (৬০), বৈশাখী চাকমা (১০), লায়লা বেগম (২৮)। বিকালে উপজেলার কয়েক জায়গা থেকে আরও ৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে নাইপুর মারমা (৪০), সুবাস চাকমা (৪০), নাছিমা বেগমের (৬০) নাম পাওয়া গেছে। ৫ জনের নাম পাওয়া যায়নি। কাপ্তাই রাইখালীর কারিগরপাড়ায় নিহত ৪ জনের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেলেও তাৎক্ষণিকভাবে নাম পাওয়া যায়নি। এছাড়া সিভিল সার্জন ডা. সহীদ তালুকদার বিলাইছড়িতে ২ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করলেও তাদের নাম জানাতে পারেননি। আগের দিন সোমবার রাঙ্গামাটি শহরের পুলিশ লাইন এলাকায় এক শিশু এবং কাপ্তাইয়ের নতুন বাজারে এক শিশু পাহাড়ের মাটিচাপায় মারা যায়। জেলা প্রশাসন থেকে শহরসহ জেলায় মোট ৩৫ জনের নিহতের তালিকা পাওয়া গেছে বলে জানান নেজারত ডেপুটি কালেক্টর তাপস দাশ। বিশেষজ্ঞরা জানান, পাহাড়ে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণ করে বসবাস করায় পাহাড় ধসে এ ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে। রাঙ্গামাটি পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম বলেন, শহরসহ রাঙ্গামাটির আশপাশে বিভিন্ন জায়গায় পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে লোকজন। তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে বসবাস করায় পাহাড় ধসে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
প্রতিরোধে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে জেলা প্রশাসন থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। এ জন্য শহরসহ বিভিন্ন স্থানে ১৬টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। হতাহতদের দেখতে হাসপাতালে যান রাঙ্গামাটির সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা, জেলা প্রশাসক মো. মানজারুল মান্নানসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা। দুর্যোগ মোকাবেলায় মঙ্গলবার বিকালে জরুরি সভা করেছে জেলা প্রশাসন। এদিকে সড়কের ওপর পাহাড় ধসে মাটি পড়ায় রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন রুটে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে রাঙ্গামাটির ওইসব রুটে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া তার ছিঁড়ে ও খাম্বা উপড়ে পড়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বিদ্যুৎ সংযোগ। ফলে অন্ধকারে ভুতুড়ে শহরে পরিণত হয়েছে গোটা রাঙ্গামাটি শহর ও আশপাশের এলাকা। এদিকে রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি আব্বাস হোসাইন আফতাব জানান, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দু’টি ইউনিয়নে পৃথক পাহাড় ধসের ঘটনায় ঘুমন্ত অবস্থায় মাটিচাপা পড়ে চার পরিবারের ২১ জন নিহত হয়েছে। রাজানগর ও ইসলামপুর ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল হোসেন পাহাড় ধসে ২১ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ ছাড়া এ উপজেলায় আরও দুই মহিলা নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, ঘুমন্ত অবস্থায় সোমবার মধ্যরাতে রাজানগর ইউনিয়নের ঠাকুরঘোনা মইন্যার টেক এলাকায় পাহাড় ধসে কাঁচাঘর চাপা পড়ে মারা গেছেন নজরুল ইসলাম (৪০), তার স্ত্রী আসমা আকতার (৩৫), তাদের ছেলে ননাইয়া (১৫) ও মেয়ে সাথী আকতার (১৯)। একই ইউনিয়নের বালুখালী এলাকায় মারা গেছেন ইসমাইল (৪২), তার স্ত্রী মনিরা খাতুন (৩৭), তাদের দুই মেয়ে ইছামিন (৮) ও ইভামনি (৪)। একই উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নে মাটিচাপায় প্রাণ হারিয়েছেন সুজন (২৪) তার স্ত্রী মুন্নি (১৯), মুন্নির অপর তিন বোন জ্যোৎস্না (১৮), শাহনূর আকতার (১৫) ও পালু (১২)। তাদের পিতার নাম মোহাম্মদ সেলিম। রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পাহাড়তলী ঘোনা এলাকায় আরও পাঁচজন মারা গেছে বলে নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিচয় জানা যায়নি। রাঙ্গুনিয়া উপজেলা প্রশাসন সূত্র বলেছে, বিস্তীর্ণ এলাকা পানিবন্দি হয়ে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনা স্থলে যাওয়া যাচ্ছে না। তবে হতাহতদের উদ্ধার ও তাদের দাফন-কাফন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানসহ জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।   চন্দনাইশ প্রতিনিধি আবিদুর রহমান বাবুল জানান, মঙ্গলবার ভোররাতে উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ধোপাছড়ি ইউনিয়নের শামুকছড়ি ও ছনবনিয়া এলাকায় পৃথক ঘটনায় দুই পরিবারের চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুই শিশুও রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছনবনিয়া এলাকার পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরত একটি আদিবাসী পরিবারের কাঁচা ঘরের ওপর মাটি চাপা পড়ে।
