Last update
Loading...

ফেসবুক, নীল খাম ও আইনস্টাইনের বেহালা

মাঝে মাঝে কিছু ‘আজাইরা কাজ’ করি আমি। যেমন, সেদিন রিকশায় উঠেই চালককে বললাম, খিলগাঁও পোস্ট অফিসে চলো। পোস্টাফিসের কথা উঠতেই রাঙা মামার (বড় মামার গা আমার মা ও তার অন্যান্য ভাই-বোনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে অস্বাভাবিক দুধে-আলতার রঙ ধারণ করেছিল বলে তাকে আমরা রাঙা মামা ডাকতাম) কথা মনে পড়ে। জমিজমা দেখভাল করতেন বলে লেখাপড়া খুব একটা করতে পারেননি তিনি। পোস্টমাস্টার হয়েছিলেন এবং শুরু থেকে রিটায়ারমেন্টের আগ পর্যন্ত তার পোস্টিং ছিল লালমনিরহাট জেলার ভোটমারী পোস্টাফিসে, আমার নানাবাড়ি থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরে। রবীন্দ্রনাথের ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পের নায়কের মতো কখনও দূরাঞ্চলে পোস্টিং হয়নি বলে সেবা-শুশ্রূষার জন্য তার রতনের মতো বালিকার প্রয়োজন পড়েনি। তো সেই পাকিস্তান আমলে স্কুলের ছুটিতে নানাবাড়ি গেলেই রাঙা মামার পকেট থেকে দু’-এক টাকা খসাতে তার পোস্টাফিসে যেতেই হতো। সেখানে দেখতাম কীভাবে কাটা হচ্ছে সদ্য ট্রেন থেকে নামানো ডাকের ব্যাগ, পোস্টম্যান আলাদা করছেন এলাকাভিত্তিক চিঠি, স্ট্যাম্পিং করছেন সেগুলোর ওপর, আর মানি-অর্ডারের ফরমগুলো থেকে হিসাব করছেন প্রাপকদের টাকার অংক। পোস্টমাস্টারই অফিসটির বড়কর্তা। রাঙা মামা কী কী যেন লিখতেন আর ছোট্ট একটা ফাঁক দিয়ে গ্রামবাসী টাকা ঢুকিয়ে তার হাত থেকে নিতেন খাম, ডাকটিকিট, মানি-অর্ডার ফরম। টু-থ্রিতে পড়তাম যখন, পোস্টাফিসে যাওয়া হয়নি তখনও, চিঠিগুলো ঢাকা থেকে কীভাবে ভোটমারী আসে বুঝতাম না। একদিন রাঙা মামাকে জিজ্ঞেস করায় বলেছিলেন- ফেরেশতারা নিয়ে আসেন। এই শুনে একদিন ছোট্ট একটা চিঠি লিখে রাঙা মামার বিছানার নিচে রেখে ফেরেশতাদের উদ্দেশে বলেছিলাম, চিঠিটা নানির বিছানার নিচে পৌঁছে দিন তো। ঘণ্টাখানেক পর সেখানে সেটা না পেয়ে খুব হতাশ হয়েছিলাম। ক্লায়েন্টশূন্য খিলগাঁও পোস্টাফিসে পৌঁছেই আমি ৩০০ টাকা দিয়ে কটকটা হলুদ রঙের একশ’টি ডাকবিভাগের খাম কিনি। কর্মটি একান্তই আমার ব্যক্তিগত একটি আন্দোলনের অংশ। প্রথমেই আমি একটি ছোট্ট চিঠি- ‘আমি ভালো আছি’- লিখে একটা খামে ভরে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক বান্ধবীর ঠিকানা লেখার পর খামটি পোস্টাফিস-সংলগ্ন ডাকবাক্সে ফেলি, অতঃপর বাকি খামগুলো অফিসে নিয়ে এসে রাখি ড্রয়ারে। ডিপার্টমেন্টের কলিগদের দিয়ে শুরু হয় আন্দোলনের পরের পর্ব। সবার হাতে