Last update
Loading...

মিরসরাইয়ে পাহাড়ে ঝুঁকিতে বসবাস ২০ হাজার মানুষের

মিরসরাই উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ে প্রায় ২০ হাজার মানুষ মৃত্যুঝুঁকিতে বসবাস করছে। উপজেলার করেরহাট ইউনিয়ন, হিঙ্গুলী ইউনিয়ন, জোরারগঞ্জ ইউনিয়ন, দূর্গাপুর ইউনিয়ন, মিরসরাই সদর ইউনিয়ন, খইয়াছড়া ইউনিয়ন ও ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের পাহাড়গুলোতে বাঙ্গালী ও ত্রিপুরা ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের লোকজন দীর্ঘদিন যাবৎ বসবাস করে আসছে। সম্প্রতি রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি সহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় পাহাড় ধসে প্রায় দেড় শতাধিক লোকের প্রাণহানীর ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ চট্টগ্রামের অন্যান্য উপজেলায় যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে মানুষ বসবাস করে সেখান থেকে তাদের সরিয়ে সমতলে আনতে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। প্রশাসন শুরুতে কঠোর অবস্থানে থাকলেও পরবর্তীতে তা প্রচারাভিযানে আটকে থাকে। সমতলে জায়গার দাম বেড়ে যাওয়া, যৌথ পরিবারগুলো ভেঙ্গে যাওয়ায় এখন অনেক বাঙ্গালি পরিবারও পাহাড়ে গিয়ে বসবাস করছে। জানা গেছে, উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের সামনের খিল, নলকূপ-আশ্রয়ণ কেন্দ্র, কালাপানিয়া, কয়লা, ঝিলতলী পাহাড়ে বাঙ্গালী ও ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠ সম্প্রদায়ের প্রায় ১৫’শ পরিবার বসবাস করে। এরমধ্যে কয়লা এলাকায় বেশী বসবাস করে। যেখানে পাহাড়ের খাদে (ক্যানেল) বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা বেশী। করেরহাটের বিভিন্ন পাহাড়ে প্রায় ৬ হাজার লোক বসবাস করে। হিঙ্গুলী ইউনিয়নের পূর্ব হিঙ্গুলী গ্রামে প্রায় ৮০ পরিবার বসবাস করে। জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের খিলমুরালী গ্রামের কিছু অংশের পাহাড়ে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করে। দূর্গাপুর ইউনিয়নের রায়পুর ¬¬২’শ পরিবার¬¬¬¬¬¬¬, সংশটিলা ৫০ পরিবার, রব্বাইন্নাটিলা এলাকায় ৫০টি পরিবার বসবাস করে। মিরসরাই সদর ইউনিয়নের উত্তর তালবাড়িয়া, মধ্যম তালবাড়িয়া গ্রামের পাহাড়ে প্রায় ৫’শ পরিবার বসবাস করে। খইয়াছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ তালবাড়িয়া এলাকায় ৮০ পরিবার, কাঁঠালবাগান এলাকায় ৪০ পরিবার, রেল স্টেশন এলাকায় ৮০ পরিবার বাঙ্গালী বসবাস করে। এছাড়া নিজতালুক এলাকায় প্রায় ৬’শ ত্রিপুরা পরিবার বসবাস করে। ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের উত্তর ওয়াহেদপুর গ্রামে প্রায় ২’শ পরিবার, বাউয়াছড়া সেচ প্রকল্প এলাকায় ১’শ পরিবার, হাদিফকিরহাট এলাকায় ৮০টি পরিবার বসবাস করে।
উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ে প্রায় ২০ হাজার লোক বসবাস করেন। অতীত থেকেও পাহাড়ে মানুষ বসবাস করলেও বর্তমান সময়ের মতো এভাবে পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা আগে ঘটেনি। পাহাড়ের বড় বড় গাছ কেটে ফেলা, সামাজিক বনায়নের নামে পাহাড় পরিষ্কার করে ফেলা, পাহাড়ে বসবাসকারীরা পাহাড়ের পাদদেশ কেটে ঘর নির্মাণ করা, পাহাড় কেটে ঝুম চাষই পাহাড় ধসের অন্যতম কারণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। পাহাড় ধস ঠেকাতে এখন থেকে পাহাড়ে বনায়নের উপর গুরুত্ব না দিলে আগামী এক দশকের মধ্যে হয়তো সব পাহাড় মাটিতে গুটিয়ে যাবে। তাছাড়া সরকারী ভাবে পাহাড়ে বনায়ন করার জন্য হত দরিদ্র পাহাড় নির্ভর পরিবারের মাঝে বরাদ্ধ দেওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাযশে তা বিত্তবানদের নামে বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে। এতে করে তারা প্রথমদিকে পাহাড়ে গাছের চারা রোপনের পর যতœ নিলেও পরবর্তীতে আর খোঁজ খবর রাখেন না। ফলে বনবিভাগ পাহাড়ে বনায়নের যে লক্ষ্য নিয়েছে তা শতভাগ পূরণ হচ্ছে না। বছরের পর বছর খালি পড়ে রয়েছে পাহাড়। ফলে যে কোন সময় ঘটতে পারে মারাত্মক দূর্ঘটনা। পূর্ণবাসন ব্যবস্থা না করায় প্রতিবছর ঝুঁকিতে