Last update
Loading...

ঘরে মা ও তিন সন্তানের লাশ

রাত সাড়ে ১১টায় (বৃহস্পতিবার) অন্য দিনের মতো মোস্তফা কামাল সমিতির (স্থানীয় যুব কল্যাণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রোপার্টি) অফিস থেকে বের হন। একটি দোকানে বসে চা পান করেন তিনি। তারপর এক প্রতিবেশীর সঙ্গে বাসার উদ্দেশে রওনা দেন। বাসায় এসে দরজা নক (ধাক্কা) করেন কামাল। দরজা নক করলে দুই মেয়ে নুসরাত মোস্তফা আঁখি (১৩) ও আরিশা মোস্তফা (৯) বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে- এমন চিত্র প্রতিদিনের। কিন্তু এদিন বারবার দরজা নক করলেও ভেতর থেকে কেউ সাড়া দিচ্ছিল না। তাই জানালা দিয়ে ভেতরে হাত ঢুকিয়ে নিজেই ঘরের দরজা খোলেন কামাল। ঘরে প্রবেশ করতেই তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। একটি কক্ষে খাটের মধ্যে সারিবদ্ধভাবে রাখা দুই মেয়ে আঁখি, আরিশা এবং ১১ মাস বয়সী ছেলে মোছামিম সাদের লাশ। অন্য কক্ষে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে তার স্ত্রী রেহেনা পারভীন (৩৫)। এ দৃশ্য দেখে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন কামাল। তার চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের এমন পরিস্থিতিতে ভড়কে যান সবাই। মর্মান্তিক এ ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর তুরাগের কামারপাড়ার কালিয়ারটেকের একটি বাসায়। খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে কামালের স্ত্রী ও তিন শিশু সন্তানের লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায় পুলিশ। রেহেনার স্বামী মোস্তফা কামাল ও প্রতিবেশীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে উল্লিখিত সব তথ্য। এ প্রসঙ্গে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বলছেন, তিন শিশু সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।
তবে মায়ের মৃত্যু রহস্যজনক। তাই তার ঘারের টিস্যু পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তিনি আত্মহত্যা করেছেন নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে প্রতিবেদন পেলে নিশ্চিত হওয়া যাবে।তবে রেহেনার স্বামী কামালের দাবি, তুরাগের স্থানীয় দুই প্রভাবশালীকে তিনি ডেসটিনির ব্যবসার জন্য ৫০ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। তারা টাকা ফেরত দেননি। এর জেরে তার স্ত্রী ও তিন সন্তানকে হত্যা করা হতে পারে। অন্যদিকে রেহেনার ভাই মাহবুব আলমের দাবি, পারিবারিক বিরোধের জেরে রেহেনা ও তার তিন সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে পুলিশ বলছে, মোস্তফা কামালের স্ত্রী রেহেনা পারভীন তার তিন সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করেছেন। সুরতহাল প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে, রেহেনার গলায় অর্ধচন্দ্রাকৃতির দাগ দেখা গেছে। এ ঘটনায় শুক্রবার রাত ৯টা পর্যন্ত কাউকে আটক বা গ্রেফতার করেনি পুলিশ। এমনকি এ ঘটনায় কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা হয়নি। রেহেনার আত্মহত্যার কারণ হিসেবে পুলিশ বলছে, দীর্ঘদিন ধরে মোস্তফা কামাল বেকার। এ কারণে আর্থিক অনটন ছিল পরিবারে। এ নিয়ে প্রায় প্রতিদিন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া লেগেই থাকত। তাছাড়া মোস্তফা কামালের ভাই-বোনদের মধ্যে জমি সংক্রান্ত বিরোধ ছিল। এ নিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। এসব বিষয় নিয়ে মানসিক যন্ত্রণা ছিল রেহেনার মধ্যে। এমন পরিস্থিতিতে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন রেহেনা। এ কারণে সন্তানদের