একটি করে খাম ধরিয়ে দিয়ে বলি- প্রিয়জনদের মধ্য থেকে বেছে যে কোনো একজনকে একটা চিঠি লিখবেন প্লিজ। সিদ্ধান্ত হয়, এরপর যারাই দেখা করতে আসবেন, প্রত্যেককেই দেয়া হবে একটি খাম। এই লেখাটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, তাই প্রথমেই বলে রাখছি আমি কিন্তু টেকনোলজির বিরুদ্ধবাদী কেউ নই। বরং আমার ধীশক্তি যদি ভালো হতো, এইসব ছাইপাশ না লিখে নব নব টেকনোলজি উদ্ভাবনেরই চেষ্টা নিতাম। জীবন যতই জটিল হচ্ছে, প্রকৃতি যতই বিরূপ হয়ে পড়ছে, যতই বাড়ছে মানুষ- টেকনোলজির অভাব ততই অনুভূত হচ্ছে। যেমন, কুড়ি বছর আগেও মোবাইল ফোন অপরিহার্য কোনো ভোগ্যপণ্য ছিল না,
বাসাবো থেকে মিরপুর গিয়ে বন্ধুকে পেলাম না তো কী হয়েছে, কুড়ি আর কুড়ি চল্লিশ মিনিট নষ্ট হতো বড়জোর। এখন নষ্ট হবে কমপক্ষে চার ঘণ্টা, অবরুদ্ধ গতির বিরক্তি তো আছেই। মোবাইল তাই এখন অপরিহার্য একটি যন্ত্র, এর কল্যাণে আগেই জেনে নিচ্ছি যার কাছে যাব তাকে পাব কিনা। অথবা যন্ত্রটির মাধ্যমেই সেরে নিচ্ছি প্রয়োজনীয় কথা। টেকনোলজির এমন অসংখ্য অপরিহার্যতার কথা বলা যায়, সেগুলো না বলে এটুকু বলাই যথেষ্ট যে, এই পৃথিবীর উৎপাদিকা শক্তি ও ধারণক্ষমতা এখন যেমন আছে, সবসময়ই যেহেতু তেমন থাকবে না, সেহেতু সেই ঘাটতি পূরণের জন্য টেকনোলজি মানবজাতির এক অনিবার্য জীবনাদর্শ। আমরা আসলে কথা বলব এখন টেকনোলজির ব্যবহার নিয়ে। না, ‘রবীন্দ্র সমগ্র’-এর মতো ‘টেকনোলজি সমগ্র’-এর ব্যবহার আমাদের প্রতিপাদ্য নয়। এই ক্ষুদ্র পরিসরে সেটা সম্ভবও নয়। টেকনোলজির ব্যবহার সম্পর্কে আইনস্টাইনের মতো সারগর্ভ কথা আর কেউ বলেননি। বলেছিলেন- Technology without liberal arts may turn an explosive- মননশীল শিল্প ছাড়া প্রযুক্তি বিস্ফোরক হয়ে পড়তে পারে। সে কারণেই সম্ভবত, আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্ব এবং E = mc2-এর মতো ফর্মুলা বের হয়েছিল যার মাথা থেকে, তার হাতে ধরা থাকত একটি বেহালা। সেই বেহালার সুরের একটি অর্থ হয়তো এমন যে, আনবিক শক্তির প্রচণ্ডতা তো বুঝলে, সেটার দরকারও ছিল, তবে তা প্রয়োগ করার আগে মনটাকে শিল্পসম্মত করে তোলো। যা হোক, আমরা কথা বলব হাজারো টেকনোলজির একটি- তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে; সেটাও আবার সমগ্রতায় নয়, শুধুই ফেসবুক। আবার বলে রাখি, ফেসবুকের ব্যবহার নয়, এর বর্তমান ধারার ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকব আমরা। তুলনা করার সুযোগ নেই যার, তার বঞ্চনাবোধও থাকে না।
