Last update
Loading...

সিরিয়া ইস্যুতে ইরানি-রুশ অক্ষের সঙ্গে এরদোগানের আপোষের রহস্য

সিরিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে এই ইস্যুতে ইরান ও রাশিয়ার দিকে তুরস্কের ঝুঁকে পড়ার বিষয়ে আমরা সম্প্রতি কথা বলেছি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষক মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খানের সাথে। রেডিও তেহরানকে দেয়া তার ওই সাক্ষাৎকার এখানে তুলে ধরা হল:
রেডিও তেহরান: জনাব মোহাম্মাদ মুনির হোসেন খান সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়ার পরিস্থিতিতে একটি বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। আর এরই প্রমাণ হল তুরস্কের এরদোগান সরকার  সিরিয়ায় ইরান ও রাশিয়ার প্রস্তাবিত ডিএস্কেলেশন জোন তথা উত্তেজনা-মুক্ত বা যুদ্ধ-মুক্ত অঞ্চল গঠনের প্রস্তাবটি মেনে নিয়েছে। প্রশ্ন হল তুর্কি সরকার  ইরান ও রাশিয়ার এই প্রস্তাবে কেন সম্মত হলো? আর পাশ্চাত্য ও তার আঞ্চলিক মিত্র আর সেবাদাস সরকারগুলো কেনোইবা আসাদের বিরোধিতায়  আদাজল খেয়ে লেগেছিল? সিরিয়ার নিকট-অতীত ও সাম্প্রতিক পরিস্থিতির পটভূমিসহ এসব বিষয়ে আপনার মতামত ও ব্যাখ্যা জানতে চাই।
মোহাম্মাদ মুনির হোসেন খান:  আপনার প্রশ্নের প্রথম অংশের  জবাব স্পষ্টভাবে দেয়ার জন্যই আগে আমাদের জানা দরকার  সিরিয়া সংকটের নিয়ামক বা ফ্যাক্টরগুলো সম্পর্কে।  এই ফ্যাক্টরগুলোর অন্যতম হচ্ছে তুরস্কের এরদোগান সরকার। শুধু অন্যতমই নয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরও বটে এই তুরস্ক। তুরস্ক যদি এ সংকট সৃষ্টির ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন না করত তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,ব্রিটেন, ইসরাইল, সৌদি আরব, কাতার, আমিরাত, জর্দান প্রভৃতির পক্ষে সিরিয়ায় গোলযোগ, ফিতনা ও সংকট তৈরি করা আদৌ সম্ভব হতো কিনা সন্দেহ। সিরিয়ায় গোলযোগ সৃষ্টিকারী অধিকাংশ দেশি-বিদেশি জঙ্গি সন্ত্রাসীর সামরিক প্রশিক্ষণ এবং তাদের জন্য বেশিরভাগ অস্ত্র-গোলাবারুদ ও  রসদপত্র সরবরাহ আর  লজিস্টিক সাপোর্টসহ নানা ধরনের সহায়তা দান  তুর্কী-সিরিয়া সীমান্ত দিয়ে তুরস্কের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। অবশ্য  ইহুদিবাদী  ইসরাইলও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান ও ভূমিকা রেখেছে এবং বর্তমানেও রাখছে। আর জর্দান ছোট দেশ এবং সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ার কারণে জর্দানের পক্ষ থেকে সিরিয়ায় গোলযোগ সৃষ্টিকারীদের প্রতি লজিস্টিক সুযোগ-সুবিধা দেয়া স্বাভাবিকভাবে যে কম হবে তা স্পষ্ট।
তাছাড়া তুরস্ক ও ইরাকের সাথে রয়েছে সিরিয়ার সবচেয়ে বেশি দীর্ঘ সীমান্ত। তুরস্ক জর্দানের চেয়ে সামরিক, অর্থনৈতিক ওজন আর শক্তির দিক থেকে বহুগুণ শক্তিশালী একটি শিল্পোন্নত দেশ এবং ন্যাটোর এক অন্যতম শক্তিশালী সক্রিয় সদস্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর ন্যাটো-জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক বাহিনী রয়েছে তুরস্কের। তুরস্ক শিল্পোন্নত ও অর্থনৈতিকভাবে প্রাগ্রসর ২০ জাতি জোটেরও অন্তর্ভুক্ত। আবার বিশ্বের বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলো থেকে রিক্রুটকৃত বহু জঙ্গি জিহাদিকে ইসরাইলে এনে সামরিক ট্রেনিং এবং ইসরাইল-সিরিয়া সীমান্ত দিয়ে সিরিয়ায় পাঠাতে গেলে তাদের অনেকেই হয়তো তাতে রাজী হতো না। কিন্তু তুরস্ক এক্ষেত্রে সীমান্তের দেশ ও সহযোগী হওয়াতে এই সমস্যায় পড়তে হয়নি মার্কিন, সৌদি, কাতারি ও আমিরাত সরকারকে। তাই, তুরস্কে এদেরকে অনায়াসে চালান দেয়া সম্ভব হয়েছে।
উল্লেখ্য, যখন এরদোগান-আব্দুল্লাহ গুলের এ.কে পার্টি (জাস্টিস পার্টি) বিংশ শতাব্দীর ৯০ দশকের শেষের দিকে তুরস্কে ক্ষমতা লাভ করে তখন সিরিয়ার বাশার আল আসাদ সরকারের সাথে আব্দুল্লাহ-এরদোগান প্রশাসনের বেশ উষ্ণ সম্পর্ক ছিল। এরদোগান তো বাশার আল আসাদকে ভাই পর্যন্ত বলেছিল। তুরস্ক-সিরিয়া উষ্ণ সম্পর্কের বদৌলতে সিরিয়ায় আশ্রয়গ্রহণকারী তুরস্কের বামপন্থী বিদ্রোহী কুর্দি নেতা আব্দুল্লাহ ওজালানকে তুরস্কে এনে পরবর্তীতে তার সাথে শান্তি ও যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে দক্ষিণ তুরস্কের কুর্দিস্তানে দীর্ঘ তিন দশক স্থায়ী কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী পিকেকে’র বিদ্রোহের আপাততঃ নিষ্পত্তি হয়। ২০১১ সাল পর্যন্ত এ সম্পর্ক ভালোই ছিল।