এতে মেকো ইয়াং খেয়াং (৫০) তার মেয়ে মেমো  ইয়াং খেয়াং (১৩), কেউছা ইয়াং খেয়াং (১০) নিহত হয়। আহত হয় সানুউ ইয়াং খেয়াং ও সোউ খেয়াং। প্রায় একই সময়ে শামুকছড়ি এলাকায় মাটিচাপা পড়ে নিহত হয় আজগর আলীর মেয়ে মাহিয়া (৩)। ঘটনার পর দুই ঘণ্টা মাটিচাপা পড়ে থাকে তাদের লাশ। দুর্গম ওই এলাকায় কোনো উদ্ধারকারী দল যেতে পারেনি।  স্থানীয়রা দুই ঘণ্টাব্যাপী উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে মাটি চাপা পড়া লাশ এবং আহতদের উদ্ধার করে। এর মধ্যে আহতদের বান্দরবান হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য  পাঠানো হয়েছে। জানা গেছে, শামুকছড়ি ও ছনবনিয়া এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে  ঝুঁকিপূর্ণভাবে ৩০ পরিবারের অন্তত ২০০ লোক বসবাস করছে। চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লুৎফর রহমান ধোপাছড়ির শামুক ছড়ি ও ছনবনিয়া এলাকায় পাহাড় ধসে দুই পরিবারের চারজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন যুগান্তরকে। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী মঙ্গলবার বিকালে যুগান্তরকে জানান, রাঙ্গুনিয়া ও রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। পাহাড় ধসে আহতদের চিকিৎসা দিতে মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। বান্দরবান প্রতিনিধি এনামুল হক কাশেমী জানান, মঙ্গলবার ভোররাতে প্রবল বর্ষণে বান্দরবান  জেলা শহরের অদূরে লেমুঝিরি ও কালাঘাটা  এলাকায় পাহাড় ধসে  মা-মেয়েসহ তিন পরিবারের ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে লেমুঝিরি এলাকায় নিজের ঘরেই মাটিচাপা পড়ে মারা গেছেন  শ্রমিক নুরুল আলমের স্ত্রী কামরুন্নাহার (৪০) ও তার মেয়ে সুফিয়া বেগম (৮) । কালাঘাটা এলাকায় পৃথক পাহাড় ধসের ঘটনায় মারা গেছেন রেবা ত্রিপুরা (২২) নামে একজন। একই এলাকায় আরেক পরিবারের তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এরা হচ্ছে মিঠু বড়–য়া (৫), বোন শুভ বড়–য়া (৪) এবং লতা বড়–য়া (৭)। তারা তিন ভাইবোন। পুলিশ ও দমকল বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে নিহতদের লাশ উদ্ধার করে সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে।  ঘনটাস্থল পরিদর্শন করেন বান্দরবান  জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক। জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রধান সড়ক ও কয়েকটি সেতু বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সোমবার রাত থেকে বান্দরবান জেলা সদরের সঙ্গে  চট্টগ্রাম ও রাঙ্গামাটিসহ সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এ ছাড়া বান্দরবান  জেলার অপর ছয়টি উপজেলা সদর ও জেলা সদরের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে সোমবার সন্ধ্যা থেকেই। জেলা শহরসহ সাতটি উপজেলায় দু’দিন ধরে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ। বান্দরবান জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক জানান,  জেলার বিভিন্ন স্থানে ৪০টি অস্থায়ী বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব এলাকায় দুর্গতদের  মাঝে শুকনা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়,  বান্দরবানে পাহাড় ধসে যে তিন পরিবারের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে ওই পরিবারগুলো দরিদ্র। ঘরের কর্তারা সবাই শ্রমজীবী মানুষ। জীবিকার কারণেই তারা পাহাড়ের পাদদেশে ঘর করে বসবাস করে আসছিল। সারা দেশে ভূমিহীনদের মাঝে সরকারি খাসভূমি বন্দোবস্তি দেয়া হলেও তিন পার্বত্য জেলায় স্থানীয় কঠোর আইনের কারণে ভূমি বন্দোবস্তি প্রদান  বন্ধ ২৫ বছর ধরেই। ফলে বাধ্য হয়েই জেলার বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ৩০ হাজার ভূমিহীন পরিবার  মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে  বিভিন্ন পাহাড়ের পাদদেশেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস করছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশ  : এদিকে চট্টগ্রাম ও তিন পার্বত্য জেলার সব হাসপাতাল এবং চিকিৎসকদের ভূমিধসে আহতদের দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ২৪ ঘণ্টা তৎপর থাকার নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালকসহ সিভিল সার্জনদেরও সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তিনি। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে পাহাড় ধসে সেনা সদস্যসহ সাধারণ মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে স্বজনদের প্রতি আন্তরিক সহানুভূতি জানান তিনি। তিনি নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন। বিবৃতিতে তিনি জানান, আহতদের দ্রুত চিকিৎসা প্রদানের জন্য ইতোমধ্যে চিকিৎসক ও নার্সদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেবা প্রদানে নিরলস কাজ করে চলেছে। বাউফল ও সিংগাইরে সেনা সদস্যদের বাড়িতে শোকের মাতম
বাউফল : নিহত হন সেনা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান তানভীর ওরফে শান্তর বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কালিশুরি ইউপির সিংহেরকাঠি গ্রামে। তার বাবার নাম মো. আবদুস সালাম মোল্লা। পিতা সালাম মোল্লার চাকরির সুবাদে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার টঙ্গী এলাকায় পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে থাকতেন তানভীর। তানভীরের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছে তানভীরের পুরো পরিবার। তানভীরের চাচা মোজাম্মেল মোল্লা বলেন, পরিবারের একমাত্র গর্বের ধন তানভীরকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছে সবাই।
মানিকগঞ্জ :  সেনাবাহিনীর মেজর মাহফুজের গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের সিংগাইরে। তিনি উপজেলার তালেবপুর ইউনিয়নের ইরতা গ্রামের মোজাম্মেল হোসেনের ছেলে।  তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ছিলেন। তার মায়ের নাম বেনি বেগম। মাহফুজের মামাতো ভাই তালেবপুর ইউপি সদস্য হুমায়ুন জানান, মাহফুজ ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় বড় হয়েছেন। পড়াশোনাও করেছেন ঢাকাতেই। তবে বছরে দু-একবার  গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। ওই সেনা সদস্যের মৃত্যুতে পরিবারে শোকের মাতম চলছে।

0 comments:

Post a Comment