হত্যার পর তিনি আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন। এ বিষয়ে শুক্রবার দুপুরে পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) বিধান ত্রিপুরা যুগান্তরকে বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে তিন সন্তানকে হত্যার পর রেহেনা আত্মহত্যা করেছেন। তবে এর প্রেক্ষাপট এবং কারণগুলো অনুসন্ধান করা হচ্ছে। পুলিশের উত্তরা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার (এডিসি) শাহেন শাহ মাহমুদ ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, হত্যার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, তিন সন্তানকে হত্যার পর মা আত্মহত্যা করেছেন। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হবে। পারিবারিক সূত্র জানায়, মোস্তফা কামাল চট্টগ্রামে একটি বায়িং হাউসে উচ্চ বেতনে চাকরি করতেন। ওই চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। পরে ডেসটিনিতে প্রায় ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। এ সময় তিনি অনেকের কাছ থেকে ধারও করেছিলেন। ডেসটিনি বন্ধ হয়ে গেলে তিনি এ টাকা আর তুলতে পারেননি। একদিকে চাকরি নেই, অন্যদিকে পাওনাদারদের চাপ ছিল তার ওপর। এসব বিষয় নিয়ে স্ত্রী রেহেনার সঙ্গে পারিবারিক কলহ ছিল তার। রেহেনার ভাবী সুলতানা বেগম জানান, ৬ বোন ৪ ভাইয়ের মধ্যে রেহেনা ছিলেন পঞ্চম। ২০০০ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাস করেছিলেন তিনি। পরে সমাজ কল্যাণে এমএ ডিগ্রি নেন। আর্থিক অনটন নিয়ে হতাশা থেকে বাঁচতে রেহেনা চাকরি খুঁজছিলেন। কিন্তু চাকরি পাননি। তুরাগের কামারপাড়ার কাইলারটেকের সানবিম স্কুল রোডের ১নং গলির ৮৯ নম্বর বাড়িতে স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন মোস্তফা কামাল। ২০১০ সালে পৈতৃক সম্পত্তির ওপর এক তলা একটি বাড়ি করেন। এ বাড়িটির মালিক তিনি ও তার বোন শামসুন্নাহার। শামসুন্নাহার চট্টগ্রামে থাকেন। কামাল জানান, ওই বাড়ির মধ্যে ২০টি ঘর আছে। এর মধ্যে তিনটি করে ঘর নিয়ে তিনি এবং তার আরেক বোন কোহিনুর থাকেন। বাকি ১৪টি ঘর ভাড়া দেয়া হয়েছে, যার টাকা তার মা ও বোন (শামসুন্নাহার) নেন। মোস্তফা কামালের ভাষ্য, দীর্ঘদিন বেকার থাকায় তারা কয়েকজন মিলে একটি যুব কল্যাণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রোপার্টি গড়ে তুলেছেন। কালিয়ারটেক এলাকাতেই এর অফিস। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে তিনি সেখানেই ছিলেন। রাত ১২টার দিকে বাসায় ফিরে তিনি স্ত্রী ও তিন সন্তানের লাশ দেখতে পান। স্থানীয় পরশমণি ল্যাবরেটরি স্কুলে তার বড় মেয়ে নুসরাত মোস্তফা আঁখি ৫ম শ্রেণীতে ও ছোট মেয়ে আরিশা মোস্তফা প্রথম শ্রেণীতে পড়ে। পরিবার যা বলছে : স্ত্রী ও তিন শিশু সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় মোস্তফা কামাল। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমার স্ত্রী আত্মহত্যা করতে পারে না। এলাকার দুই প্রভাবশালীকে ডেসটিনির ব্যবসার জন্য ৫০ লাখ টাকা দিয়েছিলাম। পরে ওই টাকা আর পাইনি। তারা এ ঘটনা ঘটাতে পারে। ওরা এতটাই প্রভাবশালী যে, ওদের নাম বললে আমাকেও মেরে ফেলবে। এদিকে নিহত রেহেনা পারভিনের ভাই মাহবুব আলম সাগর বলেন, পারিবারিক বিরোধের জেরে রেহানা পারভীনকে হত্যা করা হয়েছে। তার অভিযোগ, রেহেনার সঙ্গে ননদ, দেবর ও শাশুড়ির বিরোধ চলে আসছিল। তারা গত দেড় বছল ধরে তুরাগের ওই বাড়ি ভাড়ার সব টাকা নিয়ে নিত। তাদের এক টাকাও দিত না। রেহেনার স্বামী মোস্তফা কামাল দীর্ঘদিন ধরে বেকার রয়েছেন। কোনো আয় না থাকায় আর্থিক অনটন লেগেই থাকত। কয়েকদিন আগে ১৭ লাখ টাকার পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করা হলেও কোনো টাকা কামালকে দেয়া হয়নি। সন্তানদের লেখাপড়া চালানো এবং পরিবারের খরচ চালানো তার পক্ষে সম্ভব হতো না। এরপরও বাড়ি ভাড়ার টাকা মোস্তফা কামালকে না দিয়ে তার মা এবং ভাই-বোন ভোগ করতেন। তিনি আরও বলেন, মোস্তফা কামালের বোন কোহিনুর বেগম ও তার স্বামী ওই বাড়িতেই থাকেন। এ ঘটনার পর কোহিনুর ও তার স্বামী হাসপাতাল মর্গেও আসেননি। এতে বিষয়টি আরও সন্দেহ তৈরি করে। ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল : শুক্রবার দুপুরে ১২টায় নিহতদের লাশের ময়নাতদন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে সম্পন্ন হয়েছে। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, তিন শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। রেহেনা পারভীনের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনি আত্মহত্যা করেছেন, নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে, তা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হবে। এদিকে মৃত রেহেনা পারভীন ও তার তিন সন্তানের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছেন তুরাগ থানার এসআই খগেন্দ্র চন্দ্র সরকার।
এতে তিনি উল্লেখ করেন, মোস্তফা কামালের স্ত্রী রেহেনা পারভীন তার তিন সন্তানকে হত্যা করে নিজে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন এমন খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একটি কক্ষে তিন সন্তানের লাশ ছিল। তাদের গলায় আলাদাভাবে ওড়না পেঁচানো ছিল। অন্য কক্ষে খাটের ওপর রেহানা পারভীনের লাশ রাখা ছিল। তার গলার বামপাশে অর্ধচন্দ্রাকৃতি দাগ রয়েছে। ডান হাতের ওপরে রয়েছে রক্ত লাগানো দাগ। সুরতহাল প্রতিবেদন আরও বলা হয়, রেহেনার মেয়ে নুসরাত মোস্তফা আঁখি ওরফে শান্তার (১৩) গলায় হলুদ রঙের সুতি ওড়না দিয়ে পেঁচানো ও গলায় সামান্য কালো কালো দাগ ছিল। পা দুটি খাট থেকে নিচের দিকে হাঁটু বরাবর নামানো ছিল। এছাড়া পা দুটি গোলাপি ওড়না দিয়ে বাঁধা ছিল। তার পরনে ছিল হাফ হাতা গোলাপি গেঞ্জি ও গোলাপি সুতি পায়জামা। তার ছোট বোন আরিশার লাশ খাটের ওপরে ছিল। তার কান দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। গলায় ওড়না পেঁচানো ছিল। এছাড়া ১১ মাসের শিশু মুছামিম ওরফে সাদের গলায় ছাপা বেগুনি নীল রঙের সুতি ওড়না দিয়ে পেঁচানো ও পায়ের পাতায় রক্ত জমানো কালো দাগ ছিল। পরনে ছিল হাফ শার্ট ও হাফ প্যান্ট। নিহতদের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার উভারামপুর গ্রামে। সব হারিয়ে কামালের আর্তনাদ : ঘরে প্রবেশ করেই মোস্তফা কামাল দেখতে পান তিন শিশুসন্তান খাটের মধ্যে পড়ে আছে। ওই সময় ১১ মাস বয়সী ছেলে সাদকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করেন তিনি। ওই সময় প্রতিবেশীদের ধারণ করা একটি ভিডিও ফুটেজ যুগান্তরের কাছে এসেছে। ওই ফুটেজে দেখা যায়, ছেলেকে ধরে আহাজারি করছেন মোস্তফা কামাল। দুই মেয়ের গাল ধরে আদর করছেন। তখন তিনি শুধু বলছিলেন, আল্লাহ একি হয়ে গেল। তিনি আর কোনো কথা বলতে পারছিলেন না। প্রতিবেশীরা তাকে শান্ত করতে পারছিলেন না। কামাল উদ্দিন নামে এক প্রতিবেশী জানান, এখানে আমরা যারা থাকি তাদের মধ্যে মোস্তফা কামাল ও তার স্ত্রী রেহেনা পারভীন শিক্ষিত। এ কারণে রেহেনা অন্যদের সঙ্গে মিশতেন না। তাছাড়া তাদের অভাব-অনটনের বিষয়েও কারও কাছে বলতেন না। নাছিমা বেগম নামে এক প্রতিবেশী জানান, রেহেনা সারা দিন একাকী বাসায় থাকতেন। কখনোই প্রতিবেশীদের বাড়িতে আসতেন না।

0 comments:

Post a Comment