কিন্তু ২০১১ সালের জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মাসে তিউনিসিয়া, মিসর, লিবিয়া, বাহরাইন, ইয়েমেনের জনগণ মার্কিন ও পাশ্চাত্য সমর্থিত স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণ অভ্যুত্থান করলে একের পর এক তিউনিসিয়া ও মিসরের স্বৈরাচারী শাসক বেন আলী ও হুসনি মুবারক সরকারের পতন ঘটে এবং লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধের সূচনা হয় এবং কয়েক মাস গৃহযুদ্ধ চলার পর লিবিয়ায় গাদ্দাফি সরকারের পতন হয় এবং ঐ বছরই স্বৈরতান্ত্রিক একনায়ক গাদ্দাফি নিহত হয়।
ঠিক একইভাবে ইয়েমেনের মার্কিন-সৌদি সমর্থিত একনায়ক আলী আব্দুল্লাহ সালেহ সরকারেরও পতন ঘটে। কিন্তু মার্কিন সরকারের নির্দেশে সৌদি সরকার সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে ২০১১ সালে বাহরাইনের ক্ষমতাসীন রাজবংশ আল-খলিফাকে বাহরাইনি জনগণের ন্যায্য গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের হাত থেকে রক্ষা করে।  নিতান্ত পরিহাসের  বিষয় হচ্ছে এই যে,পাশ্চাত্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাহরাইনের জনগণের জন্য গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার গুরুত্বপূর্ণ নয় এবং সেদেশে স্বৈরাচারী জালেম শাসকের মধ্যযুগীয় রাজতন্ত্র থাকলেও তাতে আপত্তি ও অসুবিধা নেই!
কিন্তু পাশ্চাত্য ও মার্কিন সরকারের দৃষ্টিতে সিরিয়ায় তথাকথিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অত্যাবশ্যক তথা ফরজ! এর কারণ হচ্ছে বাহরাইনে গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে মার্কিন ও পাশ্চাত্যের অবৈধ স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয় এবং সিরিয়ায় তথাকথিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে পাশ্চাত্যের সেইসব অবৈধ স্বার্থ অটুট থাকে! অর্থাৎ সিরিয়ায় আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারলে ইসরাইলের নিরাপত্তা, অস্তিত্ব ও গোটা মধ্যপ্রাচ্যের উপর এর অবৈধ আধিপত্য, কর্তৃত্ব ও একচেটিয়া দাপট প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা বিধান করা সম্ভব যা ইতোমধ্যে হুমকির সম্মুখীন ও সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল ৩৩ দিনের ইসরাইল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধে এবং ২২দিন ও ৮ দিনের দু-দু’টো ইসরাইল গাজা যুদ্ধে।
এটা স্পষ্ট মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের আধিপত্য, কর্তৃত্ব ও একক দাপট  আসলে পাশ্চাত্য, বিশেষকরে ইঙ্গ-মার্কিন আধিপত্য,কর্তৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বেরই নামান্তর এবং এ যুদ্ধগুলোয় ইসরাইলের ভরাডুবি ও ব্যর্থতায় সিরিয়ার বাশার আল আসাদ সরকারের অবদান ও ভূমিকা ছিল সত্যিই অনস্বীকার্য যা ইসরাইল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। তাই আরব বিশ্বে পাশ্চাত্য সমর্থিত স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে  গণঅভ্যুত্থান চলাকালে মধ্যপ্রাচ্যের এ অবস্থা ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সিআইএ, এমআই-সিক্স (ব্রিটেন), মোসাদ(ইসরাইল) এবং সৌদি-কাতারি-তুর্কি শাসকচক্রের নীলনকশা, সার্বিক সহায়তা ও মদদে সিরিয়ায় এক কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাশার আল আসাদ সরকারের পতন ঘটানোর উদ্যোগ নেয়া হয় খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে।
সিরিয়া বিরোধী ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইলী পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রে আরব প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের (সৌদি আরব, কাতার,প্রভৃতি)সহযোগিতা নিতান্ত স্বাভাবিক কিন্তু তুরস্ক কেন এর সহযোগী হয়েছে?  এরদোগান ইসরাইল আরোপিত  ২০০৮ সালে গাজা অবরোধ ভাঙ্গার জন্য ত্রাণ সামগ্রী এবং গাজা অবরোধের বিরুদ্ধে সোচ্চার মানবাধিকার কর্মীদের বহনকারী তুর্কী জাহাজে ইসরাইলী হেলিকপ্টারের আক্রমণে কিছু তুর্কী ও বিদেশী নাগরিক নিহত হওয়া এবং ইসরাইলী নৌবাহিনী কর্তৃক উক্ত জাহাজ আটক করার প্রতিবাদে ইসরাইল থেকে তুর্কী রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে তুর্কী-ইসরাইল কূটনৈতিক সম্পর্ক স্মরণাতীতকালে সর্বনিম্ন পর্যায় নামিয়ে এনেছিল।