যেমন, বয়স্ক আমরা যখন জ্যামে পড়ি, তখন বিরক্ত হই, কখনও আবার সেই বিরক্তি চরমে ওঠে। কিন্তু খেয়াল করে দেখেছি এখনকার তরুণ-তরুণীরা জ্যামে পড়লে ‘শিট’, ‘রাবিশ’ ইত্যাদি বলা দূরের কথা, খুব একটা ভাবান্তরও হয় না তাদের। কারণ এই যে, জ্যামহীন ঢাকার শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্যের অভিজ্ঞতা নেই তাদের আর তাই তুলনা করতে পারে না বলে জ্যামের ঢাকাকেই স্বাভাবিক মনে করে। ঠিক তেমন খামে ভরা চিঠি, সেটা যদি আবার হয় নীল খাম, ডাকপিয়নের হাত থেকে পাওয়ার যে কী আনন্দ, সেই যুগটা তারা দেখেনি বলে স্মার্টফোন অথবা ল্যাপটপের কমিউনিকেশনটাই তাদের কাছে মোক্ষম। সেটা না হয় ঠিক আছে, চিঠি দিয়ে তো আর প্রতিদিন যোগাযোগ করা যায় না। কিন্তু ফেসবুকের এ কেমন ব্যবহার যে, এইট-নাইনে পড়া ছেলে-মেয়ে তার রুমের দরজা বন্ধ করে প্রহরের পর প্রহর মগ্ন থাকবে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে, এমনকি ডাইনিং টেবিলেও বাবা-মার সঙ্গে কথা বলার মানসিকতা থাকবে না, বার্ট্রান্ড রাসেলের চেয়েও বড় দার্শনিক সেজে কী যেন ভাববে? এটা কেমন ফেসবুক যে, সেটা থেকে তাকে আলাদা করতে চাইলে সে আত্মহত্যার হুমকি দেবে? Habit is the second nature- সে কারণেই কি ফেসবুক চালানো এমন অভ্যাস হয়েছে যে, ব্যবহারকারীর দ্বিতীয় সত্তা হয়ে পড়েছে তা, আর সেটাকে আঘাত করা মানে জীবন বিপন্ন হয়ে পড়া? হবে হয়তো, কারণ এমন ইউজারও পাওয়া গেছে, ফোনে চার্জ নেই অথচ সে এমন মগ্ন যে, খেয়াল করছে না, তাকিয়েই থেকেছে স্ক্রিনে আর বৃথাই দেখতে চেয়েছে ক’টা লাইক পড়েছে তার স্ট্যাটাসে। পাঠকরা জানেন কি, রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালে ফেসবুক-আসক্ত রোগীর সংখ্যা ইতিমধ্যেই অনেক। সেখানে এমন রোগীও রয়েছে, যাকে ভারতেশ্বরী হোমস থেকে ফেসবুক-আসক্তির কারণে বহিষ্কার করার পর সে ভর্তি হয়েছিল শাহীন স্কুলে। স্কুল বদলেছে, আসক্তি বদলায়নি। সেই ভবিষ্যদ্বাণীই ফলে যায়, যদি ভবিষ্যৎবক্তা বিষয়টিকে যোগ্যতার সঙ্গে স্কয়ারলি দেখতে পারেন। ফেসবুকের mass use বা গণব্যবহার শুরু হওয়ার বেশিদিন হয়নি, তাই বর্তমান ধারার ব্যবহার আলটিমেটলি মানবসমাজের কতটা ক্ষতি করবে, তার পরিমাপ করার সময় এখনও হয়নি। তবে বর্তমান ধারাটি অব্যাহত থাকলে একটা সময় যে আমাদের এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে, কে বলবে মিছা কথা! চোখের মাইওয়াপিয়া (হ্রস্বদৃষ্টি) ও নিউরোলজিক্যাল সমস্যাসহ কী কী সংকটে পড়তে যাচ্ছে আজকের ফেসবুক জেনারেশন, সেসব ফিজিওলজিক্যাল ব্যাপার-স্যাপার ডাক্তাররাই বলবেন, আমরা শুধু মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ড্যামেজগুলোর কথাই সংক্ষেপে বলে যাব। অবশ্য এই মুহূর্তে যেসব ভাবনা স্ট্রাইক করছে, সেগুলোই শুধু। আবারও বলছি, আমরা কিন্তু ফেসবুকের বিরোধিতা করছি না, এর বর্তমান ধারার ব্যবহার নিয়ে কথা।
