Last update
Loading...

বর্গির মতো খাজনা আদায় কাম্য নয়!

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত প্রস্তাবিত বাজেটকে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ বাজেট হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আমরা জানি না, এটা কতটা সত্য। তবে এ কথা সত্য যে, এটি তার শ্রেষ্ঠ তামাশা মাত্র। জনগণ অধিকতর কর ও শুল্ক দিয়ে তা উপলব্ধি করবে। এটুকু তার সফলতা। এবার তিনি আপামর জনগণকে বাজেটের বিরুদ্ধে এক কাতারে দাঁড় করাতে পেরেছেন। যেটা এর আগে খুব একটা দেখা যায়নি। অন্য অর্থমন্ত্রীরা পারেননি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। এসব আলোচনা যতটা না ইতিবাচক তার চেয়ে বেশি নেতিবাচক। এ বাজেটকে সরকারের মন্ত্রী, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের এমপি ও নেতাকর্মীরাই গণবিরোধী আখ্যা দিয়েছেন। আর বিরোধী দলের কাছে এ বাজেট তো সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনার ধারালো তলোয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। বিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের মতে, এ বাজেট সরকারের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব তৈরিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে। অর্থনীতিবিদরাও বাজেটের কারণে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার কথা তুলে ধরেছেন যৌক্তিকভাবে। এ বাজেটে সাধারণ মানুষ, স্বল্পসঞ্চয়ী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, শিল্পপতিসহ সব ধরনের মানুষই ক্ষুব্ধ। প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাট ও করের বোঝা এতটাই বেশি ও প্রকাশ্য যে, খোদ ক্ষমতাসীন দলেও এর সমর্থনে লোক পাওয়া কঠিন। বরং ক্ষমতার অন্দরমহল থেকে অর্থমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্টদের পদত্যাগের দাবি উঠেছে। রাজনীতিবিদ এবং অর্থনীতিবিদ উভয়ের আলোচনা-সমালোচনায় দেখা যায়, সরকারি দল এখন নির্বাচনমুখী কিন্তু বাজেট জনবিরোধী, অর্থাৎ নির্বাচনবিরোধী। এই অনুসন্ধানী বিশ্লেষণকে সরকারি দলের বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। এ বাজেট ক্ষমতাসীন দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার জন্য পরিকল্পিত কিনা সেটিও খতিয়ে দেখার বিষয় হতে পারে। প্রসঙ্গত, ‘সরকার নির্বাচনমুখী, বাজেট নির্বাচনবিরোধী’ বিশ্লেষকদের এমন উদ্ধৃতি দিয়ে বাজেট ঘোষণার পরদিন যুগান্তরে প্রকাশিত হয় বিশেষ প্রতিবেদন।
বাজেট আলোচনার অধিকাংশ সংসদ সদস্যের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে যুগান্তরের প্রতিবেদনের সত্যতা মিলল। বাজেটের আকার বেড়েছে। ভ্যাট ও শুল্ক হার বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে, আবগারি শুল্ক বাড়বে। কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৪০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব এসেছে। এই কর দেবে কে? জনগণ দেবে? কিন্তু জনগণ কী পাবে? দেশের মানুষ সচেতন। এই হিসাবটা তারা নিতে চাইবেন এবং তার প্রমাণ এবারের বাজেটে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের প্রতিক্রিয়া। সাধারণ মানুষ জানতে চায়, এক লাখ টাকা থাকলেই সম্পদশালী হয় কীভাবে? ভ্যাট চালু হলে একজন মধ্যবিত্ত নাগরিককে কত খাতে কতবার ভ্যাট দিতে হবে, ব্যাংকে কী হারে আবগারি শুল্ক বাড়বে? স্বল্পসঞ্চয়ী আর কত মূলধন ভেঙে খাবে? এসবের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা জনগণ পেতে চায়। অথচ জনগণের চাওয়ার বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর কোনো আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। ১৯ জুন জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় এমপিরা