আর ২০০৯ সালের ডিসেম্বর -২০১০ সালের জানুয়ারির ২২ দিনের প্রথম ইসরাইল-গাজা যুদ্ধে সহস্রাধিক বেসামরিক নারী-পুরুষ ও শিশু নৃশংস ইসরাইলী বিমান হামলায় নিহত হওয়ার প্রতিবাদ হিসেবে ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট শিমোন পেরেজকে শিশু হত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধী বলে আখ্যায়িত করে সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে আন্তর্জাতিক কনফারেন্স কক্ষ সবার সামনে ত্যাগ করেছিল এরদোগান। অথচ সেই এরদোগানই আবার শরীক হয়েছে অশুভ অপবিত্র শয়তানি খবিস ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইলী-আরব জোটে সিরিয়ার বিরুদ্ধে ২০১১ সালে।
এত অল্প সময়ের মধ্যে এত বিরাট পরিবর্তন ও মহাডিগবাজি তথা এরপর অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই এই এরদোগান সরকার রাষ্ট্রদূত পর্যায় তুর্কী-ইসরাইল কূটনৈতিক সম্পর্ককে আবার সম্পূর্ণ স্বাভাবিক করেছে। অথচ এই সময়ের মধ্যে ইসরাইল গাজার সাথে আরও দু-দু’টি যুদ্ধ করে (৮দিনের যুদ্ধ ও ২০১৪ সালের জুন-জুলাইয়ের (রমযান-শাওয়াল) প্রায় ৫৪ দিনের যুদ্ধ)  নির্বিচারে বোমাবর্ষণ ও বিমান হামলা চালিয়ে গাজায় হাজার হাজার বেসামরিক ফিলিস্তিনি নর-নারী ও শিশু হত্যা করে। এ দুই যুদ্ধে ইসরাইল অবরুদ্ধ গাজায় হাজার হাজার নিরীহ নর-নারী ও শিশু হত্যা করা সত্ত্বেও এরদোগানের দৃষ্টিতে নেতানিয়াহু (ইসরাইলী প্রধান মন্ত্রী),ইহুদ বারাক ও শিমোন পেরেজ আর শিশু হত্যাকারী বলে গণ্য হয় নি! এর কারণ কি?..
কারণ, এ দুটো (ইসরাইল-গাজা) যুদ্ধ হয়েছিল সিরিয়ায় ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইলি-সৌদি-কাতারি-তুর্কি সরকারের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ ও গোলযোগ চলাকালীন সময়। তাই এরদোগান কিভাবে সিরিয়ায় অশান্তি, সংকট ও গোলযোগ সৃষ্টির পরিকল্পনা ও প্রক্রিয়ায় নিজ শরীককে (ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী) শিশু-হত্যাকারী বলে অভিহিত করতে পারে?
এখন আমরা উত্থাপিত প্রশ্নের প্রথম অংশের জবাব দেয়ার চেষ্টা করব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিলুপ্ত ওসমানী (অটোম্যান) সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর উচ্চাভিলাষী এরদোগানকে সিরিয়ায় মার্কিন-ইসরাইল-সৌদি-কাতারি-তুর্কি  আধিপত্য স্থাপনে শরীক হওয়ার টোপ দিয়ে সেদেশে এই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিতে টেনে নিয়ে আসে। আর এভাবে সৌদি-কাতারি অর্থায়নের পাশাপাশি তুরস্কের সার্বিক ও সর্বাত্মক লজিস্টিক সহায়তা এবং ফিল্ড সাপোর্টে  নোংরা-অশুভ-কুচক্রী  ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইলি অক্ষটি (The unholy evil vicious Anglo-U.S-Israeli AXIS) সিরিয়ায় নিজেদের নীল-নক্সা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হয়। এ নীল নক্সার স্বরূপটা আরও কিছু পরে ব্যাখ্যা করব।
আর ওসমানী সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর উচ্চাভিলাষী এরদোগান সিরিয়ায় আধিপত্য স্থাপনের আশায় অথবা অন্ততপক্ষে সিরিয়ার তুর্কি সীমান্তবর্তী উত্তরাঞ্চল যার কিছু অধিবাসী তুর্কী ভাষাভাষী তুর্কমেন এবং তেলসমৃদ্ধ হওয়ায় তা তুরস্কের অন্তর্ভুক্ত করার লোভে ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইলি এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জড়িত হয়।
তুরস্কের এ ধরণের উচ্চাভিলাষ ইরাককে নিয়েও রয়েছে। ইরাকের তেলসমৃদ্ধ কির্কুক ও মসুল প্রদেশের প্রতিও তুরস্কের লোলুপ দৃষ্টি রয়েছে। কারণ এ অঞ্চলের অধিবাসীদের একটা অংশ তুর্কী ভাষাভাষী তুর্কমেন। তাই দায়েশ (আইএস) জঙ্গি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ইরাকী সেনাবাহিনী ও জনপ্রিয় গণবাহিনী আল-হাশদুশশাবী সফল অভিযান শুরু করলে সুপ্রতিবেশীসুলভ মনোবৃত্তি পরিহার করে তুর্কী বাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে মসুল প্রদেশের উত্তরে ইরাকী ভূখণ্ডের কয়েক কিলোমিটার ভিতরে দখলদার বাহিনীর মতো অবস্থান নেয়। ইরাক সরকার এর তীব্র প্রতিবাদ করে আসছে। ঠিক এ ধরণের কাজ তুরস্ক উত্তর সিরিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলেও করে আসছে। সিরিয়া সরকারের সেনাবাহিনীর হাতে বিপর্যস্ত পলায়নপর জঙ্গি সন্ত্রাসীরা যাতে করে সীমান্ত অতিক্রম করে তুরস্কের ভেতরে অনুপ্রবেশ করতে না পারে সেই অজুহাতে তুর্কি সরকার সিরিয়ার  এইসব সীমান্তে সেনা পাঠায়। অথচ এসব পলায়নপর জঙ্গি সন্ত্রাসীদের সিংহভাগই বিগত বছরগুলোয় তুরস্কে সামরিক ট্রেনিং নিয়ে তুর্কী-সিরিয় সীমান্ত দিয়ে সিরিয়ায় প্রবেশ করেছে।এদের কাছেই তুরস্ক হতে অস্ত্র, গোলাবারুদ, খাদ্য ও রসদপত্র সরবরাহ করা হত এবং বর্তমানেও তা করা হচ্ছে যা শুনতে সত্যি খুব অবাকই লাগে।