ক. ফেসবুক আমাদের মুড কন্ট্রোল করছে। প্রতিবারই যখন লগইন করছি, মনজুড়ে থাকছে রেড নোটিফেকশনের প্রত্যাশা। ভালো কথা, লাইক যদি বেশি পেলাম, নিউরোট্রান্সমিটার ডোপামিনের নিঃসরণ বেড়ে গেল, মুডটা হ্যাপি হয়ে গেল। কিন্তু যদি না দেখছি লাইক অথবা দেখলেও আগের লাইকের চেয়ে সংখ্যায় কম, তখন? মুহূর্তেই ডিপ্রেশন। এই যে মুডের ফ্লাকচুয়েশন, এর কি কোনোই প্রভাব নেই মনস্তত্ত্বে? অথবা যদি বলি, এত তুচ্ছ কারণে লাইফ হ্যাপি কিংবা আনহ্যাপি হতে পারে?
খ. ফেসবুক ক্রমাগতভাবে মানুষকে তার রিয়াল লাইফ থেকে আইসোলেট করে একটা ভার্চুয়াল জগতে নিয়ে যাচ্ছে। সে তার পারিপার্শ্বিক জগতকে পর্যবেক্ষণ করতে পারছে না, ভার্চুয়াল জগতেই তার বিচরণ। এমন একটা সময় হয়তো আসবে, তার বাস্তব জীবন বলে কিছু থাকবে না।
গ. তরুণ প্রজন্মকে নার্সিসিস্ট অর্থাৎ আত্মপ্রেমিক বানিয়ে তুলছে ফেসবুক। প্রতি মুহূর্তে সে কী করছে, কী পরছে, কী খাচ্ছে- ছবি তুলে শেয়ার দিচ্ছে আর ভাবছে তাতে প্রত্যাশার বেশি পড়বে লাইক। তার এই নার্সিসিজম যত বাড়বে, অন্যের প্রতি সহানুভূতি ততই কমতে থাকবে।
ঘ. ফেসবুকের ইউজার মাইন্ডফুল থাকছে শুধুই তার স্মার্টফোন অথবা ল্যাপটপে, বাকি সবকিছুতেই সে আনমাইন্ডফুল। অথচ জীবনের সবকিছুই, এমনকি খাওয়া-দাওয়াটাও করতে হয় প্রেজেন্স অফ মাইন্ডে।
ঙ. বলা হচ্ছে, ফেসবুক হচ্ছে সোশ্যাল কমিউনিকেশন মিডিয়া। কিন্তু এই কমিউনিকেশনের সোশ্যাল ইমপ্লিকেশনটা কী? রামপাল ইস্যু ধরা যাক। লাইক পড়েছে লাখে লাখে, মাঠে জমায়েত হয়েছে কত? কয়েকশ’। মানে কী? মানে ফেসবুকের মাধ্যমে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন যিনি, তিনি মনে করেছেন এক মহাদায়িত্ব পালন করা হয়েছে। অতিরিক্ত কিছু করার দরকার নেই। অর্থাৎ যোগাযোগটা সলিড নয়, বায়বীয়। মাঠ বা রাস্তাটা হল রিয়াল লাইফ, সেখানে নামবেন কেন তিনি, তিনি যে ভার্চুয়াল জগতের বাসিন্দা। ফেসবুকের যোগাযোগটাকে আমি বলি, পরস্পর পিঠ চুলকাচুলকি। ইংরেজিত বলে end justifies means- মানুষে মানুষে সম্পর্ক, রাজনীতিসহ সব কিছুর পরিণতিই বলে দেয় পদ্ধতি বা উপায়টা ঠিক ছিল কিনা। ফেসবুকের কোন্ যোগাযোগের ইতিবাচক ফল দেখেছি আমরা? তাহরির স্কয়ার? সে তো লস্ট গেম!