বলেছেন, অর্থমন্ত্রী কার পরামর্শে আর কেনই বা নির্বাচনবিরোধী এমন বাজেট দিলেন। আবগারি শুল্কের জন্য গোটা জাতি আওয়ামী লীগ সম্পর্কে খারাপ ধারণা নেবে- এটা আমরা চাই না। যেসব প্রস্তাবনায় জনগণের কষ্ট হবে, দুর্ভোগ বাড়বে, তা জনগণ মেনে নিতে পারে না। আবগারি শুল্কের প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে হবে। সঞ্চয়পত্রের ওপর সুদের হার কমানোর কথা বলেছেন, এটা চলবে না। আইএমএফের কথায় এটা করা যাবে না। ওরা তো কৃষিতে ভর্তুকি কমাতে বলেছে। সেটি করলে কী হতো? ওরা কি আমাদের ভালো চায়? সোলার প্যানেল, তেল ও এলপিজির ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার করতে হবে। সরকারদলীয় এমপি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম (বীরউত্তম) বাজেট পাসের সময় স্বাধীনভাবে মতামত রাখা এবং ভোট দেয়ার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধন চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাজেটে যদি এমপিদের স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়, তবে অর্থমন্ত্রী এভাবে অনড় অবস্থানে থাকতে পারতেন না। এমপিদের কথা শুনতে হতো। সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, এ বাজেট আগামী নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে। তাই ব্যাংক আমানতের ওপর আরোপিত শুল্ক পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী শেখ সেলিম বলেছেন, আপনার কিছু কথাবার্তায় সরকারকে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়। আপনার বয়স হয়ে গেছে। কখন কী বলে ফেলেন হুঁশ থাকে না। আপনি হলমার্ক কেলেঙ্কারির সময় বলেছিলেন, চার হাজার কোটি টাকা কোনো টাকাই না। আর এখন এক লাখ টাকা বেশি হয়ে গেল? আপনার একগুঁয়েমি বন্ধ করেন। কথা কম বলুন। আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেছেন, ব্যাংকের জন্য হাজার কোটি টাকা মূলধন অর্থমন্ত্রী কোত্থেকে দিলেন, এসব কার টাকা? যেখানে লুটপাটের মাধ্যমে ব্যাংকের টাকা নয়ছয় হয়েছে, সেখানে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে অর্থমন্ত্রী জনগণের টাকা কাউকে দিতে পারেন না। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, আবগারি শুল্ক যদি বাড়ানো হয় তাহলে সেটি হবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। ব্যাংক আমানতে বাড়তি আবগারি শুল্ক থেকে সরকার পাবে ২০০ কোটি টাকার মতো। এজন্য বিপুলসংখ্যক লোকের আয় কমিয়ে দেব? ঋণখেলাপিদের বোঝা যদি আমরা নিতে পারি, তাহলে নিন্মবিত্ত ও মধ্যবিত্তের দায় কেন নিতে পারব না? তিনি আরও বলেন, ব্যাংক আমানত ও সঞ্চয়পত্র হল আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের গুরুত্বপূর্ণ দুটি জায়গা। এখন তাদের সেই সামান্য আয়ের ওপর হাত দেয়া চলবে না। এমন অবস্থা চললে অর্থমন্ত্রীকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গুপ্তধন’ গল্পের পিতামহে পরিণত হতে হবে- যে নাকি গুপ্তধন পাহারা দেয়ার জন্য নিজের নাতিকে হত্যা করে যক্ষ বানিয়ে ফেলেছিলেন। জনগণের ওপর এই বোঝা চাপিয়ে অর্থমন্ত্রী কি আমাদের যক্ষের ধন পাহারাদার বানাবেন? আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সঞ্চয়পত্রে সুদ কমানোর পরামর্শ দেয়ার বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, এসব সংগঠন যারা পদ্মা সেতুতে বাধা দিয়েছিল। কৃষিতে ভর্তুকি না দিতে পরামর্শ দেয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় এটি একটি ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান। এরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ফতোয়া দেয় অথচ এই প্রতিষ্ঠানের সাবেক তিনজন প্রধান দুর্নীতির কারণে কারাদণ্ডিত হন। কাজেই অন্ধের মতো আইএমএফের পরামর্শে চললে আমাদের বিপদে পড়তে হবে।