উল্লেখ্য ইরাক ও সিরিয়ার দায়েশ (আইএস) অধিকৃত অঞ্চলের তেলখনির তেল (পেট্রোলিয়াম) এ জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি তুরস্ক এবং ইউরোপীয় ফরাসী-সুইডিশ আন্তর্জাতিক সিমেন্ট ও নির্মাণ সামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লা ফার্জ হোলসিম কোম্পানির  মাধ্যমে জ্বালানী তেল ও পেট্রোলিয়ামের কালো বাজারে বিক্রি করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার কামিয়েছে। আর দায়েশ-তুর্কী তেল-চোরাচালানে স্বয়ং এরদোগানের ছেলে ও জামাতাও জড়িত  বলে জানা যায় এবং এরদোগানের ছেলে এ কারণেই দায়েশের তেলমন্ত্রী বলে খ্যাতি অর্জন করেছে। ইরাক সিরিয়া থেকে লুণ্ঠিত এ তেল তুরস্ক হয়ে চলে যেত ইসরাইলে এবং সেখান থেকে ইসরাইলের যেটুকু প্রয়োজন তা রেখে বাকি তেল সাপ্লাই দেয়া হতো বিশ্ব বাজারে। আর এভাবে সিরিয়া সংকটের বদৌলতে গড়ে উঠেছে ইরাক-সিরিয়ার তেল-সম্পদ লুণ্ঠন করে বিশ্ব তেলের কালো বাজারে তুর্কী-ইসরাইলি-পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর রমরমা ব্যবসা।
এ ছাড়া সিরিয়া সংকটের সুবাদে সেদেশে ঢুকে তুর্কী সীমান্তবর্তী সিরিয়ার কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চল কব্জা করতে পারলে তুরস্ক নিয়ন্ত্রিত কুর্দি প্রদেশগুলোর পিকেকে এবং অন্যান্য কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোর ভবিষ্যৎ বিদ্রোহ ও গোলযোগ দমন করাও তুরস্কের জন্য হয়তো বহুলাংশে সম্ভব হবে। আর সিরিয়ায় গোলযোগ ও সংকটে বাশার আল আসাদ সরকারের পতনে নোংরা-অশুভ-কুচক্রী  ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইলী-সৌদি-কাতারি অক্ষের সাথে সহযোগিতার সুবাদে সিরিয়ার বেশ কিছু অঞ্চল মালে গনিমত হিসেবে পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে ইরাকেও এ ধরণের মালে গনিমত পেতে পারে তুরস্ক। তা ছাড়া এ প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা ও সম্প্রসারণে এই অশুভ অক্ষের সাথে থেকে যদি ইয়েমেনসহ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা এমনকি ইরানেও ভবিষ্যতে মালে গনিমত পাওয়া যায় তাহলে মন্দ কি! ইরানে মালে গনিমত পাওয়ার অর্থ: সিরিয়া আর ইরাকে নোংরা-অশুভ-কুচক্রী ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইল-সৌদি-কাতারি অক্ষের ফিতনা, গোলযোগ, যুদ্ধ ও সংকট সৃষ্টির এক অন্যতম বৃহৎ বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ হচ্ছে ভবিষ্যতে ফিতনা, গোলযোগ, দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ ও সংকট বাধিয়ে ইরানকে ধরাশায়ী করা যা করতে পারলে ইসরাইলের চূড়ান্ত নিরাপত্তা বিধান সম্ভব হবে এবং সেইসাথে ইরানকে টুকরো টুকরো করে এর তেল-গ্যাস ও অন্যান্য খনিজসম্পদ সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই অক্ষ ও তার সহযোগী দেশগুলো তখন ইরানে তাদের মালে গনিমত লাভ করতে পারবে। কি মহাভয়ানক এ পরিকল্পনা যা সমেত জাহান্নামে যাক্ এই অপবিত্র-অশুভ-খবিস শয়তানি অক্ষ।
অপবিত্র-অশুভ-শয়তানি-খবিস মূল ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইলী অক্ষটি সৌদি আরব, কাতার, আমিরাত ও তুরস্কের শাসকচক্রকে বুঝিয়েছে ইসরাইল, আরব রাজন্যবর্গ ও তুরস্কের  যৌথ স্বার্থ সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত  করার জন্য প্রয়োজন সিরিয়া, ইরাক ও ইরানকে টুকরো টুকরো করা। আবার সেই সাথে হয়তো অশুভ অপবিত্র শয়তানি খবিস ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইলী অক্ষটি এরদোগানের কানে কানে বলে থাকতে পারে যে সিরিয়া সংকটে সহযোগিতা করলে এর নগদ আরেকটি পুরস্কার তুরস্কের জন্য অপেক্ষা করবে আর তা হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে  তুরস্কের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণ যা হচ্ছে এক