চ. টেক্সটের মাধ্যমে যে যোগাযোগ, সেটা টোটাল কমিউনিকেশনের মাত্র ৭ শতাংশ, ভয়েস কলের ক্ষেত্রে সেটা ৪৫ শতাংশ, কেবল মুখোমুখি সাক্ষাতেই একজনকে পুরোপুরি বুঝে ওঠা সম্ভব। ফলে ফেসবুকের যোগাযোগ অনেক বিভ্রান্তি তৈরি করছে, সৃষ্টি করছে ভুল বোঝাবুঝি, আর এতে বিপদগ্রস্তও হচ্ছে অনেকে। ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’- এই টেক্সট সৎ না ফেক- বডি ল্যাংগুয়েজ ও মোড অফ এক্সপ্রেশন ছাড়া বুঝব কীভাবে?
ছ. ফেসবুক তরুণ-তরুণীকে ঝুঁকিপ্রবণও করে তুলছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই ঘটাচ্ছে বড় ধরনের বিপদ। কিছুদিন আগে ভারতে একটি চলন্ত ট্রেনের কত সামনে থেকে সেলফি তুলে পোস্ট করা যায়, সেই চেষ্টায় ট্রেনটিতে কাটা পড়ে মরেছে এক তরুণ। দ্যাখো আমি কত বড় অ্যাডভেঞ্চারাস- এই অর্থহীন বীরপুঙ্গব তৈরি করে চলেছে ফেসবুক।
জ. স্ট্রং পার্সোনালিটি না থাকলে ফেসবুক কি হীন মানসিকতাও (inferiority complex) জন্ম দেয় না? ও সোনারগাঁয়ে খাচ্ছে, দামি গাড়ির ছবি দেখাচ্ছে, নায়াগ্রা ফল্সের সামনে দাঁড়িয়ে আছে- আমি পারছি না। এই কমপ্লেক্সের সঙ্গে পরশ্রীকাতরতাও কি মিশে থাকতে পারে না?
ঝ. ফেসবুক কি বাজার অর্থনীতির এক মাস্টারপ্ল্যান? এই অর্থে যে, মানুষকে আইসোলেট করে ফেলো, তাহলে সে বেশি বেশি কনজিউম করবে। তাই তো! একা অথবা বিষণ্ণ হয়ে পড়লে শপিংয়ে যাওয়ার ইচ্ছা জাগে, বারে গিয়ে মদ খেতে হয়।
ঞ. ফেসবুক জীবনের শৃঙ্খলা ভেঙে দিয়েছে। তরুণ-তরুণীর ঘুমানোর সময় এখন অনির্ধারিত, কতক্ষণ ঘুমাবে সে তারও ঠিক নেই, নিউ মার্কেট বা বেইলি রোড থেকে মনের মতো একটা বই কিনে পড়ার যে আনন্দ, সেটা সে জানে না; প্রেম করে, কিন্তু কীভাবে সেটা করতে হয় সেই শিল্প জানে না; মুখোমুখি বসে না, পাশাপাশি বসে কিছুক্ষণ, এরপর দু’জনেরই হাত চলে যায় স্ক্রিনে। পাশে বসা মানব বা মানবীর চেয়ে হাতের যন্ত্রটিই তার আপন বেশি। আসলে সে নিজেই স্টেরিওটাইপ একটা যন্ত্রবিশেষ।
ট. ফেসবুক কি তরুণ প্রজন্মের ক্রিয়েটিভিটিও নষ্ট করছে না? কানেক্টেড ফ্রেন্ডদের নিরর্থক ইনফরমেশনে ঠাসা তার মাথা। ইনফরমেশনের প্রতি ঝোঁক যার, সে সৃজনশীল হবে কীভাবে? আইটি সেক্টরের মুঘলরা মানুষের মগজ ধোলাইয়ে একটা বড় সাফল্য পেয়েছে। Knowledge is power-এর পরিবর্তে তারা মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে Information is power. জ্ঞান, নব উদ্ভাবন- এসব এখন অতি মামুলি বিষয়। কোন্ বন্ধু আজ কোন্ রেস্টুরেন্টে খেলো, কোন্ বাসে কক্সবাজার গেল- এসব ইনফরমেশন জানলেই চলে এখন। ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে পড়েছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম। গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ডের জন্য বরাদ্দ থাকে সময়, ওদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেড়ে নিচ্ছে সময় রাস্তার জ্যাম, ফেসবুকে যাচ্ছে প্রহরের পর প্রহর। বাকি যেটুকু থাকে, সে তো ঘুমের। কাজটা করে সে কখন? স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ইত্যাদির প্রকৃত অর্থ কী, আমি এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। তবে এটুকু বুঝি, মনে যা-ই থাক, প্রকাশ্যে ধর্মদ্রোহিতা কিংবা দেশদ্রোহিতা কোনোভাবেই স্বাধীনতা নয়। শিশুর স্কুলবিমুখতাও যেমন। এ ধরনের স্বাধীনতা অ্যালাও করা যায় না। ফেসবুক ব্যবহারের বর্তমান যে রীতি, সেটাকেও কিশোর-তরুণ-যুবার স্বাধীনতা মেনে নিই কী করে? পাল্টাতেই হবে এই রীতি।
পুনশ্চঃ ‘আমি ভালো আছি’- এই ছোট্ট চিঠিটা বান্ধবীকে পোস্ট করার সময় একটা ঘটনা মনে পড়েছিল। পাঠকের সঙ্গে শেয়ার করি। পোস্টাল ডিপার্টমেন্ট গ্রাহকদের একটা সুবিধা দিয়ে থাকে। কারও কাছে যদি টাকা না থাকে এবং তিনি জরুরিভিত্তিতে কাউকে চিঠি লিখতে চান, তাহলে ডাকটিকিট ছাড়াই, অর্থাৎ বিনা খরচায় চিঠি পাঠাতে পারেন তিনি। এটাকে বলে বিয়ারিং চিঠি, অর্থাৎ প্রাপককে দ্বিগুণ চার্জ দিয়ে চিঠিটি খালাস করতে হবে। তো দুই বন্ধু, খুব বিখ্যাত ছিলেন তারা, নাম মনে নেই, ধরা যাক তাদের নাম টম ও ডিক- থাকতেন ইউরোপের দুই আলাদা শহরে। টম একবার আমার মতো ‘আমি ভালো আছি’- এই তিনটি শব্দ লিখে ডিককে একটি বিয়ারিং চিঠি পাঠাল, উদ্দেশ্য খামোখাই তার কিছু টাকা নষ্ট করা। কয়েকদিন পর টমের নামে এলো একটি বড়, ভারি পার্সেল; সেটাও বিয়ারিং। তিনি পার্সেলটিকে একটা দামি গিফট ভেবে মহা উৎসাহে দ্বিগুণ চার্জ দিয়ে ডেলিভারি নিলেন। খুলে দেখলেন, সেটা একটি পাথরখণ্ড, পাঠিয়েছে ডিক, সঙ্গে একটি চিঠি, সেখানে লেখা রয়েছে- তুমি ভালো আছো জেনে এই পাথরটি আমার বুকের উপর দিয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। তবে এত বড় প্রতিশোধের পর টম দমবার পাত্র নয়। তিনি লিখলেন, এবার আর বিয়ারিং নয়- তুমি পাথরখণ্ডটি এমনভাবে ভেঙেছ যে, সেটা একটা শিল্পের আকার ধারণ করেছে। ওটাকে আমি শোপিস করে রেখেছি!
লেখক : সাংবাদিক

0 comments:

Post a Comment