২. অর্থমন্ত্রী ইংরেজি কিছু শব্দকে উচ্চমাত্রার মর্যাদায় অভিষিক্ত করে ছেড়েছেন। ঊর্ধ্বমুখে ছুড়ে দেয়া সেই কথাগুলো এখন প্রায় তার ওপরই পতিত হচ্ছে আরও উচ্চমাত্রায়। আমাদের দুর্ভাগ্য তিনি সেটা উপলব্ধি করতে পারছেন না। অর্থমন্ত্রীর দাবিকৃত তার জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ বাজেট’ ও একই পরিণতির সাক্ষ্য বহন করছে। তার কার্যকালের ভেতরে সংঘটিত ভয়াবহ অর্থনৈতিক দুর্নীতি ও লুটপাটের কোনো সুরাহা হয়নি। হলমার্ক, যুবক, ডেসটিনির যে অর্থনৈতিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তিনি তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারেননি। খেলাপি ঋণ আদায়ে রাখতে পারেননি কোনো অবদান, উল্টো ঋণখেলাপিরা এখন শুধু ঋণখেলাপিতেই থেমে নেই, তারা ঋণ হজম করে দেয়ার পদ্ধতিও বের করে ফেলেছেন। আর এই ঋণ হজমের সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতার ভূমিকাও পালন করছেন তিনি। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ব্যাংকের মূলধনের জোগান দিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে খোয়া যাওয়া টাকা ফেরত আনার ব্যবস্থা হয়নি। হয়নি অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থাও। তারপরও অর্থমন্ত্রী নিজের ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ দাবি করে বক্তব্য রাখেন অবলীলায়। করভারে সাধারণ মানুষকে জর্জরিত করার এর চেয়ে ভালো বাজেট আর এর আগে প্রণীত হয়েছে বলে মনে পড়ে না। অবস্থা এমন যে, করস্পৃষ্ট সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিবাদ জানাতে মুখ খুললে তার জন্যও টাকা গুনতে হবে। ফলে বাজেট পাস হওয়ার আগেই শুরু হয়ে গেছে মূল্যবৃদ্ধির হিড়িক। ফ্লাট রেটে ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লাখ টাকা থাকলেই আবগারি শুল্ক আরোপের প্রস্তাবনা ব্যাপক জনরোষের জন্ম দিয়েছে। এই জনরোষের আগুনে ইতিমধ্যে শাসক দলের ভাবমূর্তি পুড়তে শুরু করেছে। আর সেই আঁচে দগ্ধ হয়েই শাসক দলের নেতাকর্মীরা পর্যন্ত প্রতিবাদে সোচ্চার অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। তারা সংসদে, সংসদের বাইরে বিভিন্ন ফোরামে সে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। শোনা যাচ্ছে, প্রস্তাবিত ভ্যাট ও আবগারি শুল্কের হার নতুন করে পুনর্নির্ধারণ করা হবে। কিন্তু যে ক্ষতি ইতিমধ্যে হয়ে গেল, জনমনে শাসক দলের সম্পর্কে যে জনবিরোধী ভাবমূর্তি অঙ্কিত হয়ে গেল তা কি সহজে মুছে ফেলা যাবে? বাজেট প্রণয়নের উদ্দেশ্য জনমনে স্বস্তি আনা, আস্থা তৈরি করা। সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা। এক কথায় জনমনের শঙ্কা দূর করা কিন্তু এই বাজেট জনমনের সেই শঙ্কা হরণ না করে বরং জনমনে তৈরি করছে ভয়াবহ আতঙ্ক, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। একটি প্রসিদ্ধ লোকছড়া আছে আমাদের দেশে- ‘খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গি এলো দেশে/বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/খাজনা দেব কিসে?’ এই বাজেট খাজনা আদায়ের বাজেটে রূপ নিয়েছে। শাসক দলকে বর্গি বানিয়ে ছাড়বে। আমরা খাজনা আদায় চাই। কিন্তু বর্গির মতো খাজনা আদায় কিছুতেই কাম্য হতে পারে না। দেশের অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে, জনগণের কল্যাণের দিক বিবেচনা করেই বাজেট প্রণয়ন হয়। কিন্তু কেন এবার এমনটা হল না, সে প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই। তবে বাজেট পাসের জন্য আরও কয়েকদিন সময় হাতে আছে। অর্থমন্ত্রী ‘বাজারের চিৎকার’ আর সংসদের সহকর্মীদের বক্তব্য আমলে নিলে অন্তত রক্ষা পাবে সাধারণ মানুষ আর শিল্পমুখী হবে বেসরকারি উদ্যোগ।

0 comments:

Post a Comment