কালের ‘সিক ম্যান অব ইউরোপ’ বলে খ্যাত তুরস্কের বহুযুগের লালিত স্বপ্ন এবং যা বহু বছর যাবত পাশ্চাত্য তুরস্কের সামনে মূলোর মত ঝুলিয়ে রেখে কেবল ফায়দাই লুটছে! আর এ থেকে পাশ্চাত্যের সর্বশেষ ফায়দা হচ্ছে এই যে বিশেষ প্রাণীর মুখের সামনে মুলো ঝুলিয়ে তাকে যেমন যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে চালনা করা যায় ঠিক তেমনি  তুর্কী প্রধানমন্ত্রী এরদোগানের সামনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের  মূলো ঝুলিয়ে তাকে সিরিয়ায় গোলযোগ ও সংকট সৃষ্টির পরিকল্পনায় শরিক করেছে পাশ্চাত্য! আসলে মূল অশুভ-অপবিত্র-খবিস-শয়তানি ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইলী অক্ষের আসল লক্ষ্য ও মহাপরিকল্পনা হচ্ছে শুধু সিরিয়া, ইরাক ও ইরানকেই নয় বরং সৌদি আরব, ইয়েমেন, তুরস্ক, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, মিসর, লিবিয়া (বর্তমানে তা বিজাতীয় ষড়যন্ত্রে তিন টুকরায় বিভক্ত হয়ে আছে),আলজেরিয়া, সুদান,তিউনিসিয়া, মরক্কো, নাইজেরিয়া, চাদ, ইন্দোনেশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকাসহ গোটা মুসলিম বিশ্বকে খণ্ড বিখণ্ড করে নতুন মধ্যপ্রাচ্য বা গ্রেটার মিডল ইস্ট (মরক্কো থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত প্রসারিত বৃহৎ মধ্যপ্রাচ্য) গঠন করা।
প্রখ্যাত ব্রিটিশ রাজনীতিজ্ঞ জর্জ গ্যালোওয়ের মতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ অটোম্যান সাম্রাজ্যকে ভেঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে ২২টি দুর্বল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল ১০০ বছর আগে। আর বর্তমানে পাশ্চাত্য (নয়া ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ) চাচ্ছে এই ২২টি দুর্বল রাষ্ট্রকে ভেঙ্গে আরও ৩০০টি অতি ক্ষুদ্র ও মহাদুর্বল রাষ্ট্র (রাজ্য বলাই শ্রেয়) প্রতিষ্ঠা করতে। তাহলে যেমন অতি সহজে ইসরাইলের অস্তিত্ব, নিরাপত্তা ও হেজেমোনি সুনিশ্চিত করা যাবে ঠিক তেমনি আরও অতি সহজে অত্র অঞ্চলের সমুদয় সম্পদ লুণ্ঠন এবং সব ধরণের সুযোগ সুবিধা ভোগ করা সম্ভব হবে। পাশ্চাত্য অর্থাৎ নয়া ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এটা হচ্ছে এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা জুড়ে দেশ ভাঙ্গা-গড়ার যে গোপন মহাপরিকল্পনা ও নীল নক্সা আছে সেটার প্রথম পর্যায় বা ধাপ।
এর পরবর্তী ধাপে রয়েছে ভারত ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াসহ ইউরেশিয়ার দেশগুলো বিশেষ করে রাশিয়া ও চীনের ভাঙ্গা-গড়ার প্রক্রিয়া। দেশ ভাঙ্গা-গড়ার প্রক্রিয়ায় লাতিন ও মধ্য আমেরিকার ঐ সব দেশ ও রাষ্ট্রগুলো সংযোজিত হতে পারে যেগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পটেনশিয়াল থ্রেট বা হুমকি স্বরূপ।
এ ভাঙ্গা-গড়ার সর্বশেষ ধাপ বা পর্যায়ে থাকতে পারে মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলো যেমন: জার্মানি, স্পেন,ফ্রান্স,বেলজিয়াম, ইতালি ইত্যাদি। স্পেনের বাস্ক ও ক্যাটালোনিয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন সক্রিয় এবং বেলজিয়ামে উত্তরাঞ্চলীয় ধনী ডাচ(ফ্লেমিং ফ্লেমিশ)জনগোষ্ঠীর সাথে দক্ষিণাঞ্চলীয় দরিদ্র ফরাসী ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব রয়েছে। এ ছাড়াও উত্তরের ধনী ডাচ জনগোষ্ঠী বেলজিয়াম থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়। আর ব্রেক্সিটের পর খোদ গ্রেট ব্রিটেন থেকে স্কটল্যান্ডের বের হয়ে যাওয়ার  আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। আর ব্রেক্সিটই প্রমাণ করে যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে ইঙ্গ-মার্কিন অক্ষ তেমন একটা আগ্রহী নয়।
ব্রেক্সিট যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মৃত্যু-ঘণ্টা তাতে সন্দেহ নেই। যা হোক এ ব্যাপারে আরও চিন্তা-ভাবনা,গবেষণা ও অধ্যয়নের দরকার আছে। পূর্ব ইউরোপকে উল্লেখ করা হয়নি এ কারণে যে, সেখানে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশে এ ভাঙ্গা-গড়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে যার সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে ইউক্রেন।
রেডিও তেহরান: কিন্তু জনাব মোহাম্মাদ মুনির হোসেন খান ইউক্রেনের ভাঙ্গনের জন্য রাশিয়াই কি দায়ী নয়?