বসবাসকারীর সংখ্যা বাড়ছে। উপজেলার অতি দরিদ্র বাসিন্দারা নিজেদের জমি না থাকায় সরকারি খাস পাহাড়ে বসবাস শুরু করেন। এক পর্যায়ে বাড়তে থাকে পাহাড়ে বসবাসকারীদের সংখ্যা। বর্ষায় দেশের বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধ্বসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও এদেরকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য সর্তকবার্তা ছাড়া কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। মিরসরাই সদর ইউনিয়নের তালবাড়িয়া গ্রামের চৌধুরী পাড়ার বাসিন্দা তোতন ত্রিপুরা (৩৫) বলেন, আমরা ছোট বেলা থেকে এখানে বসবাস করে আসছি। আগে পাহাড়ে বসবাসকারী কম থাকলেও এখন তা বেড়ে গেছে। কেননা বড় পরিবারগুলো আস্তে আস্তে ভেঙ্গে যাচ্ছে। আমাদের নিজস্ব কোন ভূমি নেই। সরকারী জায়গায় থাকি। রাঙ্গামাটি, রামগড়ে পাহাড় ধসের খবর শুনলেও কি করবো। আমাদেরতো যাওয়ার আর জায়গা নেই। বাঁচলেও এখানে থাকবো মরলেও এখানে মরবো। আরেক বাসিন্দা মুহিম ত্রিপুরা বলেন, আমাদের খোঁজ খবর কে রাখে। পাহাড়ের চূড়ায় ভাঙ্গা ঘরে ছেলে মেয়ে নিয়ে বসবাস করছি। বর্ষাকালে ডরে ডরে (ভয়ে ভয়ে) থাকি কখন পাহাড় ধসে পড়ে। সারারাত জাগ্রত থাকি। বর্ষাকালে মেম্বার-চেয়ারম্যানরা আমাদের সরে যেতে বললেও আমাদের জন্য কোন স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করেন না। করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন নয়ন জানান, করেরহাট ইউনিয়নে পাহাড়ের বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে তিনি নিজ উদ্যোগে মাইকিং, মেম্বারদের মাধ্যমে পাহাড়ি নেতাদের আহ্বান করেছেন। শীঘ্রই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় চিহ্নিত করা হবে বলে তিনি বলেন। মিরসরাই সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এমরান উদ্দিন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে সরে যেতে পাহাড়ের অধিবাসীদের সর্তকতা করা হয়েছে। তাছাড়া উত্তর ও মধ্য তালবাড়ীয়া এলাকায় বসবাসকারীরা পাহাড়ের উঁচুতে থাকে। ফলে তারা কিছুটা ঝুঁকিমুক্ত। ওয়াহেদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুল কবির ফিরোজ বলেন, ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের আওতাধীন বড়দারোগারহাট থেকে নয়দুয়ার এলাকা পর্যন্ত প্রায় ২’শ ৫০টি পরিবার বসবাস করে। যাদের অধিকাংশ বাঙ্গালী। যাদের নিজস্ব কোন জায়গা নেই। তাদের সরকারী আশ্রয়স্থলে সরিয়ে নেওয়ার পক্রিয়া চলছে। উপজেলা আ’লীগের ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক এবং সিপিপি টিম লিডাম এম. সাইফুল্লাহ দিদার বলেন, মিরসরাইয়ের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে সিপিপি’র টিম নেই। তারপরও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলার পর আমরা পাহাড়ের অধিবাসীদের মাঝে সর্তকবার্তা প্রচারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টি ইউপি চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্যকে তাদের নিরাপদে সরিয়ে আনার জন্য আহ্বান করেছি। মিরসরাইয়ের নৃত্বাত্তিক জনগোষ্ঠীদের সংগঠন উপজেলা নৃত্বাত্তিক বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি সাধন চন্দ্র ত্রিপুরা জানান, ২০১১ সালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর পাহাড়ে বসবাসকারী ঝুঁকিপূর্ণ নৃত্বাত্তিক পরিবারের তালিকা প্রেরণ করা হলেও পুণর্বাসনের ব্যবস্থা করেনি সরকার। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের সংখ্যা গতবারের চেয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় আবার তালিকা করে ইউএনও বরাবর প্রদান করা হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়া আহমেদ সুমন বলেন, মিরসরাইয়ে পাহাড়ে বসবাসকারীদের সমতলে ফিরে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানদের সাথে বিশেষ বৈঠক হয়েছে। পাহাড়ে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে পাহাড়ে বসবাসকারীদের তালিকা তৈরি করে দ্রুত জমা দেয়ার নিদের্শ দেয়া হয়েছে। তালিকা পেলে পুণর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।

0 comments:

Post a Comment