মোহাম্মাদ মুনির হোসেন খান: অনেকে হয়তো বলতে পারে যে, ইউক্রেন থেকে ক্রিমিয়াকে রাশিয়া ছিনিয়ে নিয়েছে এবং ইউক্রেনের রুশ-ভাষাভাষী অঞ্চলটি রাশিয়ার উস্কানিতে কিয়েভের কাছ থেকে   বিচ্ছিন্ন হতে চাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য বলতে হয় পাশ্চাত্য বিশেষকরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোট অত্র অঞ্চলে রুশ প্রভাব খর্ব করার উদ্দেশ্যে  ইউক্রেনের নির্বাচিত রুশপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে কৃত্রিম গোলযোগ,সংকট ও ফিতনা সৃষ্টি করে এই সরকারের পতন ঘটিয়ে সেখানে  পাশ্চাত্যের একটি ধামাধরা সরকারকে ক্ষমতায় বসানোর কারণেই ইউক্রেনের   বর্তমান অবস্থার উদ্ভব হয়েছে। দেশটিতে আজ  ইউক্রাইনী ও রুশ ভাষাভাষীদের মধ্যে যে জাতিগত দ্বন্দ্ব হচ্ছে তার আসল উদগাতাই হচ্ছে পাশ্চাত্যের এ উস্কানিমূলক পদক্ষেপ। অত্র অঞ্চলসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে রুশ প্রভাব খর্ব করার পাশাপাশি খোদ রাশিয়াকেও বিশেষ করে দেশটির অর্থনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করা এবং আভ্যন্তরীণ গোলযোগ ও অশান্তির শিকার করে  রুশ জাতির জাগরণের প্রতীক ভ্লাদিমির পুতিনের ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকেও নষ্ট করার লক্ষ্যে রাশিয়াকে ইউক্রেইন সংকটের মূল হোতা বলে প্রচারের চেষ্টা করছে পাশ্চাত্য তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর এই অজুহাত দেখিয়েই রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ওয়াশিংটন। আর সম্ভবত: এটাই হচ্ছে ইউক্রেইন সংকটের নেপথ্য কারণ। আর কই পাশ্চাত্য কর্তৃক এই গোলযোগ সৃষ্টি এবং ইউক্রেনের ঘরোয়া বিষয়ে পাশ্চাত্যের অযাচিত হস্তক্ষেপের আগে তো দেশটি কখনও এ ধরণের ভাঙ্গা-গড়া প্রক্রিয়ার শিকার হয়নি।
রেডিও তেহরান: আমাদের সেই মূল প্রশ্নটি তথা সিরিয়া ইস্যুতে তুর্কি ভূমিকায় পরিবর্তনের পটভূমির কথা মাথায় রেখে দেশগুলোর ভাঙ্গা-গড়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আপনি কি আরও ব্যাখ্যা দেবেন?
মোহাম্মাদ মুনির হোসেন খান: যে কোন দেশ উল্লেখিত ভাঙ্গা-গড়া প্রক্রিয়ার শিকার হবে কি হবে না তা নির্ভর করে কতকগুলো কারণ বা ফ্যাক্টরের উপর যেগুলোর কিছু হচ্ছে অভ্যন্তরীণ (internal) অর্থাৎ দেশীয় এবং কিছু হচ্ছে  বাইরের বা বিদেশীদের সৃষ্ট (external) কারণ। আবার দেশীয় বা বিদেশী উভয় ধরণের ফ্যাক্টর বা কারণের কিছু হতে পারে সুপ্ত (dormant) অর্থাৎ সম্ভাবনাময় তথা বর্তমানে অনুদ্ভুত বা বর্তমানে বিরাজমান ও বিদ্যমান নয় তবে ভবিষ্যতে তার উদ্ভব হবে এবং কিছু হতে পারে বর্তমানে বিরাজমান ও বিদ্যমান। যদি কোন দেশ এসব কারণ মোকাবেলায় যথেষ্ট শক্তিশালী ও পর্যাপ্ত ক্ষমতার অধিকারী হয় তাহলে সে দেশ উক্ত ভাঙ্গা-গড়া প্রক্রিয়ার শিকার হবে না এবং নিজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হবে। আর এর অন্যথা হলে সেদেশের অস্তিত্ব সত্যি সত্যি বিপন্ন হবে। প্রতিটি দেশই- তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত মহাশক্তিধর পরাশক্তি হোক না কেন- এ ধরণের ভাঙ্গা-গড়া প্রক্রিয়ার যাবতীয় ফ্যাক্টরের সম্মুখীন হতে পারে যে কোন যুগ সন্ধিক্ষণে। আর এটাই হচ্ছে চরম ঐতিহাসিক সত্য ও ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম যার পুনরাবৃত্তি যুগে যুগে হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে।
সিরিয়ার ওপর দীর্ঘ ৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে সংকট চাপিয়ে দেয়ার পরও দেশটির পরিস্থিতি  অপবিত্র-অশুভ-শয়তানি-খবিস অক্ষটির অন্তর্ভুক্ত কোন একটি দেশের পক্ষে যায়নি। অর্থাৎ বাশার আল আসাদ সরকারের পতন ঘটেনি বরং এই সরকার টিকে রয়েছে।  আর রণাঙ্গনগুলোতে বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও দলগুলোর বিরুদ্ধে সিরিয় সরকারের উত্তরোত্তর বিজয় ও সাফল্য  অব্যাহত রয়েছে। সিরিয় সরকার বিরোধী সকল গ্রুপের মধ্যে ঐক্যও দেখা যাচ্ছে না। বরং তাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ  ক্রমেই বাড়ছে। বিভিন্ন সময় সিরিয়ায় বিভিন্ন অঞ্চল দখল ও পুনর্দখলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বিদ্রোহী তাকফিরি  সালাফি ওয়াহাবি  জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, দল, গ্রুপ ও মোর্চাগুলোর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংঘর্ষ ও যুদ্ধ হচ্ছে। এ পর্যন্ত বিদ্রোহী শিবিরের নানা গোষ্ঠী একে অপরের হাজার হাজার সমর্থক ও যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। সম্প্রতি (১৬-৫-২০১৭) বার্তা সংস্থাগুলোর খবরে জানা গেছে, সিরিয়ায় জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জাবহাতুন নুসরা এবং অপর একটি জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জাইশুল ইসলামের মধ্যকার সংঘর্ষে উভয় পক্ষেরই বহু যোদ্ধা ও সমর্থক হতাহত হয়েছে।
যে তুর্কি সরকার সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতন ঘটানোর জন্য নানা বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে মদদ দিয়েছে সেই তুর্কি সরকারই এখন সেইসব মদদের  ফলে সৃষ্ট মারাত্মক নানা পরিণতির শিকার হচ্ছে। যেমন, সিরিয়ায় পরাজিত বিভিন্ন জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর পলায়নপর সমর্থক, কর্মী ও যোদ্ধারা বিশেষ করে দায়েশের সন্ত্রাসীরা  সীমান্ত পেরিয়ে তুরস্কে ঢুকছে এবং তুরস্কের বিভিন্ন শহরে বিগত এক থেকে দেড় বছরে এসব জঙ্গিদের সন্ত্রাসী হামলায় ৩০০রও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ফলে তুরস্কের অভ্যন্তরীণ জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হয়েছে।
সিরিয়ার গোলযোগে তুর্কি সরকার ও সেদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর জড়িত থাকার সুযোগে হাজার হাজার তুর্কি যুবক সিরিয়ায় গিয়ে জঙ্গি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর তত্ত্বাবধানে অস্ত্র ও বোমা হামলা এবং সন্ত্রাসী কর্মতৎপরতার ট্রেনিং নিয়ে তুরস্কে ফিরে এসেছে। সিরিয়ায় কুবানিসহ কুর্দি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদ ও সহযোগিতায় সশস্ত্র সিরিয় কুর্দি গ্রুপ ও দলগুলো কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগে তুরস্কের কুর্দিস্তানে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিল ঘোষণা দিয়ে ‘পিকেকে’সহ বিভিন্ন কুর্দি বিচ্ছন্নতাবাদী গ্রুপ তুর্কি সরকার ও সেনাবাহিনীর উপর সশস্ত্র হামলা শুরু করেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ কর্তৃক প্রকাশিত বিশ্বের শীর্ষ সংঘাতময় ১০ দেশের তালিকায় তুরস্ক রয়েছে সপ্তম স্থানে। (দৈনিক যুগান্তর ১৩-৫-২০১৭ দ্রঃ)
২০১৫ সালের একদম শেষের দিকে তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে তুর্কী বিমান বাহিনী কর্তৃক একটি রুশ জঙ্গি বিমান ভূপাতিত হলে তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে রাজনৈতিক টানাপড়েন দেখা দেয়। ফলে রাশিয়া তুরস্কে সব রুশ পণ্য রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপকরে এবং রুশ পর্যটকদের তুরস্ক ভ্রমণ স্থগিত হয়।
এদিকে ২০১৬ সালের জুলাই মাসে এরদোগান সরকারের বিরুদ্ধে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ফাতহুল্লাহ গুলেন ও তার সংগঠনের জড়িত থাকাকে কেন্দ্র করে এরদোগান সরকার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য সন্দেহ ও আস্থাহীনতা বেড়ে যায়।  পার্লামেন্টারি পদ্ধতি থেকে প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থায় সরকার পরিচালনা পদ্ধতিতে অনুমোদন দানকারী গণভোটের আয়োজনকে কেন্দ্র করে পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে এরদোগান  সরকারের সম্পর্কে তীব্র অবনতি ঘটে। এরফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে তুরস্কের অন্তর্ভুক্তি একরকম অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আর এর আগে ২০১৩সালের জুন মাসে মিশরের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে সৌদি আরব ও কাতারের কামড়াকামড়ির জের ধরে সৌদি সমর্থিত জেনারেল সিসির সামরিক অভ্যুত্থানে তুরস্ক-কাতার সমর্থিত মুরসি সরকারের পতন ঘটে। আর এসবই ছিল এরদোগান সরকারের জন্য  এক একটি বড় ধাক্কা বা আঘাত।
সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ সরকারের পতন হলে দেশটিকে যে টুকরো টুকরো করে দেয়া হবে এবং আরব এই দেশ ভাঙ্গা-গড়া প্রক্রিয়ার পরবর্তী টার্গেট যে ইরান নয় বরং তুরস্ক -যার আলামতও ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে- তাতে এরদোগান সরকারের মনেও এখন কোন সন্দেহ নেই।  রাশিয়া আরোপিত রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা ও তুরস্কে রুশ পর্যটকদের আগমন স্থগিত হওয়ার কারণে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর রুশ বোমারু বিমান ভূপাতিত করার কারণে রাশিয়া কর্তৃক প্রতিশোধ গ্রহণের আশংকায়   হয়তো সিরিয়ায় অপবিত্র অশুভ শয়তানি খবিস ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইলী-প্রতিক্রিয়াশীল আরব অক্ষের সাথে জয়েন্ট অ্যাডভেনচারিজম বা  সম্মিলিত হঠকারী অভিযানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের  মোহ ভঙ্গ হয়ে থাকতে পারে!
এ ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নে তুরস্কের অন্তর্ভুক্তি বর্তমানে এক রকম অসম্ভব হয়ে পড়ায় ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় চীন-রাশিয়ার প্রাধান্যের সাংহাই জোট এবং ব্রাজিল-রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা নিয়ে সদ্য-গঠিত জোট ব্রিক্সে তুরস্কের অন্তর্ভুক্তি যাতে সহজ হয় সেজন্য হয়তো রাশিয়ার প্রস্তাবিত ও দামেস্ক-তেহরান সমর্থিত সিরিয়ায় ডিএস্কেলেশন বা উত্তেজনা-প্রশমণ জোন গঠন প্রক্রিয়ায় তুরস্ক সম্মত হয়ে থাকতে পারে। তবে শয়তানি খবিস ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইলী-আরব প্রতিক্রিয়াশীল অক্ষের কোন লোভনীয় টোপে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান  যে আবারও ডিগবাজী খাবেন না তা গ্যারান্টি দিয়ে বলার উপায় নেই!
রেডিও তেহরান: সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  তার মিত্রস্থানীয় মুসলিম দেশগুলোসহ যে কোন বড় মুসলিম দেশকে কেন খণ্ড বিখণ্ড করতে চায়?
মোহাম্মাদ মুনীর হোসেন খান: এ প্রশ্নের জবাবে বলতে হয়: মিত্র দেশগুলো যে ভবিষ্যতে শত্রুদেশে পরিণত হবে না এমন নিশ্চয়তা কি দেয়া সম্ভব? রাজতান্ত্রিক যুগে ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল এবং ইরানের শাহ-সরকারকে পারস্যোপসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ-সংরক্ষণকারী পুলিশ বলা হত। এ ছাড়াও  শাহ-শাসিত ইরান এককালে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দান সহ আরব-ইসরাইল যুদ্ধগুলোতে ইসরাইলের পক্ষাবলম্বন করেছিল এবং শাহ সরকার ইসরাইলে নিয়মিত তেল ( পেট্রোলিয়াম )রপ্তানি করত। অথচ সেই ইরান ১৯৭৯ সালে ইমাম খোমেনীর (র) নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পরে মার্কিন বলয় থেকে বের হয়ে এসে ৩৮ বছর ধরে পাশ্চাত্য বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং ইসরাইল বিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাই ইরান সেই থেকে আজ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে পাশ্চাত্য ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অবৈধ স্বার্থ ও হেজিমোনি বা একাধিপত্যের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ হুমকিস্বরূপ।
ইসলামী বিপ্লবের কল্যাণে ইরান আজ শক্তিশালী দেশ এবং আঞ্চলিক পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,পাশ্চাত্য ও ইসরাইলের কাছে মোটেও কাম্য নয়। তাই ভবিষ্যতে এ ধরণের ঘটনার আর যেন পুনরাবৃত্তি না হয় সেজন্য পাশ্চাত্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী ইসরাইল অর্থাৎ সেই অপবিত্র-অশুভ-খবিস-শয়তানি অক্ষ তাই আর রিস্ক নিতে চায় না এবং সেজন্য প্রথম পর্যায়ে শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে মধ্যপ্রাচ্যের সব মুসলিম দেশ বিশেষকরে যেসব দেশ বড় ও শক্তিশালী সেগুলোকে ভাঙ্গা-গড়া প্রক্রিয়ার শিকার করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশ ও জাতিতে বিভক্ত করে দিতে চাচ্ছে।
সুদান, লিবিয়া, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়াকে এ প্রক্রিয়ার মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে। যদিও ইরান ইয়েমেন, আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়াকে এধরণের ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া থেকে মুক্ত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং এ ক্ষেত্রে অনেক সাফল্যও অর্জন করেছে এবং আশা করা যায় যে এ জাতীয় সাফল্যার্জন অব্যাহত থাকবে এবং অশুভ অপবিত্র খবিস শয়তানি অক্ষের সকল অপচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র নস্যাৎ ও ভণ্ডুল হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানকেও হাঁটি-হাঁটি পা পা করে খণ্ড-বিখণ্ড করার দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর ন্যাটো জোটভুক্ত শক্তিশালী দেশ তুরস্ককেও দেশ ভাঙ্গা-গড়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রবেশ করানো হয়েছে যার আলামত প্রকাশিত হয়েছে তুরস্কের অন্তর্ভুক্ত কুর্দিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী পিকেকে।
Parstoday.com

0 comments:

Post a Comment